কিছুই মাথায় ঢুকছিল না সুধাকরের। অফিস গেল না, সোজা ঘরে চলে এল। সুবোধকে একটা ফোন করে দিল— তুই এখুনি একবার আমাদের বাড়ি চলে আয়, জরুরি কথা আছে।
বাড়িতে গিয়ে সুধাকর দেখল চন্দ্রা এখনও বাজার থেকে ফেরেনি। বসার ঘরে বসে অপেক্ষা করতে লাগল ছেলেটির। মনে মনে ভাবতে লাগল কী করবে এবার? কী ব্যবস্থা করবে ওর?
একটু পরে সুশান্ত ঘরে ঢুকতেই সুধাকর শিকারি বাঘের মতো তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কলার ধরে চেঁচিয়ে উঠল, “মিথ্যাবাদী, ঠগবাজ, ধাপ্পাবাজ কোথাকার! ছেলে সেজে আমাদের ঘরে ঢুকেছিস কী মতলবে? আমাদেরকে বশ করে টাকাকড়ি, গয়নাগাঁটি, সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার মতলব করেছিলি, না? সে গুড়ে বালি, তোর সব কেরামতি ধরা পড়ে গিয়েছে।’
আচমকা আক্রমণে হকচকিয়ে গিয়েছিল সূর্য। নিজেকে ছাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলতে লাগল, ‘আমি ঠগ জোচ্চোর নই। কোনও মতলবেও আসিনি। আমি কেবল…।’
—চোপ বদমায়েশ, একদম মিথ্যা কথা বলবি না। সত্যি করে বল, তুই আমাদের ছেলে সূর্য কিনা?
সুশান্ত ক্ষীণস্বরে বলল, ‘না, আমি সূর্য নই।’
—তাহলে কেন মিথ্যা কথা বলেছিলি? কেন মিথ্যা পরিচয় দিয়ে ঢুকেছিলি আমাদের ঘরে? কী ভেবেছিলি, আমরা ধরতে পারব না, সেই সুযোগে আমাদের সবকিছু আত্মসাৎ করে পালাবি, তাই না? বলে তার গালে দিল এক থাপ্পড়।
সুশান্ত নিজেকে সামলে মিনতি করে বলল, ‘আমি কোনও খারাপ মতলবে আসিনি। ডাক্তারকাকুর কথায় আপনাদের…।’
—চুপ কর বদমায়েশ, একদম মিথ্যা কথা বলবি না। আর তোর ষড়যন্ত্রে ডাক্তারকেও জড়াবি না। সত্যি করে বল তোর আসল মতলব কী? আর কার কার বাড়িতে এমন কীর্তি করেছিস?
—ও ঠিকই বলছে সুধাকর, মিথ্যা বলছে না।
চমকে উঠল সুধাকর। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল দরজায় দাঁড়িয়ে সুবোধ ডাক্তার, কখন এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি।
রাগের স্বরে বলল, ‘আরে জানিস না তুই, ও আমাদের সূর্য নয়, একটা ধাপ্পাবাজ, সূর্য সেজে এসেছে। এটা ওর পেশা, আরও অনেকের বাড়িতে এই কীর্তি করেছে। আজ হাতেনাতে ধরা পড়ে গিয়ে গল্প ফাঁদছে। আবার তোকেও জড়াচ্ছে এর মধ্যে।’
—আমাকে জড়াচ্ছে না বন্ধু। আর ব্যাপারটা আমার অজানাও নয়। সত্যি বলতে কী, আমিই ওকে নিয়ে এসেছিলাম তোদের কাছে৷
—কী বলছিস তুই? সুধাকর তো অবাক।
—ঠিকই বলছি। কিন্তু আগে ওর কলার ছেড়ে শান্ত হয়ে বোস, তারপর সব বলব।
দু’জনে সোফায় বসল। সুশান্ত দাঁড়িয়ে রইল অধোবদনে। তারপর সুবোধ ডাক্তার বলতে শুরু করল আসল ঘটনাটা।
—বউদির অবস্থা দিনদিন খারাপ হতে দেখে আমার খুব চিন্তা হচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম এভাবে চললে উনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না। ছেলের ফিরে আসাই একমাত্র পারে ওনাকে বাঁচাতে। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? এরই মধ্যে হঠাৎ আমার কানে এল আমার এক পুরোনো রোগীর কথা। তারও খানিকটা একইরকম কেস। এক ক্ষীণদৃষ্টি বৃদ্ধার একমাত্র অবলম্বন নাতনিকে দুর্ঘটনায় হারিয়ে খুবই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, মৃত্যু ত্বরান্বিত হচ্ছিল। তখন নাকি তার নাতনির মতো একটি মেয়ে তার নাতনি সেজে এসে বৃদ্ধাকে সারিয়ে তুলেছিল। যদিও তারপর বৃদ্ধা বেশিদিন বাঁচেননি। হঠাৎ ডেঙ্গিতে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু তার শেষ ক’টা বছর খুব আনন্দে কেটেছিল। তখন সেই মেয়ের খোঁজ করে করে আমি পৌঁছাই এই সুশান্তর কাছে। দেখলাম ওরা কয়েকজন ছেলেমেয়ে মিলে এইরকম বৃদ্ধবৃদ্ধাদের সেবা করে, তাদেরকে সারিয়ে তোলে। বিনিময়ে সামান্য কিছু অর্থ নেয় ওদের খরচ চালাবার জন্যে। ওদের পরার্থপরতা, বয়স্কদের প্রতি ওদের ভক্তিশ্রদ্ধা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তারপর যখন দেখলাম সুশান্তর সঙ্গে তোদের সূর্যের মুখের আদলে অনেকটা মিল আছে আর বয়সটাও সূর্য বেঁচে থাকলে এইরকমই হত, তখনই আমি ঠিক করি ওকে সূর্য সাজিয়ে তোদের বাড়িতে নিয়ে আসব। ওকে রাজি করিয়ে নির্দিষ্ট ফি জমা করে দিলাম। তারপর তোকে আমার দার্জিলিং বেড়াতে যাওয়ার এবং সেখানে খুঁজে পাওয়ার মিথ্যা গল্প ফেঁদে ওকে নিয়ে এসেছিলাম তোদের ঘরে। তারপর যা যা হয়েছে সবই তোর জানা। এবার তুইই ঠিক কর কী করবি? ওকে তাড়িয়ে দিবি, না পুলিশের হাতে দিবি। তবে হঠাৎ ও চলে গেলে বউদির মনের অবস্থাটা কী হবে সেটাও একটু মাথায় রাখিস।
—না না, তুই যা-ই বল, ও ঠকিয়েছে আমাদের। চন্দ্রাকে তো ঠকিয়েছেই, আমাকেও ঘুণাক্ষরে কিছু জানতে দেয়নি। ডেঞ্জারাস ছেলে ও, ওকে আমি পুলিসে দেব।
—না, ওকে কোথাও দেবে না তুমি।
পিছন ফিরে সুধাকর দেখে বাজারের ব্যাগ হাতে চন্দ্রাবলী দাঁড়িয়ে। সুধাকর বলল, ‘তুমি জানো না চন্দ্রা, ও আমাদের…।
—সূর্য নয়, তাই তো? সেটা আমি জানি।
—কী বলছ তুমি? সুধাকর তো হতবাক।
—ঠিকই বলছি গো। তবে সত্যিটা জেনেছি বেশ কিছুদিন পরে। ও যখন তোমার অফিসে গিয়ে বসতে রাজি হল না, আমি একটু আশ্চর্য হয়েছিলাম। তোমাদের অফিসে কাঁচাটাকার লেনদেন, তবুও গেল না কেন? আরও অবাক হলাম তোমার উইলে ওর নাম দিতে মানা করতে দেখে। অর্থ বা সম্পত্তি নিতে আবার কেউ অস্বীকার করে নাকি? নিজের ছেলেও না বলবে না। বুঝেছিলাম কিছু একটা ব্যাপার আছে। আর মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। যতই সূর্যর মতো দেখতে হোক, ও যে আমার সূর্য নয়, সেটাও আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারছিলাম। তখন একদিন আদর করে গায়ে হাত বুলিয়ে জেনে নিলাম আসল সত্যটা। ডাক্তারের কথায় ঝুঁকির পরোয়া না করে সূর্য হয়ে এসেছে আমার মতো এক মুমূর্ষু মানুষকে বাঁচাতে। অভিভূত হয়ে গেলাম আমি। ও যেভাবে সেবাযত্ন করে আমাকে সারিয়ে তুলেছে, আমার সূর্যের অভাব পূরণ করে অন্তরে মমতার ফল্গুধারা বইয়ে দিয়েছে, তার তুলনা হয় না। সেদিন মনে হল, আজ আমার সূর্য বেঁচে থাকলেও বোধহয় আমার জন্যে এতখানি করত না।
সব শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল সুধাকর। বলল, ‘তুমি তো এসব কিছুই বলোনি আমাকে?’
—কী আর বলব? বললে তুমি ওকে রাখতে? তখনই তাড়িয়ে দিতে।
স্বাভিমানে ঘা লাগল সুধাকরের। রাগের স্বরে বলল, ‘না, সে যাই হোক, ও যে মিথ্যাচার করেছে তার শাস্তি তো পেতেই হবে। ও আমাকে এসব কথা এতদিন বলেনি কেন?’
চন্দ্রাবলী ক্ষণিক তাকাল সুশান্তর দিকে। বেচারি মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। কৃত্রিম রাগের সুরে বলল, “ঠিকই বলেছ, শাস্তি তো ওকে পেতেই হবে। তবে সে শাস্তি আমি দেব।’
ডাক্তার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী শাস্তি দেবে বউদি?”
—ওর শাস্তি হল… আমার সূর্য হয়ে এই বাড়িতে ওকে বন্দি থাকতে হবে সারা জীবন। কখনও আমাকে ছেড়ে যাবে না। বলে সুশান্তর মাথাটা বুকে টেনে নিল।
আনন্দে ভরে উঠল ডাক্তারের মনটা। হাতের মোবাইল যে বেজে চলেছে সেদিকে খেয়াল ছিল না।
সুধাকরও সেই আনন্দের ছোঁয়াচ এড়াতে পারল না। এগিয়ে গিয়ে স্ত্রী-পুত্রকে আবদ্ধ করল উষ্ণ বাহুবন্ধনে।





