কারও ঘুমোনোর সময় খুবই কম, কেউ-বা আবার ঘুমোতে চেয়েও ঘুমোতে পারেন না। তবে কারণ যাইহোক, ঘুম কিন্তু জরুরি। কারণ, জীবনের তিনভাগের একভাগ সময় ঘুমোতে পারলে সুফল পাওয়া যায়। আসলে, সুস্থতার জন্য চাই আরামের ঘুম। তাই, কম ঘুমোনোর কী ফল হতে পারে কিংবা সুস্থতার জন্য কীভাবে, কতটা ঘুমোবেন, সেই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং পরামর্শ দিয়েছেন কনসালট্যান্ট পালমোনোলজিস্ট ডা. সুমিত কুমার দে।

সমীক্ষা অনুযায়ী বলা যায়, টানা সাত-আট ঘণ্টা না ঘুমোলে, মস্তিষ্কের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়। এভাবে দীর্ঘদিন না ঘুমোলে, বড়ো কোনও অসুখ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রসঙ্গত বলা যায়, প্রায় পঁয়তাল্লিশ শতাংশ মানুষ স্লিপ ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত।

আসলে, অনিদ্রা এমন এক সমস্যা, যার কুপ্রভাব পড়ে সারাজীবন। তাই বলা বাহুল্য, ঘুম এক অমূল্য সম্পদ। সারাদিনের ক্লান্তি দূরীভূত হয় ঘুমের মাধ্যমেই। খিদে, আনন্দ, ভয়, মৈথুন এবং নিদ্রা— এসব এমন এক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা প্রায় দমিয়ে রাখা যায় না৷

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ঘুম না হওয়ার জন্য মানসিক কারণই থাকে প্রধান ভূমিকায়। নানারকম মানসিক চাপের কারণে রাতে ঘুম আসে না। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। অবশ্য অনেকে কম ঘুমিয়েও ফ্রেশ থাকতে পারেন, তাই তাদের ব্যতিক্রম হিসাবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। তবে কম সময় ঘুমোলেও, যদি তা আরামের ঘুম হয়, তাহলে ক্ষতি নেই।

সাধারণ ভাবে নবজাতকের জন্য কুড়ি ঘণ্টা, ছয় থেকে সাত বছর বয়সিদের জন্য বারো ঘণ্টা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম জরুরি। তবে ৪৫ বছর বয়সের পর কিছুটা ঘুম কম হয় অনেকের, এতে অবশ্য তেমন কোনও ক্ষতি নেই। কারণ, বয়স বাড়লে ঘুমও কমে যায়। আর যা উল্লেখযোগ্য তা হল, দশ ঘণ্টা খারাপ ঘুমের পরিবর্তে, চার-পাঁচ ঘণ্টা আরামের ঘুম অনেক ভালো।

কম ঘুমের সমস্যা

ঘুম কম হলে শরীর ও মন দুই-ই খারাপ থাকে। সারাদিন ঝিমুনি ভাব থাকে এবং চনমনে থাকার অনুভূতিটাই নষ্ট হয়ে যায়। সব কাজে নিষ্ঠা ও একাগ্রতা কমে যায় এবং ভুল হতে থাকে। গ্যাস, মাথাব্যথা এবং দিনভর একপ্রকার শারীরিক অস্থিরতার সমস্যায় ভুগতে হয় ঘুম কম হলে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিন যদি ঘুম কম হতে থাকে, তাহলে ইমিউন সিস্টেম-এর উপর খারাপ প্রভাব পড়ে। এর ফলে, ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস, হার্ট-এর সমস্যা, ব্রেন স্ট্রোক, লিভার প্রভৃতির সমস্যায় ভুগতে হয়।

ঘুমচক্র

রাতে শোওয়ার পর, মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্তরের ভিন্ন ক্রিয়াকলাপ শুরু হয়। চোখ বন্ধ করার পর, হালকা ঘুম থেকে গভীর ঘুমে পৌঁছোনোর জন্য পাঁচটি স্টেজ আছে। আর এই ঘুমচক্রে গভীর ঘুমের স্তরে পৌঁছোতে সময় লাগে নব্বই মিনিট।

বর্তমানে ইলেক্ট্রোইন্‌সিফেলোগ্রাফ যন্ত্রের মাধ্যমে ঘুমের প্রকারভেদ করা যায়। তাই, ঘুম মূলত দুই প্রকার। একটিকে বলা হয়, প্রি-র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট অথবা অ্যাক্টিভ স্লিপ অথবা প্যারাডক্সিকল স্লিপ এবং অন্যটিকে বলা হয় নন-র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট। এই দ্বিতীয় পর্যায়টিতেই শুধুমাত্র আরামের ঘুম হয়।

আসলে চোখ বন্ধ করার পরেই শুরু হয় মস্তিষ্ক তরঙ্গ। যাকে আক্ষরিক অর্থে বলা হয় বিটা ওয়েভস্। তবে আরাম বাড়লে উৎপন্ন হয় আলফা ওয়েভস্। এই ওয়েভস্ সঞ্চারিত হলে গভীর ঘুম শুরু হয়। আর যদি ঠিকমতো ঘুম না হয়, অর্থাৎ ঘুমের মধ্যে যদি কোনও ভিস্যুয়াল তৈরি হয় (যাকে আমরা ‘স্বপ্ন দেখা’ বলে থাকি), তাহলে সেই অবস্থাকে বলে হিপনোগ্যাগিক হ্যাল্যুসিনেশনস।

ঘুমের নির্ধারিত সময়

শরীরের মাস্টার বায়োলজিক্যাল ক্লক-ই নিদ্রা ও জাগরণের সময় নির্ধারণ করে। আর এই ক্লক আলোর সংস্পর্শে এলে ঘুম বিঘ্নিত হয়, অর্থাৎ ঘুম ভেঙে যায়। এই ঘুমোনো এবং ঘুম ভাঙার প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম।

সময়েই ঘুমোনো উচিত। কারণ, রাত জাগার পর দিনে যত ঘণ্টাই ঘুমোন না কেন, তা শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য উপযোগী হবে না। অবশ্য রাতে কাজ এবং দিনে ঘুমোনোর দীর্ঘদিনের অভ্যাস হলে হয়তো খুব ক্ষতি হবে না। কিন্তু ঘন ঘন যদি এই অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটে তাহলেই বিপত্তি। কারণ দিনের আলোয় কাজ এবং রাতের অন্ধকারে ঘুমোনোর যে অভ্যেস রয়েছে আমাদের, তার ব্যতিক্রম হলে শরীর মানিয়ে নিতে পারবে না, কুফল দেবেই।

হালকা এবং গভীর ঘুমের সংজ্ঞা

ঘুমোনোর পর যদি দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে ঘুম ভেঙে যায় এবং আবার কিছুক্ষণ বাদে ঘুম পায়, তাহলে ওই অবস্থাকে হালকা ঘুম বলা হয়। আর যদি টানা ছয় থেকে আট ঘণ্টা আরামে ঘুমিয়ে ওঠা যায়, তাহলে তা গভীর ঘুমের লক্ষণ।

শোওয়ার সঠিক পদ্ধতি

শরীর এবং মনে আরামের অনুভূতি হলে তবেই বুঝতে হবে শোওয়ার ধরন ঠিক আছে। যাদের গভীর ঘুম হয়, তারা বারবার শোওয়ার ধরন বদলান না। তাই হাত-পা ছড়িয়ে নিশ্চিন্তে আরাম উপভোগ করতে করতে চোখ বন্ধ করতে হবে। শোওয়ার সময় বুকে (হার্ট-এ) কিংবা হাত, পা-এর স্ট্রং নার্ভ-এ যেন চাপ না পড়ে। কারণ রক্ত সঞ্চালন কিংবা হৃদস্পন্দনে বাধা পড়লে শারীরিক কষ্ট হবে এবং ঘুম ভেঙে যাবে।

ঘুম না হওয়ার সমস্যা

নানারকম কারণে ঘুম হয় না। দুশ্চিন্তা, শারীরিক চোট, বিভিন্ন শিফ্‌ট-এ কাজ করা, অধিক ভ্রমণ, নতুন নতুন পরিবেশে বসবাস, ধূমপান, দীর্ঘ রোগভোগের কারণে বেশি পরিমাণে ওষুধ সেবন প্রভৃতি কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। আর দীর্ঘদিন যদি ঘুম কম হতে থাকে, তাহলে নানারকম সমস্যা তৈরি হয়। কাজে অনীহা, চেহারায় উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যাওয়া, চুল পড়া, হজমের গণ্ডগোল ছাড়াও, একাধিক রোগের শিকার হওয়ার সম্ভবনা থাকে।

চিকিৎসা

স্বাভাবিক ঘুম না হওয়া মানেই অসুস্থতার লক্ষণ। ঘুমোনোর চেষ্টা করেও যদি ঘুমোতে না পারেন এবং তা যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা শুরু করা উচিত।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

ঘুম কোনও বিলাসিতা নয়। এটি একটি জৈবিক প্রয়োজনীয়তা। তবুও, ঘুমের ব্যাধি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কাজের চাপ, অতিরিক্ত স্ক্রিন এক্সপোজার, অনিয়মিত খাবারের সময় এবং নানারকম উদ্বেগ, স্বাভাবিক ঘুমচক্রকে ব্যাহত করে। তা সত্ত্বেও, ঘুমের সমস্যাগুলিকে প্রায়ই চিকিৎসাগত সমস্যা হিসাবে বিবেচনা না করে, জীবনযাত্রার সমস্যা হিসাবে উড়িয়ে দেওয়া হয়।

ঘুমের ব্যাধিগুলির মধ্যে অনিদ্রা, অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (OSA), রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম, সার্কাডিয়ান রিদম ডিসঅর্ডার এবং প্যারাসোমনিয়ার মতো রোগ উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে, অনিদ্রা এবং স্লিপ অ্যাপনিয়া ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রায় তিনজন ভারতীয়ের মধ্যে একজনের ঘুমের মান খারাপ।

ঘুমোতে অসুবিধা কিংবা ঘুমের ঘাটতি, বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে প্রকট হয়ে উঠছে। কাজের চাপ, রাতের শিফ্ট, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এবং গভীর রাতে মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার এর প্রধান কারণ। অনেক রোগী ওভার-দ্য-কাউন্টার ঘুমের ওষুধ এবং অ্যালকোহল গ্রহণের ফলে, আরও ক্ষতি করছেন নিজের স্বাস্থ্যের।

অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া আরও একটি প্রধান উদ্বেগ, বিশেষকরে ভারতে স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের সমস্যার কারণে। ঘুমের সময় বারবার শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যাঘাত, যার ফলে জোরে নাক ডাকা, দিনের বেলায় ক্লান্তি, সকালে মাথাব্যথা এবং মনোযোগের অভাব দেখা দেয়। দুর্ভাগ্যবশত, নাক ডাকাকে প্রায়ই ক্ষতিকারক, এমনকী হাস্যকর বিষয় করে তোলা হয়, যা চিকিৎসা মূল্যায়নে বিলম্ব ঘটায়। চিকিৎসা না করা স্লিপ অ্যাপনিয়া উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি করে চলেছে।

ঘুমের ব্যাধি কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যের উপরই কুপ্রভাব ফেলে না, মানসিক সুস্থতাকেও নষ্ট করে। দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা এবং কাজের দক্ষতা হ্রাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত। শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে ঘুমের অভাব বিরক্তি, আচরণগত সমস্যা এবং ঘুমের সমস্যা হিসাবে প্রকাশ পেতে পারে, যা ভুল রোগ নির্ণয়ের দিকে পরিচালিত করে। অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ, বেশি রাতে স্ক্রিন ব্যবহার প্রভৃতি ঘুমের সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।

ভারতের মহিলারাও ঘুমের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তন, মেনোপজ এবং থাইরয়েড-এর সমস্যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তবুও মহিলারা প্রায়ই তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্যের চেয়ে পারিবারিক দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেন, লক্ষণগুলি তীব্র হলেই কেবল চিকিৎসা সহায়তা চান। একই ভাবে, স্লিপ অ্যাপনিয়া, রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম-এর চিকিৎসা না করে, এই সমস্যাগুলিকে প্রায়ই বার্ধক্যের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসাবে ভেবে নেওয়া হয়। আসলে, ভারতে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে একটি হল সচেতনতার অভাব। তাই, ঘুমের সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।

এক্ষেত্রে জেনে রাখুন, বেশিরভাগ ঘুমের ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারে ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি পরামর্শ, অনিদ্রার জন্য আচরণগত থেরাপি, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ওষুধ। এছাড়া, জীবনশৈলীর পরিবর্তন, নিয়মিত সঠিক সময়ে ঘুম, ঘুমের আগে স্ক্রিনের সংস্পর্শে আসা কমানো, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতিকে মাধ্যম করা যেতে পারে চিকিৎসার ক্ষেত্রে।

ভারতীয় প্রেক্ষাপটে, ঘুমের ব্যাধি মোকাবিলার জন্য মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়ামের পাশাপাশি, ঘুমকে স্বাস্থ্যের একটি স্তম্ভ হিসেবে ধরে নিতে হবে। জনসচেতনতামূলক প্রচার, বিশ্রামকে গুরুত্ব দেওয়া, স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস সম্পর্কে স্কুল শিক্ষা এবং নিয়মিত হেল্থ চেক-আপ প্রভৃতি সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...