বিশ্বের অন্যতম রৌদ্রোজ্জ্বল দেশ ভারত, তবুও ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিতে ভুগছে, যা অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুলপড়ুয়া, কর্মজীবী, গর্ভবতী মহিলা এবং বয়স্ক নাগরিকদের রক্ত পরীক্ষায় বারবার ভিটামিন ডি-র মাত্রা উদ্বেগজনক ভাবে কম দেখা যাচ্ছে। এই ঘাটতি কোনও ছোটোখাটো পুষ্টির সমস্যার মতো বিষয় নয়, এটি হাড়ের স্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, পেশি শক্তি, মানসিক সুস্থতা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকির উপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ফর্টিস হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. জয়দীপ ঘোষ।
শরীরে ভিটামিন ডি-র গুরুত্ব
ভিটামিন ডি একটি সাধারণ ভিটামিনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ— এটি হরমোনের মতো কাজ করে, শরীরে ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, হাড় ও দাঁতকে শক্তিশালী করে, পেশিশক্তিকে স্বাভাবিক রাখে, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং রোগ প্রতিরোধক কোষগুলিকে সক্রিয় করে। পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি ছাড়া, শরীর সঠিক ভাবে ক্যালসিয়াম ব্যবহার করতে পারে না। ভিটামিন ডি-র ঘাটতির ফলে হাড় দুর্বল, পিঠে ব্যথা, ক্লান্তি, পেশিতে খিঁচুনি, ঘন ঘন সংক্রমণ এবং ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
পরিহাসের বিষয় হল, এই সংকট এমন একটি দেশেও দেখা দিচ্ছে, যেখানে প্রচুর সূর্যালোক পাওয়া যায়। অর্থাৎ, প্রাকৃতিক সূর্যালোকের সংস্পর্শ নাটকীয় ভাবে কমিয়ে দিয়েছে আধুনিক ভারতীয় জীবনযাত্রা। বেশিরভাগ মানুষ অফিস, বাড়ি, স্কুল এবং যানবাহনের ভিতরেই দিন কাটান এবং বাইরে বেরোনোর সময় লম্বা পোশাক, ছাতা, সানস্ক্রিন অথবা বায়ু দূষণের কারণে তারা সূর্যালোক থেকে দূরে থাকেন। এছাড়াও, ভারতীয় ত্বকে মেলানিনের পরিমাণ বেশি থাকে, যা স্বাভাবিক ভাবেই অতিবেগুনি রশ্মিকে বাধা দেয়। যার অর্থ হল, ফর্সা ত্বকের মতো কালো ত্বকে একই পরিমাণ ভিটামিন ডি উৎপাদনের জন্য উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি সূর্যালোকের প্রয়োজন হয়। ক্রমবর্ধমান স্থূলতাও এতে প্রভাব ফেলে, কারণ ভিটামিন ডি চর্বিযুক্ত টিস্যুতে আটকে যায় এবং সমস্যা তৈরি করে। সেইসঙ্গে, এই কারণগুলি ভিটামিন ডি-র অভাবের একটি নীরব মহামারী তৈরি করেছে।
হাড়ের স্বাস্থ্যের বাইরেও, ভিটামিন ডি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি রোগ প্রতিরোধক কোষগুলিকে সক্রিয় করে, যা শরীরকে ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে এবং টিস্যুগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন অত্যধিক কুপ্রদাহ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ডি-র ঘাটতি ঘন ঘন শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, ধীর নিরাময়, এমনকী অকারণে শারীরিক ক্লান্তি তৈরি করে। অতএব, শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি বজায় রাখা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ভিটামিন ডি-র ঘাটতির লক্ষণ
ভিটামিন ডি-র অভাব সহজে বোঝা যায় না, কারণ এর লক্ষণগুলি অস্পষ্ট এবং দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে সহজেই উপেক্ষা করা হয়। ক্রমাগত ক্লান্তি, হাড় এবং পিঠে ব্যথা, পেশি দুর্বলতা, চুল পড়া, মেজাজ হারানো, ঘন ঘন সংক্রমণ এবং বিলম্বে সুস্থতা প্রভৃতি সাধারণ লক্ষণগুলি দেখা যায়। ডায়াবেটিস, থাইরয়েড রোগ, স্থূলতা, অস্টিওপোরোসিস, অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা, অথবা যারা গর্ভবতী কিংবা যাদের মেনোপজ হয়ে গেছে, তাদের নিয়মিত ভিটামিন ডি-র পরীক্ষা করা উচিত।
ভিটামিন ডি-র মূল উৎস
ভিটামিন ডি-র সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রাকৃতিক উৎস হল সূর্যের আলো। যখন স্বাভাবিক মাত্রায় অতিবেগুনি বি রশ্মি সরাসরি খালি ত্বকের উপর পড়ে, তখন শরীরে ভিটামিন ডি-থ্রি উৎপাদন শুরু করে, যা পরবর্তীতে লিভার এবং কিডনি দ্বারা সক্রিয় হয়। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি যে-কোনও ওষুধ কিংবা খাবারের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। তবে, সমস্ত সূর্যের আলো কাজ করে না। শুধুমাত্র তীব্র, সরাসরি দুপুরের সূর্যের আলো, অর্থাৎ সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩-টের মধ্যে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরি করে। ভোরবেলা এবং বিকেলের সূর্যের আলোতে পর্যাপ্ত UVB রশ্মি থাকে না। তাই, সপ্তাহে কমপক্ষে চার বা পাঁচবার মুখ, বাহু এবং পা দুপুরের সূর্যের আলোতে অন্তত ২০ থেকে ৪০ মিনিট ধরে উন্মুক্ত রেখে, শরীরে ভিটামিন ডি গ্রহণ করে সুস্থ, স্বাভাবিক থাকতে হবে।
শুধু খাবার থেকে ভিটামিন ডি সংগ্রহ করে ভিটামিন ডি-র অভাব পূরণ করা যায় না। কারণ, খুব কম খাবারেই প্রাকৃতিক ভাবে ভিটামিন ডি থাকে। স্যামন, সার্ডিন, টুনা এবং ম্যাকেরেলের মতো চর্বিযুক্ত মাছ ভিটামিন ডি-র সবচেয়ে সমৃদ্ধ উৎসগুলির মধ্যে একটি। এছাড়া, ডিমের কুসুম, কড লিভার তেল, দুধ, দই ইত্যাদি ভিটামিন ডি-র অতিরিক্ত উৎস। তবে নিরামিষ খাবারগুলিতে ভিটামিন ডি-র পরিমাণ কম থাকে। সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসা মাশরুমগুলিতে অল্প পরিমাণে ভিটামিন ডি থাকে। তবে সামগ্রিক ভাবে, পর্যাপ্ত সূর্যালোক ছাড়া খাদ্য উৎসগুলি শরীরের ভিটামিন ডি-র চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।
চিকিৎসার সঠিক উপায়
যখন রক্ত পরীক্ষায় ভিটামিন ডি-র ঘাটতির মাত্রা উদ্বেগজনক হয়, তখন কেবল সূর্যের আলো এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে সেই সমস্যার দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়। চিকিৎসকেরা সাধারণত কয়েক সপ্তাহ ধরে উচ্চ-মাত্রার ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট লিখে দেন, যাতে ক্ষয়প্রাপ্ত ভাণ্ডার পূরণ করা যায়। সঠিক ভাবে তত্ত্বাবধানে থাকলে এই চিকিৎসা পদ্ধতি নিরাপদ এবং কার্যকর। যেহেতু ভিটামিন ডি চর্বিতে দ্রবণীয়, তাই পর্যবেক্ষণ ছাড়াই অতিরিক্ত গ্রহণ ক্ষতিকারক। ভিটামিন ডি-র মাত্রা সঠিক না হলে, ক্যালসিয়াম-এর ভারসাম্যহীনতা এবং কিডনির সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই, ভিটামিন ডি-র পরিপূরক গ্রহণ সর্বদা একজন চিকিৎসকের নির্দেশে করা উচিত।
একজন চিকিৎসকের দৃষ্টিকোণ থেকে, ভিটামিন ডি-কে অপরিহার্য ‘সূর্য থেকে প্রাপ্ত পুষ্টি’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হল— নিয়মিত দুপুরের রোদে থাকা, পর্যায়ক্রমে রক্ত পরীক্ষা করা, প্রয়োজনে উপযুক্ত পরিপূরক গ্রহণ করা এবং খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ এবং সুরক্ষিত খাবার অন্তর্ভুক্ত করা। ভিটামিন ডি-র ঘাটতি হলে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ, যারা ভিটামিন ডি-র ঘাটতি অবহেলা করে চলেছেন, তারা নিজেদের অজান্তেই তাদের হাড়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে দুর্বল করে দিচ্ছেন।





