দীপক
ন’টা পঁয়ত্রিশে ট্রেন।
তাড়াহুড়ো করে বাথরুমে ঢুকতে যাব এমন সময় মোবাইলে টুং-টাং শব্দ। কালো স্ক্রিন আলো করে জ্বলে উঠল এক আননোন নাম্বার —আমি কি দীপকবাবুর সঙ্গে কথা বলছি? কিছুটা বিরক্ত মনে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল কুণ্ঠিত কথাগুলি।
—হ্যাঁ, বলছি। আপনি কে বলছেন?
—আমি হরিহর ঘোষ। আমাকে আপনি চিনবেন না। খুব বিপদে পড়ে ফোন করছি। ভদ্রলোক ইতস্তত করে চুপ করলেন।
—বিপদ! আমি ঠিক…
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘড়ঘড়ে গলা ধাক্কা দিল কানে, ‘হ্যাঁ, খুবই সমস্যায় পড়েছি। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’
—কী ব্যাপার বলুন তো? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না! আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে না তো? হয়তো রং নাম্বার!
—ফোনটা কাটবেন না দয়া করে। আপনি সাহেবগঞ্জ হাইস্কুলের ইতিহাসের মাস্টারমশাই দীপক বোস বলছেন তো? তাড়াতাড়ি বলে উঠল ওপাশের হরিহর।
—হ্যাঁ ৷ কিন্তু…
—আমি আপনাকেই চাইছি।
—আচ্ছা, বলুন। বিরক্তি গোপন করলাম৷ ঘড়ির কাঁটা লাফিয়ে লাফিয়ে এগোচ্ছে। ট্রেন মিস করলে প্রার্থনার আগে স্কুলে ঢুকতে পারব না।
—একটু সাহায্য করুন প্লিজ। আপনি সাহায্য করলে হয়তো… ভদ্রলোক আবার মাঝপথে থামলেন! ঠিক আছে, যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন? আমাকে এখনই বেরোতে হবে। হাতে বেশি সময় নেই। নিজের অজান্তেই বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে কথাগুলো বেরিয়ে গেল মুখ থেকে। ফোনে সব কথা গুছিয়ে বলতে পারব না। একটিবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
—আচ্ছা ঝামেলায় পড়লাম! আপনি কোথা থেকে বলছেন?
—তাতালপুর। সেন্ট্রাল বাসস্ট্যান্ড থেকে পূর্বদিকে যে রাস্তাটা গেছে, সেটা ধরে কিছুটা….
—হুম, বুঝেছি। আমি তাতালপুর জানি। ওখানেই নতুন স্টেডিয়াম হচ্ছে না?
—হ্যাঁ স্যার, ওই স্টেডিয়ামের পিছনেই আমার বাড়ি। আমি সামান্য কয়েকটি কথা মুখোমুখি আপনাকে বলব। বেশিক্ষণ সময় নেব না। আপনি যেখানে বলবেন, আমি চলে যাব।
—সন্ধের দিকে স্টেশনে আসতে পারবেন?
ভদ্রলোকের কাতর কণ্ঠস্বর আর এড়াতে পারলাম না।
—অবশ্যই পারব।
—তাহলে স্টেশনে ঢোকার মুখে পিন্টুর চায়ের দোকানে আমার খোঁজ করবেন। ওখানেই থাকব।
—ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার।
ফোন-লাইন কেটে দেবার পরও ‘বিপদ’ শব্দটা থমকে রইল মাথার মধ্যে। কীসের বিপদ? ওর বিপদে আমি কী করব? নাম, হরিহর ঘোষ৷ কে লোকটা? এই নামের কাউকে চিনি বলে তো মনে হচ্ছে না। আজকাল চারিদিকে যা সব ঘটনা ঘটছে। অপরিচিত লোকের সঙ্গে হুটহাট দেখা করাও চাপের। চিন্তিত মনে, তেল সাবান নিয়ে বাথরুমে ঢুকতে যাব, আবার মোবাইলে টুং-টাং শব্দ! স্ক্রিনের উপর দপদপ করছে দুটি অক্ষর— এইচএম। এই অসময়ে আবার হেডমাস্টার কেন? নিশ্চয় স্কুলে নতুন কিছু….
হরিহর
—তিনশো টাকায় হবে না? অল্পবয়সী বউটি শাড়িটা উলটে-পালটে দেখতে দেখতে বলল। বোঝা যাচ্ছে, পছন্দ হয়েছে।
—না, দিদিভাই৷ পাঁচশো টাকার শাড়ি তিনশোতে পারব না। অত কি লাভ থাকে?
—খুব পারবে? তুমি চাইলেই পারবে। শাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে দেহাতি আঁটোসাঁটো গড়নের পাশের মেয়েটি বলল। বোধহয় খুড়তুতো-জাড়তুতো বোন।
—পাঁচশো-র কমে পারব না। তুমি গায়ের কাজগুলো দেখো। আঁচলের নকশা দেখেছ! এ জিনিস তিনশো টাকায় তুমি কোথায় পাবে?
—না, কাকা অত টাকা সঙ্গে আনিনি। পরে নেব, বউটি বলল। কিছুটা হতাশ, কিছুটা ক্ষুণ্ণ মনে চলে গেল ওরা।
দশ-বিশ টাকা কমিয়ে একটু চেষ্টা করা যেত। কিন্তু এই বয়সে দরদাম, টানাহ্যাঁচড়া আর ভালো লাগে না। হয়তো ভাবল, আমি ইচ্ছে করেই দিলাম না। ওরা বোঝে না, আজকাল জামাকাপড়ে আর আগের মতো লাভ থাকে না। ওদেরও দোষ দেওয়া যায় না। মানুষের হাতে টাকা নেই। আমাদের এই দক্ষিণে বেচাকেনা অনেকটাই নির্ভর করে আলুর উপর। সেই আলুই এবছর ডুবিয়েছে। মাথা বাঁচানোই মুশকিল। ব্যাবসার অবস্থাও ভালো নয়। এধার-ওধার করে নতুন কিছু মাল নামালাম। পুরোটাই জলে গেল মনে হচ্ছে!
আমার কপালটাই খারাপ। নইলে এত ভালো সম্বন্ধ এভাবে ভেঙে যায়! কত জায়গাতে যোগাযোগ হল। কোথাও কিছু হচ্ছিল না। সবাই শেষপর্যন্ত ‘আমরা আর একটু ফরসা মেয়ে চাইছি’- -বলে এড়িয়ে যাচ্ছিল। সকলেই ফরসা, সুন্দরী মেয়ে চায়। পড়াশোনা, আচার-আচরণ, রীতিনীতির কোনও মূল্য নেই এখন। বাংলা সাহিত্যে রেগুলারে এমএ। ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড। গানে, রাজ্যস্তরের পুরস্কার। রান্না-বান্না, সেলাই- ফোঁড়া— এসবের কোনও দাম নেই এখনকার ছেলেদের কাছে! ফরসা রংটাই সব!
ওরা কিন্তু দেখতে এসেই বিয়েতে রাজি হয়ে গেল। ছেলেটি হাইস্কুল মাস্টার। মৌসুমিকে ওদের খুব পছন্দ হল। তবে, নগদ পাঁচ লক্ষ টাকা, দশ ভরি সোনা দাবি করে বসল। আমার এই সামান্য কাপড়ের ব্যাবসা। এতসব দেওয়ার সামর্থ্য কোথায়? প্রথমে ভেবেছিলাম পিছিয়ে আসব। পরে মনে হল, ওই একটিই মেয়ে, কষ্ট করে টাকাগুলো জোগাড় করতে পারলে মেয়েটার সারাজীবনের মতো একটা হিল্লে হবে। ও সুখে থাকবে। আমরা বুড়োবুড়িও নিশ্চিন্ত হব। দেশে যে সামান্য জমি-জমা ছিল, বেচে দিলাম। বাকিটা ধারদেনা। এরই মধ্যে পাকাদেখা, লগ্নপত্র, দিনক্ষণ সব ঠিক হয়ে গেল। আমি নিশ্চিন্ত মনে ওদের হাতে নগদ দু-লক্ষ টাকা তুলে দিলাম। লজ, প্যান্ডেল, গাড়ি, ক্যাটারার — বুকিং করলাম তাড়াতাড়ি। হাতে সময় কম। কিন্তু বিনামেঘে বজ্রপাত! হঠাৎ একদিন বিকেলবেলা পাত্রপক্ষ লোক মারফত টাকা ফেরত পাঠিয়ে জানাল, তারা এ বিয়েতে রাজি নয়।
সারারাত ঘুম হয়নি। মনে হচ্ছিল বুকের হাড়গোড়গুলো যেন দুমড়ে গেল। পরদিনই ছুটলাম ওদের বাড়ি। কেউ দেখা করল না। কাজের মেয়ে বাইরে এসে বলল, বাড়িতে কেউ নেই। মিথ্যে কথা। ফোনের সুইচ-অফ। হাজার ছুটোছুটি করেও কোনওভাবে যোগাযোগ করা গেল না। পাত্তাই দিল না কেউ। কেন, কী কারণে রাজি নয়? এভাবে বিয়ে ভেঙে দেওয়ার কারণই বা কী? সব ধোঁয়াশা!
এসব কথা কাউকে বলার নয়। বললেও কেউ বিশ্বাস করে না। সেদিন দীপকবাবুও প্রথমে বিশ্বাস করেনি। অবিশ্বাসী গলায় বলেছিলেন, আজকের দিনেও এমন ঘটনা ঘটে?
ফোনে কথা বলে একটু মেজাজি মনে হয়েছিল ভদ্রলোককে। কিন্তু মুখোমুখি দেখে অন্যরকম মনে হল এঁকে। আসলে মানুষের মুখ আর মন এক নয়। মন অনেকটা টইটম্বুর দিঘির মতো। বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না। ডুব দিলে তবেই ধরা পড়ে, ভিতরে অমৃত আছে না গরল। সব শুনে উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘আপনার ঘটক কী করছে? তাকে ধরুন।’
(ক্রমশ…)





