—ঘটকের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়নি। ওরা পেপারে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। তাই দেখে যোগাযোগ করেছিলাম।

—আপনি থানাতে পুরো ব্যাপারটা জানান। আমি যতদূর জানি, কাগজ-কলম হয়ে যাওয়ার পর এভাবে বিয়ে ভেঙে দেওয়া যায় না। চাইলে লোকাল পার্টি অফিসেও যোগাযোগ করতে পারেন, ওরাও এ ব্যাপারে…

—তাতে কী লাভ হবে? আমার মেয়েটাকে নিয়ে টানাটানি করবে সবাই। আমি শুধু জানতে চাই কেন ওরা পিছিয়ে গেল? ওদের কি আরও কোনও দাবিদাওয়া…। গলা বুজে এল। হাঁপানির টানটা বেড়েছে।

—কিন্তু এক্ষেত্রে আমি কী করতে পারি বলুন? আমকে এসব কথা…? ভদ্রলোক কথার মাঝে চুপ করলেন আমার দিকে তাকিয়ে। –আমার অনুরোধ, আপনি একবার পাত্রের সঙ্গে কথা বলুন। কেন ওরা…

—আমি কথা বলব! আমি কী করে কথা বলব? কী বলছেন আপনি!

—পাত্র, সুবীর পাল। আপনার স্কুলের শিক্ষক। আপনারই সহকর্মী।

দীপকবাবু অবাক চোখে তাকালেন। মনে হল, আমার কথা বিশ্বাস করলেন না। আমি নতুন ছাপানো বিয়ের কার্ডটা ওঁর হাতে দিলাম। সুবীর বছর দুয়েক আগে জয়েন করেছে। কেমেস্ট্রির টিচার। লম্বা-চওড়া স্বাস্থ্যবান ছেলে। একটু চুপচাপ। তবে, সহকর্মী বা ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আচার-ব্যবহারে কোনও ত্রুটি নেই। আজ পর্যন্ত কখনও একটা পান, সিগারেট খেতে দেখিনি। ভালো ছেলে। সেই সুবীর এমনটা করল! কার্ডটা আমার হাতে ফেরত দিয়ে ভদ্রলোক নিজের মনেই কথাগুলি বলেলেন।

—আপনি একবার ওর সঙ্গে কথা বলুন। কেন ওরা এমন করল। মৌসুমিকে তো পছন্দ করে বিয়েতে রাজি হয়েছিল। সেই মতো আমি এগিয়েছি। বুকটা ধড়পড় করছে। আজকাল একটানা কথা বললেই এরকম হচ্ছে। শরীরের কলকব্জাগুলো নড়বড়ে হয়ে আসছে। শরীরের আর কী দোষ। সামনের ফাল্গুনে বাষট্টিতে পা দেব। উচ্চমাধ্যমিকের পর থেকে একটানা সার্ভিস দিচ্ছে এই পাঁচ-আটের খাঁচা। একসময় মাথায় জিনিস নিয়ে বাড়ি-বাড়ি ফেরি করতে হয়েছে দু’বেলা দু’মুঠোর জন্য। সেখান থেকে একটু একটু করে এই শহরে জায়গা, বাড়ি, দোকান। আমার মতো সাধারণের এক জীবনে এর থেকে বেশি কী হবে। শুধু মেয়েটাকে একটা ভালো ছেলের হাতে তুলে দিতে পারলেই নিশ্চিন্তে চোখ বুজতে পারি।

—দেখুন; দেখাশোনা, বিয়ে— এগুলো একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এর সঙ্গে নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ, রীতিনীতি, জাতপাত জড়িয়ে আছে। সুবীরের সঙ্গে সহকর্মী হিসাবে সম্পর্ক আমার খুবই ভালো। কিন্তু তাই বলে তার ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা ঠিক হবে না। কথা ক’টি বলে দীপকবাবু চিন্তিত মনে চুপ করলেন।

—না না, তা কেন করবেন! আপনাদের মধ্যে কোনওরূপ মনোমালিন্য হোক আমি চাই না। আপনি শুধু একটিবার ওর সঙ্গে কথা বলুন। কেন বিয়ে ভেঙে দিতে চাইছে? কী এমন ঘটল? অনেক খোঁজাখুঁজি করে আপনাকে পেয়েছি। এই শহরে সাহেবগঞ্জ হাইস্কুলের আর কেউ থাকে না। তাই বাধ্য হয়েই আপনাকে ফোন করেছিলাম। আপনি একবার কথা বলুন। ওদের কি আরও কোনও দাবিদাওয়া আছে কিনা? যদি থাকে আমি দেওয়ার চেষ্টা করব। এখন দিতে না পারলেও, পরে-পরে দিয়ে দেব। এই অবস্থায় যদি বিয়ে ভেঙে যায়, আমি আর কখনও ওই মেয়ের বিয়ে দিতে পারব না। বদনাম রটে যাবে। অন্য কেউ রাজি হবে না বিয়েতে।

হাতদুটো ধরে অনুরোধ করেছিলাম। আর কিবা করতে পারি। সবই আমার ভাগ্য। আমরা খেটে খাওয়া গরিব মানুষ। তার উপর মেয়ের রং কালো। আমাদেরকে তো ভুগতে হবেই।

—ও হরি দাদু, দোকান কখন বন্ধ করবে? চান-টান করে খাওয়া-দাওয়ার কি ইচ্ছা নেই? সামনের চায়ের দোকান থেকে ফটিকের গলা। ছোঁড়া বড্ড জ্বালায়। ভালোওবাসে। ওকে দেখলেই বুকটা টনটন করে। মনোহরের মুখটি কেটে বসানো। পড়াশোনায় দারুণ মাথা ছিল ভাইটার। সেবার মাধ্যমিকে জেলাতে ফার্স্ট হল। চারটে বিষয়ে লেটার। চোখে অনেক স্বপ্ন। সব গোলমাল হয়ে গেল বাবা হঠাৎ চলে যেতেই। পড়াশোনা ছেড়ে আমি রোজগারের ধান্দায় ছুটলাম। ভাইটা কেমন যেন হয়ে গেল। সমস্যা তৈরি হল মাথায়। যতদিন মা ছিল ধরে বেঁধে রাখত। দু-বছরের মাথায় মা চলে যেতেই ছেলেটা ঘরছাড়া হল! এখানে সেখানে পড়ে থাকত। তারপর হঠাৎ একদিন নিখোঁজ। তখন যদি ভালো করে খোঁজখবর করা হতো তাহলে হয়তো…। দেশের জমি বাড়ির উপর তারও তো সমান অধিকার ছিল। ও দাদু…? আবার ফটিকের গলা। সত্যিই অনেক বেলা হয়েছে। তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়ে চোখের সামনে মনোহরের মুখটা ভেসে উঠেই সব অন্ধকার…!

মৌসুমি

আর কতক্ষণ দাঁড়াতে হবে কে জানে? সবাই মুখের দিকে হাঁ করে দেখছে। কেউ-কেউ চোখে দিয়ে পেট বুক চেটে নিচ্ছে। চোখ তো নয়, যেন এক্স-রে মেশিন! পিন্টু অবশ্য ভিতরেই বসতে বলেছিল। দোকানের মধ্যে, অতগুলো লোকের সামনে বসতে ইচ্ছা করল না। এখন মনে হচ্ছে ভিতরে বসলেই ভালো হতো।

—দীপকদা, একটি মেয়ে তোমার খোঁজ করছিল। দোকানের ভিতরে পিন্টুর গলা।

—মেয়ে! কে রে? কী নাম? গমগমে গলা দোকানের হট্টগোল ছাপিয়ে কানে এল।

—নাম বলেনি। বাইরে তোমার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে।

কথাবার্তা শুনে দোকানে ঢুকব কি না ইতস্তত করছি, এমন সময় ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। একমাথা কোঁকড়ানো চুল। চোখে আধুনিক স্টাইলের কালো ফ্রেমের চশমা। ঝরঝরে চেহারা। বুদ্ধিদীপ্ত মুখ। বয়স তিরিশ থেকে পঁইত্রিশের মধ্যে। ইনিই তাহলে দীপক বোস। আমাকে দেখেই জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন। হয়তো স্মৃতি হাতড়ে পরিচয় উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।

ওঁর অবস্থা দেখে বললাম, ‘আমি মৌসুমি। বাবা আপনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। হরিহর ঘোষ…।

বাবার নাম শুনেই মুখ থেকে আলতো হাসি মুছে গেল। বুঝলাম, খবর ভালো নয়। স্বাভাবিক, যারা পণের টাকা ফেরত পাঠিয়ে বিয়ে ভেঙে দেয় তাদের কাছে ভালো কিছু আশা করাই বোকামি। শুধু বাবার মুখ চেয়ে আসা।

—ও… আচ্ছা। হরিহরবাবু এলেন না? ভদ্রলোক ঠান্ডা গলায় জানতে চাইলেন।

—বাবার শরীর ভালো নেই। কয়েকদিন আগে দোকানে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল। ব্লাড প্রেশার হাই, সঙ্গে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট। ডাক্তার সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিতে বলেছে। তাই আমাকে….।

ভদ্রলোক চিন্তিত মুখে আমার দিকে তাকালেন। তার চোখ স্থির, আমার মুখের উপর। তবে, এ চাহনিতে নোংরামি নেই। নির্মল স্বচ্ছ দৃষ্টি। মেয়েরা পুরুষের চোখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারে, সে কী চায়। এ ক্ষমতা ভগবানের দান। খুব কম পুরুষ-ই আছে যারা যুবতি নারীর মুখে চোখ স্থির রেখে কথা বলতে পারে। অধিকাংশেরই চোখ, মুখ থেকে পিছলে বুকে নেমে আসে।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...