—আমি সুবীরের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। ও এড়িয়ে গেল! দীপকবাবু ইতস্তত করে থামলেন।

—জানি, তিনি এ বিয়ে করবেন না। নইলে কী আর টাকা ফেরত পাঠায়। রাগ চেপে রাখতে পারলাম না।

—ঠিক কী কারণে পিছিয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। খুব চাপা ছেলে। খোলসা করে কিছু বলল না। তবে, ওর বন্ধুমহলে খোঁজ নিয়ে জানলাম, অন্য জায়গায় দেখাশোনা চলছে। একটু থেমে আবার বললেন, তুমি ভেঙে পোড়ো না। মন শক্ত করো। যেটা হল, ভালো হল না। আমাদের, শিক্ষকদের কাছেও ব্যাপারটা খুব লজ্জার। কিন্তু আমরাই বা কী করব। একটানা কথাগুলো বলে চুপ করলেন দীপকবাবু।

—আমি ভেঙে পড়িনি। দুঃখ একটাই, মাঝখান থেকে আমার বিএড পড়া হল না।

—কেন? ভদ্রলোক বিস্মিত গলায় রাস্তা থেকে মুখ ফেরালেন।

বিএড পড়তে সবমিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ। একদিকে বিয়ে। অন্যদিকে বিএড। একসঙ্গে এত টাকা কোথায় পাবে বাবা? বিয়ের জন্য বিএড ছাড়তে হল। অথচ…।

—এখন কি আর ভর্তি হওয়া যায় না?

—কী করে ভর্তি হব? কাউন্সেলিং হয়ে গেছে অনেকদিন। ভর্তিও শেষ।

কিছু বললেন না। চোখ থেকে চশমাটা খুলে বাঁ-হাতের অশান্ত আঙুলগুলো কোঁকড়ানো চুলের মধ্যে দিয়ে চালিয়ে দিলেন। কিছুটা উত্তেজিত মনে হল।

—আমি বিএড নিয়ে ভাবছি না। যা রেজাল্ট আছে, সামনের বছর যে-কোনও ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাব। ভয় এখন বাবাকে নিয়ে। চিন্তা করে মানুষটা শেষ হয়ে যাচ্ছে! হঠাৎ করে সব এলোমেলো হয়ে গেল। চোখের সামনেটা ঝাপসা হয়ে গেল নিমেষে।

আর কথা বলার কোনও মানে হয় না। উলটো দিকে হাঁটা শুরু করতেই পিছন থেকে কানে এল, ‘শোনো মৌসুমি, শোনো…।’

—আমি দাঁড়াব না। কী হবে দাঁড়িয়ে? কী হবে ভদ্রতা দেখিয়ে? এই সমাজ কি আমাদের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করল? আমরা তো তাদের জোর করিনি। তারাই বাড়ি বয়ে এসে পছন্দ করল গদগদ ভঙ্গীতে। তারপর একদিন তারাই…। আমি কি খেলার পুতুল? যখন ইচ্ছা হল হাতে তুলে নিলাম। ইচ্ছা না হলে ছুঁড়ে দিলাম।

আসলে আজও বিয়ের বাজারে মেয়েরা পণ্য। সেখানে ফরসা রং, সুন্দর মুখের দাম বেশি। পড়াশোনা, মেধার কোনও মূল্য নেই। আমার গায়ের রং কালো। তার জন্য তো আমি দায়ী নই। কালো রং নিয়েই আমি জন্মেছি। কিন্তু স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির রেজাল্ট আমি মায়ের পেট থেকে নিয়ে আসিনি। যোগ্যতা দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে, অনেক পরিশ্রমের বিনিময়ে। অথচ কোনও দাম নেই এসবের! এই যোগ্যতার বিচার হয় চাকরির ময়দানে। অথচ সে জায়গাও আজ আঁধারে ঢাকা!

ভুল হয়েছে। অনিমেষকে ফিরিয়ে দেওয়া মস্ত বড়ো ভুল। ছেলেটা বেশি বুদ্ধিমান নয়। হয়তো ভবিষ্যতে বড়োসড়ো চাকরি পাবে না। কিন্তু আদর যত্নের কোনও অভাব হতো না ওর কাছে। কিন্তু আর ফিরে যাওয়ার কোনও রাস্তা নেই। হঠাৎ একটা তীব্র আলোয় ঝলসে গেল চোখ! তাড়াতাড়ি রাস্তা থেকে নামার আগেই…

সুবীর

সানাইটা আবার বন্ধ হল কেন? বিয়ে বাড়িতে ঝলমলে আলো আর গমগমে শব্দ না হলে চলে? আর পাঁচটা দিনের মতোই ম্যাড়ম্যাড় করে ঘর-বাড়ি। আলো, লাইটের কাজ ভালো দেখা যাবে বলেই বড়ো রাস্তার ধারে এই লজ নেওয়া। দশ হাজার বেশি পড়ল। সে পড়ুক। সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা পাওয়া গেছে বলেই ফুচকা, কফি, লস্যি, পকোড়া, পানমশলার স্টল দেওয়া গেল। ভিতরের দিকে কম পয়সায় লজ নিলে এত স্পেস পাওয়া যেত না। রাস্তার দু’দিকে দুশো মিটার লাইটের এই কারুকাজও চোখে পড়ত না কারও। ঢোকার মুখে যে দারুণ গেটটা করেছি, ওটাও সকলের নজর এড়িয়ে যেত। লোকে হয়তো বলবে বরপণের টাকায় নবাবি করছে। আরে পেয়েছি তাই করছি। তোদের পাওয়ার মুরোদ নেই, তাই বলছিস!

—এই যে দাশু, মাইক বন্ধ কেন?

—দাদা, জেনেরেটরটা গোলমাল করছে। আমতা আমতা করে বলল।

—গোলামাল করছে মানে! আর কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকজন আসতে শুরু করবে। এখন তোর জেনেরেটর খারাপ!

—আমি দেখছি দাদা, দেখছি। বলেই তাড়াতাড়ি সরে পড়ল।

—পালাবি কোথায়? তোদের টিকি বাঁধা আছে আমার হাতে। এখনও হাফ টাকা বাকি। পরে ঠিক বুঝে নেব।

দুটো ছোটো গাড়ি এসে থামল। স্কুলের স্টাফরা চলে এল কি? হ্যাঁ— তারকবাবু, হারাধনবাবু, কুণ্ডুবাবু, গৌরবদা নামছেন গাড়ি থেকে। আরে চিত্রাদি, মিতাদি, সুলেখাদি, দীপা ম্যাডাম, পারমিতা ম্যাডামও এসেছেন দেখছি! সব শেষে দেখা গেল দীপকবাবুকে। ওঁকে আশা করিনি!

মাসখানেক আগে একটু ঠোকাঠুকি হয়ে গেল ওঁর সঙ্গে। সেদিন ছুটির পর ব্যাগপত্র গুছিয়ে বেরোতে যাব; এমন সময়, শুনলাম দেখাশোনা চলছে? গম্ভীর গলায় বললেন দীপকবাবু।

চমকে উঠেছিলাম৷ কিছু বলিনি। দেখাশোনা যে চলছে স্কুলের অনেকেই জানে। এ আর নতুন কী!

—কোথাও ফাইনাল হল?

কী বলতে চাইছেন ধরতে পারলাম না। সাধারণত উনি চটুল রসিকতা, পরনিন্দা, পরচর্চা, রাজনীতির ক্যাচাল— এসবের মধ্যে থাকেন না। একটা প্রচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব আছে, অস্বীকার করা যায় না।

—তাতালপুরের হরিহর ঘোষের মেয়ের সঙ্গে নাকি কথা পাকা হয়ে গেছে? আমি কিছু বলার আগেই বলে উঠলেন।

এবার বুঝলাম। টাকা ফেরতের ব্যাপারটা তাহলে ওঁর কানেও গেছে। অস্বাভাবিক কিছু নয়। একই শহরের লোক আমরা। কিন্তু…

আমার মুখের উপর মুচকি হাসি ছুঁড়ে দিয়ে, ‘এত বড়ো খবরটা চেপে যাচ্ছ ভাই?’

কথার মধ্যে রসিকতা ছিল, নাকি শ্লেষ, বুঝতে পারলাম না। মাথাটা গরম হয়ে গেল। কোথায় দেখাশোনা হচ্ছে? কোথাও ফাইনাল হল কিনা? তোমাকে আগে থেকে বলতে হবে কেন? তুমি কে হে? স্কুলের অফিসিয়াল কাজকৰ্ম্ম করো। ছাত্রছাত্রীদের উপর একটা প্রভাব আছে। হেডমাস্টারও একটু সমীহ করে চলেন। তার মানে এই নয়, তুমি সব জায়গায় মাতব্বরি করবে।

—খবর হলে নিশ্চয় জানতে পারবেন। কথা ক’টি বলেই চলে এসেছিলাম। আরও অনেককিছুই বলতে পারতাম। কিন্তু অহেতুক কথা কাটাকাটি, ঝগড়া-বিবাদ আমার পছন্দ নয়।

ভুল একটু হয়েছিল আমাদের। তাতালপুরে মেয়ে দেখতে গিয়েই বাবার পাকা কথা দিয়ে আসা উচিত হয়নি। আমার প্রথম থেকেই খুঁতখুতানি ছিল। মেয়েটার বাপটা একটা কাপড় দোকানি। মাটির বাড়ি। একদম সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। আমার বাবা রিটায়ার্ড ব্যাংক ম্যানেজার। ভাই আর্মি অফিসার। মা হেলথে ছিল। আমাদের স্ট্যাটাস, কালচারের সঙ্গে কোনও ভাবেই মেলে না ওদের পরিবার। বাবা কী দেখে যে…! তাও মেয়েটা যদি দেখতে শুনতে ভালো হতো।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...