—সুবীর, দারুণ বউ করেছ। একদম দুধে-আলতা রং। চিত্রাদি কানের কাছে মুখ এনে বলল। সবাই একে একে বলল, “বউমা ভালো হয়েছে সুবীর।’

এ সত্য সবাইকে স্বীকার করতেই হবে। কোথায় অলকা আর কোথায়…..? কী যেন নাম ছিল মেয়েটির? হ্যাঁ, মৌসুমি। কোথায় অলকা আর কোথায় মৌসুমি! তবে, শরীরটা খাসা ছিল। কিন্তু গায়ের রং কালো। অত কালো চলে! আমাকে রাস্তা-ঘাটে, উৎসব অনুষ্ঠানে বউকে নিয়ে বেরোতে হবে তো না কি? বাবা একঝলক দেখেই কেন যে রাজি হয়েছিল কে জানে!

—অভিনন্দন সুবীর। তোমাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হোক। দীপকবাবু এগিয়ে এসে আমার হাত দুটি হাতে নিলেন।

—ধন্যবাদ। চলুন আপনাদের বসিয়ে দিই। খাওয়ার ব্যবস্থা সব রেডি। দীপকবাবু একবার অলকার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার পাশে পাশে এগিয়ে এলেন। অলকা সম্পর্কে কিছু বললেন না। ওঁর মনে কী আছে উনিই জানেন। তবে, অলকার সঙ্গে মৌসুমির তুলনা চলে না। মৌসুমির একটাই গুণ ছিল। পড়াশোনায় ভালো ছিল মেয়েটা। অত পড়াশোনা নিয়ে আমি কী করব? বউ থাকবে বাড়িতে। রান্নাবান্না করবে। ছেলে মানুষ করবে। বিয়েবাড়ি, উৎসব, অনুষ্ঠানে সঙ্গে যাবে। এর বেশি আর কী চাই?

—বুঝলে সুবীর, কবজি ডুবিয়ে খেয়েছি। অনেকদিন পর দারুণ খেলাম। রুমালে হাত মুছতে মুছতে গৌরবদা বলল।

—দারুণ তো হবেই। এক-একটা প্লেট সাড়ে পাঁচশো টাকা। ভালো না হয়ে উপায় আছে?

—সুবীরবাবু, আপনার মেনু কার্ডটি খুব সুন্দর হয়েছে। এমনটি অন্য কোথাও দেখিনি। পারমিতা ম্যাডাম কার্ডটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বললেন।

—এটা রাবার পাতার মেনু কার্ড। বাজারে নতুন এসেছে। এক-একটা মেনু কার্ডের দাম পড়েছে সাড়ে বারো টাকা। সবাই বলবে সুবীর বিয়েতে অনেক টাকা নিয়েছে। আরে খরচাটা দেখো!

দীপকবাবু দূরে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে সিগারেট টানছেন। সবার মধ্যে ওনাকেই একটু অন্যরকম লাগছে। দশ লাখ টাকা আর দশ ভরি সোনার ব্যাপারটা কি জেনে গেছে? জানলে জানবে। আমি তো আর চাইতে যাইনি। মেয়ের বাবা নিজে থেকেই দিয়েছে। শ্বশুরমশাই বড়ো টিম্বার মার্চেন্ট। অলকা তার একমাত্র মেয়ে। তাকে না দিলে কাকে দেবে। তাছাড়া ভবিষ্যতে সব তো মেয়েই পাবে। আসলে মানুষ বোঝে না। না বুঝেই সমালোচনা করা স্বভাব।

লোকজন সব আসতে শুরু করেছে। প্রায় আটশো নিমন্ত্রিত। এই সময়টা একটু ভিড় হবে। তবে, অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। কনে যাত্রীও এল বলে…

দুম করে শব্দ হল! ছেলেরা বোম ফাটাচ্ছে। উপরের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল রংবেরঙের হাউইগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার আকাশে। বিয়ে বাড়ির হাসি-ঠাট্টা রূপ-রস বর্ণ-গন্ধ ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ল পোড়া বারুদের গন্ধ…!

দীপক

অসংখ্য উত্তেজিত মুখ, কলকল করতে করতে স্টেডিয়ামের সিঁড়ি বেয়ে একদল পিঁপড়ের মতো গলগল করে রাস্তায় নামছে। সকলের মুখে একটাই কথা, এই হচ্ছে খেলা! উদবোধনী ম্যাচ এরকম না হলে চলে। সত্যিই জমাটি খেলা হল। নব্বই মিনিট মাঠ থেকে চোখ সরানো যায়নি। আরও জমে যেত, যদি ওই সাত নম্বর জার্সির ছেলেটা…

—স্যার, ভালো আছেন?

দামি শাড়ি, ম্যাচিং করা কনুই অবধি ব্লাউজ, গলায় সোনার চেন, হাতে অলংকার, সিঁথিতে সিঁদুর, কপালে বড়ো লাল টিপের এক রমণী পথ আগলে দাঁড়িয়ে!

পান পাতার মতো মুখ, পাতলা ঠোঁট, কালো গভীর চোখ, টিকালো নাক, ঘন চুল, ছোট্ট কপাল। ছিপছিপে ধারালো শরীর। রংটা একটু চাপা। চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু…

—চিনতে পারছেন না! আমি মৌসুমি। বছরখানেক আগে আপনার সঙ্গে স্টেশনে একবার…

চকিতে মনে পড়ল, টলটলে জলভরা দুটি চোখ। শুকনো হতাশ মুখ। আজ তার লেশমাত্র নেই। কোজাগরীর চাঁদের মতো একটি পরিতৃপ্ত অবয়ব জ্বলজ্বল করছে আপন বিভায়।

মৌসুমির তাহলে বিয়ে হয়ে গেছে! স্কুলের ইউনিট টেস্ট, মেয়ের পেট খারাপ, বউয়ের কোমরে ব্যথার মাঝে মৌসুমি কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছিল, খেয়াল নেই!

—পেরেছি। আসলে তোমাকে এই বেশে দেখব ভাবিনি, তাই প্রথমে একটু…। তারপর বলো, কেমন আছো?

—ভালো। বাবা আপনার কথা বলে। তৃপ্তির হাসি খেলে গেল মৌসুমির চোখে-মুখে।

ষাট-পঁয়ষট্টির মতো বয়স। রোগা-পাতলা শরীর। সাধারণ পোশাকে এক নিরীহ অসহায় বৃদ্ধ ভেসে উঠল চোখের সামনে।

—হরিহরবাবু কেমন আছেন?

—ভালো। আপনি কেমন আছন?

—ওই… চলে যাচ্ছে একরকম। তবে, সেদিন তুমি হঠাৎ করে ওভাবে ছুটতে ছুটতে চলে যাবে, ভাবিনি। তারপর ওই অ্যাকসিডেন্ট! সেরকম কিছু হয়নি। টোটোর সামান্য ধাক্কাতে আর কী হবে। তাছাড়া আমি আগেই সরে এসেছিলাম। ডান হাতে একটু লেগেছিল। যাক… নিশ্চিন্ত হলাম। সেদিন কিন্তু চিন্তায় পড়েছিলাম।

—আসলে রাগের মাথায় আপনার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করিনি। ওভাবে চলে আসা উচিত হয়নি আমার। তাই ভগবান হাতে-নাতে শাস্তি দিয়েছিল। বলেই এক-গাল হাসল মৌসুমি।

নিরহংকার নির্মল হাসি। এরকম একটা ঝকঝকে মেয়েকে সুবীর শুধুমাত্র গায়ের রঙের জন্য বাতিল করেছিল ভাবলে অবাক লাগে। শুধু কি রং? টাকা-পয়সারও লোভ ছিল। কী পেল? কিছু টাকা। আর ফরসা চামড়ার অন্তঃসারশূন্য একটা মাংসের ডেলা। পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা।

উচ্চমাধ্যমিক পাস। থার্ড ইয়ারের পরীক্ষা না দিলে, তাকে তো উচ্চমাধ্যমিক পাশই বলবে লোকে। আর সংসারের কাজকর্ম? সেখানেও লবডঙ্কা। ঘরের কোনও কাজ তো করেই না। এমনকী রান্নাটাও ঠিকঠাক পারে না। বিয়ের পর থেকেই খিটিমিটি লেগে আছে। কথায় কথায় জানলাম, আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার মাস কয়েক পরেই মৌসুমিরও বিয়ে হয়ে যায় এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে। ছেলেটি হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস-এ উচ্চপদে কর্মরত।

—পরিচয় করিয়ে দিই, আমার বর সমরেশ। আর ইনি দীপকবাবু। দীপক বোস। তোমাকে বলেছিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে বলল মৌসুমি।

‘নমস্কার” বলে দু’হাত জড়ো করে এগিয়ে এল সমরেশ।

কথার মাঝে, ফুটবল প্রেমীদের ভিড় ঠেলে কখন এক সুপুরুষ মৌসুমির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। ভালো করে দেখলাম সমরেশকে; গায়ের রং টকটকে ফরসা, হাইট পাঁচ ফুট নয়-দশ হবে, দাড়ি-গোঁফ নিখুঁত ভাবে কামানো, ব্যাকব্রাশ করা চুল, চোখে রিমলেশ চশমা, পরনে জিন্স, টি-সার্ট। বাঁ-কবজিতে দামি ঘড়ি। নিজের অজান্তেই মনের দাঁড়িপাল্লাতে সমরেশের ঝকঝকে শরীরের পাশে সুবীরের বিয়াল্লিশ কোমর চোখের সামনে ভেসে উঠল। মনে হল, পাত্র হিসাবে সমরেশের পাল্লাই বেশি ভারী।

হিপ হিপ হুররে… হিপ হিপ হুররে…। শব্দগুলো কানে আসতেই আমার হুঁশ ফিরল। বিজয়ী দল ট্রফি হাতে নাচতে নাচতে চলেছে। কিছু উৎসাহী জনতা ঘিরে ধরেছে তাদের। মৌসুমি সমরেশ আরও দু-একটা টুকিটাকি কথাবার্তার পর বিদায় নিল। পশ্চিমের ডুবন্ত সূর্যকে পিছনে ফেলে, রক্তিম রাজপথ ধরে এগিয়ে গেল দুটি কপোত-কপোতী। ওরা পরস্পর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে এগিয়ে চলেছে।

আমার মন পিছিয়ে গেল অতীতের পাতায়। বেশ কিছু বছর আগে, তখন সবেমাত্র চাকরিতে যোগ দিয়েছি। বাল্যবন্ধু প্রদীপ একটা পোস্টকার্ড সাইজের ফোটো হাতে ধরিয়ে বলল, তুই যেমন চাইছিস, ঠিক তেমন মেয়ে। তবে গায়ের রং একটু চাপা। রং নিয়ে মাথাব্যথা আমার কোনওকালেই ছিল না। ছবি দেখে ভালোই লাগল। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালেন বাবা। বললেন, ব্রাহ্মণ পরিবারে চাষা ঘরের মেয়েকে বউ করে আনতে পারব না। মেয়ে না দেখেই বাতিল করে দিলেন! বাবার মুখের উপর কোনওদিনই কথা বলতে পারিনি। সেদিনও পারলাম না। পারলে আজ হয়তো মৌসুমির পাশে…।

হিপ হিপ হুররে… হিপ হিপ হুররে…। হই হই করে এগিয়ে চলেছে ছেলেরা। আমি পিছিয়ে এলাম উলটো পথে…।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...