অ্যালার্ম বাজছে, বেশ কয়েক সেকেন্ড ধরে হয়তো…! সামান্থা ঘড়ির দিকে তাকাল। সকালে এত তাড়াতাড়ি ওঠার অভ্যাস কোনওদিনই তার ছিল না। সকাল আটটার আগে তার ঘুমই ভাঙত না। কিন্তু এখানে তা অশোভনীয়! এটা শ্বশুরবাড়ি। মাত্র দুদিন হল তার বিয়ে হয়েছে। নতুন বউ। কিন্তু এ-বাড়ির সবাই যেভাবে তাকে আপন করে নিয়েছে, সামান্থারও মনে হল, পরিবর্তে তারও কিছু করা উচিত।

নীলয়ের মুখেই শুনেছিল, নীলয়ের মা অলকানন্দা খুব সকালে উঠে পড়েন সংসারের কাজ সামলাতে। অলকানন্দার নাকি ওটাই বরাবরের অভ্যাস। সামান্থা দেখল ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে, তার মানে শাশুড়ি-মা এতক্ষণে উঠে পড়েছেন। বাড়ির সকলের সকাল সকাল চা পানের অভ্যাস। সেও তাড়াতাড়ি রাতের পোশাক বদলে চোখমুখে জল দিয়ে ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল।

সামান্থা কল্পনাও করতে পারেনি যে, নীলয়ের মা-বাবা এত সহজে নীলয়ের সঙ্গে তার বিয়েতে রাজি হয়ে যাবেন। কারণ সব সময় নীলয়ের মুখে শুনেছে, তাদের পরিবার খুব গোঁড়া ব্রাহ্মণ আর সেখানে সামান্থা খ্রিস্টান পরিবারের মেয়ে। কিন্তু বউভাতের দিনই তার মনের এই শঙ্কা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এক মুহূর্তের জন্যেও ওর মনে হয়নি, সে অন্য ধর্মের এবং ভিন্ন জাতের।

জাতি-ধর্ম কখনওই স্নেহ-ভালোবাসার মধ্যে দেয়াল হয়ে উঠতে পারে না। তারই জ্বলন্ত উদাহরণ হল নীলয়ের পরিবার। এইসব ভাবতে ভাবতে সামান্থা রান্নাঘরে ঢুকতে যাবে, হুঁশ ফিরল নীলয়ের একমাত্র পিসির চিৎকারে, ‘আরে আরে… বউমা, এ কী অনর্থ করতে যাচ্ছ…।’

নীলয়ের বিধবা পিসি কৌশল্যা বেশিরভাগ সময়েই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে ভাইয়ের সংসারেই পড়ে থাকেন। সকাল সকাল উঠে পড়েন এবং হাতে জপের মালা নিয়ে একটা ধুনুচি জ্বালিয়ে আসন পেতে হলঘরটায় বসে থাকেন। ভান করেন জপ করছেন, কিন্তু আসলে নজর রাখেন বাড়ির কে কী করছে! হলঘরটা থেকে যে সব ঘরগুলো পরিষ্কার দেখা যায়।

কৌশল্যার চিৎকারে, ভাইয়ের বউ অলকানন্দা তাড়াতাড়ি বাথরুম থেকে দৌড়ে এসে ঘরে ঢোকে। সামান্থাও হঠাৎ পিসিমার চিৎকারে স্থানুবৎ রান্নাঘরের দরজায় কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ভয়ে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে!

অলকানন্দা কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই পিসিমা সামান্থাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এই বাড়িতে পা দিয়েই তুমি আমার ভাইয়ের নাক কাটিয়েছ সমাজে। জাত-কুল সব নষ্ট হয়েছে। এখন আবার স্নান না করেই রান্নাঘরে ঢুকে আমাদের ধর্মও নষ্ট করার ইচ্ছে রয়েছে? ধর্ম নিয়ম বলে কিছু আছে তো নাকি? অবশ্য তোমরা মোমবাতি জ্বালানো ছাড়া আর কী-ই বা জানো? কিন্তু অলকানন্দা, তুমি… তোমার তো এই পরিবারে এতগুলো বছর কেটে গেল, এখনও কি তুমি নিয়মগুলো শিখতে পারলে না?”

অলকানন্দা উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকে। পিসিমা আবার বলেন, ‘বউমাকে বুঝিয়ে দাও— এ সংসারের কিছু রীতি-নিয়ম আছে। এখানে কী কী করা যাবে আর কী না, সেটা ওকে পরিষ্কার করে বলে দাও। ছেলের মোহ-তে এতটাও অন্ধ হয়ে যেও না যে, বাড়ির পুরোনো নিয়ম বদলে ফেলতে হবে।”

সামান্থা ভয়ে রান্নাঘরের দরজাতেই কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথম দুদিন অলকানন্দা ওকে কোনও কাজ করতে দেয়নি। আজ সামান্থা নিজে থেকেই ঠিক করে নিয়েছিল শাশুড়িকে যতটা সম্ভব সাহায্য করবে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না কাল অবধি যে-পিসিমা তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন, আজ এমন কী দোষ করে ফেলল যে, তার উপর পিসিমা এতটা রেগে উঠলেন?

অলকানন্দা ভয়মিশ্রিত গলায় উত্তর দিলেন, “ও তো একেবারে নতুন দিদি, আস্তে আস্তে সব শিখে যাবে। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি নিজে হাতে করে সব শিখিয়ে দেব। এবারের মতো ওকে ক্ষমা করে দিন।’

‘হ্যাঁ শিখতে তো হবেই। তোমার ছেলে শুধু বেজাতের বউ-ই নয়, অন্য ধর্মেরও মেয়ে বাড়ি নিয়ে এসেছে।’ সব শুনে অলকানন্দা চুপচাপ ওখান থেকে চলে যেতে যেতে সামান্থাকেও ইশারা করলেন সঙ্গে আসার জন্য।

ননদের চোখের আড়াল হতেই অলকানন্দা, সামান্থাকে কাছে টেনে নিয়ে স্নেহবশত ওর মাথায় হাত রাখলেন, “দিদির কথায় কষ্ট পেও না। একটু কড়া কড়া কথা বলেন ঠিকই, কিন্তু মনের দিক থেকে খুবই ভালো মানুষ। তুমি বরং স্নানটা সেরে নাও, ততক্ষণ আমি পুজোটা করে নিচ্ছি। তারপর দু’জনে মিলে চা-জলখাবার করব’, বলে অলকানন্দা পুজোর ঘরের দিকে চলে গেলেন।

এত সকালবেলায় স্নানের কথা সামান্থা ভাবতেও পারে না। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির সকলের মন জিততে গেলে সকালেই তাকে স্নান করতে হবে। নীলয় আগেই বলে দিয়েছে, সামান্থাকে নিয়ে কোনও অভিযোগ পরিবারের মুখ থেকে শুনতে সে রাজি নয়। কারণ এই ব্যাপারে ও স্ত্রীকে কোনও সাহায্যই করতে পারবে না।

সকালের ঘটনায় সামান্থা কিছুটা নিরাশ হয়ে পড়েছিল। মনের মধ্যে কোথাও যেন বাড়ির সদস্যদের প্রতি একটা বিতৃষ্ণার মনোভাব উঁকি মারার চেষ্টা করছিল। সামান্থা জোর করে মন থেকে নেতিবাচক মনোভাব সরিয়ে রেখে স্নানে চলে গেল। স্নান সেরে তৈরি হয়ে বাইরে এসে দেখল, সকলে খাবার টেবিলে এসে বসেছে।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...