—চান্স কম। তবুও একবার ভালো করে যাচাই করা দরকার। সেজন্য আমি কাল সকালেই ওর আশ্রমে যাব। শুনেছি বাবাজি ভীষণ দয়ালু এবং সবাইকেই দর্শন দেন। আমি একাই যাব। মল্লিকাকে এসব কিছু বলার দরকার নেই। আমি কনফার্ম হয়েই কলকাতায় ফোন করে দেব। তারপর যা করার ওরাই করবে। একটা আস্ত ক্রিমিনাল খুন করে সাধু সেজে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবে, এটা আমি মেনে নিতে পারব না।
( দুই )
কলকাতা থেকে বিমানযোগে দিল্লি। দিল্লি থেকে প্রাইভেট কারে হরিদ্বার। হরিদ্বারে দু’দিন থাকার পর এরা এসেছে ঋষিকেশ। ‘সিটি অফ যোগা” নামে পরিচিত ঋষিকেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের খনি। দেশ-বিদেশের পর্যটকে ভর্তি। হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য মন্দির আর আশ্রম। এখানে দেবানন্দরা উঠেছেন বাস স্ট্যান্ডের কাছের এক হোটেলে। মালিক সদাশিব পাঠক ধর্মপ্রাণ মানুষ। অতিথিপরায়ণও বটে। হোটেল চালালেও কঠোর ব্যবসায়ী মনোভাব নেই। তথাগতর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। তথাগত এখানে বহুবার এসেছে এবং প্রতিবারই এই হোটেলে ওঠে। ফলে সদাশিবের সঙ্গে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। দেবানন্দের এই প্রথমবার। কিন্তু প্রথম দর্শনেই ভালো লেগেছে সদাশিবকে। অন্তরের ছবি মুখে ফুটে উঠেছে ভদ্রলোকের, যা বর্তমান সময়ে খুব কম লোকের মুখেই দেখা যায়।
পরশু সন্ধ্যায় ঋষিকেশ পৌঁছেছিলেন। ওইদিন আর বের হননি কোথাও। গতকাল সকালেই বেরিয়েছিলেন। সারাদিন অনেক ঘোরাঘুরি হয়েছে। সদাশিবের পরিচিত ট্যাক্সিচালক রাজেশ শর্মা ঘুরে দেখিয়েছে ঋষিকেশের প্রধান প্রধান দর্শনীয় স্থান। একদিনে সব দেখা সম্ভব নয়, তাই রাজেশ মূলত শহরকেন্দ্রিক স্পটগুলোতেই নিয়ে গিয়েছিল। বিকেল বিকেল ফিরে এসেছিল হোটেলে। ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ পরেই বেরিয়ে পড়েছিল পরমার্থ নিকেতনের উদ্দেশে। হোটেল থেকে সামান্যই দূরত্ব। ওখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে চলে গিয়েছিলেন ত্রিবেণী ঘাট। ত্রিবেণী ঘাটের সন্ধ্যা আরতি একটি দর্শনীয় বিষয়। ঋষিকেশ এলে সাধারণত কেউ মিস করে না। ত্রিবেণী ঘাটেই দেবানন্দ দেখেছিলেন জগাকে। সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে অনুষ্ঠান পরিচালনা করছিল। ওকে ঘিরে থাকা ভিড়ই বুঝিয়ে দিচ্ছিল, হাওয়াই জগা আর আগের জায়গায় নেই। যেমন করেই হোক, নিজের পজিশন অনেকটা উন্নত করে ফেলেছে। রত্নাকর দস্যু বাল্মীকি হয়েছে।
পরমানন্দজি ওরফে হাওয়াই জগার আশ্রম খুঁজে বের করতে খুব একটা বেশি সময় লাগল না। ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পড়েছিলেন দেবানন্দ। আজ ওদের যাওয়ার কথা বিটলস আশ্রম। রাজেশ আসবে এগারোটার দিকে। তার আগেই জগার সঙ্গে সাক্ষাৎ-পর্ব শেষ করে হোটেলে পৌঁছে যেতে হবে। নইলে মল্লিকার সন্দেহ আরও বাড়বে। এমনিতেই কিছুটা সন্দেহ তো হয়েইছে। বারবার বলছিল, এখানে তোমার একা একা বাইরে যাওয়ার কী প্রয়োজন? অচেনা অজানা জায়গা।
দেবানন্দ গম্ভীর মুখে এড়িয়ে গেছেন বটে, কিন্তু ভালো করেই জানেন কিছু একটা সমস্যা হলে মল্লিকার মুখের তোড়ে ভেসে যেতে হবে। তথাগতকে বলে এসেছেন, একটু দেরি হলে তুই ম্যানেজ করবি। তথাগত অসহায়ের মতো মুখ করে বলেছিলেন, ‘এসব কি খুব দরকার ছিল?’
অতি নির্জন স্থান, পাখিদের কিচিরমিচির ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। বড়ো বড়ো গাছগাছালি। রোদের আলো ফাঁক ফোকর দিয়ে মাটিতে পড়ছে। ঢেউ তুলে হাওয়ায় দুলছে নীচে ফুল গাছের সারি। পিছনের ক্যানভাসে সবুজ পাহাড়। ছবির মতো সুন্দর। কিছুক্ষণ এইসব দেখতে গিয়ে দেবানন্দ অনুভব করলেন, মন একা একাই ধ্যানস্থ হয়ে গেছে যেন। মনে মনে হাসলেন, স্থান মাহাত্ম্য বলে সত্যি কি কিছু থাকে? এই মুহূর্তে পুরোপুরি অস্বীকারও করতে পারলেন না।
সামনে একটা ঘর। বাইরে থেকে ছোটো মনে হলেও আশ্রমটা একেবারে ছোটো নয়। ভিতরের পরিসর অনেকটা বড়ো। ভিতরে একটা মন্দির দেখা যাচ্ছে। অনেকগুলো ঘরেরও আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সামনের ঘরে একজন তরুণ সন্ন্যাসী বসেছিলেন। মনোযোগ দিয়ে একটা বই পড়ছিলেন। দেবানন্দকে দেখে কৌতূহলী চোখে তাকালেন।
দেবানন্দ হিন্দিতে বললেন, ‘ম্যায় স্বামী পরমানন্দজি কা সাথ সাক্ষাৎ করনা চাহাতা হুঁ। ক্যায়া এ মুমকিন হোগা?”
তরুণ সন্ন্যাসী মুদু হেসে বললেন, “আপ বঙ্গাল সে আ রহে হ্যায়? কিস লিয়ে মিলনা চাহতে হ্যায় আপ গুরুজি সে?”
—উনকা নাম বহুত শুনা হ্যায়। ইউ টিউব চ্যানেল মে উনকা প্রবচন ভি শুনা হুঁ। একবার দর্শন করনে কা মনমে অভিলাষা থা, ইস লিয়ে চলা আয়া। আপনে ঠিক হি পহেচানা। ম্যায় কলকাত্তা সে আয়া হুঁ। বাঙ্গালি হুঁ।
—ঠিক হ্যায়। আপ থোড়া দের ইন্তেজার কিজিয়ে ইহাঁ। ম্যায় গুরুজি সে পুছকে আতা হুঁ।
তরুণ সন্ন্যাসী ভিতরে মন্দিরের দিকে চলে গেলেন। দেবানন্দ বসে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। মিনিট দশেক পরে তরুণ সন্ন্যাসী এসে জানালেন, “আপ মেরে সাথ আইয়ে।”
পিছু নিলেন দেবানন্দ। দুটো ঘর পেরোতেই বিশাল এক বাঁধানো উঠোন। উঠোনের একপাশে শিবের মন্দির। মন্দিরের চূড়াতে সকালের আলো পড়ে চকচক করছে। পূজারির দল পুজোর আয়োজনে ব্যস্ত। মন্দির আঙিনার চারপাশে অনেক ঘর। সম্ভবত আশ্রমবাসীদের থাকার ব্যবস্থা। একেবারে পশ্চিমধারের একটা ঘরের সামনে এনে দাঁড় করাল তরুণ সন্ন্যাসী। এই ঘরটা তুলনামূলক ভাবে অনেক বড়ো। দরজাতে দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করা রয়েছে।
তরুণ সন্ন্যাসী বললেন, ‘গুরুজি অন্দর হ্যায়, আপ চলা যাইয়ে।’
দেবানন্দ ভিতরে ঢুকে প্রথমে একটু অন্ধকার দেখলেন। আলো থেকে হঠাৎ করে আবছা আলোর জায়গায় ঢুকলে এমনটা হয়। কয়েক সেকেন্ড পরেই অবশ্য ঠিকঠাক দেখতে পেলেন সবকিছু। ঘরের এক কোনায় একটা উঁচু বেদিতে সুখাসনে বসে আছেন পরমানন্দজি ওরফে জগবন্ধু সামন্ত। মুখে হাসি। হঠাৎ দেবানন্দের মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে উঠল। জঘন্য সব ক্রাইম করেও খাসা আছে ব্যাটা। আশ্চর্যের বিষয়, যে ভগবানের কাছে মানুষ বিচার প্রার্থনা করে, তিনিই আবার একে আশ্রয় দিয়ে রেখেছেন!
—দেখিয়ে সোয়ামীজি, ম্যায় আপসে কুছ জরুরি বাত করনে কে লিয়ে আয়া হুঁ। আপ… দেবানন্দ যথেষ্ট সংযম নিয়ে শুরু করলেও, পরমানন্দজি তাকে থামিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “আপনি বাংলায় বলতে পারেন, আমি বাংলা বুঝি।’
(ক্রমশ…)





