দেবানন্দের গোঁফের তলায় মুচকি হাসি খেলে গেল। নিজেকেই নিজের তারিফ করতে ইচ্ছে করছিল। এখনও চোখের দৃষ্টি ভোঁতা হয়ে যায়নি তাহলে!
হঠাৎ ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেলেন। সরাসরি বললেন, ‘তুমিই তাহলে জগবন্ধু সামন্ত, ওরফে হাওয়াই জগা। এতটা সৎ সাহস দেখাবে ভাবতে পারিনি। তোমার এই পরিবর্তনটুকু ভালো লাগল। ভেবেছিলাম তুমি প্রথমে অস্বীকার করবে এবং আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে।’
পরমানন্দের মুখে রহস্যমাখা হাসি। চোখে শীতল দৃষ্টি। উদাসীন গলায় বলল, ‘অতীত আর ছায়া মানুষের নিত্যসঙ্গী। যেখানেই যাক, যতদূরেই যাক, পিছু ছাড়ে কি? অতীতকে অস্বীকার করা মানে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। আমিও আপনাকে প্রথম দেখাতেই চিনেছিলাম স্যার। আপনাকে বুঝতে দিইনি। আপনি আমার ঠিকানা জোগাড় করেছেন সেটাও জানি। সত্যি কথা বলতে, সকাল থেকে অপেক্ষা করে আছি আপনি আসবেন বলে। আপনি এখানে এলেন, ওদের জানিয়ে এসেছেন তো? অবশ্য তাতেও খুব একটা কিছু আসবে যাবে না। আপনি একটু বসুন, আমি এক্ষুণি আসছি। কোথাও যাবেন না কিন্তু।’
হঠাৎ একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল দেবানন্দের শিরদাঁড়া বেয়ে। হুট করে এভাবে আসাটা কি ভুল হয়ে গেল? সাধু হলেও জগার একটা ভয়ংকর অতীত আছে, সেটা বোধহয় মাথায় রাখা উচিত ছিল।
( তিন )
জায়গাটা একটা গুহার মুখ। জঙ্গলে ছেয়ে আছে চারদিক। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ছোটো বড়ো পাথরের চাঁই। নীচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা গঙ্গা। আশপাশে জনবসতির চিহ্নমাত্র নেই। এদিকে লোকজন আসে বলেও মনে হল না। কাউকে মেরে ফেললেও বাইরের পৃথিবী টেরও পাবে না।
দেবানন্দ বললেন, ‘তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এলে কেন? আমি বুঝতে পারছি না। তোমার উদ্দেশ্যটা কী?’
জগা হেসে বলল, ‘একদিন আমি আপনার ভয়ে এখানে পালিয়ে এসেছিলাম। জীবন সবাইকেই সমান সুযোগ দেয়। আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আমি গত কয়েক মাস ধরে এইরকম কিছুর জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। সুযোগটা এভাবে আসবে ভাবতে পারিনি। আপনি ভগবান বিশ্বাস করেন?’
দেবানন্দ অবাক হয়ে বললেন, ‘করি। ভগবান তোমার আমার পূর্বপুরুষদের মতোই একজন, মানলে তাঁকেও মানতে হবে। ভগবান সমস্ত মানবজাতির পিতৃপুরুষ। তবে ভগবানের অলৌকিক তত্ত্ব আমি কখনওই মানি না। হঠাৎ একথা জিজ্ঞেস করলে কেন?’
—এমনিই। এই যে জায়গাটা দেখছেন, এখানেই একদিন আমার দেখা হয়েছিল এক সিদ্ধ সন্ন্যাসীর সঙ্গে। আমি যে আশ্রম পরিচালনা করি তার প্রতিষ্ঠাতা। আমার দীক্ষাগুরু, শিক্ষাগুরু, আত্মজ্ঞানদাতা। আপনি যেদিন আমাকে দেখা করতে বলেছিলেন, কেন যেন আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অন্য কিছুর ইঙ্গিত দিয়েছিল। আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। পালিয়ে প্রথমে চলে যাই আসাম। মাস দুই তিনেক ওখানকার জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছি। পকেটে যেটুকু টাকা ছিল একসময় ফুরিয়ে গেল। গোপনে ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা পাঠানোর জন্য বললাম। কিন্তু ভাইরা টাকা তো দিলই না, উলটে ভয় দেখাল, ফোনে আবার যোগাযোগ করলে পুলিশকে সব জানিয়ে দেবে। আমার মাথায় খুন চেপে গেলেও কিছুই করার ছিল না। বুঝলাম, সুযোগ বুঝে ওরা আমাকে পর করে দিয়েছে। অথচ আমি অনেক পাপই করেছিলাম ওদের জন্য। আমার পাপ রোজগারের অনেক টাকা ওরা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে নিজেদের ব্যাবসায় লাগিয়েছিল। আমার বিপদের দিনে ওরা সরে যাওয়ায়, প্রথমবার আমার সত্যিকারের হুঁশ ফিরেছিল। বুঝেছিলাম, আমার পাপ অন্য কেউ নেবে না, আমাকেই বহন করতে হবে।
—এ তো দেখছি দস্যু রত্নাকরের গল্পের রিপিটেশন হচ্ছে। তারপর কী করলে?
—আরও কিছুদিন বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়ালাম। কখনও উপোস করে, কখনও আধপেটা খেয়ে, কখনও বনের ফলমূল খেয়ে জীবনধারণ করেছি। চেহারা এতটাই জীর্ণ শীর্ণ হয়ে গেল যে, আমি নিজেই নিজেকে চিনতে পারছিলাম না। উশকোখুশকো চুলে জটা, মুখে লম্বা দাড়ি। একদিন প্রায় অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলাম একটা বটগাছের তলায়। ওই পথ দিয়ে একদল সাধু যাচ্ছিল। তাঁরা দয়াপরবশ হয়ে আমাকে তুলে নিয়ে যায় তাদের আখড়ায়। খাবারদাবার দিয়ে সুস্থ করে তোলে। কিছুটা নিরুপায় হয়েই ওদের দলে ভিড়ে যাই। পুলিশের নজর এড়ানো এর ফলে অনেক সহজ হয়ে যায়। ওদের সঙ্গে একসময় চলে আসি এখানে। একদিন ঘুরতে ঘুরতে চলে আসি এই জায়গায়। দেখি গুহার মুখে একজন সন্ন্যাসী ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছেন। আমি চলেই যাচ্ছিলাম। তিনি চোখ খুলে কাছে ডাকলেন। একটা লোটা হাতে দিয়ে গঙ্গা থেকে জল এনে দিতে বললেন। আমি নীরবে আদেশ পালন করলাম। উনি আমাকে কাছে ডেকে বসতে বললেন। আমি বসলাম। তারপর আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন কিছুক্ষণ। আমি সে দৃষ্টি সহ্য করতে পারছিলাম না, আবার চোখ সরিয়ে নিতেও পারছিলাম না। সে এক বিশ্রি পরিস্থিতি। অমন দৃষ্টির সামনে আমি কোনওদিন পড়িনি। মনে হচ্ছিল, আমার ভিতরটা ওঁর সামনে উদোম হয়ে পড়েছে। কোনও রাখঢাকই আর অবশিষ্ট নেই। একসময় উনি দৃষ্টি সরালেন। মৃদু হেসে বললেন, “তু আকেলা পড় গায়া বেটা। কোই তেরা সাথ নেহি দেগা। আব কেয়া করেগা তু?’ উলঙ্গের আর কী লজ্জা! আমি গড়গড় করে সব বলে দিলাম। আমার এযাবৎ করা সমস্ত পাপকর্মের বৃত্তান্ত। শেষে তাঁর কাছে মিনতি করে বললাম, “আমাকে পথ দেখান বাবা।’
দেবানন্দ নড়েচড়ে বসলেন, ‘তারপর… তারপর কী হল?’
(ক্রমশ…)





