মেয়েদের উন্নতি স্কুল-কলেজে চোখে পড়লেও, নারীর সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও সম্পূর্ণ সুখকর নয়। বাহ্যিক ভাবে হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করলেও, অনেক নারীর অন্তর্দহন আড়ালেই থেকে যায় অনেকসময়। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে নারীরা এখনও পুরুষের সমান জায়গা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। আজও অনেক মহিলা বিয়ের পরে স্বামীর উপর নির্ভরশীল থাকেন সম্পূর্ণ ভাবে। কষ্ট না করে সংরক্ষিত সুযোগসুবিধে নিতেই বেশি পছন্দ করেন অনেক মহিলা। তাই, এই মানসিকতার উন্নতি না হলে, বিড়ম্বনা থেকেই যাবে।

প্রতিবন্ধকতা

  • অসুস্থ সম্পর্ককে মেনে নেওয়া: স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকেদের থেকে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা কিংবা অত্যাচারিত হলেও, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কিংবা শাস্তির উদ্যোগ সহজে নিতে পারেন না মহিলারা। কারণ, সব মহিলারা স্বনির্ভর নন, তাই সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটিয়ে অন্যত্র বসবাস করতে পারেন না সহজে। অতএব, এই বিষয়ে হিন্দু বিবাহ আইন মোতাবেক বিবাহবিচ্ছেদ করার অধিকার থাকলেও, মানসিক দুর্বলতার জন্য তা বলবৎ করতে পারেন না অনেক মহিলা।
  • বিয়ের পরে অন্যের বাড়িতে বসবাস: ছোটোবেলা থেকে মেয়েদের শেখানো হয় যে, বিয়ের পরে তোমাকে অন্যের বাড়িতে থাকতে হবে। তাই, সহনশীল হতে হবে, মাথা নত করে থাকতে হবে, ঝগড়া-অশান্তি হলেও শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে আসতে নেই ইত্যাদি। অতএব, মেয়েদের ব্যক্তি স্বাধীনতা শেষ, প্রতিবাদ বন্ধ। শুধু অত্যাচার সহ্য করে অন্যদের অন্যায় মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই।
  • কন্যাপক্ষের লোক মানেই পদানত হয়ে থাকা: মেয়ের বাড়ি মানেই শুধু দিতে হবে। নগদ টাকা, উপহার, ইত্যাদি দেওয়ার রীতি এখনও চালু রয়েছে আমাদের সমাজে। নানা অজুহাতে মেয়েদের বাড়ির থেকে দানসামগ্রী নেওয়ার এই নির্লজ্জ নিয়ম কবে বন্ধ হবে তা জানা নেই। শুধু কি তাই, কন্যাপক্ষের লোক মানেই সবসময় আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে হবে। ছেলের বাড়ির লোক শত অন্যায় করলেও টু শব্দটি করতে পারবেন না মেয়ের বাড়ির লোকেরা। উলটে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে তাদের।
  • শখ-আহ্লাদ পূরণ করতে না পারা: শাড়ি, গয়না কিংবা কাউকে কিছু দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও, স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকেদের অনুমতি ছাড়া তা করলে অশান্তি ভোগ করতে হবে। অতএব, মনের ইচ্ছেকে দমিয়ে রাখতে হবে।
  • স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা: পুরুষদের যে-স্বাধীনতা আছে, মেয়েদের তা নেই। এখনও অনেক মেয়ে বাড়ির বাইরে বেশি রাত পর্যন্ত থাকতে পারে না। বাড়ির লোক ছাড়া একা একা কোথাও বেড়াতে যেতে পারে না কিংবা অন্যত্র রাত্রিযাপন করতে পারে না। এটাকে স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাই বলা যায়।
  • শিক্ষাগত প্রতিবন্ধকতা: বড়ো শহরে না হলেও, মফস্সল কিংবা অনেক গ্রামে আজও মেয়েরা শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। ইচ্ছে থাকলেও উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় নানা কারণে। দশ-বারো ক্লাস পাশ করলেই তো বিয়ে দেওয়া যায়, তাই আর বেশি শিক্ষার কী প্রয়োজন আছে? এমনই ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী অভিভাবকদের জন্য শেষ পর্যন্ত উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারেন না অনেক মেয়ে।
  • বিচারের প্রহসন: এখনও অনেক গ্রামে মোড়ল কিংবা পঞ্চায়েত প্রধানের দ্বারা মেয়েদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। বাড়িতে কিংবা বাড়ির বাইরে অত্যাচারিত হলে যদি কোনও মেয়ে, অপরাধীর শাস্তি চায়, তাহলে গ্রামের মোড়ল কিংবা পঞ্চায়েত প্রধানই বিচার করবে। আর সেই বিচারে বেশিরভাগই দেখা যায়, উলটে অভিযোগকারিণীর অভিযোগকেই মিথ্যে প্রমাণ করা হয় কিংবা তাকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয় গায়ের জোরে কিংবা রাজনৈতিক কারণে।
  • পোশাকের প্রতিবন্ধকতা: মেয়েরা যদি খোলামেলা পোশাক পরে তাহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। শহরে যদিওবা এ ব্যাপারে মেয়েরা কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করে, গ্রামের মেয়েরা তা পারে না। আর কোনও গ্রাম্য মেয়ে যদি একটু সাহস দেখায় এ বিষয়ে, তাহলে ‘স্বেচ্ছাচারী’, ‘নষ্ট মেয়ে’ ইত্যাদি শব্দগুলি হজম করতে হয় এবং বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে যায়।
  • প্রেমের প্রতিবন্ধকতা: বিবাহপূর্ব প্রেম কিংবা যৌনসম্পর্ককে আজও আমাদের সমাজ ঘৃণার চোখে দেখে। বেশিরভাগ মেয়ে এখনও তাই প্রেম করে লুকিয়ে। আর সমলিঙ্গে প্রেম? সে তো ‘খুন করার সমান’ অপরাধ বলে ধরে নেওয়া হয় আজও।
  • ভয়: একা চলাফেরার ভয়, শ্লীলতাহানি কিংবা ধর্ষণের ভয়, বিবাহবিচ্ছেদ হলে একা জীবনযাপনের ভয় প্রভৃতি মেয়েদের মানসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি করে। সময় বদলালেও, এমন নানা প্রতিবন্ধকতায় এখনও জর্জরিত মেয়েরা।

সমানাধিকারের প্রসঙ্গ

নারী স্বাধীনতা, পুরুষের সঙ্গে সমানাধিকার প্রভৃতি প্রসঙ্গ যখন এসে যায়, তখন দোষত্রুটির বিষয়ে নারীর নিজের দিকেও আঙুল ওঠে অনেকটাই। কারণ নারীরা যতই আধুনিক যুগে বাস করুক না কেন, স্বভাবে সম্পূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারেনি। এখনও শাশুড়ি-বউ, বউদি -ননদ, মা-মেয়ের মধ্যে ঝগড়া, হিংসের ঘটনা চলতেই থাকে। কাজেই যতদিন এই ঝগড়া-বিবাদের স্বভাবের বাইরে না আসতে পারবে নারীরা, ততদিন পুরুষের সঙ্গে সমানাধিকারের বিষয়টিও অধরাই থেকে যাবে।

অতএব, নারীকে প্রকৃত শিক্ষিত হতে হবে, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বাদানুবাদ করে সময় নষ্ট করলে চলবে না। কর্মক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতা, প্রতিভা প্রমাণ করে পুরুষের পাশে সমান ভাবে আসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে কিংবা পুরুষের থেকে আরও উঁচুতে উঠতে হবে। অবশ্য সমানাধিকার মানে এমন নয় যে, নারী তার প্রাকৃতিক কোমলত্ব হারাবে।

নারীকে মনে রাখতে হবে, কোনও কিছুই সহজে পাওয়া যায় না। বর্তমান সমাজেও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা খুব সহজ হয়ে যায়নি। এখনও নারীর সমানাধিকারের বিষয়টি শুধু সাংবিধানিক স্তরে আছে, বাস্তব অনেকটাই আলাদা। মনে রাখতে হবে, এখনও গৃহবধূ হওয়া যতটা সহজ, বিধায়ক, সাংসদ কিংবা মন্ত্রিত্ব পাওয়া ততটা সহজ নয়। পুরুষের মতো নারীকে এই জায়গায় সমান ভাবে আসন প্রতিষ্ঠা করতে গেলে মানসিকতাকে যেমন উন্নত করতে হবে, ঠিক তেমনই আর্থিক, মানসিক এবং শারীরিক ভাবেও আরও যোগ্য হওয়া দরকার। অকারণে অহংবোধ করাও চলবে না। আরও ধৈর্য, নিষ্ঠা এবং পরিশ্রম করতে হবে আত্মবিশ্বাস বজায় রেখে।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...