বেশিরভাগ পরিবারে দেখা যায়, নারী তার সমস্ত গুণ এবং শক্তি দিয়ে পরিবারকে সুখময় করতে চায়। প্রাকৃতিক নিয়মেই নারীরা সংসারের হাল ধরেন শক্ত হাতে। এর জন্য তারা অনেক সময় আত্মসুখ বিসর্জনও দিয়ে থাকেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এই যে, এত কিছু ত্যাগ স্বীকার করার পরও নারীর উপর অত্যাচার বন্ধ হয়নি। আর এইসব অত্যাচারের প্রতিফলন ঘটছে, কুপ্রভাব পড়ছে নারীর দেহে-মনে। তাদের চিত্ত তাই দোলাচলে। কখনও তারা বিরক্ত, কখনও তৈরি হচ্ছে মানসিক অস্থিরতা এবং অস্তিত্বের সংকট। কিছু ক্ষেত্রে নারী আজ দিশাহারা, তাই খুঁজছে অস্তিত্বের অর্থ। কিন্তু কবে কাটবে এই অস্তিত্বের সংকট?

জেগে ওঠার সময়

মহিলারা যত বিচক্ষণ এবং বিশ্লেষক স্বভাবের হবেন, ততই তারা অস্তিত্বের সংকট থেকে মুক্তি পাবেন। শুধু অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপালেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না, নিজেদের দোষত্রুটিগুলি খুঁজে বের করেও শোধরাতে হবে। যেমন, যে-পুরুষ মানুষটি ধর্ষণ করে, স্ত্রীর উপর অত্যাচার করে, সেও কিন্তু কোনও মায়েরই সন্তান। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, প্রত্যেক সন্তানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বেশিরভাগটাই গড়ে ওঠে ছোটোবেলায়। আর ছোটোবালায় বাবা-র থেকে মায়ের আদর্শকেই বেশি করে আপন করে নেয় সন্তান৷

অনেক মা আছেন, যারা পুত্রসন্তান কোনও অন্যায় করলে, সেই বিষয়টিকে খুব লঘু ভাবে দেখেন এবং তাকে শাসন করেন না সঠিক ভাবে। শুধু তাই নয়, মেয়েদের সম্মান করার বিষয়টিও শেখান না পুত্র সন্তানকে। তাই লাগামছাড়া স্বভাবের ওই পুত্র সন্তানটি যখন পুরুষ হয়ে ওঠে— তখন সে মহিলাদের আর সম্মান করতে পারে না। অবশ্য পুত্র সন্তানটিকেও চারিত্রিক দোষভুল শুধরে নিতে হবে। হিংসা, অহংকার প্রভৃতি দোষ কাটিয়ে উঠে অন্যকেও সম্মান করতে হবে।

নিজে উচ্চ আসনে থাকলেও, অন্যকে হেয় করলে নিজের অস্তিত্বের সংকট কাটবে না। কারণ, নারীর অস্তিত্বের বিষয়টি শুধু পুরুষ দ্বারা অত্যাচারেই সীমাবদ্ধ নয়। এক নারী অন্য নারীর দ্বারাও সংকটে পড়তে পারে। সেইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, মানুষ দুই প্রকারের হয়— ভালো আর খারাপ। এক্ষেত্রে নারী কিংবা পুরুষের উপর নির্ভর করে না বিষয়টি। তাই নিজের স্বেচ্ছাচারিতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারকেও আটকাতে হবে। শুধু নিজের কথা ভাবলে হবে না, সামগ্রিক ভাবে নারীর অস্তিত্বের সংকট কাটিয়ে উঠতে গেলে, পিছিয়ে পড়া মহিলাদের পাশেও দাঁড়াতে হবে আন্তরিক ভাবে।

নারী এখন আর অবহেলার সামগ্রী নয় কিংবা মুখ বুজে হিংসার বলি হওয়ার নয়। নারী এখন শারীরিক কিংবা মানসিক সবদিক থেকে শক্তিধারী— এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কারণ, আজ তারা শিক্ষিতা, আর্থিক ভাবে সাবলম্বী এবং লড়াই করে বাঁচতে জানে। অনেক ক্ষেত্রে তো ছেলেদের পিছনের সারিতেও রেখে দিয়েছে মেয়েরা।

বেশিরভাগ পরিবারে দেখা যায়, নারী তার সমস্ত গুণ এবং শক্তি দিয়ে পরিবারকে সুখময় করতে চায়। প্রাকৃতিক নিয়মেই নারীরা সংসারের হাল ধরেন শক্ত হাতে। এর জন্য তারা অনেক সময় আত্মসুখও বিসর্জন দিয়ে থাকেন।

স্বপ্নপূরণের জন্য মহিলারা আজকাল কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন না। গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সাহসও রাখেন মহিলারা। কিন্তু সামাজিক বাঁধন আর আইনি জটিলতা, মহিলাদের স্বপ্নপূরণে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে অনেকসময়। তবে প্রতিবন্ধকতা যেমন আছে, ঠিক তেমনই অধিকারও রয়েছে। অতএব, প্রতিবন্ধকতা কাটাতে হবে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।

আইনি অধিকার

  • ধর্ষিতার গর্ভপাতের অধিকার: খুনের দায়ে জেল হয়েছিল এক ধর্ষিতার। আর ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী হয়ে পড়েন ওই মহিলা। কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষ তাঁকে গর্ভপাতের সুযোগ না দেওয়ায় তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন। মধ্যপ্রদেশ উচ্চ আদালত আইন মোতাবেক ওই ধর্ষিতার ইচ্ছেপূরণের সম্মতি দেয়।
  • অ্যান্টি রেপ বিল: মহিলাদের সুরক্ষার জন্য তৈরি অ্যান্টি রেপ বিল ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে রাষ্ট্রপতি অনুমোদন করেছেন। এই বিল মোতাবেক, ধর্ষণের অপরাধে ন্যূনতম ২০ বছর কারাবাস, এমনকী মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। এছাড়া, শ্রীলতাহানি, ভয় দেখিয়ে মহিলাদের সংবেদনশীল অঙ্গ স্পর্শ করা, অত্যাচার করা প্রভৃতিও জামিন অযোগ্য অপরাধ এবং পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত কারাবাস হতে পারে এই ক্ষেত্রে।
  • কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার শাস্তি: ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে কার্যকরি হয়েছে সংশোধিত এই ‘সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট অফ উইমেন অ্যাট ওয়ার্কপ্লেস’ আইন। আর এই আইন অনুসারে, কর্মরত কোনও মহিলা কর্মীকে কৌশলে, ক্ষমতাবলে কিংবা বলপ্রয়োগ করে শারীরিক মিলনে বাধ্য করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এমনকী, মহিলা কর্মীর শরীরের সংবেদনশীল অংশ স্পর্শ করা, যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করা, যৌন উত্তেজক কিছু খাওয়ানো কিংবা যৌন উত্তেজনামূলক (পর্নোগ্রাফি) ছবি দেখানো ইত্যাদিও দণ্ডনীয় অপরাধ।
  • সন্তানের দেখাশোনার জন্য ছুটি: মহিলা সরকারি কর্মচারী মোট ৭৩০ দিন ছুটি নিতে পারেন সন্তানের দেখাশোনার জন্য। বাচ্চার ১৮ বছর বয়সের মধ্যে পরীক্ষা, অসুস্থতা প্রভৃতি কারণে মা ছুটি নিতে পারেন এবং এর জন্য কোনও বেতন কাটা যাবে না।
  • বিধবার অধিকার: স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী শ্বশুরবাড়িতে থাকতে পারেন এবং সম্পত্তির অধিকারও তাঁর বলবৎ থাকবে। এক্ষেত্রে শ্বশুর, শাশুড়ি কিংবা মৃত স্বামীর ভাই-বোন যদি বিধবাকে বঞ্চিত করেন সম্পত্তির অধিকার থেকে, তাহলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।
  • লিভ ইন রিলেশনশিপ সংক্রান্ত সুবিধা: যদি কোনও পুরুষ এবং মহিলা দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রীর মতো একসঙ্গে বসবাস করেন, তাহলে তাদের বিবাহিত দম্পতি ধরে নেওয়া হবে এবং সেক্ষেত্রে ওই মহিলা স্বাভাবিক স্ত্রীর মতো সবরকম অধিকার পাবেন।
  • ভরণপোষণের অধিকার: বিবাহবিচ্ছেদের পরে স্বামীকে স্ত্রী এবং সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হবে আজীবন। এক্ষেত্রে কোনও স্ত্রী যদি চান, এককালীন অর্থ আদায় করে নিতে পারেন বিচ্ছেদ হওয়া স্বামীর থেকে।
  • পণ সংক্রান্ত আইন: বিয়ের আগে কিংবা পরে স্ত্রীর বাবা-মায়ের পরিবার থেকে অর্থ কিংবা জিনিসপত্র দাবি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। স্বামী কিংবা শ্বশুর বাড়ির লোকেরা যদি পণের জন্য স্ত্রীকে মানসিক কিংবা শারীরিক অত্যাচার করেন, তাহলে অত্যাচারকারী স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ৪৯৮এ ধারা অনুযায়ী কঠিনতম শাস্তি পাবেন।
  • প্রতিবাদের অধিকার: চাইলে মহিলারা যে-কোনও বিষয়ে মুখ খুলতে পারেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরদার প্রতিবাদ করতে পারেন। এ বিষয়ে মহিলারা পুরুষদের থেকে আইনমাফিক বেশি সুবিধে পাবেন। কারণ, আইন এখন মেয়েদের পক্ষে।

সন্তানলাভ অর্থাৎ মা হওয়ার অধিকার: প্রাপ্তবয়স্ক যে কোনও মহিলা স্বইচ্ছায় মা হতে পারেন। এক্ষেত্রে তিনি যদি অবিবাহিত ও হয়ে থাকেন, তাতে কিছু অসুবিধা নেই। তাই এখন মা চাইলে একাই সন্তানের অভিভাবক হতে পারেন, বাবার প্রয়োজন নেই।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...