জগা বলল, ‘উনি বললেন, বহুত বড়া পাপ কিয়া হ্যায় তুনে। ফির ভি উসকা ঘর সমা কি কমি নেহি হোতা হ্যায় কভি। লেকিন সচ্চে দিল সে মাঙ্গনা পড়েগা। হো সাকেগা তুঝে?’ জানি না সেদিন কী হয়েছিল আমার। আমি বললাম, “আমি পারব, আমাকে আপনি যা বলবেন তাই করব বাবা।’ উনি বললেন, “সির্ফ পানি পিকে তুঝে ধ্যায়ান করনা পড়েগা, লাগাতার সাতদিন।’ আমি তাতেই রাজি হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল, আমি যেন পুতুল, উনি আমার মালিক। যে মন দিয়ে আমি দস্যুপনা করতাম, সেই মন দিয়ে কি আর সহজে ধ্যান হয়! তবুও গুরুজির আদেশ মেনে বসলাম ধ্যানে।
আজীবনের সংস্কার ভরা রয়েছে মনের লকারে। সেই মন কি আর সহজে বসে? এতকাল শুধু বাইরেটা দেখেছি, ভিতরের কোনও খবর রাখিনি। সেই প্রথম দেখলাম আমার ভিতরের ঘরের অবস্থা। কোনও কিছুই ঠিক নেই, সবই চরম অগোছালো। আমি হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম, এ কাজ আমার দ্বারা হবে না। গুরুজি ধমক দিয়ে বলেছিলেন, “তেরে ঘর কোই দুসরা আদমি সাফাই কর দেগা কেয়া? শের সে লড়না হ্যায় তো রিং মাস্টার বন, নেহি তো ভাগ যা ইহাঁসে।’
ভেগেই তো এসেছি, আর ভাগব কোথায়? ধমক খেয়ে আবার বসেছিলাম। এভাবেই একদিন সাতদিনের গণ্ডি অতিক্রান্ত হয়ে গেল। আমি টের পেলাম নয়দিনের মাথায়। শেষের রাতে বাহ্য জ্ঞান প্রায় লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কখনও এ-ভূমি, কখনও ও-ভূমি, পরের দিন সকালে উঠে অদ্ভুত এক অনুভূতি হল!’
জগা থামল। দেবানন্দের চোখে অদ্ভুত এক ঘোর। মন্ত্রমুগ্ধের মতো বললেন, ‘কীরকম?’
জগা হেসে বলল, ‘দেখি আমার কোনও খিদে নেই। শরীরে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি নেই। এতদিনের উপোস করা শরীর কী করে এতটা উজ্জীবিত থাকতে পারে! অতীতের ঘটনাগুলো মনে পড়ছে বটে, কিন্তু সেগুলো যেন গত জন্মের ঘটনা। আমি মুক্ত, আমি স্বাধীন। সে এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি। বলে বোঝানো মুশকিল। রত্নাকরের বাল্মীকি হওয়ার কাহিনি আমি প্রবচনে হামেশাই শোনাই। কিন্তু সে কাহিনি সবাই শুনে তাৎক্ষণিক ভাবে বিশ্বাস করলেও, কিছুক্ষণ পরেই তার অবচেতন মন আবার তাকে পুরোনো বিশ্বাসেই নিয়ে যায়। কারণ চেতন মন নয়, মানব মনের নাইনটি পার্সেন্ট পরিচালিত হয় অবচেতন মনের দ্বারা। মনোবিজ্ঞান খুবই জটিল এক বিজ্ঞান। এর তল খুঁজতে গিয়ে কত মানুষ পাগলই হয়ে গেছে! কত মহাজ্ঞানী সাধুপুরুষ বিভ্রান্ত হয়ে ভণ্ড কামুকে পরিণত হয়ে গেছেন! এই যেমন ধরুন, একটু আগেই আপনি আমার কাহিনি পরিপূর্ণ ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। এখন কিন্তু আপনার চোখ অন্য কথা বলছে। অর্থাৎ অবচেতন মন খেলা দেখাতে শুরু করেছে। একের পর এক যুক্তিবাণে আপনার চেতন মনকে অবচেতন মন হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ধরাশায়ী করে ফেলবে। ঠিক বলছি তো স্যার?’
চমকে উঠলেন দেবানন্দ। এই কি সেই ক্রিমিনাল হাওয়াই জগা ! ও যেসব কথা এই মুহূর্তে বলছে, সেসব ওর মতো ক্রিমিনালের মুখ থেকে আশা করা যায় না। যতদূর জানেন, ওর পড়াশোনা মাধ্যমিকের নীচেই। চেতন মন জ্যান্ত প্রমাণ চোখের সামনে দেখছে, তবুও অবচেতন মন মানতে চাইছে না। হাজারও যুক্তি, সংশয়, প্রশ্ন তৈরি করে বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে মন। চেতন আর অবচেতন মনের এই ফারাক জগার মতো লোকের জানার কথা নয়। তবুও…
জগা হেসে বলল, ‘বুঝতে পারছি আপনি মেলাতে পারছেন না। সেটাই স্বাভাবিক। আমার গুরুদেব বলতেন, প্রতিটি মানুষের মধ্যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। পশু কখনও পাশবিক প্রবৃত্তি ত্যাগ করতে পারবে না, কিন্তু মানুষ চাইলেই পাশবিক প্রবৃত্তি ত্যাগ করে দৈবী ক্ষমতা লাভ করতে পারে। আমি এখনও কতটা পশু আছি তা আমি জানি না স্যার। তাই মনে মনে নিরন্তর কামনা করতাম, কেউ আমার পরীক্ষা নিক। ভগবান আমার কথা শুনেছেন। আমার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য আপনার চেয়ে বড়ো পরীক্ষক আর কে হতে পারে?’
ঘাবড়ে গেলেন দেবানন্দ। তিনি আবার কীসের পরীক্ষক? জগাই বা কীসের পরীক্ষা দিতে চায়? একের পর এক রহস্যের প্যাঁচে ফেলে জগা কি তাঁকে কোনওভাবে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করছে? অলৌকিক তত্ত্ব খাড়া করে গোপন প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার চেষ্টা করছে? বুঝতে পারছেন না… কিছুই বুঝতে পারছেন না। আগে কখনও তার মাথা এরকম ভাবে ভোম্বল হয়নি। মাথার মধ্যে ঝিমঝিম করছে। ভাবনাগুলোকে কে যেন পুঁটুলির মধ্যে রাখা সর্ষের মতো ছড়িয়ে দিয়েছে। গুছিয়ে তুলতে পারছেন না কিছুতেই।
(ক্রমশ…)





