শুভংকর এতদূর ভেবে নিয়ে শামুকের খোলের মধ্যে গুটিয়ে থাকেন। স্বনামধন্য সাংবাদিক মানুষ। তাঁর লেখা পোস্ট এডিটোরিয়ালগুলো লোকে গোগ্রাসে গেলে। তাছাড়া, এতদিন তিলে তিলে যে মান—সম্মান অর্জন করেছেন, একদিনের এক কেলেঙ্কারিতেই সব গিয়ে পড়বে পানাপুকুরে। সুতরাং সংযমের পাকানো মোটা রশি দিয়ে নিজেকে বেঁধে রাখেন তিনি।

এই সোমা মেয়েটা নাকি একবছরের উপর কাজ নিয়েছে শুভংকরের ফ্ল্যাটে। কিন্তু তিনি আজই প্রথম দেখলেন এই সোমা মেয়েটাকে। শুভংকর লেট রাইজার। কারণও আছে। রাত একটায় লেট এডিশন ছেড়ে নিউজ ডেস্কের নাইটের লোকজনকে সব বুঝিয়ে শুনিয়ে, পাখি পড়িয়ে দরকারে ফোন করিস বলে গভীর রাতে ফিরতে হয়। সুতরাং লেট টু বেড, লেট টু রাইজ। ফলে তিনি যখন আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসেন, তার অনেক আগেই সোমার রান্নাবান্না হয়ে যায়। তারপর বাসন মেজে দিয়ে সোমা তাঁর বেডরুমও নাকি মুছে দেয়। তারপর কখন চলে যায়, টেরই পান না শুভংকর।

শুভংকরের স্ত্রী দোলন আজ খুব ভোরে স্কুলে বেরিয়ে গেছেন। সাতটায় স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন। শুভংকরকে তাই আজ সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে পড়তে হয়েছে। আবার পাড়ার ক্লাবের মাইকও বলেছে, ‘ও তুই ঘুমের ঘোরে থাকবি কত আর…’ ফলে চোখে ঘুমের জটলা নিয়েই উঠে পড়তে হয়েছে। সেই সুবাদে সোমাকে আজই প্রথম দেখলেন শুভংকর মিত্র। তিনি খবরের কাগজগুলো নিয়ে ব্যালকনিতে বেতের চেয়ারে গিয়ে বসেন।

শুভংকরের কাগজ পড়া আজ মাথায় উঠেছে। খুব মনোযোগী পাঠকের মতো কাগজ পড়ার অছিলায় সোমাকে দেখছেন তিনি। কিচেন থেকে সোমা বলল, “দাদা, তোমার চা তো খাওয়া হয়নি, করব চা? খাবে?’ শুভংকর বললেন, ‘কেন? তোর বউদি কি বলে গেছে আমায় চা করে খাওয়াতে?’

সোমা বলল, “না, তা বলে যায়নি। তবে তুমি খেলে আমিও খেতাম। এই সময়টা বউদি আর আমার টিপাটি হয়।”

—কী পাটি হয়?

—টিপাটি গো টিপাটি। মানে আমরা দু’জনে গুছিয়ে বসে চা খাই। গুলতানি করি। নইলে শরীলে ইনার্জি আসে না।

শুভংকর বললেন, “না, চা আজ আর খাওয়া হল কোথায়? করলে কর।”

চা দিতে এসে সোমা বলল, ‘এই শাড়িটা কাল বউদি আমায় দিয়েছে। আজ সাদিনতা দিবস তাই পরেচি। কেমন মানিয়েছে? ভালো?”

—তুই শাড়ি পরিস?

—কেন?

—না, তোর বয়সি মেয়েরা তো আজকাল জিনস পরে, লেগিংস কুর্তি টুর্তি পরে।

সোমা বলল, “আমার ওসব পোষায় না। বাঙালি মেয়ের গায়ে পড়ে অত গা গতর দেখানোর কী আচে? রক্ষে করো বাবা। শুভংকর আর কথা বাড়ালেন না। এই মেয়ের কথায় যা বোল্ডনেস, তাতে কোল্ডনেসটাই শ্রেয়।

সোমা বলল, “তুমি বললে না তো! এই শাড়িতে কেমন লাগছে আমায়?’ শুভংকর ভাবে, মেয়েটা কি ছিটিয়াল নাকি? গিন্নির মতো আবদার করছে! সোমা আবার বলে, ‘কী হল বললে না?”

শুভংকর বলেন, “বেশ, ভালোই তো লাগছে। বেশ মানিয়েছে।’ শুনে সোমা হেসে ফ্যাশন প্যারেডে ওয়াক করা মেয়েদের মতো একটা ঘুরপাক খেল। মানে, সামনে পিছনে সবটা দ্যাখো। নিতম্বের ঢেউটাও দ্যাখো।

শুভংকর ওঁদের দোতলার ব্যালকনির বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে কাগজ পড়ছিলেন। দু’হাতে মেলে ধরে আছেন খবরের কাগজ। পাশের টুলের উপর চায়ের কাপ-ডিশ রেখেছে সোমা। আচমকা সে হামলে পড়ে কাগজের উপর। একেবারে শুভংকরের নাকের কোল ঘেঁষে খবরের কাগজের পাতায় একটা শাড়ির বিজ্ঞাপনে তজনি ঠেকিয়ে বলে, ‘দাদা, এই শাড়িটা হেব্বি না?’ সোমার এই আচমকা উচ্ছ্বাসে শুভংকর বমকে যান। তাঁর নাকে একটা অন্যরকম মেয়েলি গন্ধ সিঁধিয়ে যায়। শুভংকরের উপর সোমার আগুন শরীর ঝুঁকে পড়ে। তড়িৎ গতিতে আবার সোমা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বলে, ‘বলো দাদা, শাড়িটা হেব্বি না?”

—তোর পছন্দ?

—হেব্বি।

—কাগজটা তুই তোর কাছে রাখিস। পুজোর সময় এটা তোর বউদিকে বলে কিনে নিস।

—ইস, বউদি, এত দামি শাড়ি কিনে দেবে নাকি?

—ঠিক আছে, আমি টাকা দেব। তুই কিনে নিস। তোর বউদিকে কিছু বলার দরকার নেই।

—মাত্তা খারাপ! বউদিকে বললে তুমিও কেস খাবে। আমিও খাব।

—আমি কেস খাব কেন?

—বাওবা! কেস খাবে না? বউদি বলবে, কাজের মেয়ের উপর তোমার এত দরদ উথলে উঠল কেন শুনি? তখন তোমার পেস্টিজটা আর থাকবে?

—তোর বউদি এসব বলবে তুই কী করে জানলি?

—জানি গো দাদা জানি। এসব ডায়লগ আমার সব মুখস্থ। তাই বউদিকে জানিয়ে কেস বিলা কোরো না।

শুভংকর চায়ে চুমুক দিয়ে বিষম খেতে যাচ্ছিল। কাপে চুমুক দিয়ে কাপ নামিয়ে রাখেন তিনি।

সোমা বলল, ‘তুমি বোসো। আমি তোমাকে ফুলকো লুচি তরকারি করে খাওয়াচ্ছি।’

—তোর বউদি কি লুচি খাওয়াতে বলে গেছে? সোমা কিচেনের দিকে পা বাড়িয়ে থমকে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, “সব ব্যাপারে অত বউদি বউদি কোরো না তো। তুমি হেডাফ দি ফ্যামিলি। আর আমার নিজের বুঝি সাধ আল্লাদ থাকতে নেই? আমার ইচ্ছে, আমি তোমাকে ফুলকো লুচি করে খাওয়াব। তুমি চুপ করে বোসো। চোখ পাকিয়ে শুভংকরকে শাসন করে চলে যায় সোমা।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...