সাইগনের ইতিহাস যেন এক রোলার কোস্টার রাইড। কখনও ফরাসি, কখনও জাপানি, আবার কখনও আমেরিকানদের দখলে! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ফরাসিদের হাত থেকে শহরটি কেড়ে নেয় জাপান। কিন্তু সে দখলও বেশিদিন টিকল না। যুদ্ধের শেষে জাপান হেরে যেতেই ফরাসিরা আবার এসে সাইগনের মালিকানা দাবি করে বসল!
তবে স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরদিন দমিয়ে রাখা যায় না। ১৯৫৪ সালে, প্রথম ইন্দো-চিন যুদ্ধের পর ভিয়েতনাম অবশেষে ফরাসিদের হাত থেকে মুক্তি পেল। কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়! জেনেভা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, দেশটিকে দু-ভাগ করা হলো— উত্তর ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম। উত্তর অংশটি হো চি মিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট শাসনে গেল। আর দক্ষিণ অংশটি আমেরিকার সমর্থন পাওয়া অ্যান্টি-কমিউনিস্ট সরকার দ্বারা শাসিত হল।
তবে এই বিভাজন শুধু সাময়িক ছিল। ১৯৫৬ সালে ভোটের মাধ্যমে দেশ একত্রিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দক্ষিণ ভিয়েতনাম ভোট দিতে রাজি হল না। তারপরই শুরু হল ইতিহাসের এক ভয়ংকর অধ্যায়— ভিয়েতনাম যুদ্ধ! বছরের পর বছর যুদ্ধের ধ্বংসলীলা চলল, রক্ত ঝরল, মানুষ ঘরছাড়া হল। শেষে ১৯৭৫ সালে উত্তর ভিয়েতনাম বিজয়ী হল। দেশ আবার একত্রিত হল। আর সাইগন পেল নতুন নাম— হো চি মিন সিটি! তবে হো চি মিন তার জীবদ্দশায় এই স্বাধীন অবিভক্ত ভিয়েতনাম দেখে যেতে পারলেন না!

এসব ভাবতে ভাবতেই কখন হোটেলে পৌঁছে গেছি টেরই পেলাম না। কিন্তু এ তো এক নতুন বিপত্তি! ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১১টা, আর হোটেলের চেক-ইন টাইম দুপুর ২টো! বিদেশি পর্যটকদের জন্য হোটেল চেক-ইনে সাধারণত খুব একটা কড়াকড়ি ব্যবস্থা থাকে না। কিন্তু এই হোটেলের রিসেপশনিস্ট একগাল হেসে জানিয়ে দিল— দুটোর আগে সম্ভব না, পরে আসুন।
আমাদের দুটো বিশাল লাগেজ। ওগুলো নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সম্ভব নয়। অনুরোধ করলাম, ‘আপনারা কি লাগেজগুলো ভিতরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারবেন?”
মেয়েটি আধা ইংরেজি, আধা ভিয়েতনামিজ ভাষায় উত্তর দিল, “ঠিক আছে, এখানেই রেখে যান।’
আশপাশে লোকজনের ভিড়। লাগেজগুলো এখানে এভাবে রেখে যাওয়াটা ঠিক হবে কি না ভেবে একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত অনেক অনুনয়-বিনয় করে আমাদের লাগেজগুলো ভিতরে রাখার ব্যবস্থা হল।
এখন হাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময়। হোটেলের সামনেই চোখে পড়ল একটা বড়ো শপিং মল আর তার সঙ্গে লাগোয়া ফুড কোর্ট। হোটেলের নরম বিছানায় শরীর এলিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন মনের ভিতর পুষে রেখে ঢুকলাম ফুড কোর্টে। খাবারের বিশাল সমারোহ দেখে ক্লান্তি নিমেষে উধাও! একটা প্লেটে করে প্রথমে এল কাঁচা মাছ, চিংড়ি, মাশরুম আর নানা ধরনের সবজি। তারপর এল গ্যাস বার্নার আর একটা কড়াই! একজন মেয়েও হাজির হল আমাদের টেবিলে, শুরু করল রান্না।
এ তো দেখি টেবিল-সাইড লাইভ কুকিং শো! এখানে রান্নায় কোনও মশলা ব্যবহার করা হয় না, শুধু নানা ধরনের সস দেওয়া হয়। আমি যেহেতু ঝাল খাবার একদম পছন্দ করি না, তাই এই খাবারের ধরন দারুণ লাগল!
খাওয়া শেষে অবশেষে হোটেলে ফিরে রুমের দরজা খুলতেই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম! বারো তলার উপরে ঘর, সঙ্গে একটা বড়ো বারান্দা। এখান থেকে শহরের অনেকটা অংশ দেখা যাচ্ছে! আমরা বেশি সময় নষ্ট না করে একটু ফ্রেশ হয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম হো চি মিন সিটি ঘুরে দেখার জন্য!
আমাদের হোটেল থেকে হাঁটা পথেই হো চি মিন সিটির বিখ্যাত নটর ডেম ক্যাথেড্রাল ব্যাসিলিকা — ইউরোপের গথিক স্থাপত্যের রাজকীয় এক নমুনা! ১৮৮০ সালে ফরাসিরা লাল ইট, টাইলস আর স্টেইন্ড গ্লাস সব আমদানি করে এনেছিল ফ্রান্স থেকে। এ যেন কলোনিয়াল আভিজাত্যের এক স্থাপত্যগত উচ্চকিত ঘোষণা! ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় কিছুটা ক্ষতি হলেও, এখনও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে কুমারী মেরি-র এক প্রশান্ত মূর্তি, যাকে রেজিনা প্যাচিস (শান্তির রানি) বলা হয়। ১৯৬২ সালে পোপ জন (২৩-তম) একে ব্যাসিলিকার মর্যাদা দেন। নিয়তির কী পরিহাস! যে শহরের একদিকে গোলা-বারুদের ঝনঝনানি, অন্যদিকে সে শহরেই দাঁড়িয়ে আছেন শান্তির রানি!
নটর ডেম ক্যাথেড্রালের পাশেই সাইগন সেন্ট্রাল পোস্ট অফিস। তবে নাম শুনেই ভুল করবেন না, এটা কোনও সাধারণ পোস্ট অফিস নয়! ফরাসি স্থপতি আলফ্রেড ফোলহু ১৮৯১ সালে এমন ভাবে ডিজাইন করেছিলেন, যেন ভবিষ্যতের মানুষ দাঁড়িয়ে বলবে, চিঠি পাঠানোর জায়গা যদি এমন হয়, তাহলে ইমেইল আসার দরকারটাই বা কী?
গথিক, রেনেসাঁ আর ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের এক দুর্দান্ত মিশ্রণ! ভিতরে ঢুকতেই হো চি মিনের বিশাল প্রতিকৃতি। ভিয়েতনামের স্বাধীনতা আন্দোলনের মহানায়ক, যাঁর নামেই এখন এই শহরের নাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকলাম, ইতিহাসের সামনে বিনম্র হওয়ার এটাই তো নিয়ম!
পোস্ট অফিস থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই পা চলে গেল হো চি মিন সিটি বুক স্ট্রিটে। ব্যস্ত শহরের মধ্যে যেন এক আশ্চর্য নিরিবিলি জায়গা! গাড়ির শব্দ নেই, হর্নের বিরক্তি নেই। শুধু ছায়াঘেরা রাস্তার পাশে সারি সারি বইয়ের দোকান, কফির স্টল, আর পাঠকের ব্যস্ততা! বইপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গোদ্যান!





