আমি এক কাপ চা নিয়ে বসলাম। চায়ের ধোঁয়া আর বইয়ের গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিল। শহরের ব্যস্ততা, ইতিহাস, বইয়ের রাজ্য ঘুরে সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে নরম বিছানায় শুয়ে মনে হল— এই যে ঘুরলাম, শিখলাম, অনুভব করলাম, সেটাই তো প্রকৃত ভ্রমণ! সত্যিই, কিছু জায়গা শুধু দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়!

আজকের দিনটা যে অ্যাডভেঞ্চারে ভরপুর হতে চলেছে, সে ব্যাপারে কোনও সংশয় নেই। বহু প্রতীক্ষিত কু চি টানেল দেখার দিন আজ! উত্তেজনায় তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে হোটেলের রিসেপশনে নেমে এলাম। মিনিট দশেক অপেক্ষার পর আমাদের ট্রাভেল গ্রুপের বাস এল। আমরা রওনা দিলাম এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী হতে।

হো চি মিন সিটির ব্যস্ততা ধীরে ধীরে পিছনে ফেলে, আমরা প্রবেশ করলাম সবুজ মাঠ, সরল প্রকৃতি আর নিস্তব্ধ এক গ্রামীণ পরিবেশে। আমাদের গাইড বেশ প্রাণবন্ত, গল্প বলতে বলতে ইতিহাসের গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু গল্প নয়, যেন যুদ্ধকালীন দিনের চিত্র চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে! ইতিহাস বইয়ে বহুবার পড়েছি এই টানেলের কথা, কিন্তু এবার আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে! এক অদ্ভুত অনুভূতি হল। উত্তেজনা, কৌতূহল আর একরাশ নীরব শ্রদ্ধা মিলেমিশে এক হয়ে গেল!

ভিয়েত কং সৈনিকরা এখানে বছরের পর বছর লুকিয়ে থেকেছে। আমরা আধঘণ্টা মোবাইল ছাড়া থাকতে পারি না, আর ওরা মাটির নীচে বছরের পর বছর কাটিয়েছে! তার উপর অন্ধকার, গরম, অক্সিজেনের অভাব, বিষাক্ত সাপ, বাদুড়, পোকামাকড় — সব মিলিয়ে এক ভয়ানক বাস্তবতা!

এই টানেলগুলো প্রথমে ফরাসি ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় এগুলো হয়ে উঠল এক জটিল গোপন ছক। শুধু লুকানোর জায়গা নয়। হাসপাতাল, রান্নাঘর, যুদ্ধ পরিকল্পনার ঘর, এমনকী অস্থায়ী স্কুল পর্যন্ত ছিল এখানে! মোট ২৫০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ এই টানেল বহুস্তর বিশিষ্ট ছিল, বোমার আঘাতেও ভাঙত না। শত্রুদের ধোঁকা দিতে চতুর সব ফাঁদ, বুবিট্র্যাপ ব্যবহার করা হতো।

একজন সৈনিক এসে দেখালেন কীভাবে ভিয়েত কং যোদ্ধারা মুহূর্তের মধ্যে গর্তে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে যেত। এবার আমাদের পালা! আমার গায়ে কাঁপুনি দিচ্ছিল, তবুও ভিতরে ঢুকলাম। মাথা নিচু করে কাঁকড়ার মতো হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে হচ্ছে। চারপাশে স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ। দেয়ালের সঙ্গে শরীর লেগে আসছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল আমি আটকে যাব! কিন্তু ভাবলাম, আমার এই সামান্য অস্বস্তি, আর যারা এখানে বছরের পর বছর কাটিয়েছে, তাদের কষ্টের তুলনায় কিচ্ছু না! তবুও, ভিতরে থাকতে থাকতে এক মুঠো রোদ আর মুক্ত বাতাসের জন্য মন আনচান করতে লাগল। অবশেষে যখন বেরিয়ে এলাম, মনে হল, এরপর থেকে নিজের ঘর কখনও ছোটো বলে মনে হবে না!

সব শেষে আমাদের দেওয়া হল যুদ্ধকালীন ভিয়েতনামি সৈনিকদের প্রধান খাবার- — সেদ্ধ কাসাভা আর বাদামের চাটনি। এখনকার শহুরে খাবারের সঙ্গে এই স্বাদের তুলনা হয় না। কিন্তু এটা খেতে খেতে মনে হল, যেন পঞ্চাশ বছর আগের ইতিহাসের এক টুকরো আমি নিজেই চিবিয়ে খাচ্ছি! এটাই ছিল সেই খাবার, যার জোরে ভিয়েত কং যোদ্ধারা আমেরিকার সৈনিকদের শুধু প্রতিরোধই করেনি, তাদের হার মানতে বাধ্য করেছিল।

বাসে ফেরার পথে জানলার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিলাম, যুদ্ধের আসল শক্তি কি অস্ত্র? নাকি ধৈর্য, কৌশল আর অদম্য মানসিক শক্তি? ভিয়েত কং যোদ্ধারা যুদ্ধ জিতেছিল মাটির নীচে, অন্ধকারে, ইতিহাসের পাতায় নয়, বাস্তবের ময়দানে! আমি ফিরে যাচ্ছি, কিন্তু কু চি টানেলের স্মৃতি আর অনুভূতি মনে থাকবে আজীবন!

কু চি টানেল থেকে ফেরার পথে ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় অনুভব করতে চাইলাম — হো চি মিন সিটির ওয়ার রেমন্যান্টস মিউজিয়াম। আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসির ভিয়েতনাম ভেটেরানস মেমোরিয়ালের সঙ্গে এর অনেক তফাৎ। যুদ্ধের ভয়াবহতা পুরোপুরি বুঝতে চাইলে দুই পক্ষের দৃষ্টিকোণই জানা প্রয়োজন। কিন্তু এই মিউজিয়ামে ঢোকার আগে বুঝতেই পারিনি যে, আমি একটাই মোশনাল রোলার কোস্টারে উঠতে চলেছি! বিস্ময়, দুঃখ, রাগ, ঘৃণা, করুণা, অবসাদ— সব অনুভূতি যেন আমাকে একসঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।

প্রবেশ মুখে বিশাল এক মার্কিন যুদ্ধবিমান আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে যুদ্ধের ক্ষত বহনকারী এক ট্যাংক। অনেকেই সেলফি তুলতে ব্যস্ত। কিন্তু আমি কিছুতেই মনের সায় পেলাম না। তাই মিউজিয়ামের ভিতরে ঢুকলাম। মিউজিয়ামের ভিতরের পরিবেশ আরও কষ্টদায়ক। দেয়ালজুড়ে কালো-সাদা দুর্বিষহ ফটোগ্রাফ। একটির পর একটি আরও বিধ্বংসী দৃশ্য! কিন্তু যা আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল, তা হল ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ প্রদর্শনী।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...