অটোচালক গাড়ির গতি একটু ধীর করে দিল। টানা টানা বাংলায় বলে চলল— এ রাজপথের নাম এখন হয়েছে কর্তব্যপথ। প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন রাজপথের দু-পাশে ব্যারিকেড করে দেওয়া হয়, যাতে ব্যারিকেড ভেঙে কেউ ভিতরে এসে কুচকাওয়াজে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে।

—আপনারা লোকাল লোক কুচকাওয়াজ দেখতে আসেন?

স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে মাথা নেড়ে উত্তর দেয়, ‘কভি, কভি।”

হাসে সুবর্ণ। সবসময় ব্যারিকেড করে কি সব আটকানো যায়? সেও একবার ব্যারিকেড ভেঙেছিল। স্মৃতিতে তার এখনও পরত পড়েনি। মনোরমার জন্মদিন। অন্য বন্ধুদের সঙ্গে সুবর্ণও নিমন্ত্রিত মনোরমার বাড়িতে। কী সুন্দর লাগছিল মনোরমাকে। হইহুল্লোড় আনন্দের মধ্যে বারবার মনোরমাকে পেতে মন চাইছিল।

মনোরমা ইঙ্গিতে জানিয়ে দিল— পরে সুযোগ হলে।

পার্টি তখন শেষের দিকে। আলমারির পিছন দিকে এল মনোরমা। মনোরমাকে জড়িয়ে ধরে একটা মাত্র চুমু…।

মনোরমার মা চেঁচিয়ে উঠলেন, —এসব কী!

কখন ওদের পিছনে এসেছিলেন, ওরা টের পায়নি।

বাড়িতে ফিরে এসে বেশ টালমাটাল লাগছিল সুবর্ণর। বিপন্ন লাগছিল নিজেকে, মনোরমাকে। মা-বাবাকে সব খুলে বলেছিল সুবর্ণ।

সব শুনে বাবা চুপ করে গেছিল। মা কথা বলেছিল খুব ধীরে। বুঝিয়েছিল— এখন এসবের সময় নয়। তাছাড়া ওনারা রাজি হবেন না।

মাকে বলেছিল সুবর্ণ— আমরা দু’জনে তো দু’জনের কাছে কমিটমেন্ট করেছি।

মনোরমা আর কলেজে আসেনি। শুনেছিল ওর বাবার ট্রান্সফার হয়ে গেছে মহারাষ্ট্রে।

ইন্ডিয়া গেটের রাস্তা পার করে হায়দ্রাবাদ হাউসের সামনে এসে অটোচালক জানতে চাইলেন, ডানদিকে বেঁকে কস্তুরবা গান্ধী মার্গে সি আর হোস্টেল তো?

—হ্যাঁ। মাথা নাড়ে সুবর্ণ।

অটো থেকে নেমে মোবাইলে টাইম দেখল, এখন হোস্টেলে ডিনার দেবে। রুমে গিয়েই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসবে, খুব খিদে পেয়েছে, সারাদিন সেভাবে…। সিঁড়ির মুখেই মিঃ দস্তিদারের সঙ্গে দেখা।

—এই ফিরলেন? আমি দুপুরেই ফিরেছি।

—ও। আসলে কাজ শেষ হতে দেরি হল। আপনি কি ক্যান্টিন থেকে ডিনার করে ফিরছেন?

—না, না। সবে তো সাড়ে আটটা বাজে, একটু পরে যাব।

ক্যান্টিনের মেনুতে দুটো রুটি, আচার, রাইস আর ডাল সবজি। রুটি খেতে খেতে সুবর্ণ ভাবে, কাল বাংলা ভবনের রেঁস্তোরা থেকে ডিনার করবে। গতবারে এসে পাশে তেলেঙ্গানা হাউসের রেস্টুরেন্ট থেকে সাউথ ইন্ডিয়ান ডিশ খেয়েছিল।

—হ্যালো, কখন এলেন?

মুখ তুলে দেখে পাশের টেবিলে মিঃ দস্তিদার। আর ওনার সঙ্গে! দস্তিদার পরিচয় করিয়ে দিলেন— ‘আমার স্ত্রী’। সৌন্দর্য আর বয়স বাড়ার ব্যক্তিত্বে কী অপরূপা লাগছে! সুবর্ণকে দেখে তার নদীর গাঙের মতো অপূর্ব মায়াবী চোখ দুটি তুলে নামিয়ে নিলেন তিনি। সুবর্ণর মুখে আলাপের একটু হাসি ফুটে রইল।

রুটির পর, রাইসও খেতে ইচ্ছে করল না সুবর্ণর। সবজিও তেমন না। শরীরটা কি ভালো নেই তবে? হাতেই ডালমাখা শুকিয়ে গেল। ওয়েটার বারবার এসে জিজ্ঞেস করে— আর কিছু লাগবে স্যার? সুবর্ণ মাথা নেড়ে উঠেই পড়ে।

হোস্টেলের রুমে এসে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে। মাথা শরীর জুড়ে একটা যন্ত্রণা বাড়ছে। এখনও তিনদিন বাড়ি ফিরতে। তবে কি ঘুম হলে সে সুস্থ বোধ করবে? লম্বা ঘুম। কিন্তু আসে না যে। ব্যালকনিতে এসে সিগারেট ধরায়। তারা ভরা আকাশের দিকে একরাশ ধোঁয়া ছুঁড়ে দেয়। এখান থেকে ইন্ডিয়া গেট দেখা যাচ্ছে না। হায়দ্রাবাদ হাউসের মাথা দেখা যাচ্ছে। যেমন দেখা যাচ্ছে না পাশের তিনশো তেইশের ব্যালকনিটা। একটা লম্বা দেয়াল খাড়া হয়ে আছে।

পরের দিন দুপুরে ইন্ডিয়া গেট ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে সুবর্ণ। আগেরবারেও এসে দেখেছিল ইন্ডিয়া গেটের ভিতরে অমর জওয়ান জ্যোতি জ্বলছে। না, এবারে তা নেই। সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন সেখানে লোটাস বানানো হয়েছে। তার একটু আগে সুভাষচন্দ্রের একটা স্ট্যাচু বসানো হয়েছে। ইন্ডিয়া গেটের বামদিকে কর্তব্যপথ ধরে ঝিলটা খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে। ঝিলের পাশে খাওয়ার স্টল। অনেক বদলে গেছে চারদিক। সুবর্ণ ইন্ডিয়া গেটের পাশে দাঁড়িয়ে উপর দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে ইন্ডিয়াগেটের কারুকার্য। -আমাদের একটা ছবি তুলে দেন তো। এই ইন্ডিয়া গেটের ফ্রন্টের দিকে।

সুবর্ণ ঘুরে তাকাতেই মিঃ দস্তিদার বলে উঠলেন, ‘আরে আপনি? কখন এসেছেন?”

—অনেকক্ষণ। দিল্লি এলেই এখানে আসি। এ জায়গাটা আমায় টানে।

—আমি ভাবলাম আজ সানডে-তে আর কোথাও যাব না, হোস্টেলের ঘরে একটু আয়েশ করি। আমার স্ত্রী মনোরমা জোর করে নিয়ে এল। দিল্লি এলে ইন্ডিয়া গেট ওর দেখা চাই-ই চাই। ও বলে— স্মৃতিস্তম্ভ শুধু ইট পাথরের নয়, মানুষ নিজেও এক একটা স্মৃতিস্তম্ভ। যতদিন বেঁচে থাকে, কত স্মৃতি বুকে বয়ে বেড়ায়!

মনোরমা মিঃ দস্তিদারের পাশে দাঁড়িয়ে উলটো দিকে মুখ করে। সুবর্ণ মাথা নিচু করে মিঃ দস্তিদারের কথায় বলে— বাঃ সুন্দর বলেছেন তো উনি।

বাই দ্য ওয়ে, মিঃ দস্তিদার এবার বলে উঠলেন— গতকাল আপনি বলছিলেন না, আপনার বাড়ি কলকাতার সোদপুরে?

—হ্যাঁ৷

মনোরমারাও একসময় সোদপুরে ছিল।

—ও তাই!

এরপর দু’একটা কথা।

শীতের মিঠে ভাব উধাও হয়ে দুপুরের রোদটা চিড়বিড় করে বাড়ছে। ইন্ডিয়া গেটের ময়দানের সতেজতা বজায় রাখতে হোস পাইপ দিয়ে জল ঢালছে কর্মীরা। মানুষজন এদিক ওদিকে, কেউ কেউ নিজস্বী তোলাতে ব্যস্ত। মিঃ দস্তিদার ছাওয়ার দিকে সরে গিয়ে গেটে প্রহরারত আর্মিদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।

সুবর্ণও কর্তব্যপথের পাশে গাছের ছায়ায় সরে এসে দাঁড়ায়। রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে নেয়। মুখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখে মিঃ দস্তিদারের পাশে দাঁড়িয়ে, তার দিকে তাকিয়ে আছে ম…নো…র…মা! নদীর গাঙের মতো অপূর্ব মায়াবী চোখ দুটি।

ইন্ডিয়া গেটের ময়দান জুড়ে একটা উত্তুরে হাওয়া পাক খেতে থাকে। অল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকে দুই স্মৃতিস্তম্ভ, যাদের বুকে বয়ে চলেছে একই স্মৃতি।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...