আমার শূন্যে ছোড়া তির কাজে লেগে গেল। টাপুর অজান্তেই সত্যি বলে দিল। আমি বললাম চিন্তা করিস না, টুপুর ভালো হয়ে যাবে। শুধু দেখিস মেডিসিন যেন দুম করে বন্ধ করে না দেয় আর মরাল সাপোর্ট দিস।

বছর ঘুরল। রেজাল্ট ভালো হওয়ায় আমি এমএসসি-তে অ্যাপ্লায়েড সাইকোলজি নিলাম। ডিপার্টমেন্টের হেড কলকাতার নাম করা মনোবিজ্ঞানী ডা. বৌধায়ন মুখার্জির সুনজরে পড়লাম। ওঁনাকে আমি একদিন টুপুরের ছবি দেখিয়ে কেস হিস্ট্রিটা বললাম। স্যার মন দিয়ে শুনে বললেন, “এই পেশেন্টরা ফেজে ফেজে চলে। রেগুলার কাউন্সেলিং, নিয়মিত মেডিকেশন আর ফ্যামিলি সাপোর্ট পেলে কনফিডেন্স ফিরে আসে, ভালো হয়ে যায়।’ খুশি হয়ে বললাম, ‘দরকার হলে আপনার সাহায্য নেব স্যার। প্লিজ সেভ মাই চাইল্ডহুড ফ্রেন্ড।’ উনি বললেন, ‘সিওর ইয়াং লেডি।’

টাপুর তো বরাবরই ভালো। ও যাদবপুর থেকে খড়গপুর আইআইটি-তে চলে গেল। এর মধ্যে মায়ের মুখে শুনলাম টুপুরের জন্য বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। মা বলল, ‘ডাক্তার বলেছেন টুপুর একদম ভালো হয়ে গেছে। গ্র্যাজুয়েশনও শেষ, তাই ওকে বিয়ে দিতেই পারেন।’ একটা বিয়েবাড়িতে টুপুর-কে দেখে পাত্র নিজেই পছন্দ করেছে। ছেলের আগ্রহ বেশি, তাই অগ্রহায়ণেই বিয়ে ফিক্স হতে পারে। টুপুরের সেই সাইকিয়াট্রিস্ট ডাক্তার গ্রিন সিগন্যাল দেওয়ায় সেন বাড়ি এগোচ্ছে।’

আমি ভবিষ্যতের সাইকিয়াট্রিস্ট। এখন স্যারের সঙ্গে নিয়মিত কেস হ্যান্ডেল করি। বন্ধু হিসেবে আমারও কিছু দায়িত্ব থেকে যায়। বিয়েটা ম্যাচিওর করছে জেনে, না জানিয়ে ঝটিকা সফরে আমি বাড়ি এলাম। মা তো হতভম্ব। কফির কাপে সিপ দিতে দিতে মায়ের সামনেই সেন কাকিকে টুকুস করে ফোন করে, যেচে বিকেলের চায়ের নেমতন্ন নিলাম।

মা তো আমার কাণ্ড দেখে চোখ কপালে তুলে বলল, ‘সর্বনাশ।”

—সর্বনাশ যাতে না হয়, সেই জন্যই এই ব্যস্ত শেডিউল ছেড়ে ছুটে এসেছি মা। নিশ্চিন্তে থাকো।

বিকেলে গেলাম। বেশ লম্বা গ্যাপের পর ওদের সঙ্গে দেখা। সেন কাকু কাকি অনেকটা বয়স বাড়িয়ে ফেলেছেন। দীর্ঘদিন পর তিনজনের সঙ্গে চুটিয়ে গল্প করে খেয়ে বাড়ি ফিরলাম। মনে হল, কোনওদিন টুপুরের কিচ্ছু হয়নি, এক্কেবারে স্বাভাবিক। আমার সাইকোলজির পাণ্ডিত্য দিয়ে কিছু নজর করতে পারলাম না। আমি যে টুপুরের বিষয় জানি, তা প্রকাশও করলাম না।

টুপুরের হবু জামাইয়ের বর্ণনায় মা উচ্ছ্বসিত। অভিনন্দন দত্তগুপ্ত। পান্টিম্বর। দুর্গাপুরে স্টিল প্ল্যান্টে চাকরি করে বিশাল পোস্টে। আমি শুধু বললাম, ‘এত পালটি-টালটি বুঝি না মা; সব ঠিক আছে। কিন্তু টুপুরের যে-অসুখটা করেছিল, সেন কাকিরা কি সেটা ছেলেকে জানিয়েছে?’ মা সদুত্তর দিতে পারল না। শুধু বলল, ‘টুপুর যখন ভালো হয়ে গেছে, তখন আগ বাড়িয়ে বলে কী লাভ? আসলে কী হয়েছিল বল তো? ডিপ্রেশন?

সবটা চেপে গিয়ে বলি, ‘ওই ধরনেরই কিছু হবে; তবে মা, এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসো। এখন অ্যারেঞ্জন্ড ম্যারেজে ছেলে-মেয়ে দু’জনের ব্লাড গ্রুপ-সহ যাবতীয় তথ্য বায়োডাটায় দিতে হয়। এটা নেহাত বর একতরফা পছন্দ করেছে তাই। টুপুর এখন একদম সুস্থ, তাই তো বলা আরও উচিত ছিল। সজ্জন মানুষ হলে ঠিক বুঝবে, পাশে থাকবে৷’

আমরা টুপুরের বিয়েতে দারুণ মজা করে আইবুড়ো ভাত থেকে নিমন্ত্রণ খেলাম। ক্যাম্পাসের মাঠে বিশাল প্যান্ডেল বেঁধে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোক দিয়ে সাজিয়ে, টুপুরের বিয়ে হয়ে গেল। স্বপ্নের মতো চারটে দিন যেন বাষ্প হয়ে মিলিয়ে গেল। টুপুর সারা পাড়াকে কাঁদিয়ে বরের সঙ্গে দুর্গাপুরে চলে গেল।

পরের বছর দীপাবলিতে কিছু আন-এক্সপেক্টেড ছুটি জুটে যেতে বাড়ি এসে দেখি, টাপুর এসেছে। শুনলাম, টুপুররা পুজোয় এসেছিল। অভিদা আর টুপুর-কে দারুণ মানিয়েছে। অভিদাকে চমৎকার সেন্সেবল ছেলে বলেই মনে হয়েছে আলাপ করে। টুপুরের বিয়ের পরে এই দেখা হল টাপুরের সঙ্গে। বলল, “চল, তিনদিনের জন্য দুর্গাপুর থেকে ঘুরে আসি দু’জনে। টুপুর আর অভি’দা দারুণ খুশি হবে। সামনেই ওদের প্রথম ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি।’

টাপুরের পাল্লায় পড়ে রাজি হয়ে গেলাম।

অনেকদিন পর এসি চেয়ারকারে দূরপাল্লার জার্নি করছি। ভীষণ ভালো লাগছে, যেন উড়ন্ত শঙ্খচিল ! নির্ধারিত সময়ে দুর্গাপুর ঢুকছে ট্রেন। আমরা লাগেজ নিয়ে ওভারব্রিজের দিকে পা চালিয়ে সিঁড়িতে পা রাখতে যাব, হঠাৎ মাথায় একটা চাঁটি। তাকিয়ে দেখে বলি, ‘ও,ও মা অভিদা তুমি!’

ড্রাইভার ততক্ষণে আমাদের লাগেজ নিয়ে নিয়েছে। অভিদা আমাদের দু’জনকে দুই পাশে নিয়ে গল্প করতে করতে এক্সিটের দিকে হাঁটতে লাগল। আমি এক সন্তান। নিজের ভাই, বোন, দাদা কেউ নেই। আমার ভীষণ ভালো লাগছিল অভিদা’র দাদা-সুলভ এই ব্যবহারের জন্য।

গাড়ি সরাসরি গুলমোহর গাছের ক্যানপির মধ্য দিয়ে গিয়ে হর্ন বাজিয়ে দাঁড়াল বাংলোর সামনে। টুপুর ভিতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে আমাদের দু’জন-কে জড়িয়ে ধরল। আদর জড়াজড়ির শেষে নজর পড়ল বাগানের ঝুলন্ত দোলনায়। আমরা বুড়ো ধাড়ি হয়ে, লাগেজ টাগেজ ভুলে ঝপাৎ করে দোলনায় উঠে পড়লাম।

ছোটোবেলায় পার্কে আমি আর টাপুর জোড়া শালিকের মতো থাকতাম সব সময়। আর সব থেকে উঁচুতে উঠে যেতাম দুলতে দুলতে। অভিদা ওদের ড্রাইভার সব দাঁড়িয়ে দেখছে আমাদের কাণ্ড। আমরাও স্মৃতি থেকে চোরকাঁটা তোলার মতো দুলে দুলে স্মৃতিচারণ করে ক্ষান্ত হলাম।

বাংলোটা কী সুন্দর করে নিপুণ হাতে সাজিয়েছে টুপুর। ঘরের প্রতিটি কোনায় টুপুরের শিল্পীসত্তার প্রতিফলন। ড্রয়িংরুম ট্রাইবল আর্ট আর মডার্ন আর্টের কম্বিনেশনে সাজানো। ঝাড়লণ্ঠনটা রঙিন নক্সাদার দড়ির বুনটে বাঁধা। ড্রইং থেকে ডাইনিং-এর লম্বা প্যাসেজের দেয়ালে ঝিনুকের বিশাল চামচ আর ফর্ক ঝোলানো। আমি বলেই ফেললাম, ‘টুপুর কী করেছিস রে, এ তো পুরো হোটেল। আমার তো বসতেই ভয় করছে।

টুপুর বরাবরই চুপচাপ। কিন্তু একটা প্রচ্ছন্ন গরিমা খেলে গেল প্রশংসা শুনে। অভিদা তো এমন ভাব করল যেন টুপুর-কে ওই আবিষ্কার করছে, এতটাই বুকের ছাতি ফুলিয়ে বলল, ‘আমার সিলেকশন একেবারে পারফেক্ট।’

স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চে বসে গেলাম সবাই। আমাদের মুখ আর আড্ডা একযোগে চলতে থাকল। দুপুরে একটা জব্বর ঘুম দিলাম। ঘুমের শেষের দিকে ঝাপসা কেমন একটা স্বপ্ন দেখে ধড়মড় করে উঠে বসে কিছুক্ষণ গুম হয়ে থাকলাম স্বপ্নের অভিঘাত সামলাতে।

টাপুর-কে ধাক্কা দিতে যাব, তখনই দরজা নক করে টুপুর একটা বাসন্তী কালারের সিল্কের শাড়ি পরে এসে ঢুকল। বলল, “কী রে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমোলে হবে?’

আমি হাঁ করে দেখছি, কী অপূর্ব লাগছে টুপুরকে। ঠিক যেন বুদ্ধদেব গুহ-র ‘কুচি”!

—চা রেডি। চল চল, ওঠ।

বাংলোর পিছনের দিকে ডেক ব্যালকনিতে সুন্দর ক্রকারিজে চা, কুকিজ, সাজানো টিকোজি দিয়ে ঢাকা টি-পট। সামনে রয়েছে সবুজ গাছ-গাছালিতে ভরা চোখ জুড়ানো বাগান।

আমরা তিনজনে বের হলাম হাঁটতে। টুপুর পরিচয় করাল মিত্র বউদি, সোনম গুলজার, ওর সব নতুন ফ্রেন্ডস সার্কেলের সঙ্গে। মনে হল টুপুরকে সবাই খুব পছন্দ করেন। রাত আটটায় অভিদা নামী রেস্তোরাঁর স্ন্যাক্স আর রেড ওয়াইন নিয়ে হাজির। আমি তো বেমালুম ভুলেই মেরে দিয়েছি গিফটের কথা। ফোনে মায়ের ম্যাসেজ দেখে দৌড়ে ঘরে গিয়ে গিফট প্যাক দুটো নিয়ে এসে অভিদা আর টুপুর-কে দিলাম। অভিদা পুরো ছেলে মানুষের মতো নতুন টাইটা পরে নিল। কাফলিংস হাতে নিয়ে বলল, ‘ভীষণ পছন্দ হয়েছে টুঙ্কা।’ আর টুপুর তো জড়িয়ে ধরে প্রায় কেঁদে ফেলে আর কী! এরপর রেড ওয়াইন দিয়ে সেলিব্রেশন। অভিদা বলল, ‘সুন্দরী শালিদের উপস্থিতি মানেই সেলিব্রেশন, চিয়ার্স।’

( ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...