সুমনকে জবাব দিয়ে দিয়েছেন ডক্টর। আর বড়োজোর একমাস বেঁচে থাকবে। তারপর কী হবে জানে না রাকা। বিয়ের তিন মাসের মধ্যে এমন ছন্দপতন ঘটবে, তা দু’জনের কেউ ভাবতে পারেনি। সুমন তাই বলল, “আমি তোমার জীবনটা নষ্ট করে দিলাম।”
রাকা ঝাঁজিয়ে উঠল, “চুপ করবে? তোমার ভিতরে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে, তুমি কি আগে জানতে?”
—জানতাম না। জানলে বিয়ে করতাম নাকি? রাকা চুপ করে রইল।
—শোনো, আমার মরার পর তুমি আবার বিয়ে করবে।
রাকা চমকে উঠল, ‘কী বলছ?’
—একা থাকতে পারবে না। তুমি তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নেবে।
সুমনের ডান হাতটা হাতের মুঠোয় নিয়ে রাকা গালে ছোঁয়াল, ‘ওগো তুমি চুপ করো। আমার কপালে যা লেখা আছে তাই হবে।”
—শোনো। আমি স্বার্থপর নই। তোমার শারীরিক চাহিদা মেটাতে পারছি না। তুমি শুকিয়ে মরছ। আমার খুব কষ্ট হয়। তুমি কাউকে ডাকতে পারো।
—ছিঃ
—ছিঃ ছিঃ কোরো না।
—তোমার সামনে ওসব করলে তোমার ভালো লাগবে? চুপ করে ঘুমাও তো।
—ঘুম আসে না। তোমার চিন্তায় মাঝেমধ্যে ভাবি, বিয়ে না করলে ভালো হতো। মরে যেতাম। কাঁদার কেউ থাকত না।
—যতসব বাজে কথা! বলেই রাকা ব্যালকনিতে এল।
ব্যালকনি থেকে সুমনের গলা শুনতে পেল, “আমার কথাটা ভেবে দেখো।’
—কী বলছে?
রাকা চমকে উঠে তাকাল পাশের ব্যালকনিতে। আগে ছিল, না পরে এল— বুঝতে পারল না। এক পলক দেখে বলল, “শুনে কী করবেন?”
সদ্য বিপত্নীক কমল সামন্ত। আইটি সেক্টরে কর্মরত। বয়স পঞ্চাশ-এর কাছাকাছি। একমাত্র ছেলে আমেরিকায় থাকে। কাজের মাসি দু’বেলা রান্না করে দিয়ে যায়। বেশ মিশুকে লোক। তবে সে ওকে এড়িয়ে চলে। আজ মনটা কেমন যেন হয়ে গেল সুমনের জন্য। তাই তাকাল।
কমল বলল, “সুমন কেমন আছে?’
—ওই যেমন থাকে।
—তোমার উপর দিয়ে খুব ঝড়-ঝাপটা যাচ্ছে।
—কী আর করা যাবে।
আজ রবিবার। তাই কাজের মেয়ে ফুলিকে ছুটি দিয়েছে। সে-ই সুমনের দেখাশোনা করে। সোমবার থেকে শনিবার ফুলি থাকে। শনিবার কোনও ক্লাস থাকে না। তবু কলেজের নাম করে বেরিয়ে পড়ে। সুমনকে বিরক্ত না করে দু-মাস ধরে অনলের ফ্ল্যাটে যাচ্ছে রাকা। গতকালও গিয়েছিল। দু’বার আগে নিজের গরজে ফ্ল্যাটে গেল। অনল ওর ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র। বয়স সাতাশ, বিবাহিত। বউ অধ্যাপনা করে উত্তরবঙ্গের একটি কলেজে।
ফাঁকা ফ্ল্যাটে প্রথম দিনেই শরীরে শরীর মিলে গেল। তারপর থেকে চলছে। সুমনকে সে কথা বলা যায় না। যতই উদারতার কথা বলুক না কেন, পুরুষ তার ইগো কখনও ভুলতে পারে না। ভাবতে ভাবতে ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়ল। তা দেখে কমল বলল, “তোমার জন্য দুঃখ হয়।’
রাকা ম্লান হাসল।
—এসো চা করি।
—যাচ্ছি।
রাকা ঘরে ঢুকতে সুমন চোখ মেলল। ওর কপালে হাত রেখে রাকা বলল, “পাশের ঘরে যাচ্ছি।’
সুমন হাতের উপর চাপ দিয়ে রাকাকে বলল, ‘বেস্ট অফ লাক।’
রাকা দরজা টেনে পাশের ফ্ল্যাটে এল। কমল চা এগিয়ে দিল— কেমন হয়েছে জানি না।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে রাকা বলল, ‘ভালো হয়েছে।”
—চা-পাতি আর একটু ফোটাতে হতো।
—তা ফোটালেন না কেন? এত তাড়াহুড়ো করার কী দরকার ছিল?
—সেটাই কথা। আমরা অনেক সময় অযথা তাড়াহুড়ো করে ফেলি। অনেক কাজ ভেবে-চিন্তে করি না। তার জন্য ভুগি।
—আমার বাবা-মা তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিল। ডাক্তার ছেলে হাতছাড়া করতে চাইল না। খোঁজ নিল না, বিয়ে দিয়ে দিল।
রাকার বাবার এক কলিগ সুমনের সন্ধান নিয়ে এল। পাত্র ডাক্তার। বারাসাতে পোস্টিং। বন্ধুদের নিয়ে রাকাকে দেখতে এল। পছন্দ হয়ে গেল। রাকারও পছন্দ হল। সুমন পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি লম্বা। মাথাভর্তি কালো চুল। বিশেষকরে ওর মায়াবী চোখ দুটো ভীষণ ভাবে ওকে টানল। বিয়ে না করার কোনও কারণ ছিল না। বিয়ে হয়ে গেল। কলকাতা থেকে সে কৃষ্ণনগর যাতায়াত শুরু করল। তিন মাস পর সুমনের মাথার যন্ত্রণা শুরু হল। সিটি স্ক্যান করে টিউমার ধরা পড়ল। লাস্ট স্টেজ। অপারেশন করতে গেলে বিপদ হতে পারে। তাই যতদিন বাঁচবে বেড রেস্টেই থাকতে হবে। আর এক মাস, তারপর সে একা হয়ে যাবে… একা। ভাবতে ভাবতে চা শেষ করে কাপ রাখল টেবিলের উপর।
কমল চা শেষ করে সিগারেট ধরাল। টানতে টানতে বলল— ঝরনার ব্রেস্ট ক্যান্সার বছরখানেক আগে ধরা পড়ল। অনেক চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারলাম না। তুমি তো সবই জানো। ছেলে তো এল না। ওই ছেলের জন্য ঝরনা কী না করেছে। ছোটোবেলায় অমল খুব ভুগত। দু’জনে রাত জেগেছি। সেই ছেলে মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়েও এল না।
রাকা চুপ করে শুনল।
—আমি মরলেও আসবে না। কোনওদিন মরে পড়ে থাকব, গন্ধ ছড়ালে মানুষ টের পাবে।
—চুপ করুন।
—এটা ঘটবে।
—বিয়ে করুন।
—এই বয়সে বিয়ে!
—কী এমন বয়স হয়েছে আপনার ?
—তুমি আমাকে বিয়ে করবে?
—যা !
—বলো করবে। কমল হঠাৎ রাকার
দু-কাঁধে হাত রাখল। আমি এখনও সক্ষম আছি। পরীক্ষা দিতে পারি।
রাকা কেঁপে উঠল। কমল ওকে ঠেলতে ঠেলতে দরজার কাছে নিয়ে এল। দরজায় খিল তুলে দিল। রাকা ফিসফিস করে বলল, ‘দরজায় খিল দিলেন কেন?”
—আমি সব শুনেছি।
—কী শুনেছেন? সুমনের সব কথা।
রাকা চুপ করে রইল।
কমল থুতনি তুলে ধরল, ‘তুমি অভুক্ত আছো। অভুক্ত শরীর নিয়ে কতদিন সুমনকে বয়ে বেড়াবে?”





