রাকা থরথর করে কেঁপে উঠল। কমল কোমর দিয়ে দেয়ালে চেপে ধরল। কোমরে কোমর মিশে গেল। ওর পৌরুষ স্ফীত হচ্ছে। রাকা টের পেল। ওর স্ত্রী অঙ্গের মুখে চাপ বাড়ছে। মাঝে শুধু একটা নাইটির ব্যবধান। কমল হঠাৎ ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে বুকে হাত রাখল। চাপ দিল। ক্রমশ চাপ বাড়ল। এক ফাঁকে কমল দেখল রাকাকে। চোখ বুজে আদর উপভোগ করছে। আরও কিছুক্ষণ আদর করে ওকে খাটের কিনারে এনে সরে এল। খাটে বসল। রাকা ফুঁসে উঠল। ঝাঁপিয়ে পড়ল কমলের উপর।

—মামদোবাজি পেয়েছেন? বলতে বলতে কমলকে চিৎ করে ফেলে চড়ে বসল। কমল নিশ্চুপ হয়ে পড়ে রইল। রাকা শরীর দোলাতে দোলাতে বলল, আরেকটু অপেক্ষা করলে হতো না?

—তুমি তো শুরু করলে।

—শুরু করেছেন আপনি। রাকা হিস হিসিয়ে বলল, আমার শরীর জাগিয়ে ধ্যাষ্টামো করা হচ্ছিল।

—আস্তে বলো। সুমন শুনতে পাবে।

—শুনুক। আমি কাউকে পরোয়া করি না। বলেই রাকা কমলের বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে কাঁদতে লাগল।

কমল পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘কেঁদো না। কেঁদে কী হবে? যতটুকু যন্ত্রণা পাওয়ার তা পেতেই হবে।”

রাকা কাঁদতে কাঁদতে কমলের বুক ভিজিয়ে দিল।

—আমার কিছু ভালো লাগে না।

—সব ঠিক হয়ে যাবে।

—সুমন মারা যাবে।

—মরার সময় পর্যন্ত তোমার জীবনে ওর ভূমিকা লেখা আছে। তুমি কী করবে বলো? বিধির বিধান কে খণ্ডাবে? দ্যাখো বিধাতা তোমাকে-আমাকে নিয়ে আবার কী লিখে রেখে গেছে?

—বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্জা।

—বেশ বলেছ। তবে আমি বুড়ো নই। পাক্কা এক ঘণ্টা বিছানায় ঝড় তুলতে পারি।

অনলের কথা মনে পড়ল। কমলের ধারে কাছে আসতে পারবে না। তারা সমবয়সি। বেচারা বউ ছাড়া থাকে। তারও প্রয়োজন বলে এগিয়ে গেল। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা মোটেই ভালো না। দাঁড়াতেই পারল না। মাথা নিচু করে রইল। দ্বিতীয়বার একটু হল। এখন মোটামুটি পারে। আর প্রয়োজন হবে না। ওর কাছে যায় বলে ফিসফাস শুরু হয়েছে। শুরু হতেই সে কলকাতায় ট্রান্সফারের আবেদন করেছে। মঞ্জুর হয়েছে। আগামী সপ্তাহে জয়েন করবে।

রাকা বলল, “আগামী সপ্তাহে আমি কলকাতায় জয়েন করব।”

—এ তো ভালো খবর।

যাতায়াতে অনেকটা সময় চলে যাচ্ছিল। ফুলির উপর সুমনের দায়িত্ব দিয়ে যেতাম। এবার থেকে অনেকটা সময় ওকে দিতে পারব।

—তুমি সুমনকে খুব ভালোবাসো তাই না?

—বেশি ভালোবাসি বলেই ভগবান ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে।

—চিন্তা কোরো না। দুনিয়ার কিছুই কারও জন্য থেমে থাকে না। চলার নামই জীবন।

—ওটাই মানুষের কাছে শেষ সান্ত্বনা।

—এই দ্যাখো না। আমার সব থেকেও কেউ নেই। তাই বলে কি আমি ভেঙে পড়েছি? আমিও ঝরনা-কে খুব ভালোবাসতাম। আমাদের লাভ ম্যারেজ ছিল। আমাদের মধ্যে কখনও ঝগড়া মারামারি হয়নি।

—শূন্যতায় ভালোবাসা ঠাঁই পায় না।

—ঠিক বলেছ। শরীর। এই শরীর ভুলিয়ে দেয়। এই শরীর অনেক ব্যথার উপশম। বলেই কমল রাকাকে বুকে টানল। এতে তুমি এনার্জি পাবে!

—বেশি এনার্জি দেবেন না। দিলে ফুলতে শুরু করব!

—বেশ বলেছ।

রাকা কখনও এভাবে কমলের সঙ্গে কথা বলেনি। সে সুযোগ হয়নি। ওরা স্বামী-স্ত্রী ওদের দু’জনকে যথেষ্ট ভালোবাসত। সে কয়েক মাস আগে এই ফ্লাটে এসেছে। সুমন আছে পাঁচ বছর ধরে। ঝরনা বউদির সঙ্গে ওর ভালো সম্পর্ক ছিল। সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল তা সে তলিয়ে ভাবেনি। ভাবার সময় হয়নি। সে সাতটায় বেরিয়ে যেত। অনেকটা সময় ওরা পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকত। সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ ছিল। আসলে, সময় সুযোগ দুটো মানুষকে এক বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়। আজ যেমন কমলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হল। হয়তো সুমনের ইন্ধন না থাকলে সম্পর্ক হতো না। তার জন্য মনে কোনও গ্লানি নেই। বড্ড নির্ভার লাগল নিজেকে। ধীরে ধীরে বলল, “নিজেকে খুব হালকা লাগছে।

—এবার দেখবে কাজে মন বসবে।

—ছাড়ুন। সুমনকে দেখে আসি।

—আরেকটু থাকো না।

—অনেকক্ষণ হল এখানে এসেছি। আমি যাব আর আসব।

—আসবে তো? বলেই কমল উঠে বসল।

রাকা খাট থেকে নেমে পড়ে সাবধানে দরজার খিল খুলে বাইরে এল। করিডোর অন্ধকার। লাইট জ্বেলে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল।

—জেগে আছো?

সুমনের সাড়া পেল না। তবে শ্বাস ছাড়ছে, শুনে রাকা জিরো পাওয়ারের লাইটটা জ্বেলে কিচেনে ঢুকল। দু-কাপ চা করে বেডরুমে এল। সুমনের কপালে হাত দিল। অমনি সুমন চোখ মেলল, ‘চায়ের গন্ধ পাচ্ছি।’

রাকা কোনও কথা না বলে সুমনের পিঠের নীচে দুটো বালিশ দিয়ে বসিয়ে দিল। চায়ের কাপ হাতে দিতে সুমন বলল, “অনলবাবু ফোন করেছিলেন।’

রাকা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মোবাইল হাতে নিল। অন করে দেখল সাতটা মিসড কল।

—আমি ধরিনি। তোমাকেও ডাকিনি।

—বেশ করেছ।

সুমন মৃদু হাসল।

—আমি কৃষ্ণনগর থেকে চলে আসছি শুনে ছেলেটা আপসেট হয়ে পড়েছে।

—তোমাকে খুব মিস করবে। বেচারাকে একবার ফোন করো।

—পরে করব। রাতে কী খাবে?

—এক গেলাস দুধ দিও।

—ক’টা বাজে?

—ন’টা। আমি এবার নিশ্চিন্তে মরতে পারব।

—হঠাৎ এ কথা কেন?

ঝরনা বউদি খুব ভালো ছিলেন। কমলদাও খুব ভালো লোক। তোমাকে লক্ষ্য রাখবেন। সুমন বলতে বলতে রাকার হাত দুটো জড়িয়ে ধরল, “আমি তোমার গর্ভে ছেলে হয়ে ফিরে আসব। তোমার ইচ্ছে ছিল মা হওয়ার।”

—চুপ করো, বলেই সুমনের মুখ চেপে ধরল রাকা। জিভে লাগাম দাও।

মুখ থেকে হাত সরিয়ে সুমন বলল, ‘রাকা, আমাকে বলতে দাও। কমলদার ছেলে আর ফিরে আসবে না।’

—তাতে আমার কী?

—কমলদা যাতে মরার সময় জল পায় তার ব্যবস্থা করো।

—কমলদার জন্য তোমার এত দরদ উথলে উঠছে কেন?

—কারণ ঝরনা বউদি মরার সময় ছেলেকে খুব খুঁজছিল। ওর সেই চাউনি আজও আমি ভুলতে পারিনি। বেচারা ছেলের হাতে জল না খেয়ে মরে গেল।

—কমলদা আমার চেয়ে কুড়ি বছরের বড়ো।

—কমলদা এখনও শক্ত-সমর্থ্য আছেন। কমলদাকে দুঃখ দিও না।

—মানে!

—কিছু মনে কোরো না। আমি অনধিকার চর্চা করে ফেলছি। সুমন বলল, হোয়াটসঅ্যাপে তোমাদের চ্যাটগুলো পড়ে ফেলেছি। ডিলিট করোনি কেন?

রাকার মুখটা কালো হয়ে গেল। খুব সাবধানে মেলামেশা করেও ধরা পড়ে গেল। ভেবেছিল কেউ জানতে পারবে না। সুমনও জানতে পারবে না। সব সময় মোবাইল নিজের হাতের কাছে রাখত। আজই ভুল হল। ভুল সময়ে অনল ফোন করল। সুমন জেনে গেল। তাই নিজেকে খুব খেলো মনে হল। তাতেই ডুকরে কেঁদে উঠল, ‘ভুল করে ওর ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছি। আর হবে না। ওর জন্যই আমি কৃষ্ণনগর থেকে ট্রান্সফার নিয়ে চলে আসছি। বিশ্বাস করো।’

—বিশ্বাস করলাম। সুমন রাকার হাতে চাপ দিল। তুমি আমাকে বিশ্বাস করো। যা বলছি মন থেকে বলছি। আমি তোমাকে সুখী দেখে মরতে চাই। বলেই রাকাকে বুকে চেপে ধরল। ওর গায়ে কমলদার গায়ের গন্ধ পেয়ে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল। এই গন্ধটা তার ভীষণ চেনা। ঝরনা বউদির গায়ে পেত। পাঁচ-পাঁচটা বছর এই গন্ধটা পেয়েছে। কমলদাকে তার প্রতিদান দেওয়া দরকার। সত্যটা প্রকাশ করা দরকার। তাই সুমন ধীরে ধীরে বলল, ‘যে কথা না বললেই নয়, সে কথা আজ তোমাকে বলব।’

—আমি শুনব না। তুমি আজ বেশি কথা বলে ফেলছ।

—আমাকে বলতে দাও। আর হয়তো সুযোগ পাব না। আজ আমাকে কথায় পেয়েছে।

—বলো।

—ঝরনা বউদি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।

ঘরে যেন বোমা ফাটল। তাতেই ছিন্নভিন্ন হল রাকা। ওর চোখমুখের চেহারা বদলে গেল। তা দেখতে দেখতে সুমন আবার বলল, ‘আমি পাপ করেছি। আমি প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।’

রাকা থরথর করে কেঁপে উঠল। কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘এ কথা না বললেই চলছিল না।’

—না বলতে পেরে আমি গুমরে গুমরে মরছিলাম। আমি ছলাকলায় ভুলিয়ে ঝরনা বউদিকে এই বিছানায় টেনে এনেছিলাম। তুমি কমলদাকে গায়ে মেখেছ। শোধবোধ হয়ে গেছে। এবার আমি মরে শান্তি পাব।

রাকা ডুকরে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে দরজার সামনে অস্থির পায়ের শব্দ শুনতে পেল। শুনতে শুনতে সুমনের বুক ভেজাল চোখের জলে। সুমন ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “এবার ও ঘরে যাও।”

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...