সকালবেলায় বাজার সেরে একটু জিরিয়ে নিয়ে গৌরাঙ্গবাবু পাড়ার মুদিখানার দোকানের উদ্দেশে ঘরের বাইরে পা বাড়াতেই বিশাল এক ভ্যান গাড়িতে বসা চব্বিশ-পঁচিশ বছরের একটি তরতাজা যুবক হঠাৎ কৌতূহল ভরা স্বরে জিজ্ঞাসা করে, ‘কাকু, অভিরূপ মুখার্জ্জী নামে এখানে কেউ থাকেন?”
অজানা অচেনা ছেলেটির মুখে সকালবেলায় নিজ পুত্রের নাম উচ্চারিত হতেই গৌরাঙ্গবাবু যারপরনাই একটু যেন অবাক হন এবং বলতে দ্বিধা নেই, একটু রাগতঃস্বরে জবাবদিহি করেন, ‘হ্যাঁ, আমারই নবাব পুত্তুর সে।’ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “আবার কোনও জিনিসপত্র অর্ডার করেছে নাকি?”
অতঃপর ছেলেটির কাছ থেকে কোনওরকম উত্তরের আশা না করেই মনে মনে তিনি বলতে থাকেন— এ এক জ্বালা হয়েছে! কোভিডের কারণে বিশ্বজুড়ে সবাই দিশেহারা, অথচ আমার ‘সুপুত্র’-র এখনও ষোলআনা বাবুগিরি বজায় আছে। প্রতিদিন কিছু না কিছু আসছেই। ঠাঁট-বাট দেখে আর বাঁচি না! তিনি মনে মনে সেকাল আর একাল নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন। বলি এককালে আমরাও ইয়াং ছিলাম, মনের নিভৃত কোণে আমাদেরও অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা জমে ছিল। কিন্তু আমাদের কালে এখনকার মতো বাবুগিরির প্রতি এতটা প্রবণতা ছিল না।
ছেলের উপর অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণে সেখানে দাঁড়িয়েই তিনি হাঁক দিলেন, ‘অ্যাই কে আছো? একবার বাইরে এসো, নবাব পুত্তুরের নামে কী সব জিনিসপত্তর এসেছে। ছাড়িয়ে নিয়ে যাও।’ কথাটুকু শেষ করেই তিনি দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন নিজের কাজে। আর মনে মনে কেবলই সেকাল-একাল নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন।
স্পষ্ট মনে আছে স্কুলের সাদা কাপড়ের জুতোর তলাটা ঘষে ফুটো হয়ে যাওয়ার পরেও সেখানে অতি যত্ন সহকারে তাপ্পি লাগিয়ে পায়ের শোভা বর্ধন করতে হতো। ছেঁড়া জুতোর পরিচর্যার বেলাতেও কোনওপ্রকার অবহেলা ছিল না। ক্লাসের পরিত্যক্ত অবশিষ্ট টুকরো চকগুলি লোকচক্ষুর আড়ালে আগাম সংগ্রহ করে রাখতে হতো ছেঁড়া জুতো পালিশ করার জন্য। কী সুন্দর ছিল ফেলে আসা সেই বিগত দিনগুলি! অভাব ছিল, কিন্তু স্বভাবটা কখনও বদলায়নি। এখনও রাস্তায় একটা বোতাম পড়ে থাকলে তিনি সেটা নির্দ্বিধায় হাতে তুলে নেন, ভবিষ্যতে যদি কখনও প্রয়োজন পড়ে এই ভেবে।
—সেকালে গরিব হওয়ার কারণে মানুষের মনে বিন্দুমাত্রও ক্ষোভ ছিল না। অভাব ছিল অলংকারতুল্য অহংকার। মানুষের চরিত্র গঠনে অভাবের অবদান অনস্বীকার্য! এর প্রভাব যেমন দীর্ঘস্থায়ী, তেমনই অতুলনীয়। মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখায়। তাঁর মতে অভাব এক মহান সম্পদ। সেই সম্পদে সমৃদ্ধ হয়ে মনের আঙিনা জুড়ে বিরাজ করে অপার শান্তি। অথচ এখনকার মানুষের ধারণায় অভাব, নাকি এক অমোঘ অভিশাপ! তারা বুঝতেই চায় না কথাটা যে, অভাব অভিশাপ নয়, বরং আশীর্বাদ। কারণ ইতিহাস প্রসিদ্ধ অধিকাংশ মহাপুরুষ-ই ছিলেন অভাবগ্রস্ত। অভাবের কারণেই তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং জীবনে সুপ্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন।
—এখন ব্র্যান্ড-এর যুগ। অথচ সেকালের মানুষের ব্র্যান্ডেড মেজাজটা কিন্তু ইদানীংকালে বিরল। এমনকী আত্মসম্মান বোধটাও ইদানীংকালে অতীব নিম্নগামী! তখনকার দিনের আত্মসম্মান বোধ এখনকার মতো এতটা ঠুনকো ছিল না। অনেকটা ক্রাস্ট আয়রন নির্মিত টিপু সুলতানের তরবারি তুল্য, যেমন ধারালো, তেমনই ছিল শক্ত।
হঠাৎ নিজের অজান্তে বহুদিন পূর্বে কোনও এক পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কথা তাঁর অতর্কিতে মনে পড়ে যায়— একবার প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর তাঁর বাড়িতে অনুষ্ঠিত দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে স্বয়ং না গিয়ে পরিবর্তে পুত্র দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে পেয়াদা পাঠিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়কে সেই পুজোয় অংশগ্রহণ করার জন্য নিমন্ত্রণ করতে। কিন্তু আত্মসম্মানপ্রিয় রাজা রামমোহন রায় বন্ধুবর প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের নিমন্ত্রণ রক্ষা করেননি সেইবার এই কারণে যে, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর সশরীরে নিজে না এসে, পেয়াদা পাঠিয়েছিলেন বলে।
কিন্তু এখনকার দিনে মুঠো ফোনের সাহায্যে কাউকে নিজের পোষ্য কুকুরের জন্মদিনে নিমন্ত্রণ করলেও, নিমন্ত্রিত ব্যক্তিটির তন- মন-প্রাণ অপার কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে ওঠে। নিমন্ত্রণ রক্ষা বা সেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে না পারাটা তার বিচারে অধর্ম বা মনুষ্যত্বের অবমাননা বলে বিবেচিত হয়। ভাবতে অবাক লাগে যে, সময়ের বিবর্তনে মানুষের আত্মসম্মান বোধটাও আজ অধোগামী!
—মোজা পরে লোকে হাঁটু পর্যন্ত। আজীবন তাই দেখে অভ্যস্ত। অথচ এখনকার আধুনিক যুগের ছেলে-মেয়েদের ফ্যাশনের ধরনটাই আলাদা। তারা মোজা পরে গোড়ালি পর্যন্ত, জুতোর বাইরে যেন দেখা না যায়! জুতোর ভিতরে অদৃশ্য হয়ে থাকে সেই মোজা। কী যে বাহারের স্টাইল তা ভগবানেরও অজানা! ওই ভাবে মোজা গলানোর যে কী প্রয়োজন সেটা তাঁর বোধে কুলোয় না? তারচেয়ে বরং মোজা ছাড়া জুতো পরলেই হয়। ধুতির সঙ্গে বিহারিরা যেমন মোজা ছাড়া জুতো পরেন। ওদের বিচারে এটাই নাকি আধুনিক স্টাইল! বলিহারি স্টাইল!
—নিজের রুচিবোধ অপরের মধ্যে সংক্রমিত করতে পারাটাই প্রকৃত স্টাইল। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এদের বিচারে কোনটা আসল, কোনটা নকল, এই বিষয়ে কোনও ধারণাই নেই। এদের কোট-জামা-জ্যাকেট সব অ্যাবডোমিন পর্যন্ত। মেয়েদের ব্লাউজ সদৃশ্য সব পোশাক। এরা জামা পরে অথচ বোতাম লাগায় না। দূর থেকে অনেকটা যেন কাকতাড়ুয়াদের মতো দেখতে লাগে, যখন জামার দু’দিকটা পতাকার মতো আন্দোলিত হতে থাকে বাতাসের দাপটে।
—প্যান্টের ভিতরে জামা গোঁজার দিন শেষ। কোমর নেই অথচ পরনে জিন্স। কী যে বিকট লাগে দেখতে একেকজনকে! কথায় বলে না— মাথায় নাই চুল, বগলে শ্যাম্পু। অনেকটা সেইরকম। আজকাল কোর্টেরও হাত গোটানো থাকে কবজি পর্যন্ত, ভাবা যায়? এরা প্রকৃত স্টাইল কাকে বলে তা জানেই না। এর চেয়ে আমাদের সময়ে ধুতির প্রচলন ছিল ঢের ভালো।
স্বনামধন্য কণ্ঠশিল্পী, বাঙালির গর্ব শ্রদ্ধেয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর সারাটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন হাফ হাতা বুশ সার্ট আর ধুতি পরে। স্টাইল কাকে বলে তিনি সেটা চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে গিয়েছেন।
—বিদ্যাসাগর মহাশয়কে তাঁর স্কুল কর্তৃপক্ষ সাহেবি পোশাক পরে স্কুলে আসতে বলায় সেদিন তিনি নিঃসঙ্কোচে এবং সগর্বে চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। আসল কথা, সর্বসম্মতিক্রমে সুরুচিসম্পন্ন স্টাইলই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।
কতবার ছেলেকে তিনি নিষেধ করেছেন খোলামকুচির মতো যেন টাকা নষ্ট না করে। বেসরকারি চাকরির কোনও স্থিরতা নেই, ভবিষ্যৎ নেই। যে-কোনও দিন ‘চাকরি নট’ হয়ে যাওয়ার নোটিস আসতে পারে। এই পরিস্থিতিতে টাকার মূল্য বোঝাটা যে একান্তই আবশ্যক। কিন্তু কাকে বোঝাবেন তিনি?
—“টাকা মাটি, মাটি টাকা’ যে যাই বলুক, সংসারি লোকের কাছে টাকার মূল্য কিন্তু অসীম। অর্থ বিনে সুস্থ জীবনযাপন করা যে বড়োই দুরূহ। বিপদকালে কারও কাছে হাত পাতলেও এই বস্তু সহজে কেউ হাতছাড়া করতে চান না। এই কথাটুকু অন্তত এই বয়সে বোধগম্য হওয়া উচিত। অবশ্য অন্য কেউ দেবেনই বা কেন? যে-মানুষ সময় থাকতে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন থাকে, তাকে তো উপযুক্ত কর্মফল ভোগ করতেই হবে।
—প্রকৃতি থেকে যথাযথ জীবনের শিক্ষা নেওয়া উচিত। সঞ্চয়ের পাঠ সামান্য পিঁপড়ের কাছ থেকেও নেওয়া যায়! কিন্তু চোখ থাকলে তবে তো? রাজর্ষি অত্রির পুত্র দত্তাত্রেয়ও প্রকৃতি থেকে পাঠ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর মানুষরূপী কোনও গুরু ছিল না। বনের চব্বিশটি প্রাণীর আচরণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি তাদের গুরু হিসাবে বরণ করেছিলেন। অথচ আমার সুপুত্র চটিও পরেন এগারোশো টাকা দামের আর জুতো পরেন দু’হাজার টাকা দামের। কোনও মানে আছে এই বাবুগিরির? খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। বলি অত দামি চটি-জুতো পায়ে গলাবার জন্য, নাকি মাথায় রাখার উপকরণ? সস্তা দামের চটি-জুতোতেও তো সেই একই কাজ হতে পারে। এ কেবল যুক্তিহীন বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়।
—মানুষের ইয়ং বয়সটা হল পরিশ্রম করার জন্য, ঝুঁকি নেওয়ার জন্য। এই সময়টা হারিয়ে গেলে আর কি ফিরে পাওয়া যাবে? কখনওই না। এই সময়টাতেই পরিশ্রম করে রোজগার করতে হয় অনাগত ভবিষ্যৎ জীবনটাকে সুরক্ষিত করার জন্য। বোঝা উচিত, “দেহপট সনে নট সকলি হারায়। তা না করে— ‘উঠল বাই তো কটক যাই’।





