বিতালা মন্দির চত্বরের বাইরে পূর্বদিকে ৯৭৫ মিটার লম্বা ও ৩৯৬ মিটার চওড়া বাজার ছিল। এখন যার কাঠামোটুকুই অবশিষ্ট আছে, কোথাও শুধু কয়েকটা পিলার। মন্দিরে যাওয়ার পথের দু-পাশে এরকম প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত মণ্ডপ ও বাজার চোখে পড়ল। মন্দিরের উত্তর-পূর্বে আছে বিষ্ণু বা ব্রহ্ম বিতালা মন্দির ও তৎসংলগ্ন মণ্ডপ, বাজার। মূল মণ্ডপে কৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা ও রামায়ণের ঘটনাবলি খোদিত আছে। প্রত্যক্ষ করলাম দেয়ালে মাওয়ালি আর্ট। পিলারে বিভিন্ন চরিত্র ও স্বরলিপিগুলিও এককথায় অপূর্ব। উৎসব মণ্ডপের মুক্ত মঞ্চটা ষোড়শ শতকে তৈরি হয়েছিল।
বিতালা মন্দির যাওয়ার পথে আছে আয়তাকার তল বিশিষ্ট দোতলা প্রবেশ পথ— তলাভারাঘাটা। প্রায় ভগ্নদশা নিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে এই অংশটি। বিতালা মন্দিরের কাছেই আছে কুডুরে গোম্বে মণ্ডপ, যেখানে উৎসবের সময় দর্শনার্থীরা একত্রিত হতো। পিলারে ঘোড়সওয়ার খোদাই করা আছে।

১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণ দেবরায় দ্বারা নির্মিত কৃষ্ণ মন্দির, বালকৃষ্ণকে ওড়িশার উদয়গিড়ি থেকে আনা হয়েছিল। এখানে গর্ভগৃহ, অন্তরাল, অর্দ্ধমণ্ডপ ও মহামণ্ডপ আছে। এছাড়াও এখানে অনেক ছোটো ছোটো মন্দির আছে। সবচেয়ে বড়ো গোপুরাতে কলিঙ্গ যুদ্ধের স্টুকো আকৃতির কারুকাজের দেখা মিলল। এই অঞ্চলে এই বিস্তৃত ঐতিহাসিক স্থাপত্য দেখতে হলে ইচ্ছের সঙ্গে সঙ্গে দু’পায়ের বলভরসা প্রবল ভাবে প্রয়োজন। বিতালা মন্দিরের উত্তর প্রবেশদ্বারের থেকে খানিকটা এগোলে পাওয়া যায় কিংস ব্যালেন্স। বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষ্যে রাজার দামি পাথর ও ধাতু মাপার জন্য এই তুলাযন্ত্র ব্যবহৃৎ হতো। মন্দির ও জনসাধারণকে দান দেওয়ার সময় এটা কাজে আসত। দুটো গ্রানাইটের স্তম্ভের মাঝে রয়েছে একটা কারুকার্য করা বিম। স্তম্ভে রাজা কৃষ্ণ দেবরায় ও রানিদের জীবন বর্ণিত আছে।
এখানের সব দর্শনীয় স্থানই সন্ধে ছ’টায় বন্ধ হয়ে যায়। তাই বেলা থাকতেই আসার পথে ফেলে আসা কুইনস বাথ দেখার জন্য ফিরে এলাম। এখানে এসে বালি, সুগ্রীবদের বর্তমান বংশধরদের সঙ্গে দেখা হল। যদিও তারা কারও বিরক্তির কারণ না হয়ে নিজেদের মধ্যে খেলায় মত্ত ছিল। ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের অন্যতম নমুনা এই কুইনস বাথ। ১৫ বর্গমিটার ক্ষেত্রফলের ও ১.৮ মিটার গভীরতার এই বর্গাকার স্নানাগারের তিনদিকের খোলা আর্চ আলো প্রবেশের উপযোগী। চারপাশের করিডরের মাঝে মাঝে ঝুলবারান্দা আছে। দক্ষিণের একমাত্র সিঁড়ি স্নানাগারে নেমে গেছে। এখানেও সিলিংয়ের কাজগুলো অনেকাংশেই নষ্ট হয়ে গেছে।
স্নানের পরে পোশাক পরিবর্তনের জন্য সারি সারি ঘর ছিল। বর্তমানে তা কালের গর্ভে লীন হয়েছে। শুধুমাত্র উপরে ওঠার সিঁড়িটা অবশিষ্ট আছে। একজন মহিলা সিকিউরিটি খুব আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের ছবি তুলে দেওয়ার পর আমরা বেরিয়ে পড়লাম। এখানে বিনামূল্যে প্রবেশ করা যায়, গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য কোনও অর্থমূল্য নেই। প্রাচীন এই নগরীর বুকে ততক্ষণে সন্ধে নেমে এসেছে। গেস্টহাউসে ফিরে, ঘরে দেওয়া ইলেকট্রিক কেটলিতে চা বানিয়ে তা পান করে চায়ের তৃষ্ণা নিবারণ হল। সাড়ে আটটায় এল রুটি, ডাল, সবজি, আচার, স্যালাড ও দইয়ের দেড়শো টাকা মূল্যের থালি।
পরদিন নতুন কিছু দেখার স্বপ্ন নিয়ে ঘুমোতে গেলাম। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্তই হাম্পি ভ্রমণের সঠিক সময়। খোলা আকাশের নীচে এই পাথুরে স্থাপত্য প্রত্যক্ষ করতে হয় বলে পরদিন সকাল সকাল ধোসা ও চা সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম বিরূপাক্ষ মন্দিরের উদ্দেশ্যে। এটা সপ্তম শতকে নির্মিত শিবমন্দির। এখনও বিগ্রহ আছে ও প্রতিদিন পুজো হয়। মন্দিরে ঢোকার জন্য জুতো জমা দেওয়ার আগে পাশ দিয়ে প্রবাহিত তুঙ্গভদ্রা নদী দেখে নিলাম। যদিও এই অংশে নদী বেশ মজে গেছে। এখানেও ভগ্ন বাজার, অতীতের পুষ্করিনি নজরে পড়ল। প্রত্যেকে ২ টাকার বিনিময়ে জুতো জমা রেখে মন্দিরে প্রবেশ করলাম।
১৪০০ শতকে রাজা কৃষ্ণ দেবরায়ের অভিষেক উপলক্ষ্যে পুনরায় নির্মিত এই মন্দিরটিকে প্রসন্ন বিরূপাক্ষও বলা হয়। দক্ষিণ ভারতের সমস্ত মন্দিরের বৃহদাকার পিরামিডের মতো প্রবেশদ্বারকে গোপুরা বলে। এই মন্দিরেও এরকম স্বর্ণসদৃশ গোপুরা আছে। কয়েকটা কৌণিক মণ্ডপ ও মাঝের মহামণ্ডপে দীপস্তম্ভ আছে। এছাড়াও দক্ষিণে ক্ষয়ে যাওয়া বারান্দা ও স্তম্ভ আছে। পূর্বমুখী এই মন্দিরটা ভূমির থেকে অনেক নীচে অবস্থিত হওয়ায় একে ভূনিম্নস্থ শিবমন্দিরও বলে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল মিউজিয়াম ও জু। তাই, আমরা পাথুরে স্থাপত্যকে ডাইনে, বাঁয়ে রেখে এগিয়ে চললাম।
(ক্রমশ…)





