হায়দরাবাদ থেকে সাত সকালে বেরিয়েছি। লং ড্রাইভে চলেছি নাগার্জুন সাগর। শহরের সীমানা ছাড়তেই গাড়ি গতি পায়। তবে পথপার্শ্বস্থ সবুজের ছোঁয়া সেভাবে মন ছোঁয় না। হায়দরাবাদ থেকে ১৬৮ কিমি দক্ষিণ পূর্বে কৃষ্ণানদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত নাগার্জুন সাগর। এই তল্লাটে রাস্তা সারাইয়ের কাজ চলছে বলে, বাতাসে প্রচুর ধুলিকণা। ঘণ্টাখানেক চলার পর পথ-পার্শ্বস্থ এক ধাবায় দক্ষিণী পদে ব্রেকফাস্ট সারলাম। আবার গাড়ির চাকা গড়ায়। এবার ভাঙাচোরা রাস্তা থেকে মসৃণ সড়কে। দ্রুত ছুটতে থাকে গাড়ি।

দূরে দৃশ্যমান হয় নাল্লামালাই পাহাড়শ্রেণির ল্যান্ডস্কেপ। দু’পাশে অনুর্বর বন্ধুর পাথুরে জমি। কোথাও চোখে পড়ে তুলো ও তুয়ার নিবিড় চাষ। ঘণ্টা তিনেক পর নাগার্জুন সাগরের নাগাল পেলাম। অবশ্য সংরক্ষিত এলাকা বলে সরাসরি লঞ্চঘাটে উপস্থিত হতে পারলাম না। শুনলাম, বাঁধপাড়ের পুরাতন পথ সাধারণের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়ছে। অতএব আরও কিছুটা এগিয়ে ঘুরপথে বিজয়পুরীর লঞ্চঘাটে পৌঁছালাম।

কয়েকটা ছোটোখাটো হাতে গোনা দোকান, লজ, হোটেল, আর এপিটিডিসি-র রিসর্ট নিয়ে বিজয়পুরীর (দক্ষিণ) ছোট জনপদ। একটু এগিয়েই বাসস্ট্যান্ড। কয়েকটা অটো, টেম্পো, আর ছোটো বড়ো গাড়ির জটলা। গাড়ি থেকে নেমে ফেরি লঞ্চের টিকিট কাটতে পড়িমরি করে ছুটলাম। ছুটির দিন বলে তালিকার বাইরেও লঞ্চ দেওয়া হবে বলে কাউন্টার থেকে জানানো হল। টিকিট কেটেই সোজা লঞ্চঘাটের লাইনে। লঞ্চে ওঠার বাঁধানো জেটিঘাট ছবির মতো।

যাত্রী বোঝাই হতেই লঞ্চ ছেড়ে দিল। চলেছি নাগার্জুনকোন্ডা দ্বীপে। কৃষ্ণার জল কেটে এগিয়ে চলেছি। চারিদিকে শুধু ঘন নীল জল। দিগন্ত ছোঁয়া সেই ঘন জলরাশি রোদে চিকচিক করছে। আর কাছে দূরে জল ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে নাল্লামালাই পর্বতশ্রেণি। শিরশিরে হাওয়ার মধ্যে আদিগন্ত এই জলরাশির দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে থাকি। এককথায় এই জলযাত্রা অসাধারণ।

তেলেঙ্গানা রাজ্যের নালগোন্ডা জেলায় অবস্থিত নাগার্জুন সাগর। এর বিশালত্ব দেখে বিস্মিত হতে হয়। এটি বিশ্বের উচ্চতম বাঁধ। আবার বাঁধ সৃষ্ট নাগার্জুন সাগর হল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম লেক। স্বাধীনতা পরবর্তী ষাটের দশকে বিদ্যুৎ ও সেচের প্রয়োজন মেটাতে কৃষ্ণা নদীর উপর বাঁধের পরিকল্পনা করা হয়। ১ কিমি দীর্ঘ ১২৪ মিটার উঁচু ছাব্বিশটি সুইস গেটের এই বাঁধ থেকে উৎপন্ন হয় চারশো মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ। অন্যদিকে জওহর ও লালবাহাদুর নামের দুটি খাল দিয়ে প্রায় ৩৫ লক্ষ একর জমিতে সেচের জল সরবরাহ করা হয়। এর ফলে মাইলের পর মাইল অনুর্বর কৃষি জমি আজ ভরে গেছে আদিগন্ত সবুজে। অন্ধ্র হয়ে উঠেছে ভারতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অন্নভাণ্ডার।

নীলনদের উপর নির্মিত আসওয়ান বাঁধের আদলে তৈরি এই বাঁধের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। অবশ্য খাতায়-কলমে এই কাজ শুরু হয় পরের বছর ১৯৫৫ সাল নাগাদ। দশ বছরের মাথায় ১৯৬৬ সালে কাজ শেষ হলে, ইন্দিরা গান্ধী বাঁধটির উদ্বোধন করেন। কিন্তু এই কৃত্রিম বাঁধের বাস্তবায়ন ঘটলে, এর জলে তলিয়ে যায় অতীতের ধান্যকটক, বিজয়পুরী, শ্রীপর্বতের একটা বড়ো অংশ। সলিলসমাধি ঘটে দু’হাজার বছরের বেশি প্রাচীন দাক্ষিণাত্যের মহান বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রত্নসম্ভার-এর। তবে ডুবে যাওয়ার আগে ওই অঞ্চলের অধিকাংশ প্রত্ন নিদর্শনই পুনঃস্থাপিত হয় নাগার্জুনকোন্ডা দ্বীপে। সেই দ্বীপেই এখন আমরা চলেছি।

তিনদিকে নাল্লামালাইয়ের জঙ্গলে ভরা পাহাড় আর অন্যদিকে বহমান কৃষ্ণানদীর মাঝে এক বিস্তীর্ণ উপত্যকা, এই ছিল অতীতের নাগার্জুনকোন্ডা। তেলুগু ভাষায় ‘কোন্ডা’ অর্থ পাহাড় আর বৌদ্ধ আচার্য নাগার্জুনের নাম থেকে নাম হয় নাগার্জুনকোন্ডা। এরও পূর্বে নাম ছিল বিজয়পুরী। খুবই সমৃদ্ধশালী ছিল এই জনপদ। এই অঞ্চলে রাজত্ব করেছে সাতবাহন, ইক্ষ্বাকু বংশের বহু রাজা। যারা সনাতন হিন্দুধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে বৌদ্ধ শ্রমণ নাগার্জুন সিংহল থেকে অমরাবতী হয়ে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে এখানে হাজির হন। তারই হাত ধরে গড়ে উঠে বৌদ্ধ সংস্কৃতির এক বিশাল কর্মকাণ্ড। ক্রমে রাজপৃষ্ঠপোষকতায় তিনি গড়ে তোলেন স্তুপ, চৈত্য, বিহার, মণ্ডপ, বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রাবাস ইত্যাদি। শুধু স্বদেশ নয়, বিদেশ থেকেও বহু শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসত।

ইতিহাস বলছে, নাগার্জুনকোণ্ডা বিখ্যাত হয়, খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি ইক্ষ্বাকু রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বশিষ্ঠপুত্র চামতমুলার আমলে। কিন্তু পরবর্তী পহ্লব, কদম্ব বিষ্ণু-কুন্তী ও সালোঙ্করণ বংশের রাজারা বৌদ্ধধর্মের প্রতি অনুরাগী ছিলেন না। তাঁরা কেবলমাত্র ব্রাহ্মণ ধর্ম ও পৌরাণিক দেবতাদের প্রতিই ভক্তিশ্রদ্ধা দেখাতেন। ফলে পঞ্চম শতাব্দী থেকে রাজানুগ্রহের অভাবে ও শৈবধর্মের পুনরুদ্ভবের ফলে নাগার্জুন-কোন্ডার ও সেই সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের বৌদ্ধধর্ম ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। ক্রমেই এই উপত্যকা হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্তরালে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...