প্রায় দেড় হাজার বছর পর নাগার্জুনকোন্ডা উপত্যকা প্রচারের আলোয় আসে। ১৯৬২ সালে এআর সরস্বতীর উদ্যোগে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ব্যাপক খননকার্য চালিয়ে, প্রস্তর যুগ থেকে মধ্যযুগের মাঝামাঝি পর্যন্ত বহু নিদর্শন খুঁজে পান। বৌদ্ধস্তুপ, বিহার, চৈত্য ও মণ্ডপের ধ্বংসাবশেষ ছাড়াও পাওয়া যায় বহু হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি, মুদ্রা, নব্যপ্রস্তর যুগের নরকঙ্কাল, প্রস্তর যুগ ও পরবর্তীকালে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র এবং হাতিয়ার। এই সমস্ত প্রত্নসম্ভার সংরক্ষণ করা হয়, প্রত্নস্থলের কাছেই এক মিউজিয়ামে। এর কিছুদিন পরই দেখা দেয় এই সঙ্কট। এই বিপদের মোকাবিলায় ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এক অভূতপূর্ব পরিকল্পনা করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় তা বাস্তবে রূপায়িত করে।

পুরো মিউজিয়ামটি তারা নাগার্জুনকোন্ডা পাহাড়ের টেবিল টপে উঠিয়ে নিয়ে যান। আর গঠন, আকৃতি, আয়তন সমস্ত কিছু অপরিবর্তিত রেখে সতেরোটি নির্মাণের অনুকৃতি নির্মিত হয় এই পাহাড়ের সমতল ভূমিতে। আরও চোদ্দটি এই ধরনের অনুকৃতি নির্মিত হয় বিজয়পুরী থেকে আট কিমি দূরে অনুপু নামক এক গ্রামে।
৪৫ মিনিট লঞ্চযাত্রা শেষে পৌঁছালাম দ্বীপ জেটিতে। জেটি থেকে পাহাড়ি সিঁড়িপথ ধরে উপরে উঠতেই, পাকা সড়ক। সামান্য হাঁটাপথেই মিউজিয়াম। সুন্দর কেয়ারি করা ফুলবাগিচা ঘেরা পরিবেশ। বিজয়পুরী জেটিঘাট থেকেই মিউজিয়ামের টিকিট কাটা ছিল। ভিতরে ঢুকে দেখি, থরে থরে সাজানো প্রস্তর থেকে মধ্যযুগীয় আমলের বিপুল প্রত্নসম্ভার। এর মধ্যে রয়েছে প্রাচীনমুদ্রা, অলংকার, মাটির ভস্মাধার, অগুনতি মূর্তি, ভাস্কর্য, শিলালিপি ইত্যাদি। এছাড়া চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যে বেশ কিছু হিন্দু মূর্তি। এর মধ্যে রয়েছে যোগনৃসিংহ, মহিষমর্দিনী, গণেশ, শিবশক্তি ইত্যাদি। নজর কাড়ে বুদ্ধের বিশাল স্টোন ইমেজ, বুদ্ধিস্ট অ্যান্টিকস ও সেই সময়কার পটারির বেশ কিছু কালেকশন। রয়েছে নাগার্জুনকোন্ডার বিখ্যাত স্তুপের অনন্য সাধারণ শিল্পকর্মের খণ্ড খণ্ড অংশ বিশেষ। পাশের ঘরে রয়েছে প্রাচীনকালে নাগার্জুনকোন্ডার বৌদ্ধ জনপদটি কেমন ছিল, তার একটি সুন্দর মডেল। অনবদ্য স্তুপটিরও একটি মডেল চোখে পড়ল। আছে প্রস্তরযুগের ব্যবহৃত বিভিন্ন হাতিয়ার।

মিউজিয়ামের পিছনে আছে ক্যাফেটেরিয়া। এই পথটাও ফুলে ফুলে সাজানো। এবার ঝোপ জঙ্গলের মাঝে গ্রাম্য পাকা সড়ক ধরে চললাম সাইট দেখতে। হাঁটতে হাঁটতে হাজির হলাম, এক পুনঃস্থাপিত প্রত্নস্থলে। যেখানে ভাঙাচোরা ইঁট সারির মাঝে দণ্ডায়মান এক বুদ্ধের দর্শন মিলল। এখানে পুনঃনির্মাণ এতটাই সুন্দর যে, মনে হয় যেন দেড় দু-হাজার বছর আগের কোনও বৌদ্ধ সংস্কৃতি কেন্দ্রের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছি কষায় পরিহিত মুণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধ ভিক্ষুদের। প্রার্থনালগ্নে সমবেত হয়েছেন এখানে। স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি সমবেত কণ্ঠে তাদের প্রার্থনা— বুদ্ধং স্মরণং গচ্ছামি, ধম্মং স্মরণং গচ্ছামি, সংঘং স্মরণং গচ্ছামি।
পায়ে পায়ে আরও কয়েকটি পুনঃস্থাপিত প্রত্নস্থল দেখে শেষে লঞ্চঘাটে এলাম। ফেরার পথে ডেকে বসে জলদর্পণেও ইতিহাসকে খুঁজছিলাম। নাগার্জুনকোন্ডার অতীত মনের কোণে অনুরণন তুলছিল। ভাবনায় ভর করছিল বৌদ্ধধর্ম কথা। বিজয়পুরী লঞ্চঘাটে ফিরে পড়ন্ত দুপুরে লাঞ্চ সারা হল। সময়াভাবে ৮ কিমি দূরে অনুপুতে অন্যান্য বৌদ্ধ নিদর্শনগুলি দেখতে যাওয়া হল না৷
ফেরার পথে ১১ কিমি দূরে ইথিপোথালা জলপ্রপাত দেখতে গেলাম। পড়ন্ত বিকালে টিকিট কেটে প্রপাত পরিমণ্ডলে প্রবেশ করলাম। নির্জন শান্ত গাছগাছালি ঘেরা জায়গাটা খুবই মনোরম। চারদিকে পাহাড়ি পরিমণ্ডলের মধ্যে চন্দ্রভাঙ্কা নদীর জলধারা দেখে মুগ্ধ হলাম। অফ সিজন বলে ক্ষীণ জলধারা। প্রপাতের উচ্চতা ৭০ ফুট। উঁচু পাহাড় থেকে নীচে পড়ে, জলধারাটি একটি মাঝারি লেগুনের সৃষ্টি করেছে। গিরিখাত দিয়ে বয়ে চলা স্রোতধারা ৩ কিমি দূরে কৃষ্ণায় পতিত হয়েছে।
তেলুগু ভাষায় ইথিপোথালা কথার অর্থ তোলা আর ফেলা। এখানে বাঁদরদের উৎপাত মাত্রাতিরিক্ত। ফুরিয়ে আসা বিকেলে, রেলিং দেওয়া নেটের ওপারে ঝরে পড়া স্রোতধারার ছবি তুললাম। কাছেই রয়েছে একটি ক্রোকোডাইল বিড্রিং সেন্টার। শুনলাম প্রতি সন্ধ্যায় এই প্রপাত কৃত্রিম রঙিন আলোয় উদ্ভাসিত হয়। প্রপাত সন্নিকটে গাছগাছালির মাঝে সুন্দর সুন্দর কটেজ দেখে, থাকার ইচ্ছা হল। কিন্তু এই যাত্রায় তার আর উপায় নেই। অতএব অন্ধকারকে অনুষঙ্গ করেই ফেরার পথ ধরি।
কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে ফলকনামা কিংবা ইস্টকোস্ট এক্সপ্রেসে হায়দরাবাদ পৌঁছে, সড়কপথে নাগার্জুন সাগর আসতে হবে। এই রুটে নিয়মিত বাস চলাচল করলেও, গাড়িভাড়া করে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ। হায়দরাবাদ থেকে ১৬৮ কিমি দূরে নাগার্জুন সাগর পৌঁছাতে ঘণ্টা তিনেক মতো সময় লাগবে। আবার বিজয়ওয়াড়া থেকেও এই ট্যুরটা অনায়াসেই করতে পারেন। বিজয়ওয়াড়া থেকে এই পথের দূরত্ব ১৭৫ কিমি।
কোথায় থাকবেন: হায়দরাবাদ বা বিজয়ওয়াড়া থেকে গাড়িতে এসে দিনে দিনেই এই ট্যুরটা করা যায়। তাই সাধারণ ভাবে এখানে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। তবে রাস্তার ধকলের কথা ভেবে এবং ভালো ভাবে দেখার জন্য নাগার্জুন সাগর অথবা ইথিপোথালাতে এক বা দুটো দিন থাকলেই ভালো হয়। অনেক প্রাইভেট হোটেল রয়েছে, চাইলে সেখানে থাকতে পারেন।
মনে রাখবেন: নাগার্জুনকোন্ডা মিউজিয়াম শুক্রবার বন্ধ থাকে। দিনে দিনে ট্যুরটা করলে, সমস্ত কিছু দেখে হায়দরাবাদ শহরে ফিরতে রাত ১০টা-১১টা বেজে যাবে। এটা মাথায় রাখতে হবে।
ছবি সৌজন্য: লেখক
(সমাপ্ত)





