গ্রামের একেবারে ছোটো ছেলে আর বাড়ির মা-বোন-কাকিমা-জেঠিমাদের ওই নাচের তাঁবুতে ঢোকার কোনও অনুমতি না থাকবার জন্য একমাত্র তাদেরকেই নাগরদোলা চড়তে বা এগরোল ও আইসক্রিমের দোকানের সামনে দেখা যাচ্ছে। বাকি ভিড়টা সেই নাচের তাঁবুর সামনেই ঘোরাঘুরি করে। শোনা যাচ্ছে, বয়সে যেসব পুরুষের শীতের গন্ধ লেগে গেছে, তারাও নতুন রহস্যের সন্ধানে একটু রাত বাড়তেই এদিক ওদিক ঘুরে টুক করে ঢুকে পড়ছে নাচের তাঁবুতে। বাইরে একটা বুড়ো লোক প্রতিদিনই চিৎকার করছে, ‘একটুকুন হিলি নেন, একটুকুন হিলি নেন।”

ছোটো দরজার ভিতর দিয়ে তাঁবুতে ঢুকতে গেলে সেই বুড়োর হাতে পঞ্চাশ টাকা গুঁজে টিকিট নিতে হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, কেউ কেউ আরেকটু বেশি টাকা দিয়ে স্টেজের আরও একটু সামনে একটা দড়িবাঁধা জায়গাতে চলে যাচ্ছে। সেখানেই তারা চটুল গানের সঙ্গে স্টেজে ছোটো পোশাক পরে নাচতে থাকা মেয়েগুলোর সঙ্গে নিজেরাও নাচতে আরম্ভ করে। কখনও হাত তুলে টাকা গুঁজে দেয় শুধুমাত্র অন্তর্বাস পরে নাচতে থাকা মেয়েগুলোর বুকে। কখনও জড়িয়ে ধরে তাদের সঙ্গেও নাচতে চায়। মঞ্চের উপরে থাকা দু’জন মোটা লোক তখনই মঞ্চের কাছে এসে তাদের সরিয়ে দেয়।

রাত যত বাড়ে তত রঙিন হয় বুগিবুগির মঞ্চ। দেখা যায় আশপাশের গ্রামের লোকজনরাও রাত নামতেই মেলার মাঠে চলে আসছে। আর কোনও জায়গায় কোনও ভিড় না থাকলেও বুগিবুগির মঞ্চের সামনে সব সময় লম্বা লাইন। একদল নাচ দেখে বেরোতেই আবার একদল ঢুকে যাচ্ছে। বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে চিৎকার, হাততালি আর সিটি বাজানোর শব্দ। অনেকেই নাকি নাইট শিফটের ডিউটি ফাঁকি দিয়েও মুখ ঢেকে চুপিচুপি সেই তাঁবুর ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। তাদের অনুরোধে রাত্রি দুটো আড়াইটে পর্যন্ত বুগিবুগি চালাতে হচ্ছে। একমাসের মেলাতে মেলা কমিটিকে দেওয়া টাকা তাদের এক সপ্তাহের মধ্যেই উঠে গেছে। অন্য দোকানদার বা নাগরদোলা মালিকরা সেরকম টাকা না দিলেও, বুগিবুগির টেন্ট সব টাকাটাই দিয়ে দিয়েছে। স্বভাবতই কোনও দোকানদার আর ট্যা-ফু করতে পারেনি। মেলা কমিটিও চুপ।

একদিন থানার বড়োবাবু সহ অন্যান্য পুলিশ অফিসারদের ডেকে সুন্দর ভাবে একটা অনুষ্ঠানও করেছে। সেখানে তাদের জন্য বিশেষ খাওয়া ও পানের ব্যবস্থা ছিল। তবে একবারের জন্যও তাঁবুর কাছে যাননি গোস্বামীবাবু। এই বছর তার ছোটো শালার অসুখের জন্যে মেলা শুরুর কয়েকদিন আগে থেকেই ছিলেন না। অথচ অন্যবছর প্রতিদিন নিয়ম করে ক্লাবে বসেছেন, মেলা কমিটির অফিসে বসেছেন, এমনকী মেলাতেও ঘুরে ঘুরে সবাইকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘সব ঠিক আছে তো, বিক্রি হচ্ছে?”

কয়েকটা স্টল ও নাগরদোলার আলোর সমস্যা থাকলে, বাড়তি আলোর ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়া জলের ব্যবস্থা, টয়লেটের ব্যবস্থা, নোংরা ফেলবার জন্যে ব্যবস্থা সবকিছু দেখেশুনে তারপর শান্তি পেতেন। এবার এইসবের দায়িত্ব কয়েকজনকে দিয়ে গেলেও প্রশান্তই ছিল তাদের মাথা। ফোনে তাদের থেকে শুনেছেন এবার বিক্রি মোটামুটি, একমাত্র খাবার স্টলগুলোতে ভালো বিক্রি হচ্ছে। এটা অবশ্য প্রতিবারেই হয়৷ নাগরদোলাতে ভিড়টা একেবারে কমে গেছে। শুধু কোনও কিছু জিজ্ঞেস করেননি বুগি বুগি নাচের তাঁবুটার ব্যাপারে। কী হচ্ছে, কে করছে কিছু জানার চেষ্টাও করেননি।

মেলা শুরুর সাতদিনের মাথায় তিনি ফিরে আসেন। সেদিনই সন্ধেবেলাতে মিলন সমিতির অফিসে বসে আছেন। মেলার সময় প্রতিদিন নিয়ম করেই বসেন। হিসাব মেলানোর কাজের সঙ্গে এই সন্ধেবেলাতেই যত উটকো ঝামেলা আরম্ভ হয়। সেই সময় পুলিশে খবর দিয়ে সব কিছু সামলানোর চেষ্টা করা হয়। মেলার আওয়াজ পৌঁছে যাচ্ছে অফিসের টেবিল পর্যন্ত। শুধু বুগিবুগির তাঁবুর গান শোনা যাচ্ছে না। অফিস থেকে তাঁবুটা বেশ কিছুটা দূরে। এর মাঝে অনেকগুলো স্তর পেরিয়ে তবে আসতে হয়। তাছাড়া বুগিবুগি নাচের তাঁবুটা বসেছে মেলার মাঠ থেকে একটু আলাদা একটা জায়গায়। অন্যসময় অফিসে ক্লাবের সদস্যরা থাকলেও মেলার সময় সেভাবে কেউ আসে না। মেলাতেই ঘুরে ঘুরে তারা সব দেখাশোনা করে। অন্তত গোস্বামীবাবু তাদের সেরকম নির্দেশই দিয়ে রেখেছেন। শুধু ভানুকে একটু পরে আসবার জন্য বলেছেন। ছেলেটা প্রতি সন্ধ্যায় এসে চা তৈরি করে।

দরজার কাছে কয়েকজনের গলার শব্দ পেলেন। ঘাড় তুলে দেখলেন বাইরে চারজন মধ্যবয়সি মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন।

গোস্বামীবাবু মুখ তুলতেই একজন বলে উঠল, ‘অনেকক্ষণ এসেছি, কথা আছে।’
গোস্বামীবাবু তাদের ইশারাতে ভিতরে আসতে বললেন। চারজন ভিতরে ঢুকলেন। সবাই গোস্বামীবাবুর চেনা, এই গ্রামেরই বউ সব। কেউ দাদা, কেউ কাকা সম্বোধনে ডাকে। গোস্বামীবাবু তাদের সামনের চেয়ারে বসতে বললেন। একজন একটু গম্ভীর ভাবে বলে উঠলেন, ‘ক্লাবের কি খুব বেশি টাকার দরকার?

আচমকা এইরকমের প্রশ্নে গোস্বামীবাবু একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। কী উত্তর দেবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। কিছু সময় পরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হঠাৎ এ প্রশ্ন?”

—ঠাকুরের মেলাতে ওইরকম নোংরা নাচের কি খুব দরকার ছিল।

—-নোংরা নাচ! কই আমাকে তো সেরকম কেউই কিছু বলেনি। প্রশান্তও কিছু বলেনি।

—বলবে কী করে, আর আপনাকে বলেনি এটাও আমরা বিশ্বাস করব কীভাবে? ক্লাব তো মেলার টাকা ছাড়াও প্রতি রাতে পাঁচ হাজার টাকা করে পাচ্ছে। একমাস মেলা মানে কত টাকা উঠবে সে কি আর আমরা জানি না?

এই প্রশ্নের কোনও উত্তর গোস্বামীবাবুর কাছে ছিল না। তাও একটু নিচু গলায় বললেন, ‘আমি তো এবছর ছিলাম না, আজই এসেছি। আমার সম্বন্ধীর শরীর খারাপ ছিল।’

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...