আমাদের চালক বলল, কোর এরিয়া দিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি না থাকলেও সে আমাদের সরকারি রেটের চেয়ে কমে মেটলা ঘুরিয়ে আনবে। শেষে ওয়াচ টাওয়ার পর্যন্ত নাকি মোষের গাড়ি বরাদ্দ। জঙ্গলের গভীরে ঢুকবে না এবং ওয়াচ টাওয়ার পিছু জনসংখ্যার বাধা বন্ধকতা থাকায় বাইরের গাড়ি নিতে দ্বিধা করছিলাম। শেষে ঠিক করলাম মেঢলা ঘুরে আসব। ওদিকে রিসর্টের মালিক ও তাঁর পত্নীও নিজেদের গাড়িতে মেঢলা যাচ্ছেন। অনেকগুলো বিকল্প।

গরুমারা জাতীয় উদ্যান

লাটাগুড়িকে কেন্দ্র করে গরুমারা, চম্পাসারি ও চাপরামারি অভয়ারণ্য ঘোরা যায়। একাধিক ওয়াচ টাওয়ার আছে। যাত্রাপ্রসাদ, চুকচুকি, মেঢলা, চাপরামারি ও চন্দ্রচূড়— এই পাঁচ জায়গার নিরীক্ষণ কেন্দ্রে যাওয়া যায় গরুমারার প্রবেশ ফটকে টিকিট কেটে জিপসি সাফারি করে। অভিজ্ঞজনের পরামর্শে ও জনপ্রিয়তার দাবিতে গতবারে যাত্রাপ্রসাদ গিয়েছিলাম বলে এবারে ইচ্ছা ছিল মেঢলায় ঘুরে আসার। ওখানে কিছু দূর জিপসিতে গিয়ে ওয়াচ টাওয়ারে পৌঁছাতে হয় মোষের গাড়ি করে। এই তথ্য এবারেই জানলাম। জলপাইগুড়ির বাসিন্দা অল্প বয়সি ছোকরাকে আমাদের জিপসির সঙ্গী হিসাবে পেলাম।

যাত্রাপ্রসাদ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্ৰ

আগেরদিনের অভিজ্ঞতার জেরে তাড়াতাড়ি লাইন দিয়েও দেখলাম শেষ রক্ষা হচ্ছে না। শেষ ট্রিপের জন্যও মেঢলার টিকিট পাওয়া যাবে না। কারণ দিনটা ছিল সপ্তাহের শেষ, স্থানীয় মানুষেরও ঢল। প্রতিটি ওয়াচ টাওয়ারে সর্বাধিক ৪০ জন পর্যটককে অনুমতি দেওয়া হয়। অগত্যা আবার যাত্রাপ্রসাদ। ওই ছেলেদুটোও একটু হতাশ হল। আমাদের ৬ জনের মোট ২১৪০ টাকা লেগেছিল। বর্তমানে প্রত্যাশিত ভাবে দর বেড়ে গেছে।

এই বিকেলের শেষ ট্রিপে গাড়ি জঙ্গলে ঢোকে সাড়ে ৪টা নাগাদ। ফেরার পর আদিবাসী নৃত্যের আয়োজন ছিল। যাক, একটা কিছু নতুন দেখব। গতবার দুপুরের সাফারিতে ট্রাইবাল ডান্সটা যুক্ত ছিল না। টিকিটের সঙ্গে পাটের হস্তশিল্পের সামান্য নমুনা পাওয়া গেল। লাগোয়া রিসর্টে ফিরে খেয়ে নিয়েই আবার গাড়ির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ল শুভংকর মেয়েকে নিয়ে। আমি একটু পরে মাকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা করলাম মূল ফটকের দিকে, যেখান থেকে যাত্রাপ্রসাদের দিকে জিপসি যাত্রা করবে। এবারেও পথে ময়ূর, নেউল ছাড়া আর কোনও প্রাণী চোখে পড়ল না। ময়ূরগুলোও আবার পেখম খসা।

গাইড বলল, শীতকালে ডিসেম্বর থেকে ময়ূরের পেখমে কলপ বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে তার আকার আর বাহার। আমি প্রশ্ন করলাম, তা হলে বর্ষায় ময়ূর পেখম তুলে নাচে কেন? সে কি তার হালকা ল্যাজ তুলতে সুবিধা হবে বলে? আমার রসিকতায় ওই ছেলেদুটোর একজন ভদ্রতা করে সামান্য হাসল। যাত্রাপ্রসাদ যদিও এক সাঁতারকুশল কুনকি হাতির নামে নামাঙ্কিত, তবে এটা ‘রাইনো পয়েন্ট’ বলে পরিচিত। গতবার এসে বুনো মোষ আর গণ্ডারের জল খাওয়া দেখেছিলাম। এদিকটায় তৃণভূমি থাকায় এই প্রাণীগুলোই বেশি। এবার গণ্ডার অনেক দূর থেকে “টু-কি’ দিয়েই মিলিয়ে গেল।

তবে, আধ ঘণ্টার মধ্যে গণ্ডা গণ্ডা বাইসন এসে নীচের তৃণভূমি ছেয়ে ফেলল। তাদের পিঠে সাদা বক। ঠিক ছেয়ে ফেলতে পারেনি। তবে ঘন সবুজের মধ্যে কালো কালো চতুষ্পদ আর তাদের ঘিরে ইতস্তত সাদা সাদা বকের ঝাঁক একটা চমৎকার নকশা বানিয়ে ফেলল। দূর থেকে পোষা মোষ আর বুনো মোষের ফারাক করা যায় না মাথার কাছে বিশেষ সাদাটে রোম ছাড়া। তাদের বিরাট আকারের কিছুই টের পাওয়া যায় না। তবে দূরত্বজনিত আকার হ্রাস পুষিয়ে গেল সংখ্যা দিয়ে। আমার মেয়ে উর্বী ৭২ পর্যন্ত গুনল। যাত্রাপ্রসাদ জায়গাটার নৈসর্গিক সোন্দর্য এমনিতে অসাধারণ।

সময়টা শীতকাল হলে বন্য প্রাণী দেখার পক্ষে আদর্শ। তবে এইখানকার বনবাংলোয় অনেক আগে থাকতে বুকিং করে রাত্রিবাস করতে পারলে খরচ ও চোখ দুই সার্থক হয়। বনের স্থানে স্থানে গর্ত খুঁড়ে নুন ভরা আছে। রাতে বন্য প্রাণীরা সেই নুন খেতে এলে পর্যটকদের উল্লাসের সীমা থাকে না।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...