প্রবালের অফিস কলিগ বিকাশের যাতায়াত বাড়ে শেলীর বাড়িতে। শেলীর সঙ্গে খানিকটা সময় কাটায়। দরকারি কথাবার্তা চলে। অফিস থেকে টাকাকড়ি সব, ওই তদ্বির করে তাড়াতাড়ি পাইয়ে দিয়েছে। প্রবালের অফিসে শেলীর চাকরির ব্যাপারেও কথাবার্তা চালাচ্ছে বিকাশ। আসলে ইউনিয়ন সেক্রেটারি বিকাশ প্রবালের খুব কাছের বন্ধুও বটে। ওরা প্রায় একই সময়ে জয়েন করেছিল চাকরিতে।

ব্যাচেলর বিকাশ, প্রবাল থাকতে প্রায়ই আসত ওদের বাড়ি। আড্ডা মারত। সেই সূত্রে এ পাড়ায় সবাই চেনে বিকাশকে। যেভাবে বিকাশ পাশে দাঁড়িয়েছে শেলীর, তাতে পাড়া তো বটেই, আত্মীয়রাও সবাই বিকাশকে বাহবা দিল!

বেশ ক’টা মাস কেটে গেল। শেলী এখন প্রবালের অফিসে চাকরি পেয়েছে বিকাশের দৌলতেই। বেশ সময় কেটে যায় শেলীর। এখন আর অতটা একা লাগে না। ক্রমশ সহজ হয়ে উঠছে সে। যদিও বুকের ভিতর একটা চাপা কষ্ট রাতে বিছানায় শুলেই চেপে বসে। কেমন যেন হু হু বাতাস বুক হালকা করে ছড়িয়ে পড়ে ঢাউস বাড়িটায়। কেবলই দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে প্রবালের ছবি আঁকড়ে কাটে নির্ঘুম রাত। ভোরের দিকে ক্লান্তিতে ঘুম নামে দু-চোখে, তখনই প্রবাল এসে দখল করে সকল সত্তা। শেলী সহজ হয়েও সহজ হতে পারে না। পুরো ব্যাপারটা এখনও কেমন যেন ঘোলাটে ওর কাছে। এরকমটা তো হওয়ার ছিল না।

বেশ সুখেই কাটছিল জীবন। একমাত্র মেয়ে তৃণাকে নিয়ে ওদের আর ভাবনা নেই। সে এখন বড়ো হয়ে গেছে। পুণেতে চাকরি করছে। কিন্তু হঠাৎই এই দুর্ঘটনা। অবিশ্বাস্য। কল্পনারও অতীত। কত স্মৃতি ভিড় করে আসে মনের ভিতর। এখন মনে পড়ে মধুর মুহূর্তগুলো।

ধীরে ধীরে শেলী এখন অনেকটা স্বাভাবিক। আসলে বিকাশ ওকে আগলে রেখেছে দু-হাত দিয়ে। নিজের চেম্বারে ওকে পিএ করে রেখেছে। কাজের ফাঁকে প্রবালেরই কথা বেশি ওঠে। নানান আলোচনা চলে। সেই ওদের প্রথম দেখা বিয়ে বাড়ির ভিড়ে। আলাপ ক্রমশ ভালোলাগা পেরিয়ে কখন যেন ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়ল ওরা। সবটুকু জানা বিকাশের। কতদিন ওরা তিনজনে মিলে রেস্টুরেন্টে ফিশ ফ্রাই আর চা খেয়েছে। বেড়াতেও গেছে কাছে-পিঠে। বিকাশকে যে কাছছাড়া করতে চাইত না প্রবাল। শুধু বিয়ের পর হানিমুনে ওদের দু’জনকেই পাঠিয়েছে বিকাশ। আরও কয়েকবার ইচ্ছে করে শেষ মুহূর্তে বিকাশ সরে এসেছে। যায়নি ওদের সঙ্গে।

অফিসে খুব স্বাভাবিক ভাবেই একটা চাপা গুঞ্জন চলছে বিকাশ আর শেলীকে নিয়ে। শুধু তাই না, পাড়াতেও ওদের মেলামেশাটা ভালো নজরে দেখছে না কেউ। নানান কথা উঠছে। ওদের কানেও গেছে সেসব কথা। শেলী এবার খানিকটা সংযত। নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায়। সমাজ সংসার বড়ো কঠিন ঠাঁই যে। কিন্তু বিকাশ যে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। কাছাকাছি পৌঁছে গেছে শেলীর। প্রায় প্রতিদিন বাইকে করে শেলীকে বাড়ি পৌঁছে চা, জলখাবার খেয়ে আড্ডা মেরে ফেরে। কোনও কোনওদিন আবার ডিনার সেরেই ফেরে। আসলে একা মানুষ, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেই বা কী করবে সে!

শেলী নিজে এবার একটু একটু বুঝতে পারছে। ব্যাপারটা জটিল হচ্ছে। কিছু বলার আগেই সেদিন বিকাশ প্রস্তাবটা দিয়েই বসল শেলীকে। বিয়ের প্রস্তাব। এভাবে একা একা থাকা যায় না। প্রবালের নিজের বাড়িতেই থাকতে পারে ওরা দু’জন। এভাবে দূরে দূরে থাকার মানে হয় না। কিন্তু শেলীর ঘোর আপত্তি।

—না না। এ হয় না। বন্ধু হিসেবেই তো থাকা যায়। অসুবিধেটা কোথায়। মেয়ে মোটেই ভালো চোখে দেখবে না। স্বার্থপর ভাববে মাকে।

বিকাশ হাজারটা যুক্তি খাড়া করছে। জীবন আগে। লোকে দু-দিন বলবে তারপর সব চুপ করে যাবে। তাছাড়া এতে অন্যায় কোথায়।

শেলীর এক কথা— কোনওদিনই বন্ধু ছাড়া কিছু ভাবেনি বিকাশকে। কাজেই সম্ভব নয়। এইতো বেশ আছি। তোমার দয়ায় চাকরি করছি, এটাই অনেক। কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। না না এ হয় না। এ অন্যায়। এ পাপ। শেলী রুখে দাঁড়ায়। একটা অপরাধবোধ কাজ করে ভিতর ভিতর।

বিকাশ শেষ পর্যন্ত বন্ধু হয়েই সারাজীবন পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিল শেলীকে। শেলী খুশি। মেয়েকে সেদিন রাতে সব খুলে বলল শেলী। মেয়ে অবশ্য ব্যাপারটা শুনে মাকে রাজি হয়ে যেতে বলল। তবু শেলীর মনে নানান প্রশ্নের আনাগোনা। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে সে। বন্ধু হয়েই থাকতে চায়, বিকাশ যখন রাজি। তখন আর কোনও কথা নয়। তৃণা আর জোর করল না। মায়ের উপর সবটুকু ছেড়ে দিল। শেলী আর কিছু জানাল না বিকাশকে। শুধু নিজেকে মনে মনে ধন্যবাদ দিল।

প্রবালের সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল কত কী। আকাশে চাঁদের মোহময় জ্যোৎস্নার বাহার। হালকা ঠান্ডা ঠান্ডা হওয়া বইছে। ঘরের আলো নিভিয়ে আবার এসে দাঁড়াল জানলার গ্রিল ধরে। ওর সারা গায়ে লেপটে আছে রুপোলি চাঁদের মাখন নরম মোলায়েম আবেশ জড়ানো সুখের অন্তহীন চেনা প্রহর। শেলী হারিয়ে যেতে থাকল অতীতের গোপন কুঠরিতে, যেখানে শুধু প্রলয় আর শেলী। আর অফুরান আনন্দের আবেগময় ভালোলাগার পরশ। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেল টেবিলে সাজানো প্রবালের ছবিটা। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে ওদের দশ বাই দশ ঘরের পুরনো আসবাব। বিছানা বালিশ। প্রবালের ছবিটা।

স্বপ্নের বারান্দায় প্রবাল আর শেলীর হাত ধরাধরি করে হেঁটে যাওয়া দেখতে দেখতে বায়োস্কোপের ফ্ল্যাশব্যাক দৃশ্যের মতো সুখের উদ্দাম জলপ্রপাত ঝরতে থাকে বিরামহীন। সেই কাল্পনিক বৃষ্টিসুখের বিন্দুর স্পর্শে শেলী হারিয়ে যেতে লাগল। শ্বেতশুভ্র পবিত্র সুখের চাদর শেলীর অশান্ত মনটায় ভালোলাগার এক বাস্তব পরশ ফুটিয়ে তুলল নিজের অজান্তেই।

ওদিকে গির্জা-র ঘড়িতে রাত বারোটার ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। শেলীর সেদিকে কোনও হুঁশই নেই। কেমন যেন একটা মধুর আবেশ ওকে আছন্ন করে রাখল সারারাত।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...