আদিবাসী গ্রাম নিগির্ধার, কাছেই রয়েছে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট-এর দ্বিতীয় চেকপোস্ট। প্রকাণ্ড সব শাল বৃক্ষের ফাঁকে বেশ কয়েকটি অফিসঘর। এখানেও চেক করা হল কাগজপত্র। ওয়াকিটকিতে কীসব কথাবার্তা চলল। আমরা হাত-পা ছাড়িয়ে নিতে একটু এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করলাম। এক বনকর্মীর সঙ্গে আলাপচারিতা চলল। কিন্তু মনের মধ্যে একটি প্রশ্ন রয়েই গেল— এত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা সত্ত্বেও চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন? জীবজন্তু তো বটেই, নির্দ্বিধায় গাছ কেটে চালান হয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর। আমার এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের গাইড অশোক বলল, ‘স্যার সরকারি তরফে অবশ্যই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু বনকর্মীর সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। বর্তমানে সিমলিপাল অভয়ারণ্যের মধ্যে রয়েছে ১২টি রেঞ্জ অফিস। এক একটা রেঞ্জ অফিসের অধীনে আছে আবার ৩০ থেকে ৩৫টি বিট অফিস। এক একটা বিট অফিসে আবার পাঁচ থেকে ছয়জন কর্মী নিযুক্ত। তাদের কাজ মূলত গাছ চুরি ও বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধের জন্য পাহারা দেওয়া। তাদের এলাকা অবশ্য নির্দিষ্ট। সেই এলাকায় টহল দেওয়ার ফাঁকে কেউ যদি এইসব অবৈধ কাজ করে, তাহলে তো কিছুই করার নেই স্যার।’
স্থানীয়রা যাতে বন ও বন্যপ্রাণী নিধন না করে, তার জন্য বর্তমানে স্থানীয় লোকজনদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে বন দপ্তর। একশো দিনের কাজ হোক অথবা জঙ্গলের যে-কোনও কাজ, এখানকার স্থানীয়দেরই প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফলে অল্প বিস্তর চাষাবাদ ও পশুপালনের বাইরে বন দপ্তরের উদ্যোগে এই কর্মসংস্থান তাদের অনেককেই বন্য- -প্রেমী করে তুলেছে। গাইডের মুখে আরও শুনলাম, কিছুদিন আগে চোরাশিকারিদের ছোড়া গুলিতে এক ফরেস্ট অফিসার মারা গিয়েছেন। যা খুবই মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। চোরাশিকারিদের দল জঙ্গলের এক প্রান্তে আগুন ধরিয়ে পাহাড়ের অন্যপ্রান্তে অপেক্ষায় থাকে, পশু নিধনের জন্য। সেই খবর বনকর্মীদের মারফত বন দপ্তরে পৌঁছায়। সেই এলাকায় থাকা ফরেস্ট অফিসার দলবল-সহ হাজির হন ঘটনাস্থলে। ফলে শুরু হয় খণ্ডযুদ্ধ। উভয়পক্ষে গুলি বিনিময় চলে। শিকারিদের ছোড়া গুলিতে ঘটনাস্থলেই সেই ফরেস্ট অফিসার মারা যান। চোরা শিকারিদের তরফে অনেকে আহত হলেও, তাদের ধরা সম্ভব হয়নি। ওরা জঙ্গলের বেপথে প্রবেশ করে। ফলে চেকপোস্টে হাজারও কড়াকড়ি, তাদের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে এতটুকুও ব্যাঘাত সৃষ্টি করে না।

ঘন বন ক্রমশ আরও গভীর, আরও অন্ধকার ও স্যাঁতস্যাঁতে হতে থাকল। মাথার উপর আকাশ ঢাকা গাছের শামিয়ানা। গাইডের ইশারায় হঠাৎ গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার ধারে শাল জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যায় আমাদের গাইড। চোখ তুলে দেখি একটা উঁচু গাছের মগডালে একটা মালাবার জায়েন্ট স্কুইরাল। সন্তর্পণে বেশ কয়েকটা ছবি নিতেই, ডাল থেকে ডালে লাফিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। রাস্তার দু’পাশে অসংখ্য বানর তাদের কচিকাঁচাদের নিয়ে সংসার পেতে বসেছে।
এক ঝোপের আড়ালে দারুণ একটা বন মোরগের দেখা পেলাম। সুন্দর সুঠাম চেহারা। তবে ছোটাছুটি করেও তার দেমাকি রূপের ছবি মিলল না। রাস্তা দিয়ে আপনমনে বিচরণরত এক ময়ূরের সঙ্গেও সাক্ষাৎ ঘটল। আমাদের গাড়ির উপস্থিতিতে সচকিত হয়ে সে বেচারি উড়ে গিয়ে বসল একটা গাছের মগডালে। জঙ্গলের আলোছায়ার মাঝে হঠাৎ চলে আসা আরও কিছু বন্যের উপস্থিতি আমরা মনে মনে কামনা করছিলাম। কিন্তু সেরকম কিছু ঘটল না।
এভাবে দীর্ঘ পথ চলার পর পৌঁছালাম জোরাণ্ডায়। জোরাণ্ডার পরিত্যক্ত বাংলোর সামনে গাড়ি পার্ক করে ড্রাইভার। আরও দুটো গাড়ি আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রথম কয়েকজন ট্যুরিস্টকে ঘুরতে দেখলাম। গাইড বলল, আজ তবু গোটা তিনেক গাড়ি এন্ট্রি করেছে। গতকাল তো কোনও ট্যুরিস্ট গাড়িই জঙ্গলে প্রবেশ করেনি। তাই সারা রাস্তায় কোথাও কোনও হইহুল্লোড় নেই। নেই কোনও গাড়ির তীব্র হর্নের আওয়াজ। বুঝলাম, গ্রীষ্মের দাবদাহে শরীরে কষ্ট হলেও, এটাও এক অন্য প্রাপ্তি। যেটা শীতকালে কখনওই সম্ভব হতো না। তখন শুধুই হইহুল্লোড় আর পিকনিকের মেজাজ।
এই মুহূর্তে ফিনফিনে দখিনা বাতাস বইছে। একটা ফুরফুরে মেজাজি আবহাওয়া। মাথার উপরে ঘন নীল আকাশ এবং এই সবকিছুকে সঙ্গত দিচ্ছে শাল-পিয়ালের বর্ণ বৈচিত্র্য। এগিয়ে চলি জোরাণ্ডা ভিউ পয়েন্টের দিকে। ঝরাপাতার উপর দিয়ে চলার সময় মচমচ আওয়াজে নৈঃশব্দতা ভঙ্গ হয়। আমাদের পদশব্দে সচকিত একটা গিরগিটি গলা উঁচিয়ে আমাদের দেখে নিয়েই লুকিয়ে পড়ে পাতার আড়ালে। সামনে ঝাঁকড়া গাছ থেকে হঠাৎ কিছু টিয়া পাখি জেট প্লেনের মতো আকাশকে চিরে পাহাড়ের অন্য প্রান্তে মিলিয়ে যায়।
চারপাশে পাহাড়। কোনওটা একদম ন্যাড়া। কোনওটা সবুজে সবুজ। তারই মধ্যে অন্য রঙের ছোঁয়া। দু-তিনটে পাহাড় আড়াআড়ি ভাবে একটা ঘেরা অঞ্চল তৈরি করেছে। মাঝে গভীর গিরিখাত। কেমন যেন সিনেমায় দেখা আদিম সভ্যতার মতো। উলটো দিকের পাহাড়ের দেয়ালে নজর পড়তেই দেখা মিলল এক জলপ্রপাতের। তীব্রবেগে সেই জলধারা নামছে নীচের খাদে। এটাই জোরাণ্ডা জলপ্রপাত। যার উচ্চতা ৪৯০ ফুট। উচ্চতার নিরিখে ভারতের উনিশতম।
(ক্রমশ…)





