গত কয়েক বছর ধরে ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এর জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জানানো হয়েছে যে, শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই এই দলটি ভারত জুড়ে ৭৫টিরও বেশি শো করেছে। এই বছরের শুরুতে, জার্মানিতে একটি উৎসবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁরা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। লেডি এমসি কেরালার এক অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানিয়েছেন, ‘আমরা বুঝতে পারিনি যে, ওই শো-এ আসা দর্শকদের ভিড় কোথায় শেষ হয়েছিল। এত জনপ্রিয়তার কারণে এই ব্যান্ড সম্প্রতি হেয়ার সিরাম ব্র্যান্ড লিভন, ফ্যাশন ব্র্যান্ড জুডিও এবং ট্রুব্রাউনজের প্রচারে অংশ নিয়েছে।’

অনন্য কাহিনি

‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এর একটি গান ‘গেম ফ্লিপ’ ইনস্টাগ্রাম-এ পোস্ট হওয়ার পর এখনও পর্যন্ত ১৫.৫ মিলিয়নেরও বেশি ভিউ এবং ১,২০০,০০০ লাইক পেয়েছে। মিউজিক কম্পোজার এ আর রহমান এবং সন্তোষ নারায়ণের সঙ্গে দেখা করেছেন জে কুইন। রহমান ও নারায়ণ দু’জনেই জানিয়েছেন, তাঁরাও রিলটি দেখেছেন। এর জন্য ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এর সদস্যরা ভীষণ খুশি। মার্চ মাসে দলটি অস্কার বিজয়ী সুরকার এম এম কীরাবানি-র সঙ্গেও একটি কনসার্টে অংশগ্রহণ করে, যা সংগীতে তাদের অবদানের প্রতি সম্মান জানাতে আয়োজিত হয়েছিল।

‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এর সদস্যরা মঞ্চের বাইরে এক প্রাকৃতিক উষ্ণতা প্রকাশ করেন। তাঁরা উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। তাঁদের শক্তি বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার মধ্যে নিহিত। এই নারীদের মধ্যে কেউ কেউ আর্থিক অসুবিধা, পারিবারিক বিরোধিতা এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে এখানে পৌঁছেছেন। মুম্বইয়ে এবং অন্য জায়গায় বেড়ে ওঠা এই তরুণীরা নিজেদের শহর সম্পর্কে তাদের নিজস্ব অনন্য সফর-কাহিনি শেয়ার করেন। তাদের রাজনৈতিক বোধগম্যতা এখনও বিকশিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। হয়তো তাঁরা সবসময় একে অপরের সঙ্গে একমত হন না, কিন্তু তবুও তাদের জীবনের গল্পগুলো একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন।

নৃত্যশিল্পী বিগল এমজি পূর্বে আরেকটি হিপ-হপ গ্রুপের অংশ ছিলেন, যে দলটিকে তিনি তার বিকাশে সাহায্য করার জন্য কৃতিত্ব দেন। কিন্তু ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’-এ যোগদানের পর তিনি আরও নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ বোধ করছেন বলে জানিয়েছেন। গ্রাফিটি শিল্পী গৌরী এর আগে আরেকটি পপ দলে কাজ করেছিলেন, যেখানে বেশিরভাগ সদস্য ছিলেন পুরুষ। কিন্তু তিনি মনে করেন, এখানে তাঁর আসল পরিচয়ের সঙ্গে খোলামেলা ভাবে থাকার স্বাধীনতা আছে। এখানে তাঁরা একসঙ্গে নাচ করেন, কাঁদেন এবং লড়াই করে আনন্দ পান বলে জানিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে জে কুইন জানিয়েছেন, ‘যদি কারও কোনও সমস্যা থাকে, আমরা একে অপরকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে কেউ কাউকে বিচার করে না।”

2020 সালে ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড উইমেন’- ‘-এর প্রতিষ্ঠার পর, এর দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য—ক্রান্তিনারী এবং #প্রীতি, হিপ-হপ শিল্পীদের একটি ঘরোয়া জ্যাম সেশনে মিলিত হন৷ ‘প্রথম সাক্ষাতের পরপরই, আমরা একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলাম। মনে হচ্ছিল যেন আমরা একে অপরকে অনেক দিন ধরে চিনি। এটি এমন এক সম্পর্ক, যা মুহূর্তের মধ্যে অনুভূত হয়েছিল।”—জানালেন #প্রীতি।

পুরুষদের চ্যালেঞ্জ

হিপ-হপ ভারতেও দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। কিন্তু তার ঐতিহ্যবাহী ধারার বাইরে চলে গিয়েছিল, যা নারী বিদ্বেষ, মদ্যপান এবং অর্থের উন্মাদনাকে উৎসাহিত করেছিল। দেশজুড়ে র‍্যাপাররা, যাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রান্তিক অঞ্চল থেকে এসেছিলেন, তারা হিপ-হপকে একটি নতুন দিকদর্শন দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কারণ তাঁদের সংগীত ছিল বুদ্ধিদীপ্ত, মনোমুগ্ধকর এবং পরীক্ষামূলক। সেইসঙ্গে তাঁরা সামাজিক বৈষম্য এবং ক্ষমতাকেন্দ্রগুলিকে চ্যালেঞ্জ করতে ভয় পেতেন না। তা সত্ত্বেও, হিপ-হপ গ্রুপগুলিকে মূলত পুরুষ-শাসিত বিশ্ব হিসাবে বিবেচনা করা হতো।

ক্রান্তিনারী এই প্রসঙ্গে আক্ষেপ করে জানান যে, ‘ছেলেদের এমন কিছু দল ছিল, যেখানে কিছু মেয়েও ছিল, যারা হিপ-হপ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ছেলেরা তাদের দলের অংশ বলে মনে করত না মেয়েদের। ছেলেরা মেয়েদের বলত যে, এতে তোমার কেরিয়ার তৈরি হবে না, শেষ পর্যন্ত তোমাকে বিয়ে করে সংসারী হতে হবে। পুরুষ শিল্পীরা যে তাদের নারী শিল্পীদের সাহায্য করতে ইচ্ছুক ছিলেন না তা নয়, কিন্তু ইতিমধ্যেই ধারণা করা হয়েছিল যে, বেশিরভাগ মহিলা হিপ-হপকে একটি অস্থায়ী শখ বলে মনে করতেন। তাই, নারীদের দলগত ভাবে কাজ করার সুযোগ বিরল ছিল।”

কখনও কখনও সহকর্মী পুরুষ র‍্যাপাররা তাদের সঙ্গে কাজ করা মহিলাদের পরিচালনা করার চেষ্টাও করতেন। ‘এটা আমার সঙ্গে অনেকবার ঘটেছে’, মহিলা এমসি পুরুষ হিপ-হপ দলের সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন একথা। এও জানান, ‘ছেলেরা নির্দেশ দিয়ে বলত— এটা নাও, এটা নিয়ে লেখো, ওটা নিয়ে লেখো ইত্যাদি। তার প্রভাব নারী র‍্যাপারদের লেখার বিষয়বস্তু এবং লেখার ধরন দুটোই বদলে দেয়।

#প্রীতি জানান, ‘আমরা তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় আমরা আমাদের নারীত্ব হারিয়ে ফেলছি এবং ধীরে ধীরে পুরুষতান্ত্রিক স্টাইলের দিকে ঝুঁকছি। আসলে ছেলেদের দলগুলি ঠিক যেন গ্যাংস্টার র‍্যাপার।’ ‘অথচ যা আমরা নই’ ক্রান্তিনারী যোগ করলেন।

জ্যাম সেশনের পর যেখানে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, ক্রান্তিনারী এবং হ্যাশট্যাগ প্রীতি একসঙ্গে দোসা খাওয়ার সময় তাদের হতাশাগুলি একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন। তাঁরা দু’জনে ইতিমধ্যেই অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে একইরকম আলোচনা করেছেন। হ্যাশট্যাগ প্রীতি এর আগে একটি সর্ব-মহিলা দল গঠনের চেষ্টা করেছিলেন, যেখানে তিনি সফল হননি। ক্রান্তিনারীও কিছু প্রতিষ্ঠিত মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাদের কেউই পাত্তা দেননি।

এখন তাঁরা দু’জনেই মহিলাদের জন্য একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একটি এমন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে র‍্যাপাররা একত্রিত হয়ে খোলাখুলি নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরতে পারবেন। তবে তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন না যে, তাঁদের প্রচেষ্টা কোথায় নিয়ে যাবে। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত ভাবে জানিয়েছেন তাঁরা, ‘আমরা যে ছেলেদের উপর নির্ভরশীল ছিলাম, একসময় তাদের পিছনে ফেলে এগোতে চেয়েছিলাম,’ ক্রান্তিনারী স্মৃতি রোমন্থন করে জানান।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...