কান হল আমাদের শ্রবণ ইন্দ্রিয়, যা শব্দ তরঙ্গ গ্রহণ করে এবং মস্তিষ্ককে তা পাঠায়। এরপর মস্তিষ্ক বিচারকের ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ, বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা ‘কানপাতলা’। অর্থাৎ, তারা সহজেই সবকিছু বিশ্বাস করে নেন এবং তাদের মস্তিষ্ক বিচারকের ভূমিকা পালন করতে পারে না সঠিক ভাবে। যার ফলে তৈরি হয় সমস্যা।

আসলে, কিছু মানুষ এত সহজে সবকিছু বিশ্বাস করে নেন যে, যার ফলে শুধু তিনি ক্ষতির শিকার হন তা নয়, অন্যরাও বিপদে পড়েন অনেক সময়। কিন্তু কেন অনেকে মাঝেমধ্যে এমন কিছু বিশ্বাস করেন, যা তার কোনও যুক্তি কিংবা বিচার- বিশ্লেষণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে না?

এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, অন্ধবিশ্বাস কেবল ধর্ম কিংবা আধ্যাত্মিকতার বিষয় নয়। অন্ধবিশ্বাসের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কারণ, আজকের সমাজ মাধ্যমের সক্রিয়তার যুগে, ভুল তথ্য মুহূর্তের মধ্যে সারা পৃথিবীকে তোলপাড় করে দিতে পারে। যেমন, কোনও প্রশ্ন ছাড়াই রাজনৈতিক নেতাদের কথা বিশ্বাস করা হয়, তেমনই, সমাজ মাধ্যমে শেয়ার হওয়া ছবি কিংবা ভিডিওর সত্যতা যাচাই না করে, মুহূর্তের মধ্যে তা নিজে বিশ্বাস করে নিয়ে, অন্যকে শেয়ার করে দেওয়া হয়। এ এক ভয়ংকর প্রবণতা। এই অন্ধবিশ্বাসের কারণে নষ্ট হতে পারে মধুর কোনও সম্পর্ক, অশান্তি ছড়াতে পারে সংসারে এবং নষ্ট হতে পারে সামাজিক সম্মানও। শুধু তাই নয়, অনেক সময় ঝগড়া, লড়াই, এমনকী আত্মহত্যা কিংবা হত্যার ঘটনাও ঘটে যায় এর জন্য।

সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দেবদীপ রায় চৌধুরী-র মতে, বিশ্বাস হল মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে এমন সবচেয়ে শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলির মধ্যে একটি। এটি আমাদের চিন্তাভাবনা, ভালোবাসা, ভয়, আত্মবিশ্বাস এবং অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। কুসংস্কার এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব থেকে শুরু করে, গভীর ভাবে ধারণ করা ব্যক্তিগত বিশ্বাস পর্যন্ত, মানুষ প্রায়ই অসাধারণ নিশ্চয়তার সঙ্গে সবকিছু বিশ্বাস করে। এমনকী যখন বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ অনুপস্থিত, দুর্বল কিংবা পরস্পরবিরোধী থাকে, তখনও বিচার-বিবেচনা না করেই বিশ্বাস অটুট রাখে।

যেমন, কেউ বিশ্বাস করেন যে, তিনি একজন অসফল মানুষ। কিন্তু সেই ব্যক্তিই আবার অন্যের কথা শুনে নিজেকে সফল ব্যক্তি হিসাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেন। কিন্তু কেন অনেকে নিজের বিচার-বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে কথার সত্য-মিথ্যা যাচাই করে নেন না কিংবা তার সেই ক্ষমতা থাকে না?

বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, বিশ্বাস শব্দটির অনেক আগেই বিচার এবং বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা এসে গেছে সেই আদিম যুগ থেকে। যেমন, ঝোপঝাড়ের মধ্যে থেকে কোনও শব্দ কানে এসে পৌঁছালে কিংবা কোনও অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে, মনে যে ভয়ের সঞ্চার হতো, সেই সময় থেকেই মস্তিষ্ককে কাজে লাগিয়ে বিচার, বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেকে শিকারি কিংবা শত্রুর আক্রমণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা করে নিত আদিম মানুষ।

আসলে, আমাদের মস্তিষ্ক যাচাই করে দেখার চেয়ে বেঁচে থাকার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য বিবর্তিত হয়েছিল। তাই, সমাজ আধুনিক হলেও, আজও কিছু মানুষের মন, মস্তিষ্কে সেই আদিম প্রবৃত্তি থেকে গেছে। মনস্তাত্ত্বিক ভাবে আজও তাই বিশ্বাস মূলত সত্যতা যাচাই করার মধ্যে নয়, বরং ব্যক্তিগত নির্বুদ্ধিতা এবং স্বার্থের মধ্যে থেকে গেছে অনেকের মধ্যে।

আসলে, মানব মস্তিষ্ক বাস্তবতার নিরপেক্ষ রেকর্ডার নয়। এর চেতন এবং অবচেতন দুটি স্তর আছে। তাই কানের মাধ্যমে শব্দ তরঙ্গ মস্তিষ্কে পৌঁছানোর পর মস্তিষ্ক প্রশ্ন করতে থাকে অনবরত এর অর্থ কী? এটি কি নিরাপদ? আমি ইতিমধ্যে যা জানি, তার সঙ্গে এটি কীভাবে খাপ খায়? ইত্যাদি।

আসলে, যখন তথ্য অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ কিংবা আবেগগত ভাবে অভিভূত হয়, তখন মস্তিষ্ক শূন্যস্থান পূরণ করে নেয় নিজের মতো করে। আর তখনই বিশ্বাস বাসা বাঁধে অনায়াসে।

জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে যে, অস্পষ্টতার চেয়ে স্পষ্ট উত্তরের আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি। অনিশ্চয়তা অস্বস্তি, উদ্বেগ এবং নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি তৈরি করে। বিশ্বাস, এমনকী ভুল বিশ্বাসও, সেই অস্বস্তি থেকে মুক্তি দিতে পারে। তাই, বিশ্বাস সত্যতার উপর নির্ভর করে না অনেক সময়।

যেমন— ‘আমি জানি না কেন আমার সম্পর্কগুলি ব্যর্থ হচ্ছে’— এই অনিশ্চয়তার চেয়ে ‘আমি প্রেমের অযোগ্য’ ধরে নেওয়া হয়তো ভালো। কারণ, প্রথম ভাবনায় ব্যর্থতার কারণ না জানার কারণে মানসিক অবসাদে ভুগতে হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় ভাবনায় নিজেকে অযোগ্য ধরে নিয়ে দোষত্রুটিগুলো শুধরে নিতে পারবে। অর্থাৎ, বিষয়টি ‘নেই মামার থেকে কানা মামা ভালো’ হয়ে ওঠে।

যাইহোক, প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করে নেওয়ার প্রধান কারণ অনেক। তবে, মস্তিষ্কের ট্রমা এই প্রক্রিয়াটিকে তীব্র করে তোলে। আঘাতপ্রাপ্ত মস্তিষ্ক হাইপারভিজিল্যান্ট হয়ে ওঠে এবং এমন বিশ্বাস তৈরি করে, যা নির্ভুলতার চেয়ে ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। এই ধরনের ক্ষেত্রে, বিশ্বাস একটি বেঁচে থাকার কৌশল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, বিশ্বাসগুলি প্রায়ই মনস্তাত্ত্বিক নোঙর হিসাবে কাজ করে।

মস্তিষ্কের অনুর্বরতার কারণে, একবার কোনও বিষয়ে বিশ্বাস তৈরি হয়ে গেলে, মন এটি রক্ষা করার জন্য মস্তিষ্কের উপযোগী হয়ে ওঠে। মনের এই পক্ষপাত বিদ্যমান বিশ্বাসকে সমর্থন করে, যা নিজের এবং অন্যের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এই পক্ষপাত স্বয়ংক্রিয় ভাবে এবং অবচেতন ভাবে কাজ করে। এটি সকলকে প্রভাবিত করে, এমনকী প্রশিক্ষিত পেশাদারকেও।

আসলে, সত্যতা যাচাই করার বিষয়টি মনোযোগের উপর নির্ভর করে। কারণ, মনোযোগ সব শব্দের ফিল্টার করে। তারপরই বিশ্বাসগুলি আর বিচার, বিশ্লেষণহীন থাকে না। গ্রহণ এবং বর্জন করে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে।

অনেক বিশ্বাস ব্যক্তিগত ভাবে নয়, বরং সামাজিক ভাবে ধারণ করা হয়। পরিবার, সম্প্রদায়, সংস্কৃতি কিংবা আদর্শের উপরও মস্তিষ্কের উর্বরতা এবং অনুর্বরতার বিষয়টি নির্ভর করে।

ছোটো থেকেই আমাদের পিতামাতা, শিক্ষক, নেতা এবং বিশেষজ্ঞদের উপর বিশ্বাস রাখতে শেখানো হয়। শেখার জন্য এটি প্রয়োজনীয় হলেও, এটি ঝুঁকিও তৈরি করে। কারণ, এক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যা কিংবা ঠিক-ভুল যাচাই করতে শেখানো হয় না। আর সমস্যার সূত্রপাত ঠিক তখন থেকেই হয়।

অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তির কর্তৃত্বও বিশ্বাসকে প্রভাবিত করে। তখন মস্তিষ্ক প্রমাণের পরিবর্তে নিশ্চয়তায় রূপান্তরিত হয়। এক্ষেত্রে তথ্যের চেয়ে ভারী কণ্ঠস্বর, ক্ষমতার দৌরাত্ম্য এবং ভয় জাগিয়ে তোলার কারণে মিথ্যেকে সত্য ধরে নিয়ে হজম করতে হয়।

মনে রাখবেন, বিশ্বাস কেবল পরিবার, সম্প্রদায় কিংবা নেতাদের কাছ থেকে আমরা যা গ্রহণ করি, তা নয়। এটি এমন একটি বিষয়, যা হাজার হাজার বছর আগে থেকেই আমাদের মধ্যে গেঁথে আছে। মানুষ প্যাটার্ন-অনুসন্ধানকারী প্রাণী। আমাদের পূর্বপুরুষদের আধুনিক বিজ্ঞানের অ্যাক্সেস ছিল না। তাই তারা পৃথিবীকে বোঝার জন্য পর্যবেক্ষণ, অন্তর্দৃষ্টি এবং অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করতেন। যদি তারা কালো মেঘ দেখতে পেতেন এবং তারপরে ঝড় আসত, তখন তারা দুটিকে যুক্ত করে পরবর্তী সময় কালো মেঘ দেখলে ঝড় আসতে পারে ধরে নিয়ে সতর্ক থাকতেন। ভেবে দেখুন, সেই আদিমকালেও বিশ্বাস নির্ভরশীল ছিল পর্যবেক্ষণ এবং ঘটনার উপর। আর আজকের এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগে, যেখানে এআই-কে মাধ্যম করে সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য করে দেওয়া অত্যন্ত সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমন জটিল সময়ে তো বিশ্বাসের আগে আরও বেশি সতর্ক হওয়া জরুরি।

অবশ্য এক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন যে, তাহলে কি সবকিছুই সন্দেহের চোখে দেখতে হবে? আজ্ঞে না। বিষয়টি সন্দেহ কিংবা অবিশ্বাসের নয়। বিষয়টি সত্যতা যাচাইয়ের। সমস্যা বিশ্বাস করা নিয়ে নয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন কেউ যুক্তি এবং প্রশ্ন ছাড়াই বিশ্বাস করেন, তখন। তাই, যদি নিজেকে এবং অন্যকে বিপদে ফেলতে না চান, তাহলে বিচারকের মতো কথার সত্যতা যাচাই করে নিন। কোনও কিছু শোনার পর, তা সহজে বিশ্বাস না করে, কানাকানি না করে, সমাজ মাধ্যমে শেয়ার না করে, যুক্তি দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে তারপর বিশ্বাসের সিদ্ধান্ত নিন। কারণ, সব কথা সত্যি না-ও হতে পারে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...