বর্ষার আগমন গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ থেকে অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি নিয়ে আসে। বৃষ্টির জলে ধোয়া রাস্তাঘাট, চারপাশের সতেজ সবুজ প্রকৃতি এবং তাপমাত্রার হ্রাসের বিষয়টি সবাই আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে। তবে বর্ষাকালে সংক্রামক রোগের প্রকোপও উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যায়, বিশেষকরে পরিপাকতন্ত্র বা পাকস্থলী-সংক্রান্ত রোগ এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ। এই সময়ে ডায়রিয়া, ফুড পয়জনিং, ভাইরাল জ্বর, হেপাটাইটিস এবং অন্যান্য জলবাহিত রোগে আক্রান্ত হঅয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। দূষিত জমা জল ব্যাকটেরিয়াজনিত এবং ভাইরাসজনিত অসুস্থতা বৃদ্ধির জন্যেও আদর্শ অবস্থা তৈরি করে এই বর্ষাকালে। লক্ষণগুলোর দ্রুত চিহ্নিতকরণ এবং যথাযথ চিকিৎসা জটিলতা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে দিতে পারে এবং স্বাস্থ্যের গুরুতর অবনতি আটকাতে পারে।
কলকাতা-র সল্টলেক অঞ্চলে অবস্থিত মণিপাল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট জিআই সার্জন (ল্যাপারোস্কোপি ও অনকোসার্জারি) ডা. সঞ্জয় মণ্ডল জানিয়েছেন, ‘বর্ষাকাল একাধিক সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার পক্ষে সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি করে। বর্ষাকালে দূষিত জমা জল, মশার প্রজনন বৃদ্ধি এবং খাবার ও জলের পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখার ফলে, লেপটোস্পাইরোসিস, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল সংক্রমণ আর শ্বাসপ্রশ্বাসের অসুখ বেড়ে যেতে পারে। এই সংক্রমণের ফলে প্রথম দিকে জ্বর, মাথাব্যথা, হাতে-পায়ে ব্যথা এবং ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখা দেয়। আর যদি দেরিতে রোগনির্ণয় হয় অথবা রোগী নিজে নিজে ওষুধ খায়, তাহলে ক্ষতি অনিবার্য। তাই, এই সময় লক্ষণগুলোর দ্রুত চিহ্নিতকরণ এবং সময়োচিত চিকিৎসা, রোগ জটিল হয়ে ওঠা আটকাতে পারে এবং দ্রুত সুস্থতা নিশ্চিত করে।’

বর্ষাকালে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন। কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা অবলম্বন করলেই বর্ষাকালটি সুস্থ ও আনন্দদায়ক ভাবে কাটানো সম্ভব।
বর্ষাকালে পরিপাকতন্ত্র বা অন্ত্র-সংক্রান্ত অসুস্থতা কেন বেশি দেখা যায়? এই প্রশ্নের উত্তরে ডা. সঞ্জয় মণ্ডল জানিয়েছেন, বর্ষাকাল ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং পরজীবীর বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। জলবদ্ধতা, পানীয় জল দূষিত হওয়া, খাবার সঠিক ভাবে সংরক্ষণ না করা এবং বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়া, এসব সংক্রমণ বাড়িয়ে দেয়।
বর্ষাকালে পরিপাকতন্ত্রের যেসব সাধারণ রোগ দেখা যায়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাকিউট গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস, ফুড পয়জনিং (খাদ্যে বিষক্রিয়া), টাইফয়েড জ্বর, কলেরা, হেপাটাইটিস এ ও ই, অ্যামিবিয়াসিস এবং জিয়ার্ডিয়াসিস। এই রোগগুলো সাধারণত দূষিত খাবার ও জলের মাধ্যমে ছড়ায়, তাই খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি।
বর্ষাকালের সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে উপেক্ষিত সংক্রমণগুলোর অন্যতম হল লেপটোস্পাইরোসিস। এটা একটা ব্যাকটেরিয়াল অসুখ, যার কারণ হল লেপটোস্পাইরা প্রজাতি ব্যাকটেরিয়া। বহু মানুষ বুঝতে পারেন না যে, জমা জলের মধ্যে দিয়ে খালি পায়ে বা চপ্পল পরে হাঁটলে, চামড়ায় সামান্য ছড়ে যাওয়া জায়গা থাকলেও সেখান দিয়ে লেপটোস্পাইরা ব্যাকটেরিয়া ঢুকে পড়তে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া ইঁদুর কিংবা ছুঁচো জাতীয় প্রাণির মূত্র থেকে বেরিয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এই কারণে বৃষ্টির জমা জলের মধ্যে দিয়ে খালি পায়ে না হাঁটা উচিত। ওয়াটারপ্রুফ জুতো এবং সুরক্ষামূলক গ্লাভস পরা উচিত এই সময়। সেইসঙ্গে, বাড়ির বাইরে পা রাখার আগে কাটা জায়গা ও ঘষা খাওয়া জায়গাগুলোকে আবৃত করা দরকার আর যথাযথ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি।
বর্ষাকালের প্রথম বৃষ্টি ঈডিস ঈজিপ্সি মশার প্রজনন চক্রও আরম্ভ করে। বদ্ধ পরিষ্কার জল জমে থাকে ফুলের টবে, নির্মাণ কেন্দ্রে এবং ফেলে দেওয়া পাত্রে। যেখানে মশার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে, ফলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঘটনা বাড়ে।
ভারি বৃষ্টিতে পুরনো নিকাশি নালাগুলোও উপচে পড়তে পারে, ফলে পানীয় জল দূষিত হয়ে যেতে পারে এবং রাস্তার খাবারের পরিচ্ছন্নতা নষ্ট হতে পারে। এর ফলে টাইফয়েড, জ্বর, কলেরা, প্রবল গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস এবং ব্যাকটেরিয়াল আমাশয়ের মতো রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বর্ষাকালের শুরুতে রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। প্রিয় ফুচকার মতো জলভিত্তিক রাস্তার খাবার এবং রাস্তার বিক্রেতাদের থেকে কাঁচা ফ্রুট-স্যালাড খাওয়া এই সময়ে কিছুদিন বন্ধ রাখাই ভালো। আবহাওয়া ঠান্ডা এবং স্যাঁতসেতে হয়ে যাওয়ায়, শ্বাসপ্রশ্বাসের সংক্রমণও বেড়ে যায়। এই জাতীয় সংক্রমণের মধ্যে আছে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অসুখ এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত শ্বাসপ্রশ্বাসের সংক্রমণ।
বহু বর্ষাকালজনিত অসুখ প্রাথমিক ভাবে একইরকম লক্ষণ নিয়ে দেখা দেয়। যেমন জ্বর, গায়ে ব্যথা এবং ক্লান্তি। তবে নিজে নিজে ওষুধ খেলে এবং চিকিৎসার খোঁজ করতে দেরি করলে অসুখ জটিল হয়ে উঠতে পারে। লাগাতার জ্বর, ব্যাপক দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, জন্ডিস, রক্তক্ষরণের প্রবণতা অথবা ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বর্ষাকালে যা যা করণীয়
✔ নিরাপদ ও বিশুদ্ধ জল পান করুন
✔ সদ্য রান্না করা গরম খাবার খান
✔ ফল ও শাকসবজি ভালো ভাবে ধুয়ে নিন
✔ হাত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন
✔ খাবার ঢেকে রাখুন
✔ শরীরচর্চা করুন
✔ পরিষ্কার ও শুকনো পোশাক পরুন
✔ উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
✔ মশার বংশবিস্তার রোধ করতে বাড়ির আশেপাশে জমে থাকা জল অপসারণ করুন।
বর্ষাকালে যা যা করবেন না (বর্জনীয়):
- খোলা বা ঢেকে না রাখা রাস্তার অস্বাস্থ্যকর খাবার খাবেন না
- বিশুদ্ধ জল ছাড়া পান করবেন না
- বাসি বা সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি এমন খাবার খাবেন না
- দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া বা জ্বরকে অবহেলা করবেন না
- জলাবদ্ধ এলাকায় খালি পায়ে হাঁটবেন না
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করবেন না
- খাবার মাছি ও পোকামাকড়ের সংস্পর্শে বা খোলা অবস্থায় রাখবেন না
- ফুলের টব, এয়ারকুলার কিংবা পাত্রে জল জমতে দেবেন না
- খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার বিষয়টি বাদ দেবেন না
বর্ষাকালে পেটের যেসব সংক্রমণ বা রোগ সচরাচর দেখা যায়, তার অধিকাংশই সাধারণ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমন— নিরাপদ জল পান করা, সদ্য রান্না করা খাবার খাওয়া, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। আর মনে রাখবেন, রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করা অনেক ভালো। সচেতনতার সঙ্গে কিছু অভ্যাস মেনে চললে, ব্যক্তি ও পরিবারকে অনাকাঙ্ক্ষিত অসুস্থতা থেকে রক্ষা করা যায় এবং সুস্থ থেকে বর্ষাকালের সৌন্দর্য ও আমেজ উপভোগ করা যায়।





