—ঠিক ধরেছি। জ্যোতিষার্ণব বলে ওঠেন, ওর পিছনে শনি-মঙ্গল একসঙ্গে লেগে আছে। কোথাও স্থিতি হবে না। শুনুন, প্রতি শনি আর মঙ্গলবার সকালে আপনার ছোটো মেয়ে মোহনা ঠিক এই ঘরে বসে জল খাবার খেয়ে শেষপাতে যা থাকবে, সে একমুঠো মুড়িই হোক বা পাঁউরুটির কামড়ানো টুকরো— ওই আপনার ভাসুরের ছাদে ছুঁড়ে দেবে। কাক-শালিখ যেন খায়! দেখবেন এক বছরের মধ্যে আপনার মেয়ের বিয়ের যোগ আসবে।
সত্যিই এক বছরের মধ্যে মোহনার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটল। সৌরভ তার দুই বন্ধুকে নিয়ে দেখে যাওয়ার পর তার বাবা-মা, দাদা- বউদিরা এসে তাকে দেখে পছন্দ করে গেলেন। বাড়িতে খুশির বান ডাকল। মালবিকা ছুটলেন জ্যোতিষার্ণবের বাড়ি। জ্যোতিষার্ণব রামধনকে করজোড়ে প্রণাম জানিয়ে মালবিকা বললেন, ‘সবই আপনার জন্য হল বাবা।’
রামধন মুচকি হেসে বললেন, ‘কিছুই এখনও হয়নি। বিয়ের দিন-ক্ষণ আমিই ঠিক করে দেব। ভুলে যাবেন না— আপনার মেয়ের বৈধব্য যোগ আছে।’
—তাহলে কী হবে বাবা! বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন মালবিকা।
রামধন তাঁকে আশ্বস্ত করে বলে ওঠেন, ‘আপনার মেয়ের বিয়ে আর পাঁচটা বিয়ের মতো হবে না। আসল বিয়ের আগে আর একটা বিয়ে হবে। সেখানে আমরা বিশ্বস্ত কয়েকজনই থাকব আর কেউ থাকবে না। যেমনটি বলব তেমনটিই করবেন। অন্যথা হলে আমার উপর কোনও দায় চাপাতে পারবেন না।’
বিয়ের দিন মালবিকা সবাইকে তাঁর ভাসুরের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে ব্যস্ত রাখলেন। বরানুগমন থেকে খাওয়া-দাওয়া সবকিছু সেখানে হতে লাগল। মালবিকার দোতলার ঘরে জানলা বন্ধ করে প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রথম বিয়ের আয়োজন সম্পূর্ণ হল।
যথা সময়ে মালবিকার খুবই বিশ্বস্ত মামাতো দেওর টাবু ব্যাগে ভরে তাকে নিয়ে এল। ব্যাগ খুলতেই খয়েরি-সাদা রঙের মিশেলে একটি পাতিহাঁস ‘প্যাঁক প্যাঁক’ করে বেরিয়ে এল।
রামধনের নির্দেশে পুরোহিত মোহনা-র হাতে একটি রজনীগন্ধার মালা তুলে দিয়ে, মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে, ওই হাঁসের গলায় মালাটা পরিয়ে দিতে বললেন। মালা পরানোর পর সেটিকে ছাদে নিয়ে গিয়ে কেটে ফেলার নির্দেশ দিলেন রামধন।
টাবু হাঁসটিকে ছাদে নিয়ে গিয়ে কেটে ছাড়িয়ে ফেলল। রক্ত-মাংস পালকের চিহ্নমাত্র রইল না। তারপরই বাড়িতে আবার আলো জ্বলে উঠল। এতক্ষণ যে-বাড়ি ছিল নীরব, জনশূন্য— সেই বাড়িই কোলাহলে মুখর হয়ে উঠল। ধুমধাম করে সৌরভের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল মোহনার।
মালবিকা প্রলয়ের জন্ম তারিখ লিখে দিয়ে রামধনের কাছে তার ভবিষ্যৎ জানতে চেয়েছিলেন। আসলে প্রলয়ের উচ্চাকাঙ্খা, জ্ঞানতৃষ্ণা সর্বোপরি ভালো রেজাল্ট তাঁর মনে ঈর্ষার সৃষ্টি করেছিল। তার তিন ছেলেমেয়ের কেউই তার সমকক্ষ হওয়া দূরে থাক, কাছাকাছিও যেতে পারেনি। প্রলয়ের সমবয়সি তার প্রথম পুত্রসন্তান মাত্র একমাস বয়সে অজানা জ্বরে মারা গিয়েছিল। তাই প্রলয়কে দেখলেই তার সেই সন্তানের কথা মনে পড়ে যায়। তখন ঈর্ষায় সে অন্ধ হয়ে যায়।
রামধন সেই জন্মতারিখ আর সময় যাচাই করে বলেছিলেন, ‘এই জাতক যতই ভালো হোক, কোনওদিনই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না। হতাশায় অবসাদে কখন কী করে বসে তার ঠিক নেই।’
অথচ মোহনার বিয়ের মাস তিন-চার পরেই প্রলয় এসএসসি দিয়ে স্কুলের সার্ভিস পেয়ে গেল। নামী স্কুলের শিক্ষক পদে যোগ দিতেই ফোনে সব জানিয়ে মালবিকা রামধনকে প্রশ্ন করে বসলেন, ‘প্রতিষ্ঠিত হতে বাকি আর কী রইল!’
রামধন বললেন, “গ্রহরাজ শনি তো ওকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছেন, তবে ছাড়ার সময় আবার তিনি পূর্ণ করে দিয়ে যান। গ্রহ সদয় হলে আমার আর কী করার আছে বলুন!’
মোহনার বিয়ে যেমন মালবিকা আর তাঁর ভাসুরের বাড়ি— দুই বাড়ি মিলিয়ে হয়েছিল, প্রলয়ের বিয়েও হল তেমনই দু’বাড়ি নিয়ে। তার বাড়ির বাইরের বড়ো ঘরখানায় প্রলয়ের নববিবাহিতা কনে সেজেগুজে বসল। মালবিকার তো হাড়পিত্তি জ্বলে যাবার উপক্রম। সম্পর্কে জ্ঞাতি এক দেওরকে ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহার করে বিয়ে ভাঙার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি তিনি। মোহনা বলেছিল, ‘মা এমনটা করা উচিত নয়। নিজের ভালোটা যেমন দেখব, অন্যেরটাও তো…’
মালবিকা ধমক দিলেন, “থাম। আমার কাজটা আমায় করতে দে!’
সেদিন শরীর খারাপের যে দুর্দান্ত নাটকটি করেছিলেন তিনি, তার কথা ভাবলে আজও মোহনা লজ্জা পায়।
হাজার চিন্তা করতে করতে কখন যে মোহনা ঘুমিয়ে পড়েছিল জানতেই পারেনি। কলিংবেলের মিষ্টিসুরে তার ঘুম ভেঙে গেল। দরজা খুলে দেখল শুভম আর সৌরভ এসে গেছে মিষ্টি আর আইসক্রিম নিয়ে। শুভম বলল, “মামার ফোন এসেছিল— আসবে না, দিদার কাছে থাকবে। তবে মামিমা আর রূপম আসছে। মামার খাবারটা নাহয় ওদের হাত দিয়েই পাঠিয়ে দিও।’
মোহনা হেসে বলল, “ম্যানেজমেন্টে ওস্তাদ হয়ে উঠেছিস যে! যা মিষ্টি-আইসক্রিম ফ্রিজে নিয়ে গিয়ে রাখ। আমি বরং ফ্রেশ হয়ে আসি।’
মালবিকার হাই-প্রেশার আবার হাই-সুগার তার উপর সিভিয়ার টাইপ জন্ডিস। ডাক্তার বলেছেন, ‘কমপ্লিট বেডরেস্ট।’ মল্লার তাই রাতে মায়ের কাছেই শোয়। একা রেখে আসা রিস্ক, তাই দিব্যা আর রূপম এসেছে। যে-বিমা কোম্পানির সঙ্গে মোহনা যুক্ত, সেখানের তিন সহকর্মী বান্ধবীও এসে গেছে। রাত আটটা বাজতেই ওই পাঁচজনকে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে দিল সৌরভ। সার্ভ করতে লাগল মৌলি আর জোগান দিতে লাগল মোহনা।
প্রথমে স্যালাড আর ফিসফ্রাই। তারপর বাসন্তী পোলাও সার্ভ করার আগে মৌলি বলে ওঠে, ‘মোনা যা, কিচেন থেকে মাটন-কারিটা নিয়ে আয়!’
মাটন-কারি আনতে গিয়ে ডেকচির ঢাকনা খুলতেই চমকে ওঠে মোহনা। ডেকচির ভিতর সেই খয়েরি-সাদা মিশেলের হাঁসটা প্যাঁক প্যাঁক করছে! কী বলছে ওটা! মোহনা যেন শুনতে পায় তার কথা— “বেশ তো তুমি! আমায় মালা পরিয়ে বিয়ে করে, কেটে ছাড়িয়ে ফেললে! পারলে বলো! তোমরা মানুষরা বড্ড নৃশংস! নিজেদের স্বার্থে সব কিছু করতে পারো তোমরা! কেমন কাটিয়ে দিলে কুড়িটা বছর! খুব নিষ্ঠুর…’
মোহনার আসতে দেরি হচ্ছে দেখে মৌলি রান্নাঘরে এসে দেখল— ডেকচির ঢাকনা, হাতা মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে আর মাটন-কারির ডেকচির দিকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছে মোহনা।
মৌলি তাকে সামান্য ঠেলা দিয়ে বলল, ‘ডেকচির মধ্যে কী দেখছিস রে!’
বিস্ময়াবিষ্ট গলায় মোহনা বলল, ‘দ্যাখ না, সেই হাঁসটা…!’





