বিকালের উজ্জ্বল রোদ্দুর তখন ক্রমশ ম্লান, ধূসর রঙের প্রলেপ বুলিয়ে নামবে সন্ধ্যা। বিশ বছর আগের এমনই এক গোধূলিবেলার কথা স্মরণ করে ডাইনিংরুমের সোফায় নিজের শরীরটাকে মেলে দিল মোহনা। মাথার উপর বনবন করে ঘুরছে সিলিং ফ্যান, ঠান্ডা হাওয়ায় মুহূর্তে জুড়িয়ে গেল তার ঘর্মাক্ত শরীর।

আগস্ট মাসের তৃতীয় রবিবার। মোহনার একুশতম বিবাহ-বার্ষিকীর দিনটিও পড়েছে সেদিন। তাই সকাল থেকেই ব্যস্ত মোহনা। দুপুরে ভাত, মাছের কালিয়া আর আগের দিনের আমের চাটনি দিয়ে লাঞ্চটা সেরে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে নেমে পড়েছে রাতে পনেরোজনের খাবার তৈরিতে। দুপুর তিনটে বাজার পরেই এসে গেল তার দিদি মৌলি, আনারস কেটে-কুটে বসিয়ে দিল চাটনি।

মোহনার রান্নাঘরে আমিষ-নিরামিষের আলাদা ব্যবস্থা। একটা সিঙ্গেল ওভেন-এ নিরামিষ পদ রান্না হয়। মৌলি সেটাতেই বানিয়ে ফেলল আনারসের চাটনি। মোহনার বাড়ির কাছেই ডক্টর ধর-এর চেম্বার, মেডিসিন-এ এমডি তিনি। মাস দুই-তিন অন্তর মৌলি তাঁর কাছে চেক-আপ করিয়ে নেয়। তাঁর দেওয়া খাদ্য তালিকা আর ওষুধের মহিমায় মৌলির সুগার-প্রেশার আর কোলেস্টেরল নির্দিষ্ট সীমাতেই বিরাজমান।

আনারসের চাটনি নামিয়ে ডেকচিতে ঢেলে ঠান্ডা করার জন্য সেটা খুলে রাখল মৌলি। এরপর সে ওই ওভেনেই বাসন্তী পোলাও- এর সরঞ্জাম সাজাতে শুরু করল। ততক্ষণে মোহনার ওভেন থেকে সুস্বাদু মাটন কারির সুগন্ধ বের হতে শুরু করেছে। বিবাহ-বার্ষিকীর মেনু-র মধ্যে রয়েছে— বাসন্তী পোলাও, ফিস ফ্রাই, মাটন কারি, আনারসের চাটনি, রসগোল্লা আর আইসক্রিম। মাংসের ডেকচি নামিয়ে তার উপর ঢাকনা চাপা দিল মোহনা, তারপর ভেটকির ফিলেগুলোতে মশলা মাখিয়ে ফ্রাই তৈরির জন্য রেডি করতে লাগল।

বাসন্তী পোলাও রেডি হতে ছ’টা বেজে গেল। মৌলি বলল, ‘পোলাও রেডি রে মোনা! এই ফাঁকে ডক্টর ধর-কে দেখিয়ে আসি। নাম তো লেখানোই আছে, খুব জোর হলে মিনিট চল্লিশ লাগবে।’ এর মধ্যেই শুভম আর সৌরভ মিষ্টি আর আইসক্রিম নিয়ে চলে আসবে। তুই ততক্ষণ একটু রেস্ট নিতে পারিস তো!

শুভম মোহনার একমাত্র ছেলে বিএসসি ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। সৌরভ তার স্বামী, নামী সংস্থায় কর্মরত— চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট। যে জীবনটা ছিল সংশয়ের মধ্যে কাটানোর তীব্র যন্ত্রণায়, আজ সেটাই এসে পৌঁছেছে মাধুর্যভরা নিশ্চয়তায়। ঘর-বাড়ি সাজানোয় যেমন সে সিদ্ধহস্ত, তেমনই গড়ে তুলেছে নিজের ভবিষ্যৎ। যে-ভয়ে মোহনা কলেজ-লাইফ শেষ করার পর থেকেই কুঁকড়ে থেকেছে প্রতিপলে, বিয়ের পর নতুন সংসারে মানিয়ে নেওয়ার পর থেকেই নিজেকে তৈরি করেছে একটু একটু করে। এখন সত্যি-সত্যিই যদি দুর্ভাগ্যের দিন এসে পড়ে, সামাল দেওয়ার মতো মানসিক দৃঢ়তা অর্জন করেছে সে।

মৌলি-র মুখ সুন্দর কিন্তু সে ঘোর কৃষ্ণবর্ণা। তাই তার বাবার চিন্তা ছিল তার বিয়ের ব্যাপারে। সময় যখন এল, দেখা গেল মৌলির বর-ই হল সুপুরুষ, নামটাই একটু সেকেলে— ‘হরিনাথ’। মোহনারা তিন ভাইবোন— মৌলি, মল্লার আর মোহনা। মৌলির বিয়ের পর মল্লার তার বাবার অফিসে জয়েন করল। কারণ, তার বাবা তখন মেডিক্যালি আনফিট হয়ে গেলেন। অপরদিকে মোহনা ভর্তি হল কলেজে। ঠিক সেই সুখের মুহূর্তে তাদের বাবা মাল্টি-অর্গান ফেলিওর হয়ে প্রয়াত হলেন। সেই থেকেই মোহনার জীবনে আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়ে আসতে শুরু করল।

মোহনার কলেজ-লাইফ তখন শেষের পথে। তাদের মা মালবিকা, বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্রের খোঁজে ঘটক লাগিয়ে দিলেন। ঘটকের দৌলতে দু-তিনজন পাত্র বন্ধুদের নিয়ে দেখে গেলেও খবর এল ‘কেস ক্যানসেল’।

অনেক খোঁজাখুঁজি করে মালবিকা এক জ্যোতিষীর সন্ধান পেলেন। জ্যোতিষার্ণব রামধন রায় দশটা-পাঁচটা অফিস করেন, তারপর সন্ধ্যায় পার্ট-টাইম জ্যোতিষ চর্চা করেন, তবে নামডাক আছে বেশ। এক রবিবার বেশ একটু মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি এলেন। মোহনাদের বাড়িতে। দোতলার ঘরে মোহনাকে বসিয়ে তার জন্মছক তৈরি করে ঘণ্টাখানেক পরে নিদান দিলেন, “শুনুন মা, আপনার মেয়ে মাঙ্গলিক। সপ্তমে মঙ্গল বাধা-র সৃষ্টি করছে। এসব কাটাতে সময় লাগবে। খরচও হবে একটু বেশি।’

মালবিকা হাতজোড় করে বললেন, “দেখুন ঠাকুর, আপনিই আমার বল-ভরসা! ওরা পিতৃহারা। আমার মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা আপনাকেই করে দিতে হবে বাবা!”

জ্যোতিষার্ণব রামধন দোতলার জানলার সামনে এসে দাঁড়ালেন। পাশের বাড়ির একতলার ছাদটি জানলা থেকে ফুট তিনেক দূরে। সেই ছাদে আনমনা এক যুবক বিকালের আলোয় পায়চারি করছিল। মিনিট তিনেক তাকে নিরীক্ষণ করে রামধন বলে উঠলেন, ‘এই ছেলেটি কে? কী কাজ করে?”

মালবিকা চটজলদি উত্তর দিলেন, ‘আর বলবেন না, ও হল আমার ভাসুরের ছেলে প্রলয়। কী সব পাশ-টাশ করে ঘরেই বসে আছে। মাঝে মাঝেই শুনি চাকরি পেয়েছে, অফিসে বেশ যাওয়া-আসা করে। তারপর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই চাকরি খতম! আবার সেই বাড়িতে বসা। মনে হয় সব ভুয়ো ডিগ্রি, তাই চাকরি টেকে না।’

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...