এইরকম কথা সাধারণত অদ্রিজা বলে না। আবির একটু সরে এল। চেয়ারে বসল শান্ত হয়ে। অদ্রিজা পা দুটো ভাঁজ করে সোজা করে রেখেছে। সেখানে থুতনিটা স্পর্শ করে অপলক তাকিয়ে আছে আবিরের দিকে। আবার বলল— তুই আমাকে কেন এত ভালোবাসিস?

—কেন, তোর ভালো লাগে না?

—শুধু ভালোবাসলে আমি যে সহ্য করতে পারি না।

—মানে? আবির একটু অবাক হয়।

—আমি আশা করব আমার প্রেমিক আমাকে শাসন করবে, ভুলটাকে ধরিয়ে দেবে।

আবির বুঝল অদ্রিজার সেই এক কথা। শুধু শাসনের কথা।

তারপর বলল— অনিমেষ তোকে শাসন করে?

অনিমেষের ব্যাপারটা যে আবির জেনে গেছে সেটা আগে বুঝতে পারেনি অদ্রিজা।

বেশ যেন উৎসাহিত হয়ে সে বলল— তুই জানতিস?

আবির মাথা নাড়ল। সঙ্গে দীর্ঘশ্বাস।

বলল— সে কি আমার থেকে বেশি ভালোবাসে তোকে?

–তা মনে হয় না। কিন্তু ভালো যেমন বাসে, তেমন শাসনও করে।

—আমাকে আগে বলিসনি কেন?

অদ্রিজা যেন অস্থির হয়ে উঠল। কেমন যেন কাঁচুমাচু করে বলল— কী করে বলব বল? তুই কীভাবে রি-অ্যাক্ট করবি, বুঝতে পারিনি রে!

—কতদিন থেকে এসব চলছে?

—মাসখানেক। বিশ্বাস কর অনেক ভেবেছি আমি, কিন্তু মনে হল অনিমেষকেই আমি চাই। ওর ডোন্ট কেয়ার ভাবটা আমার ভালো লাগে। তুই আমাকে ভুল ভাবিস না, প্লিজ প্লিজ।

অদ্রিজার আকুতি যেন চলতেই থাকে।

আবির কী করবে? সে কি অদ্রিজাকে ছেড়ে দেবে। সিনেমার মতো বলবে, যা তোকে ছেড়ে দিলাম। তুই এখন উড়তে পারিস। যে কোনও বাসায় মাথা গুঁজতে পারিস। আবিরের পক্ষে তা কি বলা সম্ভব? আর একবার যেন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল আবির। —কিন্তু অনিমেষ তো প্লেবয় টাইপের। ওর তো অনেক রিলেশন।

—না রে, এখন আমাকে ছাড়া আর কাউকে ভাবে না।

—ও তো ড্রিংক করলে পুরো মাতাল হয়ে যায়। সামলাতে পারবি? যদি হাত তোলে? অদ্রিজার কাছে এসব কথার যেন কোনও মানে নেই। শুধু তার মন জুড়ে রয়েছে অনিমেষ। আবির অদ্রিজার হাত ধরে কী একটা বলতে যাচ্ছিল। পারল না।

অদ্রিজা আবার বলল— আমাকে ভুলে যাবি তো বল? আমি অনিমেষকে ছাড়া বাঁচব না।

আবির যেন আরও অবাক হয়ে যাচ্ছে। যে মেয়ে কয়েকদিন আগেও তাকে ছাড়া চলতে পারত না, তাকে দু’চোখে হারাত, সে-ই কিনা অন্য একজনকে পেয়ে তাকে ভুলে গেল! মানুষ এত নিষ্ঠুর হয়! কী করে এসব কথা বলছে অদ্রিজা?

আবিরের একবার মনে হয়েছিল অদ্রিজার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাকে জড়িয়ে ধরে সারা শরীর জুড়ে চুম্বন করবে। ছাড়বে না, যতক্ষণ না সে সব কিছু ভুলে যায়, তাকে সে ছাড়বে না। পরক্ষণে মনে হল, জোর করে কি কিছু হয়? অদ্রিজা যদি তার মন থেকে আবিরকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, আবিরের সাধ্য নেই সেই মনে আবার নতুন ভাবে জায়গা করে নেওয়ার।

আবির উঠে দাঁড়াল। বলল— চল তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে। আর হয়তো আমাদের দেখা হবে না। ভালো থাকিস।

এটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই আবিরের বুকটা কেমন যেন হালকা হয়ে গেল। মনটাকে ভীষণ শক্ত করে তবেই প্রতিটি শব্দ সে উচ্চারণ করতে পারল।

অদ্রিজা কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। সে তো এখন মুক্ত। যা চেয়েছিল তাই হল। সে তো জিতেই গেল। তার তো আনন্দ পাওয়ার কথা। সে তো এখন মুক্ত বিহঙ্গ। অনিমেষের সঙ্গে আরও গভীর হতে তার আর পিছুটান থাকল না। কিন্তু সত্যি কি সে খুশি হয়েছে?

অদ্রিজা কিছু না বলে, আবিরের পিছন পিছন মেসের বাইরে বেরিয়ে এল। অটোতে তুলে দিল আবির। হাত নাড়ল সে। অদ্রিজাও অটো থেকে মুখটা বাড়িয়ে হাত নাড়ল আলতো করে।

বিরতির পর অনিমেষের বাড়ি। অদ্রিজা ব্যালকনির ফুলগাছগুলোতে জল দিচ্ছিল। কয়েকটা ফুল গাছে হলুদ পাতা ধরায় বেশ চিন্তিত সে। অনিমেষের বাড়ি ফিরতে সাধারণত রাত হয়ে যায়। কিন্তু আজ কথা দিয়েছে তাড়াতাড়ি ফিরবে। একটা বিয়েবাড়ির নিমন্ত্রণ আছে। অঞ্জলি কাকিমার মেয়ের বিয়ে। অদ্রিজাদের প্রতিবেশী। দু’জনকে খুব করে যেতে বলে গেছেন। না গেলে খারাপ দেখাবে।

একা একা যেতে ভালো লাগে না অদ্রিজার। অনিমেষ এলে একসঙ্গে বেরোবার প্ল্যান আছে। কিন্তু এরকম ক্ষেত্রে সে অনেকবার ডুবিয়েছে। অদ্রিজা হয়তো সেজেগুজে বসে আছে, তারপর দেখল অনিমেষ এল বেশ রাত করে। তাই অফিসে যাওয়ার আগে একেবারে ‘দিব্যি’ করিয়ে নিয়েছে আজ। অদ্রিজা ব্যালকনির দরজাটা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে ঘড়ির দিকে তাকাল। প্রায় সাড়ে চারটে বেজে গেছে। অনিমেষকে বলেছে অন্তত সাড়ে পাঁচটার মধ্যে ফিরতে। এইসময় আর একবার মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। ফোন করল। প্রথমে ধরল না। ফোন না ধরলে খুব রাগ হয় অদ্রিজার। এত ব্যস্ততা কীসের যে, বউয়ের ফোন ধরতে পারে না!

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...