এক সময় কাজ সেরে পুনরায় নিজের পরিত্যক্ত বিছানায় এসে বসেন। ক্রমাগত টানের শব্দে নিজেই বিরক্তি বোধ করছিলেন। তিনি হাঁপাতে থাকেন নিস্তব্ধ নিশীথের অন্ধকারে। সেদিন বোধহয় কষ্ট বেশি হচ্ছিল। মেয়ের সঙ্গে অন্য বিছানায় শুয়ে থেকেও স্ত্রী হয়ে স্বামীর কষ্টটা তিনি দূর থেকে উপলব্ধি করতে পারছিলেন। ক্রাচটা সঙ্গে নিয়ে তিনি কাছে এগিয়ে আসেন। পাশে বসে পিঠে হাত বোলাতে থাকেন।

রায়বাবু প্রশ্ন করেন— তুমি ঘুমোওনি?

—কী করে ঘুমোই বলো? তুমি হাঁপাচ্ছ আর আমাকে ঘুমোবার কথা বলছ? স্ত্রী নিজের মনের কথা ব্যক্ত করেন।

রায়বাবু শান্ত ধীর স্থির কণ্ঠে জবাবদিহি করেন— আমার কষ্ট আমার সঙ্গে যাবে, ও নিয়ে ভেবে লাভ নেই। রাত অনেক হয়েছে। যাও, গিয়ে শুয়ে পড়ো।

স্বামীর নীরবতা তাকে অনেকদিন ধরেই পীড়া দিচ্ছিল। সরমাদেবীর মনে হয়েছিল, এই মুহূর্তে মুখোমুখি বসে মনের কথা না জানতে পারলে, এমন সুবর্ণ সুযোগ হয়তো জীবনে আর কখনওই পাওয়া যাবে না। ভূমিকা ছাড়াই তিনি সটান প্রশ্ন করেন— আচ্ছা, সত্যি করে বলো তো, তুমি কী ভাবো সব সময়? তুমি কারও সঙ্গেই আজকাল কথা বলো না, কারওর খোঁজখবর নাও না! তোমার কী হয়েছে একবার বলবে?

—এই বয়সে নতুন করে ভাবার কিছুই নেই। ভাবি শুধু নিজের কথা। আমার অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছ। পাখির মতো উড়ে যেতে এক মুহূর্ত সময় লাগবে না। সংসারটা তখন চলবে কী করে সেটাই ভাবি। তোমরা যে খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে বানের জলে।

সরমাদেবী সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেন— ভেবে ভেবে শরীরটা নষ্ট করার কী প্রয়োজন? অবস্থার পরিবর্তন করতে পারবে তুমি? মেয়ে দুটো বিয়ের পর থেকে একদিনের জন্যেও বাপের বাড়ি এসে রাত্রিবাস করতে পারল না। তুমিও যে গিয়ে দু’দিন থেকে আসবে, তারও উপায় নেই। আমরা এক অভিশপ্ত পরিবার! এর চেয়ে নরকযন্ত্রণাও শ্রেয়।

—সবই আমাদের অদৃষ্ট। এতে তোমার আমার কারওর হাত নেই। সরমাদেবী একটু থেমে বলেন, তোমার অবর্তমানে আমাদের কী করে দিন কাটবে সেটা ভগবানের দায়। তা নিয়ে আমরা ভাবতে বসব কেন? পরে কী হবে, না হবে সেটা এখনই ভেবে লাভ কী? যা হওয়ার হবে।

—জানো, এই নরকযন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একটাইমাত্র উপায় আছে। বিগত কয়েকদিন যাবৎ মনের মধ্যে কথাটা ঘোরাফেরা করছে। তোমাকে বলার জন্য আমি মানসিক ভাবে নিজেকে তৈরি করছিলাম।

—কী এমন কথা যে, আমাকে বলতে এত সংকোচবোধ করছ? সরমাদেবী জানতে চান স্বামীর মনের কথা।

—কথাটা তুমি সহজ ভাবে গ্রহণ করতে পারবে কি? জানি সেই কথা মনে স্থান দেওয়াও পাপ। সবই তোমাদের কথা চিন্তা করে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। গোপালবাবুর ছেলের ওষুধের দোকানে কাজ করার সুবাদে অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। —কী জেনেছ শুনি? স্ত্রী জানতে চান।

—বিশেষ তিনটি ওষুধের নাম ও তার কার্যকারিতা সম্পর্কে আমি জানতে পেরেছি। প্রথমটি হল— – অনুভূতিনাশক পদার্থ, যার নাম সোডিয়াম থিওপেন্টন। দ্বিতীয়টি হল শ্বাসরোধক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি রাসায়নিক পদার্থ, যার নাম প্যানকিউরোনিয়াম ব্রোমাইড আর তৃতীয়টি হল হৃদস্পন্দন স্তব্ধ করার একটি রাসায়নিক পদার্থ, যার নাম পটাসিয়াম ক্লোরাইড। এর মধ্যে তৃতীয় ওষুধটা আমি ঘরে এনে রেখেছি।

সরমাদেবী আঁতকে উঠে প্রশ্ন করেন— কী বলতে চাও তুমি? স্পষ্ট করে বলো।

—আমাকে ভুল বুঝো না। অনেক শোক-তাপ-দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার পরে এই চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি, তোমার সাহায্য চাই। চাই তোমার সন্মতি। বহুদিন ধরেই ভাবছিলাম তোমাকে বলব কথাটা। কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না। আজ তুমি আমার মনের কথাটা জানতে চাইছ, তাই অকপটে বলতে হচ্ছে তোমাকে।

—তুমি যে কী বলতে চাও, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। সরমাদেবী স্পষ্ট ভাষায় জানতে চান।

—তোমাকে কিছুই করতে হবে না। শুধু প্রয়োগ করতে হবে। তুমি পারবে না আমার কষ্টের কথা ভেবে?

—কার উপর প্রয়োগ করার কথা বলছ? তুমি চলে গেলে আমরা বাঁচব কীভাবে? ভেবে দেখেছ?

—সেই ভাবনা আমার আছে, তোমার চেয়েও বেশি। আমি আমার কথা ভেবে বলছি না। সমস্ত পরিবারের কথা ভেবেই বলছি। পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ উপভোগ করার ক্ষমতা থেকে যে চিরতরে বঞ্চিত হয়ে গিয়েছেন, তার জীবন-মৃত্যু দুই সমান। তোমার মায়ের উপর প্রয়োগ করার কথা বলছি। তাকে মুক্তি দাও। আমি আর পেরে উঠছি না। এতদিন তো করলাম। এখন শরীর আর চলছে না। এইভাবে চললে আমি খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাব। সরমা, আর ক’টা দিন আমাকে বাঁচতে দাও।

কিছুক্ষণের নীরবতা। সময় এগিয়ে চলে নিজের খেয়ালে। এক সময় কী মনে করে স্ত্রী সরমা বলে ওঠেন— দাঁড়াও, আমাকে একটু ভাবতে সময় দাও। অবিরাম ধারায় বৃষ্টি পড়ছিল। তারই ফাঁকে বজ্রপাতসহ বিদ্যুতের চমক। মনে হচ্ছিল সব যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে সেই রাতেই। স্বামী-স্ত্রীর চোখে ঘুম নেই। মনের অভ্যন্তরে শুধুই চিন্তারাশির উত্তাল, উদ্দাম পাড়ে আছড়ে পড়া ঢেউ। এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে, জীবনে কখনও ভাবেননি। অন্যায় আর পাপবোধে মন-প্রাণ বিকল হয়ে পড়ছিল। যুক্তি-তর্কের সাহায্যে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। প্রাণহীন পাথরের মতো জড়বৎ হয়ে বসে ভাবছিলেন— মানুষের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। তাছাড়া গীতায় আছে, কেউ কাউকে হনন করতে পারে না। তিনি শুধু উপলক্ষ্য হয়ে থাকবেন চিরদিনের জন্যে এইটুকুই যা। আপাতত স্বামীকে বাঁচানোর একটাই মাত্র পথ খোলা। স্বামীর কথায় তিনি না করতে পারবেন না। এক সময় নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বলে ওঠেন— কোথায় সেই ওষুধ? দাও আমাকে। রাতের অন্ধকারে তুমি আমি ছাড়া এই কথা পৃথিবীতে আর কেউ জানতেও পারবে না।

রায়বাবু যন্ত্রচালিত পুত্তুলিকাবৎ উঠে গিয়ে ওষুধের শিশিটা নির্দ্বিধায় স্ত্রীর হাতে তুলে দেন। কালবিলম্ব না করে সরমাদেবী ক্রাচ হাতে বৃদ্ধা মায়ের শোওয়ার ঘরের দিকে এগিয়ে যান। বিদ্যুৎ না থাকায় রায়বাবু মোমবাতি হাতে স্ত্রীকে অতি সন্তর্পণে অনুসরণ করতে থাকেন।

সেই অস্পষ্ট আলোয় মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ভীষণ মায়া লাগে তার। নিমেষে মনের ভাব পরিবর্তন হয়ে যায়। মানসিক দ্বন্দ্বের পরেও নিজেকে ভীষণ অপরাধী, ছোটো এবং স্বার্থপর বলে মনে হয়। মায়ের নিষ্পাপ সহজ সরল মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে ওঠেন— একবার চেয়ে দ্যাখো, নিশ্চিন্ত মা কেমন বাচ্চা মেয়েটির মতো ঘুমিয়ে আছে।

ওষুধটা চামচে ঢালতে গিয়ে সেই মুহূর্তে কাছাকাছি কোথাও বজ্রপাত হয়। হাতটা কেঁপে ওঠে ভয়ে। ওষুধটা ছলকে মেঝেতে পড়ে যায়। আর তখনই মনে পড়ে যায় নিজেদের নীচ স্বার্থপরতার কথা। বাঁচার অধিকার থেকে নিজের স্বার্থে কাউকে বঞ্চিত করার নামই তো হত্যা। একমাত্র ঈশ্বর ব্যতীত এই পৃথিবীতে হত্যা করার অধিকার কারওর নেই। থাকতে পারে না, সে যেই হোক। ভয়ে শরীরটা শিহরিত হতে থাকে। নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে অন্ধকার রাতে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে নিজের অজান্তে সরমাদেবীর হঠাৎ মনে পড়ে যায় কথাগুলো— যে অভিপ্রায়ে এই পথ বেছে নেওয়া, একদিন আমিই না আবার হয়ে যাই শিকার! আমাদেরও ছেলে নেই। অন্তিমকালে কার কী পরিস্থিতি দাঁড়ায় কে বলতে পারে! তোমার অবর্তমানে আমাকে মেয়েদের গলগ্রহ হয়ে যেন থাকতে না হয় কোনওদিন।

রায়বাবুর মনে হল কথাটা তিনি নতুন শুনলেন। বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল তার অন্তর আত্মা। এতদিন যাবৎ তিনি অনেক কথাই ভেবে রেখেছিলেন। কিন্তু স্ত্রীর মুখে বলা কথাটা তার এক মুহূর্তের জন্যেও মাথায় আসেনি। কারণ তিনি নিজের সমস্যার কথা ভাবতেই ব্যস্ত ছিলেন।

ভোর হয়ে গিয়েছিল। দিনের আলো খোলা জানলা দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল। গাছের ডালে বসে পাখিরা বৃষ্টির জলে স্নান করছিল। সেদিন বেলা প্রায় এগারোটা নাগাদ শাশুড়ি মায়ের কোনও সাড়াশব্দ শুনতে না পেয়ে অবদমিত কৌতূহলবশত এক সময় পর্দা সরিয়ে ঘরে প্রবেশ করতেই তিনি অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। বুঝতে বাকি থাকে না তার যে, প্রাণপ্রদীপ নিভে গিয়েছে অনেকক্ষণ। রাত্রিবেলায় মলত্যাগ করার পরেই হয়তো বৃদ্ধা জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। চোখ দুটো তখনও খোলা। হয়তো দৃষ্টিপথ দিয়েই প্রাণবায়ু বেরিয়ে গিয়েছিল।

সেই নিশীথ অন্ধকারে কে-দা-র শব্দটাই ছিল বৃদ্ধার ইহজীবনের অন্তিম ডাক। ভবিষ্যতে ওই ডাক আর কোনওদিন শুনতে পাবেন না।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...