লোকটাকে দেখা মাত্র দেবানন্দবাবুর পুলিশি নজর কিছু একটার ইঙ্গিত দিয়ে দিল। দেবানন্দ চাকরি থেকে রিটায়ার করলেও, এই নজর সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। তার এই নজর কখনও ধোঁকা দেয়নি তাকে। তিনি জানেন, এই স্পেশাল নজরটাই তার সম্পদ। এই নজরই তাকে চাকরি জীবনে এনে দিয়েছিল একের পর এক প্রমোশন। সেই সঙ্গে সম্মানও। লোকটা কুখ্যাত ক্রিমিনাল জগবন্ধু সামন্ত, ওরফে হাওয়াই জগা। কোনও সন্দেহ নেই দেবানন্দের মনে। মুখে লম্বা দাড়ি রাখলেও, চোখ দুটো তো লুকানো যায় না!

দুদে পুলিশ অফিসার ক্রিমিনাল শনাক্ত করেন মুখ দেখে নয়, চোখ দেখে। বিদ্যেটা শিখিয়েছিলেন পুলিশেরই এক গোয়েন্দা অফিসার— মহম্মদ হান্নান। তিনি বলতেন, মানুষ হুট করে মুখ পালটে ফেলতে পারে। কিন্তু যে জিনিসটা পালটাতে পারে না, সেটা হল চোখ। প্রতিটা চোখ আলাদা, তার ভাষা আলাদা— যত বড়ো ক্রিমিনালই হোক, ওই এক জায়গায় কাবু। একবার ওটা রিড করা শিখতে পারলে, তোমার সঙ্গে কেউ পারবে না।

তবুও আরও কনফার্ম হওয়ার জন্য দেবানন্দ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অবজার্ভ করতে লাগলেন। ডানদিকের কপালে একটা কাটা দাগ ছিল জগার, সেটা দেখার চেষ্টা করলেন। কিন্তু দূরত্বের কারণে ঠিক বোঝ যাচ্ছে না। তাছাড়া দিনের আলোও অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। আজ আর অনুসন্ধান চালানো সম্ভব নয় দেখে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে একজন লোকাল লোককে অতি বিনয়ের সঙ্গে হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আভি জো বাবা প্রবচন দে রহে থে, উনকা নাম বাতা সকতে হ্যায় আপ?”

লোকটা হেসে বললেন, “কিউ নেহি? উনকা নাম সোয়ামি পরমানন্দজি। উনকা প্রবচন বহুত মসুর হ্যায়, দূর দূর সে লোগ আতে হ্যায় শুননে কে লিয়ে।”

—মুঝে ভি বহুতই আচ্ছা লাগা। উননে কাঁহা পে রহতে হ্যায় বাতা সকতে হ্যায়…?

—সুনীল মিশ্র মেরা নাম। দিল্লি কা রহনেবালা হুঁ। সাল মে তিন-চারবার আতা হুঁ ইহাঁ। বহুত আচ্ছা লাগতা হ্যায়। শুকুন মিলতা হ্যায়। পরমানন্দজি বহুত হি উচ্চমার্গ কা পুরুষ হ্যায়। ইঁহাসে দো কিলোমিটার কে দূরি পর গঙ্গা কিনারে বাবাকে ছোটাসা আশ্রম… মায়াধাম। ওঁ হিপে রহতা হ্যায় উননে। সবসে মিলতা হ্যায়। বহুতহি দয়ালু কিসম কা আদমি হ্যায় বাবা।

নাম ঠিকানা জোগাড় করে নিজের জায়গায় ফিরে এলেন দেবানন্দ। বন্ধু তথাগত একটা লোহার চেয়ারে বসে সামনের দিকে তাকিয়ে প্রকৃতির শোভা উপভোগ করছিলেন। ইনকাম ট্যাক্স ল-ইয়ার। বছর কয়েক হল ধর্মকর্মে মন দিয়েছেন। একসময় এসবের ধারেকাছে ঘেঁষতেন না। ড্রামাটিক চেঞ্জ। ওর দ্বারা ভীষণ ভাবে প্রভাবিত দেবানন্দের স্ত্রী মল্লিকা। মূলত ওদের দু’জনের তাগিদেই এবার এই তীর্থ দর্শনে আসা।

দেবানন্দ পুলিশের লোক। ধর্মকর্মের সঙ্গে সম্পর্ক কোনও কালেই ছিল না, এখনও নেই। তিনি মনে করেন, নিজে সৎ থাকা ও সৎ কর্ম করাটাই সবচেয়ে বড়ো ধর্ম পালন। যদিও এই মুহূর্তে পুলিশের ভাবমূর্তি সমাজের চোখে বড়োই খারাপ জায়গায়। লোকে স্বতঃসিদ্ধ সত্যের মতো ধরে নেয়, পুলিশ মানেই খারাপ, পুলিশ মানেই ঘুষখোর। দেবানন্দ অবশ্য সেটা নিয়ে ভাবেননি, পাত্তাও দেননি।

দুই বছর আগে চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন। কেউ কখনও, কোনও দিন, কোনও ভাবে তার চরিত্রের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেনি। তবে অনেক ক্ষেত্রে কাজের স্বচ্ছতা তিনি বজায় রাখতে পারেননি। সবাই জানে, পুলিশের চাকরি করতে গেলে উর্ধ্বতন কর্তাদের আদেশ না মেনে উপায় থাকে না। সেই সিস্টেমের পাল্লায় পড়ে, বসের অনৈতিক আদেশ পালন করতে গিয়ে জীবনে দু’বার দুটি ভীষণ অন্যায় কাজ করেছেন। সেকথা তিনি অকপটে স্বীকার করেন। সে জন্য তার অনুশোচনাও থাকবে জীবনভর।

তথাগত দেবানন্দকে দেখে মৃদু হেসে বললেন, ‘কী রে, হুট করে কোথায় চলে গিয়েছিলি? বাথরুমে?’

দেবানন্দ হাসলেন, ‘না৷ একটা প্রবাদবাক্য আছে না, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। আমার অবস্থা তাই হয়েছে। এখানে এসেও ক্রিমিনাল দেখতে শুরু করেছি। সেটারই ছানবিন করতে গিয়েছিলাম একটু।”

তথাগত অবাক হয়ে বললেন, ‘তুই এখন একজন রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার। ওসব নিয়ে শুধু শুধু কেন মাথা ঘামাতে যাবি?”

—সাধারণ কেস হলে ঘামাতাম না। আমাকে নাকানিচুবানি খাইয়ে ভেগেছিল লোকটা। এখানে এসে সন্ন্যাসী সেজে গুরুগিরি করছে। একটা ফেরোসাস ক্রিমিনাল এভাবে লোক ঠকাচ্ছে, আমি সব বুঝেও চুপ করে থাকতে পারব না। আমার চাকরি নেই তো কী হয়েছে? আমি একজন রেসপনসিবল সিটিজেন। পুলিশের সাহায্য নিয়ে ওকে আমি ফাঁসির দড়িতে ঝোলাব। ডিপার্টমেন্টে এখনও আমার যথেষ্ট সুনাম আছে। ফোন করলে ওরা অবশ্যই অ্যাকশন নেবে।

–কেসটা কী?

—তোকে বলেছিলাম, বোধহয় ভুলে গেছিস। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। হাওয়াই জগা-র নাম মনে পড়ে? জগবন্ধু সামন্ত। রেপ, কিডন্যাপ ও খুনের কেসের আসামি। নিজের বউকেও খুন করেছিল। আমার উপর তদন্তের ভার ছিল। প্রত্যক্ষদর্শী কেউ না থাকলেও, ক্রাইম সিনে যে এভিডেন্স পাওয়া গিয়েছিল, তাতে অনায়াসে ওকে আমি জেলে পুরতে পারতাম। তদন্ত যখন গুটিয়ে এনেছি, হঠাৎ এক রাতে ওর ফোন। আমাকে সরাসরি বলল, স্যার কেসটা অন্যরকম সাজিয়ে দিন। আপনার যত টাকা লাগে আমি দিতে রাজি আছি। আমার পায়ের রক্ত মাথায় উঠলেও মাথা ঠান্ডা করে জবাব দিয়েছিলাম, বেশ তো, আমিও রাজি। তুই আমার সঙ্গে দেখা কর, তারপর সব ফাইনাল হবে। কী জানি কেমন করে যেন আমার উদ্দেশ্য ধরে ফেলেছিল জগা। আমার সঙ্গে আর দেখা না করে গা ঢাকা দিল। আমি ওকে অ্যারেস্ট করার জন্য উঠে পড়ে লাগলাম। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও ধরতে না পেরে হাল ছাড়তে হল। এতদিন পর এখানে এসে দেখি, বাবু রীতিমতো সন্ন্যাসী সেজে জ্ঞানদান করছেন। লোকের মুখে শুনে যেটুকু মনে হল, তাতে পসার ভালোই জমিয়ে ফেলেছেন। ছোটোখাটো একটা আশ্রমও তৈরি করেছেন। কিন্তু ওর কপাল খারাপ, ওর বাড়া ভাতে ছাই দেওয়ার জন্য আমি এসে পড়েছি…।

—কিন্তু এতদিন পর ওকে দেখে একবারেই চিনতে পারলি? কোনও ভুল হচ্ছে না তো?

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...