অসহায়ের মতো বললেন, ‘আমি তোমার অপরাধের বিচার করার কে? আমি বড়জোর কেসটা রিওপেন করিয়ে তোমাকে আদালতে পাঠাতে পারি।’
—তাতে কোনও লাভ হবে কি? আপনার কথা কেউ শুনবে না। আপনি আমাকে কোনও শাস্তিই দিতে পারবেন না। বরং নিজেই শাস্তি পাবেন। একজন সৎ নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসারের সামনে যখন একজন দাগী আসামি খোলা আকাশের নীচে ঘুরে বেড়ায়, তার কাছে এর চেয়ে বড়ো শাস্তি আর কী হতে পারে?
দেবানন্দ বুঝলেন জগা তাকে এতক্ষণ ধরে লেজে খেলাচ্ছে। সাধু সাজলেই কি সাধু হওয়া যায়? রক্তের দাগ কি হাত থেকে অত সহজে মেটানো যায়? ব্যাটা কিছু মোহিনীবিদ্যা রপ্ত করে, কিছু শুনে শুনে রপ্ত করা জ্ঞানের কথা ঝেড়ে ব্যাবসা ফেঁদে বসেছে। ভারতবর্ষে এইরকম হাজার হাজার সাধু-সন্ন্যাসী আছে। মনে মনে চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করলেন দেবানন্দ ৷
মুখে বললেন, ‘তুমি বলছ আমি তোমাকে কিছুই করতে পারব না। তা ঠিক। আমি রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার। এখন আমার কথা শুনে ওরা কেসটা রিওপেন নাও করতে পারে। কিন্তু তোমার কথাবার্তা শুনে যেটুকু মনে হল, তাতে তুমি অন্যকিছু ভেবে রেখেছ। সেটা জানতে পারি কি?’
—নিশ্চয়ই। আমি একটা সেটেলমেন্টে আসতে চাই। তবে সেই বিষয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলব না। আপনাকে কাল বিকেলে একবার নীলকণ্ঠ মহাদেব মন্দিরে আসতে হবে। আমি গাড়ি ঠিক করে দিলে আপনার সন্দেহ হতে পারে। তাই আপনি নিজেই একটা গাড়ি ঠিক করে আসবেন। আমি মন্দির চত্বরে অপেক্ষা করব। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে না। যথাসময়ে আমি আপনার সঙ্গে দেখা করে আমার এক প্রিয় জায়গায় নিয়ে যাব। ওখানেই কথা হবে। কথা শেষে আপনি আবার ফিরে আসবেন মন্দিরে। ওই গাড়িতেই ফিরে যাবেন হোটেল।
( চার )
ঋষিকেশ থেকে বত্রিশ কিলোমিটার দূরত্ব নীলকণ্ঠ মহাদেব মন্দিরের। মণিকূট পর্বতে অবস্থিত। মণিকুট, ব্রহ্মকুট, বিষ্ণুকুট পর্বত— পাশাপাশি তিনটি পর্বত। এখানেই ভগবান শিব সমুদ্রমন্থনের সময় বিষপান করেছিলেন বলে বর্ণিত আছে। আজ মন্দির দর্শন নয়, জগার রহস্যময় সেটেলমেন্ট শোনার জন্য এসেছেন দেবানন্দ। জগার আচরণ ঠিকঠাক মনে হয়নি বলে তথাগতও সঙ্গে এসেছেন। তথাগতকে সঙ্গে করে নিয়ে আসার কোনও ইচ্ছাই ছিল না তার। কিন্তু তার মুখে জগার সাক্ষাৎকারের কথাবার্তা শোনার পর একপ্রকার জোর করেই এসেছেন। তবে কথা দিয়েছেন, গাড়িতেই থাকবেন। ওদের কথাবার্তা শেষ হলে সঙ্গে করে নিয়েই ফিরবেন। তথাগত কোনও অজানা আশঙ্কায় ভয় পেয়েছেন।
জগা বলেছিল, মন্দিরে ঢোকার মুখে সে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং সে নিজে এসে তাকে ডেকে নিয়ে যাবে। গাড়ি থেকে নেমে দেবানন্দ ওদের অপেক্ষা করতে বলে এগিয়ে গেলেন মন্দিরের প্রবেশদ্বারের দিকে। জীবনে প্রথম এলেন, সবই অচেনা মুখ। এখন বিকেল, তাই দর্শনার্থীদের ভিড় নেই। চারদিকে তাকাতে তাকাতে এগোচ্ছেন আর মনে মনে ভাবছেন, এরকম অদ্ভূত শর্ত দেওয়ার মানেটা কী? সত্যি সত্যি ওর কোনও খারাপ অভিসন্ধি নেই তো? শোনার পর থেকে তথাগত অন্তত
পঞ্চাশ-ষাটবার এই সতর্কবার্তা দিয়েছে। সেই সঙ্গে এটাও বলেছে, একটা ধামাচাপা পড়া কেস নিয়ে অতি সক্রিয়তা দেখালে লাভ কিছুই হবে না। উলটে ভয় পেয়ে জগা উলটোপালটা কিছু করে বসলে অযথা ভুগতে হবে। তথাগতের কথাটা যুক্তিপূর্ণ, গভীর ভাবে ভাবার পর দেবানন্দেরও সেকথা মনে হয়েছে। অতীত যেমনই হোক, জগা এখন প্রতিষ্ঠিত। এখানে ওর প্রতিপত্তি, সম্মান সবই রয়েছে। এই জায়গাটা এমনি এমনি তৈরি হয়নি। অনেক পরিশ্রম মেহনত করে তৈরি করতে হয়েছে। হয়তো বা ছলচাতুরির আশ্রয়ও নিয়ে থাকবে। ওর মতো অপরাধীর ক্ষেত্রে সেটাও খুবই স্বাভাবিক। সবমিলিয়ে এই পজিশন, এই প্রতিষ্ঠা— জগা কেন, অনেক সাধুবাবার পক্ষেই ত্যাগ করা সম্ভব নয়।
—চুপচাপ আমার পিছন পিছন চলে আসুন স্যার।
কানের কাছে কথাগুলো বলে যে লোকটা তাকে ক্রস করে বেশ দ্রুত এগিয়ে গেল, দেবানন্দ প্রথমে তাকে চিনতেই পারেননি। পরনে গেরুয়া বসন। লাল রঙের উত্তরীয় দিয়ে এমন ভাবে মুখ ঢেকে রেখেছে যে, একবার দেখে চেনার কোনও উপায় নেই ওটা আসলে জগা ওরফে পরমানন্দজি। জগা নিজের মুখ দেখাতে চাইছে না কেন? এখানে ওর পরিচিত লোক থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে ওর ভয়ের কী আছে? চিনলেই বা ক্ষতি কী? ভীষণ খটকা লাগল দেবানন্দের মনে। জিজ্ঞেস যে করবেন তারও উপায় নেই। জগা হেঁটে চলেছে আপন বেগে। হঠাৎ তথাগতর মতো তার মনেও প্রশ্ন জাগল, এভাবে ওর পিছু নেওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে?
পরক্ষণেই অবশ্য মনে হল, কর্মজীবনে ডিউটি পালন করতে গিয়ে এর চেয়েও কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। আজ তিনি ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবেন!
অনেকটা চড়াই উতরাই পেরিয়ে নির্জন এক জায়গায় এসে দাঁড়াল জগা। চারপাশে বেশ ঘন জঙ্গল। আরও কিছুটা এগোতেই নজরে পড়ল সামনে গভীর খাদ। দেবানন্দ একটা পাথরের চাঁইয়ের উপর বসলেন।
জগা হেসে বলল, “আপনার অভ্যেস নেই, তাই কষ্ট হচ্ছে। একটু রেস্ট নিন, ঠিক হয়ে যাবে।”
দেবানন্দ একটু রেস্ট নিয়ে বললেন, ‘এভাবে মুখ ঢেকে এলে কেন? তোমাকে চিনে ফেললে কি অসুবিধা ছিল?’
(ক্রমশ…)





