জগা বলল, ‘দরকার ছিল। সব বুঝতে পারবেন। এবার আসল কথায় আসি, যেটা বলার জন্য আপনাকে এখানে ডেকেছি। আপনি আমার অপরাধ সম্পর্কে সবই জানেন। একটি ষোলো বছরের মেয়েকে কিডন্যাপ করেছিলাম ওর বাবার কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য। কিন্তু মেয়েটার শরীর দেখে আর লোভ সামলাতে পারিনি। রেপ করেছিলাম। মেয়েটি পালানোর চেষ্টা করেছিল। তখন রাগের মাথায় এমন ভাবে মাথায় মেরেছিলাম যে, ওখানেই মারা যায়। ওর লাশ মাটি চাপা দিয়ে ব্যাপারটা সাপটে দিয়েছিলাম প্রায়। কিন্তু বিগড়ে দিল আমার বউ। ও এমন হইচই শুরু করে দিল যে, বাধ্য হয়ে ওকেও মেরে ফেলতে হল। শেষ রক্ষা হল না, পুলিশ জেনে গেল সব। শেষ চেষ্টা হিসেবে আপনার সঙ্গে একটা সেটেলমেন্ট করে বাঁচার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম আপনি ছাড়বেন না, তখন পালিয়ে গেলাম৷’ জগা থামল।

দেবানন্দ বললেন, ‘এখন তবে কীসের সেটেলমেন্ট করার জন্য ডেকেছ?”

—আমি ওই মেয়েটিকে স্বপ্নে দেখি। আমার বউ কল্পনাকেও দেখি স্যার। কল্পনা একটু মুখরা হলেও খুব ভালো মেয়ে ছিল। আমি কত নির্যাতন করতাম, তবুও সেভাবে প্রতিবাদ করত না। ছেলে মেয়ে হচ্ছে না বলে আমি সবসময় খোটা দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখতাম। অথচ শারীরিক ত্রুটি ওর নয়, আমার ছিল। ডাক্তারের রিপোর্ট লুকিয়ে রেখেছিলাম। ভাইদের বিশ্বাস করতাম বেশি। কিন্তু পরে বুঝেছি, ওরা আমাকে নিজেদের স্বার্থের জন্য মিসগাইড করে অন্যায় কাজে প্ররোচনা দিত। তবে আমি আমার পাপের বোঝা অন্য কারও উপর চাপাতে চাই না। যে পাপ করবে, ফল তাকেই পেতে হবে। সেটাই বিধাতার নিয়ম। আপনি আমাকে সেই শাস্তি দিতেই তো এসেছেন, তাই না?”

দেবানন্দ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। তার ইতস্তত ভাব দেখে জগা মৃদু হেসে বলল, ‘আপনি ইতস্তত করলেও আমি জানি আমার পাপের একটাই শাস্তি, মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু সেটা আপনি কি দিতে পারবেন? আমি নিশ্চিত, এত বছর পর পুলিশ ওই কেস নিয়ে আর মাথা ঘামাবে না। আপনি অন সার্ভিস থাকলে তবু কথা ছিল। এখন কেউ পাত্তাই দেবে না, ওদের অনেক কাজ।’

দেবানন্দ হাসলেন, “তোমার কথাগুলো বাস্তব। আমি চাইলেও তোমার কিছুই করতে পারব না। তোমাকে দেখে খুব একসাইটেড হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু এরকম অনেক কেসই আনসলভড হয়ে পড়ে থাকে। তোমার আর কোনও ভয় নেই। তুমি মুক্ত। চলো ফিরে যাই। কাল একটু ঘোরাঘুরি করে পরশু আমরা বদ্রিনাথ চলে যাব। এই জন্মে হয়তো আর দেখা হবে না।

দেবানন্দ উঠতে যাচ্ছিলেন। জগা বলল, “তাহলে সেটেলমেন্টের কী হবে স্যার, যেজন্য এত কষ্ট করে আপনাকে পাহাড়ের মাথায় নিয়ে এলাম?’

দেবানন্দ অবাক হয়ে বললেন, ‘আর কীসের সেটেলমেন্ট বলো তো? একদিন তুমি টাকা দিয়ে কেস ডিসমিস করতে চেয়েছিলে। তখন আমি রাজি ছিলাম না। আজ পরিস্থিতি অন্যরকম। আমি জেনেবুঝেও তোমাকে শাস্তি দিতে পারছি না। বললাম তো, তুমি এখন মুক্ত। নাকি আরও কোনও প্রতিশোধ নিতে চাও?’

—না স্যার। ওসব থেকে আমি এখন অনেক দূরে চলে এসেছি। আমি আসলে একজন বিচারক চাইছিলাম। দাগি আসামিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে। আত্মহত্যা অনেক আগেই করতে পারতাম। কিন্তু সেটা সাজা হতো না। আমার আত্মা আর এই কলুষিত শরীরে থাকতে চাইছে না। কিন্তু এরকম একটা পাপী শরীরের মৃত্যু নির্জনে হওয়া ঠিক নয়। তাই এই আয়োজন। আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আজ আমি কতটা পুলকিত, রোমাঞ্চিত! এখন আমি জানি, মৃত্যু বলে কিছু হয় না। আমাদের জন্ম কবে হয়েছিল? গুরুজি যেদিন ভিতরের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, আমি বলে কেউ ওখানে থাকেই না। আমি আসলে একটা জামা। যে জামা এতদিন পরেছিলাম সেটা নোংরা হয়ে গেছে, তাই পালটে ফেলব। এই কাজটি আপনারা করলে ভালো হতো, কিন্তু সে উপায় তো নেই৷ আপনি দেখে যান, আমি আমার গন্তব্যের পথে চললাম।

কথাগুলো শেষ করে উচ্চ কণ্ঠে শিবস্তোত্র পাঠ করতে লাগল জগা। দু’হাত মেলে নিজেকে ছড়িয়ে দিল আকাশের দিকে। মুখে এক ঐশ্বরিক স্নিগ্ধতা। হঠাৎ ছুটে গিয়ে খাদের মধ্যে ভাসিয়ে দিল নিজের শরীরটাকে। স্তম্ভিত, হতভম্ব দেবানন্দ ছুটে গিয়ে দেখলেন পাখির মতো নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে জগার শরীর। একটু পরেই সেটা মিলিয়ে গেল কুয়াশা মোড়া গহ্বরে। অস্তিত্বহীন হয়ে গেল জগা নামের কুখ্যাত অপরাধী।

বেশ কিছুক্ষণ পর গাড়িতে এসে বসলেন দেবানন্দ। থমথমে মুখ। তথাগত জিজ্ঞাসা করলেন, “কীরে, কোনও ঝামেলা পাকায়নি তো তোর জগা?’

দেবানন্দ থমথমে মুখে বললেন, ‘না৷ এই দু’দিন যা হল, এখন মনে হচ্ছে সেটা যেন কোনও নাট্যকারের লেখা নাটকের অংশ। আমাকে ছোট্ট একটা রোলের জন্য ডেকে আনা হয়েছিল, যে চরিত্রটা আমি ছাড়া অন্য কাউকে দিয়ে হয়তো হতো না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আমাকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে নিল কেউ, অথচ আমি বুঝতেই পারলাম না। অবিশ্বাস্য। কিন্তু বিশ্বাস না করার উপায়ও আমার নেই। তবে পুলিশ তো, তদন্তের শেষধাপ না দেখে পুরোপুরি বিশ্বাস হবে না।’

তথাগত অবাক হয়ে বললেন, ‘মানে, এই কেস আরও চলতে থাকবে?’

—হ্যাঁ। তবে জগাকে নিয়ে নয়। সেই অদৃশ্য নাট্যকারের সন্ধান আমার চাই, যে এইরকম অবিশ্বাস্য একটা স্ক্রিপ্ট লিখেছে! তোমার কি মনে হয় এরকম স্ক্রিপ্ট লেখা কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব?

তথাগত কোনও জবাব দিতে পারলেন না। অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন দেবানন্দের মুখের দিকে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...