আরও আধ ঘণ্টা পথ চলার পর চেলুংগার্ডের (এখানেও থাকা যায়) কাছে সুপিনের উপর কাঠের ঝোলা ব্রিজ পেরিয়ে অপর পারে এলাম। দূরে পাহাড়ের মাথায় ছোট্ট গ্রাম ওসলা। সবুজ উপত্যকার মাঝে সরু সাদা সিঁথির মতো বয়ে চলেছে সুপিন। সবুজ পাহাড়ের গায়ে লাল ফসলের খেত, রামদানা আর রয়েছে মটরশুঁটির খেত। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম এই অঞ্চলের সবচেয়ে বর্ধিষ্ণু ও সংস্কৃতিসম্পন্ন গ্রাম ওসলা। এ গ্রামের মানুষ গাইড এবং মালবাহকের কাজ করার পাশাপাশি, কৃষিকাজ এবং পশুপালন করে। গ্রামে রয়েছে কাঠের অনুপম কারুকার্যময় একটি প্রাচীন মন্দির। মন্দিরের আরাধ্য দেবতা দুর্যোধন। মহাভারতে যাকে ভিলেন বলে আখ্যা দেওয়া হয়, এখানে তিনি দেবতারূপে পূজিত হন। মন্দিরে বিগ্রহ দর্শনের সুযোগ পাওয়া গেল না।

যারা রুপিন নদীর বাম তীর ধরে আসবেন, তারা নদীর ওপারে সীমান্তে কিংবা বন দপ্তরের বাংলোতে রাত্রিবাস করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে পরের দিন নদী ব্রিজ পেরিয়ে খাড়া পথে হাঁটা শুরু করতে হবে।

রাতে এই অঞ্চলের বিখ্যাত গাইড সলুকরামের বাড়িতে কাটিয়ে চতুর্থ দিন সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়লাম। ওসলা থেকে হর কি দুনের দূরত্ব ১২ কিমি। ২০১৮ সালের পর থেকে পরিবেশগত কারণে সরকার হর কি দুন উপত্যকায় তাঁবু ফেলার অনুমতি দিচ্ছে না। এমনকী উপত্যকায় থাকা বাংলোর বুকিং বন্ধ করে দিয়েছে। সূর্যের আলো দেখা না গেলে, সবুজ পাহাড়ের গায়ে সাদা মেঘের ভেলার ভেসে বেড়ানো দেখতে বেশ লাগে! মিনিট ২৫ চলার পর একটা শিব মন্দির দেখলাম। ঘণ্টা বাজিয়ে নমস্কার করলাম। নৈস্বর্গিক শোভা দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম সোজা পথ ধরে। আরও আধ ঘণ্টা পর বিনাই বুগিয়ালে পৌঁছে গেলাম।

রয়েছে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। কয়েক মিনিট বিশ্রাম। অজস্র ছবি তুলে সামনের পথ ধরলাম। ঘাড় উঁচু করে দেখছি সামনের পথ। যে পথ উঠে গেছে পাহাড়ের গা বেয়ে, পথরেখা দেখা যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত। তারপর পথ ঘুরে গেছে পাহাড়ের বাঁদিকে। পূর্বে উপত্যকার মাথায় মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে তুষার শৃঙ্গ। কিছুটা পথ চড়াই ভেঙে ওঠার পর ঝরনা দেখতে পেলাম। পাশেই রয়েছে চায়ের দোকান। সেই দোকানে ক্লান্ত পথচারীরা কেউ বিশ্রাম নিচ্ছে, তো কেউ চা খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিচ্ছে। এখান থেকে খাড়া পথ উঠে গেছে কলকাভিয়াধার বুগিয়ালে।

২০ মিনিট চড়াই ভেঙে পৌঁছে গেলাম বুগিয়ালে। সুবিশাল বুগিয়াল, হাজার ফুলের মেলা, সবুজের ক্যানভাসে নানা রঙের সমারোহ। ঘাস ছাঁটা নেড়া পাহাড়ের কোলে এই বুগিয়াল। এরপর আবার আড়াআড়ি উপরে উঠতে হবে। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ছোটো ছোটো সাদা ফুলের বুনো ঝাড়ির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চললাম। বৃষ্টির সঙ্গে প্রবল ঠান্ডা হাওয়া শরীরে কাঁপন ধরাচ্ছে। সামনে এক চায়ের দোকান দেখে সবাই দাঁড়িয়ে পড়লাম। ভিতরে প্রবল ধোঁয়ার কারণে বিশ্রাম নিতে পারলাম না। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে চড়াই ভাঙা শুরু হল। আধ ঘণ্টায় কলকাত্তিয়াধার শীর্ষে পৌঁছে গেলাম। বহু নীচে সুপিন নদীর ভাগ হয়ে যাওয়া দেখলাম। সোজা পূর্বদিক থেকে বন্দরপুঁছ শৃঙ্গ থেকে আসা রুইনসারা নালা আর বাঁদিকে হর কি দুন নালা। বাঁদিকে ঘুরে ঢালু পথ ধরে পৌঁছে গেলাম আমাদের দ্বিতীয় দিনের গন্তব্য সীমান্তরা থাচে।

পঞ্চম দিন ঘুম ভাঙল ভোরে প্রবল তুষারপাতের শব্দে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় কাবু, রাতভর বৃষ্টি হলেও তা প্রবল নয়। সকালে দেখলাম গতকালের সবুজ ও ধূসর রং বদলে সাদা হয়ে গেছে। অল্প সময় পর আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করল। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আজ থেকে রৌদ্রোজ্জ্বল থাকবে। সবাই দ্রুত রেডি হয়ে নিলাম। আজ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে, যাব মোরিন্দা তাল। অভিযাত্রীরা সাধারণত বসলোতে থাকে। সেখান থেকে ‘হর কি দুন’ ঘুরে আবার বসলোতে ফিরে আসে। কিছু সময়ের মধ্যেই আকাশের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেল। পূর্বদিকে কালানাগ, বন্দরপুঁছ পর্বতশ্রেণির সহযোগী শৃঙ্গরা আকাশে উন্মুক্ত, মনে হয় হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে নেওয়া যাবে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...