আজকাল হিমালয়ের পথে হাঁটতে যাওয়ার কথা ভাবলে বুকে কাঁপুনি দেয়। কিন্তু তবুও ভবঘুরে উদাসী মন শোনে কি সে কথা! মনের মধ্যে চলতে থাকা পাহাড়ি স্বপ্নগুলো তখন ভেসে ভেসে বেড়ায়, সুড়সুড়ি দেয় মগজে। রাস্তার পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সবুজের গালিচায় ঘেরা আকাশ ছোঁয়া পাহাড়। হাঁটতে হাঁটতে চোখের সামনে ধরা পড়বে উপত্যকার ওপাশে বিপুল আকৃতির ঝরনা, আছড়ে পড়ছে নদীর অতলে পাথরগুলোর উপর। পাহাড়ি ধস, মেঘভাঙা বৃষ্টি বুকে ভয় ধরালেও ওই পাহাড়, আকাশ, নদী আর ঝরনার শব্দ বয়ে চলার অনুভূতিগুলো দিয়ে যায় আরও গহিনে প্রবেশের সাহস।
হিমালয়ের এই অমোঘ আকর্ষণে সবকিছু তুচ্ছ করে ছয় ভবঘুরে অক্টোবর মাসে বেরিয়ে পড়েছিলাম তমসা উপত্যকায় কয়েকটা দিন কাটানোর অভিপ্রায়ে। ঠিক তমসা উপত্যকা বললে বোঝা যাবে না, বরং বলা ভালো ‘স্বর্গীয় উপত্যকায়' অর্থাৎ হর কি দুন উপত্যকায়। দেরাদুন থেকে ২১০ কিমি বাসে কিংবা গাড়িতে যেতে হবে শাঁকরি। শাঁকরি থেকে ১৮ কিমি গাড়িতে ধারকোট পৌঁছে শুরু হবে ট্রেকিং। ধারকোট থেকে দু'দিন হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন ‘স্বর্গীয় উপত্যকায়'। হরিদ্বার থেকে গাড়িতে আমাদের সময় লাগল প্রায় ১৩ ঘণ্টা। হরিদ্বার থেকে শুরু করায় সংযোজিত হয়েছে আরও ৫০ কিমি। এপথ ধরে যাওয়া যায় যমুনোত্রী মন্দিরে। নওগাঁ থেকে পৃথক হয়ে গেছে যমুনোত্রীর পথ। পুরোলা, মোরি, নেটওয়ার হয়ে শাঁকরি।
ভোরের সোনালি আলো দেরাদুন উপত্যকার ধানের খেতের উপর খেলা করছে, দূরে কুয়াশামাখা সবুজ পাহাড় ঘুম থেকে জেগে উঠছে। দেরাদুন, মুসৌরি ছুঁয়ে ছুটে চলেছি পিছনে ফেলে এক একটা ঝরনা, নদী, পাহাড়ি জনপদ। তমসার পাড় ধরে ক্রমাগত এগিয়ে চলা। প্রথমদিকে বিস্তৃত রাস্তা পেলেও সংকীর্ণ হল সে পথ, ধীর হল বাহনের গতি। ভূমিধসের ফলে রাস্তা আরও সংকীর্ণ হয়েছে, থামিয়ে দিচ্ছিল সামনের দিকে এগিয়ে চলা। সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে সব যানবাহন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। ছাড়া পেয়ে আবার এগিয়ে চলা। দুপুরের পর থেকেই আকাশে মেঘের ঘনঘটা, তারপরই শুরু হল টিপটিপ বৃষ্টি। শেষ বিকেলে নেটওয়ার জনপদে এসে তমসাকে হারালাম। তমসা বিভক্ত হল দুটি ভাগে— একটি নাম নিল রুপিন আর অপরটি হল সুপিন। সুপিন নালা শেষ পর্যন্ত সঙ্গী হয়ে থাকবে। এই সুপিন নদীকেই অনেকে তমসা বলে ডাকে। যমুনার অন্যতম উপনদী তমসা দেরাদুনে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।





