অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়, কলকাতার এক পরিচিত ইতিহাস গবেষক। পুরোনো দলিল, রাজবাড়ির গল্প আর রহস্যঘেরা লোককথা— এই নিয়েই তার নিত্যকার দিনযাপন। এমনই একদিন, হঠাৎ করেই তার পার্ক স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে আসে একটি ছোটো প্যাকেট। প্যাকেটটি কোনও প্রেরকের নাম ছাড়াই এসেছে—একেবারে নির্ভুল ভাবে তার ঠিকানায়। অবাক হয়ে ভাবতে থাকেন, এ কী করে সম্ভব! আজকাল তো কাউকে চিঠি বা প্যাকেট পাঠাতে হলে প্রেরকের নাম ছাড়া নেয় না। এটা তাহলে এল কী করে! হতে পারে ভুল করে হয়েছে।

অমিতাভ অবাক হয়ে খোলেন প্যাকেটটি। ভিতরে ছিল একটি পুরোনো কাঠের কাঠি, যেন কোনও আদিম যজ্ঞ বা মন্দির থেকে পাওয়া। সঙ্গে একটি হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠি — লেখাগুলো হাতে লেখা, অসমান হরফে — ‘যে এই কাঠি ছোঁবে, তার জীবন বদলে যাবে। কিন্তু সাবধান— একবার শুরু করলে ফিরে আসার পথ থাকবে না। এই কাঠি এক রাজবাড়ির কালো ইতিহাসের অংশ। চাইলেও আর থামতে পারবে না – কে সি।’

অমিতাভ থমকে যায়। কে এই কে সি? কেনই বা সে এমন কিছু পাঠাবে? আর এই কাঠির রহস্যই বা কী!

অমিতাভ তার পুরোনো গবেষণার খাতাপত্রে খোঁজ নিতে শুরু করে। ‘কালো কাঠি’ শব্দটি সে আগে কোনওদিন শুনেছে কি? তেমন কিছু মনে পড়ে না। কিন্তু ‘কে সি” নামটি হয়তো কোথাও পড়েছিল।

দুইদিনের অনুসন্ধানে সে এক আশ্চর্য তথ্য খুঁজে পায়— ২০২২ সালে নবগ্রামের এক প্রাচীন রাজবাড়ির ইতিহাসে একটি কালো কাঠির উল্লেখ ছিল, যার মাধ্যমে নাকি অপার্থিব শক্তিকে ডাকা যেত। স্থানীয়দের মতে, সেই কাঠির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভিশাপ। যারা তা খোঁজার চেষ্টা করেছে, তাদের কেউ আর ফিরে আসেনি।

অমিতাভর মনে ভয় আর উত্তেজনা একসঙ্গে খেলে যায়। সে স্থির করে, যাইহোক, একবার গিয়ে দেখা যাক সেই রাজবাড়িটা।

অনেক খোঁজখবর নিয়ে অমিতাভ পৌঁছে গেল নবগ্রামে। নবগ্রামের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রাজবাড়ি এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। আগাছা আর বুনোগাছের জঙ্গল ঘিরে ফেলেছে চারপাশটা। গ্রামের লোকজন আজও সন্ধ্যার পরে ওদিকটায় যায় না।

অমিতাভবাবু লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে প্রবেশ করে রাজবাড়ির ভিতরে। পুরোনো মেঝে, ভাঙা সিঁড়ি, আর দেয়ালের গায়ে অদ্ভুত চিহ্ন— সবই এক রহস্যের ইঙ্গিত দেয়।

হঠাৎ, এক দেয়ালের পিছনে সে খুঁজে পায় একটি লুকানো দরজা। দরজাটি পুরোনো, কিন্তু ভিতর থেকে বন্ধ নয়। খোলা দরজার ভিতর ঢুকতেই ঠান্ডা একটা বাতাস এসে গায়ে লাগে। অমিতাভর মনে হল কেউ যেন সারা গায়ে বরফ ঢেলে দিয়েছে।

কিন্তু সবথেকে আশ্চর্যের কথা হল, ভিতরে রয়েছে বহু পুরোনো হাতে লেখা পুঁথি, একটি ধাতব বাক্স এবং সেই বাক্সের ঢাকনায় খোদাই করা কে সি নামটি।

এবার আরও অবাক হওয়ার পালা। বাক্সটি খোলার পর অমিতাভবাবু দেখেন, তার ভিতরে রয়েছে কিছু পুরোনো রোমান ও ভারতীয় মুদ্রা, একটি হাতঘড়ি, যা থেমে আছে ঠিক ১২:০২ মিনিটে, আর একটি মৃত আরশোলার শুকনো দেহ।

সবকিছুই যেন অর্থহীন— তবে সবকিছুর নীচে আবারও এক চিঠি:

সময় আটকে গেছে। যে এই ঘড়ি ধরবে, সে ফিরে যাবে ভুলে যাওয়া একটি সময়ে। কিন্তু সাবধান— যে অতীতে পা রাখবে, সে ভবিষ্যতের পথ হারাবে। তাই সাবধান।

অমিতাভবাবু ঠিক করে, সে সেই ঘড়ি ছোঁবে না। কিন্তু তখনই অসাবধান ভাবে তার হাত ছুঁয়ে যায় ঘড়িটিকে। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর তারপর সব কিছু অন্ধকার হয়ে যায়। কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

অমিতাভবাবু চোখ মেলে দেখেন, তিনি এখন আর ২০২৫ সালে নেই। চারপাশে আলোর বদলে কুয়াশা, গাড়ির বদলে ঘোড়ার গাড়ি, আর লোকজনের পোশাক একেবারেই শতাব্দী প্রাচীন।

তার বুঝতে আর অসুবিধে হয় না যে, ঘড়ি তার সময়কে সত্যিই পিছনে নিয়ে গেছে। এখন তিনি আছেন সেই নবগ্রাম রাজবাড়ির এক ভয়ংকর রাতের ঠিক আগে। যেই রাতে কালো কাঠি-র জন্য রাজপরিবারের সবাই নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।

অমিতাভবাবু লক্ষ্য করলেন, তিনি এখন ১৯২৭ সালের নবগ্রামের রাজবাড়িতে। চারপাশে রাজকীয় আলোর ঝলকানি, অন্দরমহলের ধূপের গন্ধ, আর প্রাচীন স্থাপত্যের গম্ভীর গর্জন। তার পোশাকও পালটে গেছে। তিনি এখন যেন একজন ব্রাহ্মণ ভৃত্য।

তবে তার সবথেকে বড়ো আশ্চর্য— সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে, যার চোখে ভয়। রাজকন্যা চন্দ্রাবতী। চন্দ্রাবতী অমিতাভবাবু-কে জিজ্ঞাসা করে, আপনি কি সচ্চিদানন্দ পণ্ডিত? রাজগুরু বলেছিলেন আপনি আজ আসবেন। কালো কাঠি নিয়ে কিছু বলবেন… রাজবাড়ি যেন আজ খুব অদ্ভুত।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...