উত্তর-পূর্বে হর কি দুন গিরিশিরা মাথা উঁচু করে দম্ভ প্রকাশ করছে। দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছি হর কি দুন উপত্যকার দিকে। ঢালু পথে ১৫ মিনিটের মধ্যে নেমে এলাম একটি ঝোরার কাছে। পাশেই অনেকটা উপর থেকে ঝাঁপিয়ে নামছে একটি সুদৃশ্য জলপ্রপাত। ঝোরা পেরিয়ে ১৫ মিনিট চড়াই ভাঙার পর সামনে ‘বসলো ক্যাম্প'। মনে হচ্ছে সারি সারি রঙিন (তাঁবু) ফুল ফুটে রয়েছে উপত্যকায়। সামনে এক একটি বিশাল দানবীয় শৃঙ্গ দৃশ্যমান। ঢালে হেঁটে যাওয়া বন্ধুদের লিলিপুট লাগছে। আরও ঘণ্টাখানেক চড়াই ভাঙার পর পৌঁছে গেলাম প্রকৃত অর্থে স্বর্গে। সবুজ গালিচায় মোড়া এক টুকরো স্বর্গ। অবর্ণনীয়, অনির্বচনীয় নৈসর্গিক সৌন্দর্য। সামনেই বিপুলাকৃতির হর কি দুন গিরিশিরা, বাঁদিকে রয়েছে হাতা পর্বত। ডানদিকে অর্থাৎ পূর্ব দিক জুড়ে রয়েছে স্বর্গারোহিণী শৃঙ্গরাজি।

ছবির মতো সুন্দর এই হর কি দুন উপত্যকা বহুকাল মানুষের কাছে অজানা, অবহেলিত ও অনাদৃত ছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি দুন স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক আরএল হোল্ডসওয়ার্থ, জেটিএম গিবসন, জ্যাক মার্টিন ও গুরদিয়াল সিং গ্রীষ্মাবকাশে বেরিয়ে পড়তেন হিমালয়ের গহিনে। শিক্ষকতা পেশা হলেও দুর্গমকে জয় করা আর জানার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা তাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত হিমালয়ের নানা স্বল্প পরিচিত অঞ্চলে। গিবসন ও তাঁর বন্ধুরা হিমাচলের বাসপা উপত্যকা থেকে ধৌলাধার গিরিশিরার বরাসু গিরিবর্ত অতিক্রম করে আবিষ্কার করেছিলেন হর কি দুন।

দেখতে পেয়েছিলেন দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা স্বর্গারোহিণী শৃঙ্গকে। এই উপত্যকা পাণ্ডবদের স্বর্গারোহণের কিংবদন্তি গায়ে মেখে পাশাপাশি পাঁচটি শৃঙ্গের মাঝে দৃপ্ত ভঙ্গিতে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বর্গারোহিণী (২০,৯৫৬ ফুট)- যেন চার ভাই ও দ্রৌপদীর মাঝে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির। মহাভারতে কথিত আছে পঞ্চপাণ্ডবরা দ্রৌপদী-সহ এই পথ ধরেই স্বর্গে আরোহণ করেছিলেন, তাই এর নাম ‘স্বর্গারোহিণী’। বিশাল স্বর্গারোহিণী গিরিশ্রেণি প্রাচীরের মতো ঘিরে রয়েছে যমদ্বার উপত্যকাকে। বাংলোর কাছে দাঁড়িয়ে পূর্ব দিকে বিস্তীর্ণ উপত্যকার দিকে তাকালে চোখে পড়বে হিমবাহ। সেখান থেকে যমদ্বার নালা বেরিয়ে এসে মিশেছে উত্তর দিক থেকে আসা মোরিন্দা আর মাতা-কি-গার্ডের মিলিত ধারার সঙ্গে। নাম হয়েছে হর কি দুন নালা, যা গিয়ে মিশেছে কলকাত্তিয়াধারের কাছে রুইনসারা গার্ডের সঙ্গে।





