রায়া আর মানসের বিয়ে হয়েছে বছর সাতেক আগে। তারও অনেক আগেই তাদের পরিচয়। রায়া যখন ক্লাস এইটে উঠল, তখন ওর বাবা বদলি হয়ে গেলেন ন্যাশনাল ব্যাংকের সোদপুর ব্রাঞ্চে। রায়াকে ভর্তি করা হল কনভেন্ট স্কুলে। সেখানেই মানসের সঙ্গে পরিচয়। মানসদের বাড়ি আগরপাড়ায়। ক্লাস এইটের সেই বন্ধুত্ব কলেজে ওঠার আগেই প্রেমের গণ্ডি পেরোয়। প্রেমে পড়ার কোনও নিজস্ব শর্ত থাকে না, কোনও কারণ থাকে না। দু’জনের মানসিক আদানপ্রদানই একটা সেতু গড়ে দেয়। ওদের মধ্যেও তেমন সেতু গড়ে উঠেছিল সবার অজান্তে, দু’জনের স্বপ্নেই মিশেছিল উচ্চাশা।
সোদপুর, আগরপাড়ার গলিঘুঁজি, নোনাধরা বাড়ির দেয়াল, গঙ্গাপাড়ের বস্তি— এসব থেকে অনেক অনেক দূরের দেশে তাদের নিজস্ব স্বপ্ন বেড়ে উঠছিল। কোনও তৃতীয়জন সে স্বপ্ন সম্পর্কে ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি। আর তাই উচ্চমাধ্যমিকে ভালো নম্বর নিয়ে বেরিয়ে কম্পিউটার সায়েন্স-এ ভর্তি হয় দু’জন। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি ওদের। ফোর্থ সেমিস্টার পেরোনোর আগেই নামকরা বহুজাতিক সংস্থায় প্রথম ক্যাম্পাসিং-এই চাকরি হয় মানস আর রায়ার। তাদের স্বপ্ন তখন বাস্তবের মাঠে রঙিন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে।
বিয়ের পর প্রথমে ওরা সেটলড হয় বেঙ্গালুরু-তে। বছর দুয়েক পর সেখান থেকে কোম্পানি পাঠায় নেদারল্যান্ডে। তারপর স্বপ্নের মতোই হু হু করে কেটে গেছে একের পর এক বছর। লম্বা ছুটিতে কখনও সুইটজারল্যান্ড, কখনও আমেরিকা! ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা মহাদেশগুলো হাতের তালুতে আঁকা ভাগ্যের মানচিত্রের মতোই স্পষ্ট হয়েছে বারবার। এত কিছু পাওয়ার মধ্যে না পাওয়া কিছুই খুঁজে পায়নি ওরা। চড় চড় করে স্যালারি গ্রাফ উপর দিকে উঠেছে, তার সঙ্গেই বাস্তবে উড়েছে একটার পর একটা রঙিন প্রজাপতি। এর মাঝখানে হোঁচট খাওয়া বলতে দুই একটা ঘটনা, যেমন গাড়ির লাইসেন্স পাওয়ার বিষয়টা। ও দেশে লাইসেন্স পেতে মানসকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। প্রথম ধাপ ছিল লিখিত পরীক্ষা, তাতে পাশ করার পর দ্বিতীয় ধাপ প্র্যাকটিক্যাল। বার দুয়েক প্র্যাকটিক্যালে সুবিধে করে উঠতে না পেরে, অবশেষে তৃতীয়বারের চেষ্টায় সফলতা। তারপর ডাচদের ভাষা শিখে ও দেশে পাকাপাকি ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টাও কম চাপের ছিল না। তবে এগুলোকে হোঁচট খাওয়া না বলে বরং ছোট্ট ছোট্ট হার্ডল পেরোনো বলাই ভালো।
—এই বাংলোয় একটা জিম এরিয়া করলে কেমন হয়? তুই যেভাবে মুটিয়ে যাচ্ছিস! তার উপর ওয়ার্ক ফ্রম হোম। অফিসে যাতায়াতের নড়াচড়াটুকুও উধাও!
—জিম এরিয়া তো হবেই। ওটা ম্যান্ডেটরি। আগে বাংলোর ইনসিওরেন্সটা প্রসিডিওর করি। আরও অনেক চমক থাকবে। – যেমন?
—তার খেলার জন্য দক্ষিণ-পূর্বের ওই জায়গাটা গোছাতে হবে।
—সে তো স্বপ্ন!
—স্বপ্নের বীজ জমা রেখে এসেছি তো ক্লিনিকে।
—ডক্টর সোম তো বললেন আর কিছুদিন অপেক্ষা করতে।
—সে তো পরিস্থিতির জন্য!
কখন যেন সেই সাদা প্রজাপতি পিটুনিয়াকে ছেড়ে হলুদ বোগেনভিলিয়ায় মজেছে!
স্বপ্নের মধ্যে দুঃস্বপ্নও আসে মাঝে মাঝে, হানাদারের মতো সে তার পাওনা-গণ্ডা বুঝে নিতে চায়। তখনই হঠাৎ মনে পড়ে যায় প্রজাপতির লাইফ স্প্যান মাত্র সাতদিনের। অসময়ে ঝনঝন করে বেজে ওঠে রায়ার মোবাইল।
এই তো সকালেই কথা হল মায়ের সঙ্গে, তাও ভিডিও কলিং-এ, রোজকার মতো। মায়ের মুখে হাসি, একটা বেগুনি রঙের কলমকারী পরেছে। গেল বারের শীতে বাবার সঙ্গে শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়ে সোনাঝুরির হাট থেকে কিনেছিল। জামরঙা জমিনের উপর বড়ো বড়ো ফুল, লতা, পাতা। সাবেকি ডিজাইনের নয়, বেশ নতুনত্ব আছে। সকাল সাতটায় তখন রায়ার হাতে কফির কাপ আর ওদিকে রান্না স্নান সেরে মা বসেছে মুখোমুখি। এখানে সময় সাতটা কী সাড়ে সাতটা, ওখানে তখন সূর্য মধ্যগগনে পাড়ি দেবে দেবে করছে। মায়ের হাতে খবরের কাগজ। এই অভ্যাসটা সেই কোন ছোটোবেলার থেকে রায়া আর রিমি দেখে আসছে। রুটিনমাফিক চলে মা। এতটুকুন নড়চড় হবার উপায় নেই। বাবা নিশ্চয়ই স্নানে গেছে। এর মধ্যে রায়ার সঙ্গে ভিডিও কলিং সেরে নেওয়া আর কী। কীভাবে আলু ফুলকপি দিয়ে পাতলা মাছের ঝোল করতে হয়, শুক্তোতে কী ফোড়ন দিলে স্বাদ খোলে কিংবা পটলের খোসা কীভাবে ছাড়িয়ে নিতে হয়— সবটাই মা শিখিয়ে দিয়েছে এমন মুখোমুখি ল্যাপটপের ওধারে বসেই। কিন্তু আজ সকালেও তো কিছু মনে হয়নি!
—হঠাৎ বিকেলে বাথরুমে পড়ে গিয়েই…
রিমির কথা শেষ হয় না, শিথিল হয়ে আসে রায়ার শরীর! শিকড়ে টান লাগে!
ভারত, বাংলাদেশে তখন কোভিডের তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে। চারিদিকে হাহাকার। সরকারি হিসেব ছাড়িয়ে মৃতের সংখ্যা ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে কলকাতা মেডিকেল কলেজ, এসএসকেএম-এর অবস্থা দেখে শিউরে উঠতে হয়! সেই ঢেউ যে এভাবে এত দূরে ডাচদের দেশে আছড়ে পড়বে তা বোধকরি বিধাতারও অজানা।
টেলিফোনের ওপারে বাবার সেই শক্ত ও শান্ত কণ্ঠস্বর! ‘ছেলেমানুষি করিস না রায়া। যা হওয়ার হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে তোদের এখানে আসাটা ঠিক হবে না।’
তারপর মানসের সঙ্গে দফায় দফায় রিমির কথা হয়। রিমি বলে, ‘এখানকার অবস্থা মোটেও ভালো নয়। ফ্লাইটে আসতে অসুবিধা কিছু নেই, কিন্তু এ রোগ সাংঘাতিক! তোমরা বিপদে পড়তে পারো!”
দেশে ফেরা হয়নি রায়ার। মা যেদিন চলে গেল, সেদিন ভিডিও কলিং-এ মায়ের মুখখানা শেষবারের মতো দেখিয়েছিল রিমি। কেমন হাসি হাসি মুখ। পানিহাটি বার্নিংঘাটে যখন চাল-কলা-তিল মেখে মায়ের মুখে দিচ্ছে রিমি, রায়ার স্বপ্নের প্রজাপতিটা ডানা ছেঁড়া অসহায় পোকার মতো ছটফট করছে। তিনদিন পর বিদেশে বসেই নিয়মমাফিক শ্রাদ্ধ সেরেছে সে।
(ক্রমশ…)





