দিল্লিতে জন্ম এবং হরিয়ানার এক জাঠ পরিবারের সন্তান প্রাচী তেহলান মনেপ্রাণে একজন খাঁটি ভারতীয়। খেলার মাধ্যমেই তিনি শিখেছেন যে, গোটা দেশই তাঁর ঘর। একারণেই দেশের যে-কোনও প্রান্তে তিনি নিজেকে আপন মনে করেন। বর্তমানে তিনি কেরালায় থাকেন, যেখান থেকে ‘মামাঙ্গাম’ ছবির মাধ্যমে তিনি প্রথম বড়ো স্বীকৃতি পান।
তাঁর মতে, “দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র অনন্য। ওখানকার গল্পগুলো ভারতীয় সংস্কৃতিতে গভীর, আবেগপূর্ণ প্রভাব ফেলে চলেছে। ওখানকার কলাকুশলী ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যেও এক অনন্য আবেগ রয়েছে। তাদের কঠোর পরিশ্রম এবং আবেগ প্রতিটি দৃশ্যে, প্রতিটি ফ্রেমে সুস্পষ্ট। এখানে শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণই হয় না, বরং এই শিল্পকে শ্রদ্ধা করা হয়। দক্ষিণ ভারতে চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এক আবেগঘন সংযোগ। এ কারণেই এখানকার দর্শকরা এত আবেগপ্রবণ। তাদের ভালোবাসা ও উন্মাদনাই এই শিল্পকে ক্রমাগত নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে এবং সম্ভবত এই কারণেই এখানকার চলচ্চিত্র ব্যাবসা দিন দিন উন্নতি করছে।’
আজকের সমাজে নারীর অবস্থান
প্রাচী জানিয়েছেন যে, “আজকের ভারতীয় নারীরা দশ বছর আগের নারীদের মতো আর নেই। তাঁরা এখন আরও শক্তিশালী, আরও সচেতন এবং আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ঘরে বসে অর্থ উপার্জন-ই হোক কিংবা যে-কোনও শিল্পে প্রবেশ করা, তাদের সামনে সব ধরনের সুযোগ রয়েছে। আজকের নারীরা শুধু স্বপ্নই দেখেন না, সেই স্বপ্ন পূরণের সাহসও তাদের আছে। তারা শিক্ষা, ব্যাবসা, খেলাধুলা, বিনোদন— প্রতিটি ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছেন এবং সত্যি বলতে কী, অনেক শিল্পে তারা পুরুষদের চেয়েও এগিয়ে রয়েছেন। তাই, আমি মনে করি, এটি নারীদের যুগ। নারীরা দুর্বল নয়, বরং সর্ব অর্থে শক্তিশালী। তারা নিজেদের শর্তে জীবনযাপন করছে, নিজেদের অধিকারের জন্য সোচ্চার হচ্ছে এবং নিজেদের প্রমাণ করছে। সুতরাং, তাদের দুর্বল ভাবার সময় শেষ। নারীরা এখন শক্তি ও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এবং এই যুগকে নিজেদের হাতে তুলে নিতে প্রস্তুত।’
তিনি আরও জানিয়েছেন যে, ‘আমি আমার সাধ্যমতো ভালো কিছু কাজ করার চেষ্টা করছি এবং তা নিয়ে আমি গর্বিত। আমার চারপাশে এমন মানুষেরা আছেন, যারা আমার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে মন থেকে গ্রহণ করেন। তারা আমাকে পুরোপুরি সমর্থন করেন, প্রতিটি পদক্ষেপে আমার পাশে থাকেন এবং আমাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে দেখে খুশি হন। সমাজ কেমন তা আমি জানি না। কিন্তু আমার চারপাশের পৃথিবীটা অবিশ্বাস্য ভাবে প্রগতিশীল। আমার ভাই, আমার বাবা, আমার বন্ধুরা প্রত্যেকেই আমার অগ্রগতির চালিকাশক্তি।’
পুরস্কার এবং সম্মানলাভ
প্রাচীর সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব ছিল ২১ বছর বয়সে প্রথম পদক জয় করা। ভারতের নেটবল অধিনায়ক হিসাবে প্রাচী ২০১১ সালে দক্ষিণ এশীয় বিচ গেমসে ভারতীয় দলকে তাদের প্রথম পদক এনে দেন। এই কৃতিত্বের জন্য সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় অধিনায়ক হিসেবে তাঁর নাম “লিমকা বুক অফ রেকর্ডস’-এ নথিভুক্ত হয়। তাঁর আরও একটি স্বপ্ন ছিল IIT / IIM-এ পড়াশোনা করা। যদিও তিনি সেখানে পড়াশোনা করতে পারেননি, কিন্তু TED-এ বক্তা হয়ে সেখানে নিজের গল্প বলাটা ছিল তাঁর কাছে স্বপ্নপূরণের মতো। তাঁর চলচ্চিত্র জীবনে তিনি প্রতিটি ভাষায় প্রথম অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ নবাগতা হিসেবে সম্মান পেয়েছেন। তিনি নিকনের ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরও হয়েছিলেন।
বদলে যাওয়া জীবন
প্রাচী জানিয়েছেন, ‘লকডাউন আমার জীবনটা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। করোনা আমাদের শিখিয়েছে যে, জীবন খুবই অনিশ্চিত। জীবনে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা জরুরি। আমাদের বিচক্ষণ হওয়া উচিত এবং কাজ করাও জরুরি। কিন্তু জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখাও খুব জরুরি। আমরা শুধু নিরর্থক দৌড়ে জীবন পার করছিলাম এবং প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে শামিল ছিলাম। কিন্তু আমাদের এটা বোঝা জরুরি যে, প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো, সুন্দর স্মৃতি তৈরি করা এবং সুখী থাকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। করোনা আমার দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনযাত্রা, এমনকী নিজেকে দেখার পদ্ধতিও বদলে দিয়েছে। সত্যি বলতে কী, লকডাউন আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল আমার জীবনে। এই সময়টাই আমাকে আমার জীবনের সেরা ও সবচেয়ে শক্তিশালী রূপে গড়ে তুলেছে। লোকে বলে, কখনও কখনও স্থবিরতার মধ্যেই অগ্রগতি লুকিয়ে থাকে। আর আমার জন্য, সেই স্থবিরতাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো সাফল্য হয়ে উঠেছিল।’
আবেগপূর্ণ মুহূর্ত
জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা হৃদয়ে চিরকালের জন্য গেঁথে যায়। প্রাচী-র মতে, ‘আমার জীবনেও এমনই দুটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল—
প্রথমটি ছিল ২০১০ সালের কমনওয়েলথ গেমসের জন্য ভারতীয় দলের অধিনায়ক নিযুক্ত হওয়ার মুহূর্তটি। সেই মুহূর্তের আনন্দ আমার হৃদয়ে আজও বিরাজমান। যখন বাবাকে খবরটি জানাতে ফোন করি, তখন গর্বে ও আনন্দে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। তাই সেই মুহূর্তটি ছিল অমূল্য।
দ্বিতীয়ত, যখন সুপারস্টার মামুট্টির সঙ্গে আমার প্রথম দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সূচনা হয়েছিল। চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর মুম্বইয়ের বিকেসি-তে শুটিং এবং তারপর বাবাকে ফোন করে সুসংবাদটি জানানো— সেই অনুভূতি কেমন ছিল, তা আমার পক্ষে ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল।”
নারীশক্তি
প্রাচী প্রসঙ্গত আরও জানিয়েছেন যে, ‘নারীদের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হল তাদের আবেগ এবং সহজাত প্রবৃত্তি। এই দুটি অস্ত্র, যা সঠিক ভাবে ব্যবহার করা হলে একজন নারীকে তার নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে এবং বিশ্বকে উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। যদি একজন নারী তার জীবনের কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জন করেন, তবে তিনি তার আবেগগত উপলব্ধি এবং জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এমন কিছু অর্জন করতে পারেন, যা হয়তো পুরুষরা পারে না। কথায় আছে, নিজের মনকে অনুসরণ করুন এবং নিজের চিন্তাকে অনুসরণ করুন, সাফল্য এসে নিজে থেকেই আলিঙ্গন করবে।’
‘আজকের নারীরা অনেকে এটাই করেন। তারা তাদের হৃদয়কে অনুসরণ করেন এবং নিজেদের বুদ্ধি দিয়ে পথ তৈরি করেন। এটাই তাদের সহজাত শক্তি। অধিকন্তু, সমাজে নারীর অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য তাদের আত্মরক্ষার কৌশল রপ্ত করাও অপরিহার্য। তাদের উচ্চ শিক্ষিত হওয়া উচিত এবং নিজের ব্যক্তিত্বকে উন্নত করা উচিত, যাতে কেউ কোনও ভুল কাজ করার আগে দশবার ভাবে।’
পুরস্কার এবং সম্মান
প্রাচী-র সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব ছিল ২১ বছর বয়সে প্রথম পদক জয় করা। ভারতের নেটবল অধিনায়ক হিসাবে প্রাচী ২০১১ সালে দক্ষিণ এশীয় বিচ গেমসে ভারতীয় দলকে তাদের প্রথম পদক এনে দেন। এই কৃতিত্বের জন্য সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় অধিনায়ক হিসেবে তাঁর নাম “লিমকা বুক অফ রেকর্ডস’-এ নথিভুক্ত হয়। তাঁর আরও একটি স্বপ্ন ছিল আইআইটি/ আইআইএম-এ পড়াশোনা করা। যদিও তিনি সেখানে পড়াশোনা করতে পারেননি, কিন্তু টেড-এ বক্তা হয়ে সেখানে নজের গল্প বলাটা ছিল তাঁর কাছে স্বপ্নপূরণের মতো। তাঁর চলচ্চিত্র জীবনে তিনি প্রতিটি ভাষায় প্রথম অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ নবাগতা হিসেবে সম্মান পেয়েছেন। তিনি নিকনের ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরও হয়েছিলেন।
—গরিমা পঙ্কজ





