আজ স্বাধীনতা দিবসের দিন কাজের মেয়ে সোমার হাতে দু’গালে দু’টো বাহান্ন সিক্কার চড় খেলেন শুভংকর। সকাল থেকেই পাড়ার ক্লাবে দেশভক্তির ঠেলায় তাঁর ঘুম চৌপাট হয়ে গেছে। গাঁক গাঁক করে মাইক বাজাচ্ছে। “সারে জাঁহাসে আচ্ছা, অ্যায় মেরে বতন…” শুনতে মন্দ লাগছিল না। বালিশে মুখ গুঁজে পড়েছিলেন শুভংকর।

না, মাইকের গান তাঁর ঘুম ভাঙায়নি। দোলন তাড়া লাগিয়ে ঘুমের চোদ্দোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। ‘ওঠো, ওঠো, ওঠো, দরজা লাগিয়ে আবার শোবেখন। আর যা বলেছি, মনে থাকবে তো? আপনভোলার মতো পড়ে থেকো না।’ শুভংকর ওই না শোনার মতো করে শুনেছেন। দোলনকে টাটা করে আবার এসে গড়িয়ে পড়েছেন। ঘুম তো আর আসবে না। ওই মটকা মেরে পড়ে থাকা যাকে বলে।

শুভংকর চোখ বুজে মনে মনে হিসেব করেন, আজ তাহলে কততম স্বাধীনতা দিবস? তখনই ডোর বেল বেজে উঠল, ‘ডিং ডং’। দোলন বলে গেছে, সোমা মেয়েটা আসবে। ওকে দরজা খুলে দিও। দেখো আবার কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে থেকো না। সোমা এসে ফিরে গেলে আজ হোটেল থেকে খাবার আনাতে হবে। ঘরদোর সব আ—ধোওয়া, আ—মোছা পড়ে থাকলে আমার মেজাজ ঠিক থাকে না।”

শুভংকর হাই তুলে হাঁ-গালে তুড়ি মারতে মারতে বলেছেন, ‘ঠিক আছে। তুমি এসো। সাবধানে যেও।’

দরজা খুলে দিয়ে শুভংকর অবাক। এই মেয়েটাই সোমা! সোমা শুভংকরকে দেখে একগাল হেসে বলল, ‘কী আজ বউদি ঠেলে উঠিয়ে দিয়ে গেছে তো? বেশ হয়েছে। যেমন ভোঁসভোঁস করে ঘুমোও তুমি!’

শুভংকর ভাবেন, এ তো আচ্ছা মেয়ে! এমন ভাবে মুখে খই ফোটাচ্ছ, যেন কতকালের চেনা। শুভংকর কী বলবেন?

সোমা বলল, “দাঁড়িয়ে রইলে যে! সরো! আমাকে ঢুকতে দাও।” বলে একেবারে শুভংকরের গা ঘেঁষে ঘরে ঢুকে পড়ে সোমা।

সোমা বেশ সুন্দরী। লোকের বাড়ি কাজ করা গোছের চেহারা নয় একেবারেই। রংটা একটু চাপা। হলে কী হবে? মুখটা অনেকটা সিনেমার হিরোইন রেখা রেখা ভাব। চোখে ও ঠোঁটে তেমনই অ্যাপিল। আর তেমনই শরীরের গড়নপিটন। চিকন কোমর থেকে নীচের দিকের ঢল নামা পিছনের কী জ্যামিতি! আহা! বড়ো একটা পিতলের কলসি উপুড় করলে এমনই দেখায়। সাজগোজের ঢক আছে ষোলোআনা। মনে মনে ভাবছিলেন শুভংকর মিত্র। একটা ডেইলির নিউজ এডিটর। মাঝবয়সি লোক। সোমা হিসেব মতো তাঁর মেয়ে অদ্রিজার বয়সিই হবে। তা বাপের বয়সি লোক হয়ে ওই একরত্তি মেয়ের শরীরের ভাস্কর্য বোঝাটা খুব খারাপ কাজ। তবু হাজার হলেও শুভংকর তো পুরুষ মানুষ। তাই নারীর শরীরের চিত্রিতকলা ও ভাস্কর্যে মোহিত হওয়াটা কি খুব দোষের? এটুকুতে দোষ নেই। তবে আর বেশি এগিও না। বিপদে পোড়ো না। শুভংকর এভাবেই নিজেকে শাসনে বেঁধে রাখেন।

ওঁদের নিউজ ডেস্কের সোমলতা, ঋতজাদেরও দেখেন তিনি। দুটো মেয়ে দু’জাতের ডাকসাইটে সুন্দরী। ওদের স্কিনটাইট জিনস আর একটা ক্যাজুয়াল খাটো টপ শরীরের হ্রদ, উপত্যকা সব চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। শুভংকরের মনটা ছুক ছুক করে। কিন্তু বাইরে তার কোনও ভাব—বিকার ঘটতে দেন না। তিনি মনকে ধমক লাগান। ছিঃ শুভংকর, তুমিও মেয়ের বাপ। মেয়ের বাপকে অনেক সংযত হতে হয়। একটা কেলেঙ্কারি করে বসলে লোকে মুখে থুতু দেবে। সংবাদপত্রের নিউজ এডিটরই তখন সংবাদের শিরোনামে উঠে আসবে। একেবারে কেলেঙ্কারির একশেষ। জাত, কুল, মান, চাকরি সব যাবে। দীপ্যমান দত্তর ঘটনাটাই তো চোখের সামনে একটা জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত।

কী কেলেঙ্কারিই না হল শেষটায়। ওর আন্ডারে যে পিএইচডি করছে সেই মেয়ে আর বউয়ের সাঁড়াশি আক্রমণে জান-প্রাণ-মান সব যায় যায় আর কী। লোকলজ্জা তো রয়েইছে। তবে ব্যাটার কলজে আছে। ঘরে—বাইরে, সোশাল মিডিয়ায় ঢি ঢি পড়ে গেল। তবু তার কোনও হেলদোল নেই। শুভংকর হলে ওদের বহুতল আবাসনের ছাদে উঠে সোজা পপাতধরণীতলে। তাছাড়া কোনও উপায় থাকবে না। নামকরা সাংবাদিক মানুষ। পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র জ্ঞানে পায়ে এসে পড়ে। তারা মুখে রুমাল চাপা দিয়ে বলবে, ‘কাকু, আপনার তাহলে এই কেস! এই ছুকছুকুনি কলেজের প্রফেসর আপনি!” স্ত্রী দোলন বলবে, “ছিঃ ছিঃ আমাকে স্কুল ছেড়ে দিতে হবে। কলিগদের কাছে আমি মুখ দেখাব কী করে? হাজব্যান্ড সাংবাদিক বলে যে সুতপার গা জ্বলুনির শেষ নেই, সেই সুতপা তো আসর জমিয়ে বসবে।’

মেয়ে অদ্রিজা বেঙ্গালুরু থেকে ওর মাকে ফোন করে বলবে, ‘বাবার নামে এসব কী শুনছি মা? ঘেন্নায় আমার গা গুলিয়ে উঠছে।’ শুভংকর ভাবেন, এসব কথার গোলাগুলি ছুটে আসবে চারদিক থেকে। সেদিক দিয়ে দীপ্যমানের কপাল ভালো যে, তার একেবারেই ছেলেমানুষ বয়স। অল্প বয়সিদের বেলায় শুধু কেলো। আর বয়স্কদের বেলায় তা বিচ্ছিরি কেলেঙ্কারি। অল্পবয়সিদের কেলোতে মানুষ অত আমল দেয় না। কাঁচা বয়সে ওরকম একটু আধটু ভুলচুক হতেই পারে বলে অনেকে আবার কেসটা কনসিডার করে। কিন্তু, বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে কেস আদপেই পেটি কেস না। প্রেস্টিজে একেবারে পচা ডিম কেস হয়ে যাবে। কাঁচা বয়সের কেলো, মানুষ বেশিদিন মনে রাখে না। কাঁচা আম যেমন দুদিন রোদে শুকিয়ে নিলে আমসি হয়ে যায়, তেমনই। কিন্তু কাঁচা আম আমসি হয়ে যায়। তবে, শুভংকরের মতো উচ্চশিক্ষিত মানুষের কেলেঙ্কারি হবে পাকা আমের মতো। লোকে চোকলা ছাড়িয়ে তারিয়ে তারিয়ে খাবে। আঁটি চুষে চুষে চোয়াল ব্যথা করে ফেলবে। তবু রসের আশ মিটবে না। সেখানেই শেষ না। ছাইয়ের গাদায় ফেলা সেই আঁটি থেকে আবার নতুন অঙ্কুর গজাবে। মানে দেরাজ থেকে পুরোনো ছবি বের করার মতো করে সবান্ধবে গুলজার করবে। বলবে, মনে আছে সেই সাংবাদিকের কেলেঙ্কারির কথা? মেয়ের বন্ধুরা মেয়েকে বলবে, তোর বাবা লোকটার কথা ভেবে জাস্ট ঘেন্না হচ্ছে। খারাপ লাগছে, ওই লোকটার পায়ে হাত দিয়ে আমরা প্রণাম করেছি।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...