চোখের সামনে সেই পাথুরে পথ, সেই হিমবাহ, জলস্রোত পারাপার, বসুধারার সুতীব্র অট্টহাসি, উন্মাদিনী হাওয়া... আমি তো ফিরতে পারিনি। বসে আছি বসুধারার পায়ের তলায়। এই তো এখানে সন্ধে নামছে। অন্ধকার ছেয়ে আসছে পাহাড়ে, নর-নারায়ণের বুকে। মেঘ জুড়ে বসছে তার প্রত্যন্ত এলাকায়। সেই মেঘ ছিঁড়েখুঁড়ে অঝোর ধারায় নেমে আসছে শুভ্রবর্ণা ফেনিল বসুধারা। ওই পাহাড়ের কোল ঘেঁসে বয়ে চলেছে একা অনন্যা অলকানন্দা। তার দু'হাত ধরে আছে দুই মহীয়সী হিমবাহ। ধ্যানে বসেছেন আদি অনন্ত নীলকণ্ঠ পর্বত। সামনে এই অনন্ত দুর্গম পথ পেরিয়ে স্বর্গারোহণের উদ্দেশ্যে হেঁটে চলেছেন পঞ্চপাণ্ডব। আমি যেন চাক্ষুষ করছি সেইসব দৃশ্য। আর একটু পর মেঘের আড়াল থেকে সেই ঝরনার আলোর মতো নেমে আসবে স্বর্গের রথ। আমি মিশে যাব সেই আলোয়, সেই ধারায় ইন্দ্রিয়াতীত মেলবন্ধনের ডাকে।

ফেরা
ভোর চারটে। সারা পৃথিবীর সমস্ত শক্তি একত্রিত করে উঠে দাঁড়ালাম বদ্রীনাথের হোটেলে। নেমে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো দেখতে চাই নীলকণ্ঠকে। তখন বাইরে অন্ধকার। একটু পরেই অন্ধকারের বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে সূর্যের প্রথম রশ্মি আর তার আলোয় চোখ মেলবে ধ্যানমগ্ন নীলকণ্ঠ পর্বত। সময় হয়ে এল। আলো জ্বলে উঠল আকাশের বুকে। এই আলো আমরা আমাদের শ্বাসবায়ুতে মিশিয়ে নিলাম। এরপর অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। সকাল আটটায় বদ্রীনাথ ছাড়লাম আমরা। গাড়ি নেমে চলল পাহাড়ের ঢাল ধরে। গোবিন্দঘাট পেরিয়ে পাহাড়ের বাঁক ঘুরতেই রাস্তা নেমে গেছে অলকানন্দায়। আমরাও সেই রাস্তা ধরে নেমে গেলাম নদীতে। সেই খরস্রোতা নদীর গল্পে আমাদের নাম দিলাম জুড়ে। বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার চলা শুরু। বেলা বারোটা নাগাদ হেলং পৌঁছে হোটেলে লাঞ্চ -পর্ব সেরে নিলাম জলদি। পথে দেরি না করাই শ্রেয়।

যোশিমঠের বিখ্যাত ল্যান্ডস্লাইড জোন পেরিয়ে আসার একটা অদ্ভুত শাস্তি থাকে। আজ একদিনে তিনশো দশ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে যেতে হবে। পাহাড়ি পথে এটা বিশেষ সহজ ব্যাপার নয়। পথে দেরি হলে দেবপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ বা শ্রীনগরেও থাকার ব্যবস্থা আছে। তবে আমাদের লক্ষ্য হরিদ্বার। রাস্তা ফাঁকা থাকায় বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে ঢুকে গেলাম ঋষিকেশ। তাহলে আর ঘণ্টাখানেক। এবার ফোন করে হোটেল বুক করলাম হরিদ্বারে।





