শুভংকরের বুক কেঁপে ওঠে। ভাবেন, এ কী ডেঞ্জারাস মেয়েরে বাবা! এ মেয়ে তো শুভংকরকে দিয়ে একটা কেলেঙ্কারি না করিয়েই ছাড়বে না। শুভংকর মনকে শাসানি দেন। না, শুভংকর এসব ফাঁদে পা দিও না। এই সোমারা জানে, শুভংকরদের দুর্বলতা কোথায়। সাতবাড়ি চরিয়ে খায় এরা। এভাবে দুর্বল করে ফাঁসিয়ে কাজ হাসিল করবে। এখন দিনকাল একদম ভালো না।

ওদের মতো মেয়েরা জানে, এই মাঝবয়সি পুরুষগুলো সব এক একটা মোমবাত্তি। আগুন শরীরের একটু ছোঁয়া পেলেই তালজ্ঞান খুইয়ে বসে। তারপর স্রেফ গলতে শুরু করবে। বেশিরভাগই বউয়ের সামনে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক। বউ বাড়ি না থাকলে এইসব ভদ্রলোকদের খোলস খসে পড়ে। শুভংকরের এসব টনটনে জ্ঞান আছে বিলক্ষণ। সুতরাং সিদ্ধপুরুষের মতো অনড় হও। ভেবে নিয়ে গুছিয়ে বসেন শুভংকর। খবরের কাগজে মন বসাতে চান। কিন্তু মন বসে না। এই সোমা মেয়েটা আজ সব গুবলেট করে দিয়েছে। শুভংকর নিজেকে রিলায়েবল অ্যান্ড ওয়ান্ডারফুল হাজব্যান্ড মনে করেন।

শুভংকরের কান কাঁপিয়ে মোবাইলের রিংটোন বেজে ওঠে। শুভংকর উঠে গিয়ে বিছানা থেকে মুঠোয় নেন মোবাইলটাকে। কালার স্ক্রিনে কাঁপছে সুভাষ কলিং। শুভংকর ভাবেন, আজ তাঁর অফিস ছুটি, তা জানেন সুভাষ। এখনই বলবেন, “আমি যাচ্ছি তোর বাড়ি। চুটিয়ে আড্ডা মারব আজ।’ শুভংকর ভাবেন, সোমার সঙ্গে তাঁর মিষ্টি মিষ্টি একটা ব্যাপার হচ্ছে, হোক না। সোমা কদূর যায়, দেখাই যাক না। সুভাষ এলে স্রেফ দাল মে কালা কেস হবে। ঘেঁটে যাবে সব। তাছাড়া, সোমাকে দেখলে ও ব্যাটা ঠিকই বলবে, “বাহ! বেছে বেছে একটা সেক্সি কাজের মেয়েও জুটিয়েছিস তো?’ ও ব্যাটার মুখে কোনও লাগাম নেই। বলতেই পারে। তারপর বন্ধুমহলে এনিয়ে স্থূল রসিকতাও করতে ছাড়বে না। তাই ফোন ধরে কী বলবেন, ভাবছিলেন শুভংকর। ভাবতে ভাবতেই রিংটোন মিলিয়ে গেল। শুভংকর ভাবলেন, যাক বাঁচা গেল। কিন্তু না। ফের বেজে উঠল ফোন।

সোমা কিচেন থেকে ছুটে আসে। বলে, ‘ও হরি! ফোন তো তোমার হাতেই আছে। তা বেজে যাচ্ছে, ধরছ না যে!”

শুভংকর বললেন, ‘ধরছি না, তার কারণ আছে। এখনই আড্ডা দেবে বলে ছুটে আসবে।’

সোমা বলল, “রক্ষে করো বাবা। বউদি বাড়ি নেই, আমি আর তুমি বেশ আছি। আর ঝামেলা বাড়িও না।”

শুভংকরের মনের কথাটাই যেন বলল সোমা। আবার রিংটোন।

সোমা বলল, ‘ফোন ধরে বলে দাও বাড়িতে নেই। দূরে কোথাও গেছ বলে দাও।’

শুভংকর তা-ই করলেন। ফোন ধরে বললেন, “একটা বিশেষ কাজে যাদবপুরে এসেছি। তুই বিকেলে শ্যামলকে ডেকে নিয়ে চলে আয়।”

সোমা চোখ বড়ো বড়ো করে তাকায় শুভংকরের চোখে। বলে, ‘তুমি হেব্বি দিলে তো!’ শুভংকর লজ্জা পেয়ে যায়। এভাবে অবলীলায় ডাহা মিথ্যেটা সোমার সামনে না বললেই ভালো ছিল।

যাকগে, শুভংকর সোমার গুগলিটাকে কব্জি ঘুরিয়ে বাউন্ডারিতে পাঠালেন। বললেন, ‘তোর কথা ভেবেই তো বললাম। ও এলে তোকে আবার লুচি করে খাওয়াতে হবে। অন্তত দু’দফায় চা করতে হবে। তোর আর বাড়ি যাওয়া হবে না তাহলে।”

সোমা মাথা দুলিয়ে বলল, ‘সেটা কিন্তু তুমি ঠিকই বলেছ। তোমার বন্ধু, একটু চা-জলখাবার করে না খাওয়ালে পেসটিচ থাকে না। এই রে আমি ময়দা মেখে রেখে এসেচি।” বলে সোমা দ্রুত পায়ে কিচেনে ঢুকে পড়ে।

অনেকক্ষণ সোমার কোনও সাড়া না পেয়ে তিনি শিকারি বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে কিচেনে উঁকি দেন। দেখতে চান সোমা কী করছে? দেখলেন, সোমা এরই মধ্যে লুচি বেলতে শুরু করেছে। শুভংকর ভাবেন, না সব ঠিকই আছে। পায়ে পায়ে গিয়ে আবার ব্যালকনিতে বসেন শুভংকর। এদিকটা ফ্ল্যাটের পিছন দিক। আম, কাঁঠাল, জাম, জামরুল গাছের জটলা। গাছে গাছে হরেক পাখপাখালির কলকাকলি লেগেই আছে। শুভংকর তাই আর প্রোমোটারের সঙ্গে দরদস্তুর করেননি বেশি। মনে মনে বলেছেন, আহা এমন সবুজের সমারোহ! এর দামই তো কোটি টাকা। ব্যালকনিতে বসলে চোখ জুড়িয়ে যায়। তবে মনে মনে একটা আশঙ্কাও উঁকিঝুঁকি দেয় তাঁর। তা হল, এই ফাঁকা জমিতে প্রোমোটারের চোখ পড়তে আর কতক্ষণ? এখনও পর্যন্ত এদিকটা আইসোলেটেড জোন। এদিকটা কোনও জনমানবের দৃষ্টি পড়ে না। তাই ওই দুঃসাহসী মেয়েটা যদি কোনও ছলে ঝুপ করে শুভংকরের কোলেও বসে পড়ে, তাহলে তা গাছের পাতা আর পাখি ছাড়া কারও নজরে পড়বে না। এসবই ভাবছিলেন শুভংকর। আবার এ-ও ভাবছিলেন, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...