যম— নোট হল।
চিত্রগুপ্ত— আপনার সব বই কি নিজের লেখা? আপনি হলপ করে বলতে পারেন, আপনি একটিও শব্দ, একটি লাইনও টোকেননি?
কবি— তা কী করে বলি! এত বই পড়েছি, দু-একটা তো ঢুকে যেতেই পারে।
চিত্রগুপ্ত— আমার খাতা বলছে, প্রথম দিকে অনিচ্ছাকৃত টুকলেও, পরের দিকে বেশ কিছু ইচ্ছাকৃত টুকেছেন।
কবি— কোনও প্রমাণ আছে?
চিত্রগুপ্ত— আপনি পুরাণ, গীতা, রামায়ণ, মহাভারত, বেদ, উপনিষদ, গণিত, ফিজিক্স, জেনেটিক্স, অন্যান্য বিষয় কিছুই বাদ দেননি টোকা থেকে।
কবি— লেখার মধ্যে তো সবই থাকবে।
চিত্রগুপ্ত— তাহলে আপনার কী থাকল, খালি কলম ?
কবি— মানে?
চিত্রগুপ্ত— নোট করুন মাই লর্ড, ইনি প্রথমে অনুপ্রাণিত লেখা, পরে জ্ঞান হতে মহান কাব্য ও অন্যান্য ভালো বই, তরুণ কবিদের ভালো কবিতার সার টুকতে শুরু করেন।
চিত্রগুপ্ত— আপনি প্রেম করেছিলেন?
কবি— কবি তো প্রেমিক। তার প্রেম সদা চঞ্চল। অনেকবার প্রেমে পড়েছি।
চিত্রগুপ্ত— তার মানে আপনি বহুগামী ছিলেন। এক স্ত্রী-তে মন ভরেনি।
কবি— ঠিক সেরকম নয় হুজুর। কাব্যি করতে গেলে প্রেম দরকার, বিরহ দরকার। এমনকী নারী শরীরের রূপ জানতে হয়, দেখতে হয়। তবে খারাপ চোখে না স্যার ।
চিত্রগুপ্ত— মাই লর্ড, কবি নিজেই স্বীকার করছেন, কবিতা লেখার জন্য বাস্তবে অবাস্তবে বহু প্রেম করেছেন, এমনকী নারী শরীরও নিজের কাব্যে ব্যবহার করেছেন। মর্তে যেখানে তাকানোই শ্লীলতাহানি, সেখানে উনি নিজের প্রয়োজনে তাকে নিজের মতো সাজিয়েছেন।
চিত্রগুপ্ত— আপনি কী রচনা করতেন একটু ডিটেলে বলুন?
কবি— আমি প্রেম, বিরহ, যন্ত্রণা, সমাজ, প্রকৃতি, সবকিছু নিয়েই লিখেছি।
চিত্রগুপ্ত— এই যে বললেন প্রেম, বিরহ, যন্ত্রণা— এগুলো কি আপনার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ?
কবি— নিশ্চয় স্যার, আমার নিজস্ব ভাবনা।
চিত্রগুপ্ত— তার মানে কেউ আপনার লেখা পড়ে আনন্দ পেয়েছে, কেউ কষ্টও পেয়েছে?
কবি— হ্যাঁ স্যার। একজন তো আমাকে বলেছিল, আপনার লেখা পড়ে চোখে জল এসে গিয়েছিল। আর একজন বলেছিল, মানসিক যন্ত্রণায় ছিলাম, আপনার লেখা পড়ে কষ্ট যন্ত্রণা কমে গিয়েছে।
চিত্রগুপ্ত— কথাগুলি ভালো করে শুনবেন মাই লর্ড। এই কবি নিয়তি ও কর্মফলে প্রাপ্ত যন্ত্রণা বা আনন্দে থাকা জীবকে শুধুমাত্র কয়েক পাতা পড়িয়ে যন্ত্রণাপ্রাপ্ত জীবকে আনন্দ, আর আনন্দে থাকা জীবকে যন্ত্রণা দিয়ে সুখ-দুঃখের ভারসাম্য নষ্ট করেছেন।
চিত্রগুপ্ত— আপনি তো বেশিরভাগ সময় ফেসবুকেই থাকতেন। সকলের লেখা পড়তেন নাকি শুধু প্রচারে থাকার জন্য?
কবি— ফেসবুকের লেখা কে পড়ে! আর সবাই তো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত সেখানে। তবে কিছু ভালো লেখা দেখলে কপি করে রাখতাম। আর কে কোথায় লাইক দিচ্ছে, কমেন্ট করছে দেখে, নেক্সট স্টেপ নিতাম। আমাকেও তো টিকে থাকতে হতো বাজারে।
চিত্রগুপ্ত— তার মানে টিকে থাকার জন্য আপনি ফেসবুক করতেন। আর ভালো লেখাগুলো চুপি চুপি টুকতেন।
কবি— না স্যার, টুকব কেন! ভালো লেখাগুলো বাদ দিতাম। মানে কবিতার নিয়মই হচ্ছে, যা একবার লেখা হয়ে গেছে তা আর লেখা যাবে না।
চিত্রগুপ্ত— ভালো লেখা বাদ দিতে দিতে আপনার লেখায় কী পড়ে থাকত?
কবি— যা থাকত সেটাকেই কবিতা বলে চালাতে হতো, নয়তো আমার লেখা টিকত না স্যার।
চিত্রগুপ্ত— পাঠকের কাছে কখনও জানতে চেয়েছেন, আপনার লেখা ভালো লাগছে কিনা ?
কবি— না স্যার, আমার লেখাই যে ভালো সেটা বোঝানোই আমার মোটো ছিল।
চিত্রগুপ্ত— আচ্ছা, আপনি তো বিভিন্ন সভা, বই প্রকাশ কিংবা কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে যেতেন, তা থেকে আপনার প্রাপ্তি কী ছিল?
কবি— প্রাপ্তি অনেক ছিল, তবে মেইন ছিল তরুণরা আমাকে সঙ্গে নিয়ে ছবি তুলত।
চিত্রগুপ্ত— আপনার পাশে ছবি তুলে তারা ফেসবুকে নিজের একটা প্রচার পেত বলছেন?
কবি— আজ্ঞে না। প্রচার হতো আমার। অনেক সময় আমিই বলে দিতাম ট্যাগ কোরো কিন্তু।
চিত্রগুপ্ত—আমার হাতে এক বছরের বেশ কিছু পূজাবার্ষিকী আছে, যেগুলিতে আপনার লেখা আছে। সংখ্যাটা প্রায় ১৭! কবি— হ্যাঁ ঠিক কথা স্যার।
চিত্রগুপ্ত— আপনি এক পুজোতে এতগুলো লিখেছিলেন?
কবি— আজ্ঞে।
চিত্রগুপ্ত— আপনি কি মনে করেন সব কবিতার মান সমান ছিল?
কবি— না, তা কখনও হয়? কবিতা কখন কী রকম বের হয়। আবার তাড়া থাকলে তো…।
চিত্রগুপ্ত— তাড়া?
(ক্রমশ…)





