ইতি ঊর্মি

সকাল এখন আটটা। ব্রেকফাস্ট টেবিলে আমার বিপরীতে অমর। আমাদের সংসারের তৃতীয়জন অর্থাৎ ঊর্মি আজ টেবিলে নেই। ঊর্মির কথা মনে পড়তেই ল্যান্ডফোন বিশেষ সুরে বেজে ওঠে। ফোন ধরতেই ও-প্রান্ত থেকে ব্যারিটোন ভেসে আসে এটা কি ঊর্মি দাশগুপ্তর বাড়ি?

—হ্যাঁ, বলছি, জবাব দিই আমি।

—আপনি?

—ওর মা, মিসেস দাশগুপ্ত।

—শুনুন মিসেস দাশগুপ্ত, ময়দান থানা থেকে বলছি, আপনার মেয়েকে সেন্সলেস অবস্থায় ময়দানে পাওয়া গেছে। ওকে আমরা উডল্যান্ডসে ভর্তি করিয়েছি। পকেটে ভাগ্যিস মোবাইলটা ছিল। ওটা থেকেই আপনাদের নম্বর পেলাম। শিগগির একবার নার্সিংহোমে আসুন।

লাইন কেটে যায়।

পুরো ঘটনাটা ভালো করে বুঝে উঠতে আমার বেশ কিছুটা সময় লাগে। গতকাল রাতে ঊর্মি বাড়ি ফেরেনি। থানা, পুলিশ, নার্সিংহোম শব্দগুলি একসঙ্গে আমাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে ফেলে। আমি ঘামতে থাকি। ইদানীং সামান্য উত্তেজনাতেই প্রেসারটা বেড়ে যায়।

বিপরীতে বসে থাকা অমর নির্বিকার চিত্তে টোস্টে একটা কামড় বসিয়ে কফির মধ্যে ঠোঁট ছোঁয়ায়। মাথাটা ঝাঁ করে জ্বলে ওঠে। হাতে থাকা স্যান্ডউচটা ধাঁই করে ছুড়ে মারি ওর মুখে। আচমকা আঘাতে অমর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। চলকে পড়ে কফি। থতমত খেয়ে বলে, কী-কী মানে কী হল!

—কী হল! তোমার মেয়েকে ময়দানে আনকনসাস অবস্থায় পুলিশ পেয়েছে। ওকে ওরা উডল্যান্ডসে ভর্তি করেছে।

—সে কী! বিস্ময়ে চোখ কপালে ওঠে ওর। বলে, চলো চলো, এক্ষুনি চলো। তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে অমর টেবিলে এমন জোরে ধাক্কা মারে যে টেবিলের কফিমাগ, ব্রেড, ডিমের পোচ, জলের জাগ, ইত্যাদি ছিটকে পড়ে আমার গায়ে।

রাগে পিত্তি জ্বলে যায় আমার। এখন ঝগড়াঝাঁটির সময় নয়। দাঁত কিড়মিড় করে কেবল বলি, আচ্ছা অপদার্থ ব্যাটাছেলে একটা!

—বেবি, ইয়ে মানে, কিছু মনে কোরো না, আমি ইচ্ছে করে…, ঘাবড়ে গেলে তোতলানো অমরের পুরোনো অভ্যাস।

—চোপ, একদম চোপ। এক্ষুনি তৈরি হয়ে নাও। গ্যারাজ থেকে গাড়ি বার করো। আর হ্যাঁ, তোমার ক্রেডিট কার্ড, ঊর্মির মেডিক্লেম কার্ডটা নিতে ভুলো না। যাও শিগগির।

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই যে যাই, ধ্যাতানি খেয়ে অমর ছোটে। আমিও তৈরি হয়ে নিই চটপট! এমন একটা মানুষের সঙ্গে জীবন কাটানো সম্ভব? অমরটা চিরকাল নার্ভাস। কোনও ঘটনা ফেস করার মতন মানসিক জোর নেই। কী করে অফিস সামলায় কে জানে? ইদানীং একটু ঘাবড়ে গেলেই হুইস্কি নেয়। আর হুইস্কি পান করে আরও বোদাটে মেরে যায়। মাথা একদম কাজ করে না। তখন বলে, বেবি, প্লিজ ডু সামথিং। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। হাত-পা কেমন ঠান্ডা মেরে যাচ্ছে। একটা যা তা।

গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে অমর বলে, বেবি, ঊর্মির ইন ফ্যাক্ট কী হয়েছে বলল পুলিশ?

—বলল, ওকে আনকনসাস অবস্থায় ময়দানে আজ ভোরে পাওয়া গেছে। নিশ্চয়ই ভালো কিছু ঘটেনি, জবাব দিই আমি।

অমর খানিক থম মেরে থেকে আচমকা উত্তেজিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে ওঠে, এইসব, সবকিছুর জন্য তুমি দায়ী। তুমিই মেয়েটাকে জাহান্নমে পাঠাচ্ছ। উত্তেজনায় লাল হয়ে ওঠে মুখ-চোখ।

আমারও মাথা গরম হয়ে যায়, মুখ সামলে কথা বলো অমর। সাবধানে গাড়ি চালাও। ইদানীং মাঝেমধ্যেই ও কেমন বেপরোয়া ভঙ্গিতে জ্বলে উঠছে। বিয়ের পর প্রথম প্রথম এরকম করত। একবার শ্যামলদাকে দিয়ে আচ্ছা করে কড়কে দিয়েছিলাম। এতদিন ঠিক ছিল। আবার বিগড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ওই উকিল বন্ধুটাই মাথা খাচ্ছে ওর। কী সাম চ্যাটার্জী যেন। ওটাকে একটু সাইজ করতে হবে।

গাড়ি পার্কিং লটে দাঁড় করিয়ে ছুটে যাই আমরা। দেখি ক্যালকাটা পুলিশের এক সাবইন্সপেক্টর আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। সামনাসামনি আসতেই বলল, আপনারা মি. অ্যান্ড মিসেস…

—দাশগুপ্ত, কথা শেষ করি আমি, হোয্যার ইজ আওয়ার চাইল্ড?

—আসুন আমার সঙ্গে, বলে অফিসার লিফটের দিকে এগোন। ওকে অনুসরণ করে একটি কেবিনের সামনে পৌঁছোই, উনি ইঙ্গিতে বোঝান ওটাই ঊর্মির কেবিন। ধন্যবাদ দিয়ে দরজা ঠেলে ঢুকে দেখি ঊর্মি আনকনসাস। পাশে একটি নার্স বসে। আমাদের দেখে উঠে দাঁড়ায়।

দ্রুত ঊর্মির সামনে যাই। ঠোঁট ফুলে উঠেছে, নীলচে বাদামি জমাট রক্ত। গালে, গলায় দাঁতের দাগ, বুঝতে বাকি থাকে না কিছু। অমরের দিকে তাকাই।

—ঊর্মি, মাই চাইল্ড, হাউমাউ করে কেঁদে ঝাঁপিয়ে পড়ে অমর ওর বুকে। কাঁদতে থাকে অবুঝ শিশুর মতো। ওকে টেনে সরিয়ে আনার চেষ্টা করি। নার্স বলে ওঠে, আরে আরে করছেন কী, শি নিডস কমপ্লিট রেস্ট। আপনারা ডক্টরের সঙ্গে দেখা করুন।

—কে দেখছেন ওকে? আমি প্রশ্ন করি। অমর চোখের জল মোছে। ডক্টর সোম। আসুন আমার সঙ্গে, নার্স এগিয়ে যায়। সোম-এর ঘরে নিয়ে গিয়ে প্রাথমিক পরিচয়টুকু দিয়ে ও চলে যায়।

—প্লিজ বি সিটেড। ডক্টর সোম বলেন, আচ্ছা, মি. দাশগুপ্ত, আপনার মেয়ে কোনও ড্রাগস নিত?

অমর বা আমি কেউই এ প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিলাম না। দুজনে দুজনার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম। উত্তর আমিই দিলাম, না, সেরকম তো কোনওদিন দেখিনি। এ প্রশ্ন করছেন কেন?

—মেয়েটি ডেডলি আনকনসাস। ওর ব্লাড স্যাম্পল নিয়ে টেস্টের জন্য পাঠিয়েছি। প্রাথমিক পর্যায় জানা গেছে কোনও উচ্চ ক্ষমতাযুক্ত ড্রাগ ওর শরীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ড্রাগটা ল্যাবে আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা চলছে।

—বললাম, আপনি ডাক্তার, আপনার কাছে কিছু লুকোনো উচিত নয়। ইদানীং ঊর্মি ড্রিংকস নিত একটু আধটু। তবে ড্রাগস যে নিত না সে ব্যাপারে আমি শিওর।

—খোঁজ নিন ভালো করে। ওর ঘর সার্চ করুন। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কথা বলে দেখুন। আজকালকার হাইপ্রোফাইল অ্যাফ্লুয়েনট ঘরের ছেলেমেয়েরা প্রায়ই এইসব নেশার কবলে পড়ে জীবন শেষ করে ফেলছে। মনে রাখবেন, ইয়োর চাইল্ড ইজ দ্যা মোস্ট প্রেশাস ব্লেসিং অন ইউ। একটা বাচ্চার জন্য চাইল্ডলেস কাপলসরা কী মর্মবেদনায় জ্বলে পুড়ে মরছেন তা তো দেখছি।

আমি চুপ করে থাকি। অমরের অবস্থা বুঝি এক্ষুনি ফেটে পড়বে। ইদানীং আবেগটাবেগ একদম চেপে রাখতে পারে না। স্থান কাল পাত্র বিবেচনা না করেই বার্স্ট করে, অত্যধিক অ্যালকোহল ইনটেকের ফল। কিন্তু মনে যে আশঙ্কা উঁকি মারছে সেটা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হওয়া প্রয়োজন। বলি, ইজ শি ওকে অ্যাজ আ উয়োম্যান?

ডক্টর সোম কঠিন স্বরে বলেন, আই অ্যাম সরি টু সে মিসেস দাশগুপ্ত, শি ওয়াজ ব্রুটালি রেপড অ্যাজ অ্যান আনফ্রেমড প্রপার্টি। সম্ভবত, বাই আ গ্যাং অফ পার্সনস। আওয়ার এগজামিনেশন ইজ গোয়িং অন।

—ওহ্ মাই গড! শোনামাত্র অমর চেঁচিয়ে ওঠে পাগলের মতো। দুহাতে মুখ ঢাকে। আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। আমার মেয়ে এত বড়ো বোকামি করল? কিন্তু কেন? আমারই মতো ফাস্ট লাইফ চায় ও। হ্যাঁ, ওর চাওয়াকে প্রশ্রয় দিয়েছি আমি। তবে সেজন্য প্রয়োজনীয় সাবধানতা নিতেও কি শেখাইনি ওকে? অমরটা কেঁদেই চলে।

—শান্ত হোন, এ সময় ভেঙে পড়লে চলবে না। ডক্টর সোম বলেন, থানায় যান। পুলিশের সঙ্গে কো-অপারেট করুন। ইয়োর কেস হ্যাজ অলরেডি বিন লজড।

মাথা ঠান্ডা রেখে বললাম, এখন আমাদের কী করণীয়?

—মেডিক্লেম কার্ড আছে নিশ্চয়ই? ওটা রেখে যান, সঙ্গে আপনাদের ভিজিটিং কার্ড। অমর ওগুলি এগিয়ে দেয়, ফের দুহাতে মুখ ঢাকে। বলে, উফ্ আমি, আমি ভাবতে পারছি না।

ডক্টর সোম এগিয়ে এলেন। অমরের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ভেঙে পড়বেন না মি. দাশগুপ্ত। ঘটনা এর থেকেও খারাপ হতে পারত। মেয়েকে ফেরত না-ও পেতে পারতেন। দুষ্কৃতিরা ওকে বিক্রি করে দিতে পারত। কিংবা শরীর থেকে অপারেট করে কিডনি, আই, ব্লাড ইত্যাদি বের করে নিতে পারত। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিন সেসব কিছুই ঘটেনি। মেয়েকে ফিরে পেয়েছেন আপনারা। নাও প্লিজ গো হোম, অ্যান্ড কিপ ক্লোজ কনট্যাক্ট উইথ আস। ওর জ্ঞান আসলে জানানো হবে।

ডক্টর সোমকে ধন্যবাদ জানিয়ে অমর আর আমি থানা হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। মানসিক ভাবে দারুণ বিপর্যস্ত আমি। ঊর্মির এই মারাত্মক পরিণতিটা মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না।

একটু আগে সন্ধ্যা নেমেছে। এইমাত্র ডক্টর সোম ফোনে জানালেন যে, ঊর্মির জ্ঞান ফিরেছে। বারবার বাবার কথা বলছে। এক্ষুনি ওর চোখের সামনে দুএকটি প্রিয়জনের মুখ বড়ো প্রয়োজন।

সাধারণত অফিস ছাড়তে আমার আটটা-সাড়ে আটটা বাজে। কিন্তু এরকম ফোন পাওয়ার পর আর অফিসে থাকা সম্ভব নয়। গাড়ি নিয়ে দ্রুত নার্সিংহোমের দিকে রওনা দিই।

গাড়ির গতি বাড়ে। বুকটা হু হু করে ওঠে ঊর্মির জন্য। চোখের কোল ভিজে যায়। ওর এই পরিণতির জন্য কি আমি দায়ী? ওকে তো সব সময় বোঝাতাম আমি। তা ছাড়া নিজের ভালো-মন্দ বোঝার মতন বয়স ওর হয়েছে। একুশ বছর বয়স নেহাত কম নয়! মানুষ হতে গেলে যতটুকু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রয়োজন তাতে খামতি ছিল না। তবু মেয়েটা এমন বেপরোয়া হয়ে উঠল কেন?

—আচ্ছা বেবির কি উচিত ছিল না, একটু সংযত জীবন যাপন করা? নারীমুক্তি নারী স্বাধীনতায় ও বিশ্বাসী। স্বেচ্ছাচারিতাকে ও পলিশড স্বাধীনতার মোড়কে মুড়ে নিয়েছে। মায়ের অসংযত জীবনযাত্রা কি ঊর্মির মনে কোনও প্রভাব ফেলেনি? নিশ্চয়ই ফেলেছে। মা হিসাবে কতটুকু কর্তব্য করেছে বেবি? সেই ছোট্টবেলা থেকে তো মেট্রনের দাযিত্বে বাচ্চা। মাত্র চার মাসের বাচ্চাকে ফেলে অফিস জয়েন করেছিল, আমার বারংবার বারণ সত্ত্বেও। তিন বছর বয়স থেকেই ও ক্রেশে। ক্লাস ওয়ান থেকে রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে। বন্ডিংটা তৈরি হবে আর কী করে?

গাড়িটা পার্কিং লটে রেখে চারতলায় ঊর্মির কেবিনে যাই। দরজা ঠেলে ঢুকতেই ঊর্মি, আমার দিকে তাকাল, অস্ফুটে উচ্চারণ করলে, বাপী। বলেই জ্ঞান হারাল।

দ্রুত ওর কাছে যাই। মাথায় হাত বুলোতে থাকি। চোখ দুটো আমার কেন যে এত অবাধ্য?

কতক্ষণ এভাবে কাটে জানি না। ঈশ্বরকে ডাকি, ভগবান, ওকে সুস্থ করে তোলো তুমি। নার্সের তাগাদায় বাইরে আসি। ডক্টর সোমের চেম্বারে যাই। বসুন মি. দাশগুপ্ত, বলেন ভদ্রলোক। এখন কেমন বুঝছেন?

—বেটার দ্যান বিফোর। সকালে বেশ কয়েকবার জ্ঞান এসেছে এবং গেছে। সিডেটিভ দেওয়া হয়েছে মাইল্ড। আমরা চাইছি পেশেন্ট যতটা সম্ভব মেন্টাল রেস্টে থাক। জেগে উঠলেই আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠছে।

—ওর শরীরের ড্রাগটা আইডেন্টিফাই হয়েছে?

—হ্যাঁ, অতি পরিচিত একটা ওষুধ, কমনলি নোন অ্যাজ ক্লাব ড্রাগস। সম্ভবত ওর অজান্তেই ড্রিংকসে কেউ মিশিয়ে দিয়েছিল। শুনলাম ও সেদিন কলকাতার এক ডিসকো ঠেক-এ মাঝ রাত অবধি ছিল।

—ড্রাগটা কি খুব মারাত্মক?

—ইয়েস, ভিক্টিমের বিন্দুমাত্র বাধা দেবার ক্ষমতা থাকে না।

পুলিশ এসেছিল শুনলাম। আমি আবার প্রশ্ন করি।

—হ্যাঁ, ওরা তদন্তের স্বার্থে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করছিল বলে শুনলাম। আমি তখন ছিলাম না, রাউন্ডে বেরিয়েছিলাম।

—ঊর্মির এ অবস্থায় ওদের অ্যালাউ করলেন কেন? অনুযোগ তীব্র হয় আমার।

—বারণ করে দিয়েছি, পেশেন্ট সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ওরা আর ডিস্টার্ব করবে না, বললেন ডক্টর সোম।

—থ্যাংক ইউ ডক্টর।

—ইটস অল রাইট। মনে জোর রাখুন, সব ঠিক হয়ে যাবে। ইট ইজ আ গ্রেট শক ফর হার। শি নিডস প্রপার কাউন্সেলিং। ওকে শারীরিক ভাবে একটু সুস্থ করে সে ব্যবস্থা আমরা করব।

ডক্টর সোমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফের ঊর্মির কাছে যাই। ও এখনও অচেতন। মাথায় হাত বুলোই। নীরবে চোখের জল ফেলি। একসময় নার্সিংহামে ছেড়ে গাড়িতে এসে বসি। নিজেকে এত দুঃখিত, এত অসহায় আগে কখনও মনে হয়নি।

ড্রাইভ করতে করতে মনে হয়, ঊর্মিকে বড়ো করে তোলার ব্যাপারে কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে গেছে। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের পিছনে ছুটতে ছুটতে সন্তানকে যথেষ্ট সময় দিতে পারিনি। যদিও মেয়ের এডুকেশনাল ব্যাপারগুলি বরাবরই বেবির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়েছে। বেবির ইচ্ছাতেই ঊর্মি রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে। ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন গার্লস হস্টেলে। ঊর্মি ছুটিতে বাড়ি আসলে বেবি অসন্তুষ্ট হতো।

গাড়িটা ক্লাবে পার্ক করি। আজ আর কারুর সঙ্গে নয়, একা একাই মদ্যপান করব। কোনার দিকে এক টেবিলে বসে দুটি ড্রিংকসের অর্ডার দিই।

ড্রিংকস নিতে নিতে মনে হয়, আমি নিশ্চিত, ঊর্মির আজকের পরিণতির জন্য বেবিই দায়ী। হ্যাঁ ঠিক তাই, বেবিই দায়ী। একবার শক্ত হাতে হাল ধরতে গিয়ে যা অবস্থা হয়েছিল, ল্যাজে-গোবরে একদম। ক্যালকাটা পুলিশের কোন ইন্সপেক্টর নাকি ওর দাদা, সেই দিনটার কথা ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। কী অপমান!

শালা, এমন হড়কানি দিল, পিলে চমকে যাবার জোগাড়। ব্যাটা বলে কিনা, মি. দাশগুপ্ত, আপনার স্ত্রী যে কমপ্লেন দিয়েছেন তাতে এক্ষুনি ফোরনাইনটি এইট-এ ধারায় কেস স্টার্ট করতে পারি, সেটা জানেন কি? অ্যারেস্ট করে আজ সারা রাত লকআপে রাখব, কাল কোর্টে চালান করব। নব্বই দিনের আগে জামিন পাবেন না। আর উনি আমাকে আপনার সম্পর্কে যা যা বললেন, তা যদি কোর্টে বলেন, কম সে কম বছর দশেক জেলের ঘানি ঘোরাতে হবে। যাবেন নাকি?

—কোথায়? সভয়ে প্রশ্ন করি আমি।

—ঘানি টানতে?

আমি চুপ করে থাকি। লজ্জায় মনে হচ্ছে, গলায় দড়ি দিই। নিজের স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে… উফ্ ভগবান!

শালা আইসি বলে, স্ত্রীকে আর ডিস্টার্ব করবেন না। ওকে ঘাঁটালে কী হতে পারে বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই? যান, বাড়ি যান এখন। কমপ্লেনটা আমার কাছে থাকল, দেখবেন এটা যেন আমাকে ব্যবহার করতে না হয়।

ধ্যাতানি খেয়ে গরুচোরের মতো বাড়ি ফিরে এসেছিলাম সেদিন। সেই থেকে আর কোনওদিন বেবির সঙ্গে আমার সংঘর্ষ হয়নি। আমি আমার মতো থাকি, ও ওর মতো। বেবি কী একটা এনজিও চালায়। তাছাড়া নানারকম মিটিং-ফিটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বছর খানেক কথাবার্তা বন্ধ ছিল। পরে বন্ধুবান্ধব, লোকজনের নিন্দামন্দের কথা ভেবে আমাকে আপস করতে হল, বিশেষ করে ঊর্মির মুখ চেয়ে। ঊর্মি তুই কি বুঝবি না মা, আমার যন্ত্রণার কথা? এই নীরব রক্তক্ষরণের কথা? চোখ ফেটে জল আসে আমার।

—স্যার, আর কিছু? দেখলাম অর্ডার নেওয়ার জন্য ছেলেটি আগ্রহী চোখে তাকিয়ে টু মোর প্লিজ, জবাব দিলাম আমি। বেয়ারা সোডা বরফ মিশিয়ে ড্রিংকস তৈরি করে দিল। গেলাসে ঠোঁট ঠেকাই আমি। আমার মনে হয়, বেবির সঙ্গে দাম্পত্যের এই ফাটলের প্রভাব আমি কোনওদিন ঊর্মির ওপর পড়তে দিইনি। আমার কর্পোরেট লাইফের তুমুল ব্যস্ততার মধ্যেও যখন যতটা পেরেছি সময় দিয়েছি ওকে।

আশ্চর্য! গত তিন-চার বছরে ঊর্মি কত দ্রুত বদলে গেল! যা সব বন্ধুবান্ধব জুটল। কী তাদের অদ্ভুত সাজগোজ, কানে দুল, নাকে দুল, চুলে রং। ঊর্মিকে কত বুঝিয়েছি, যে-ফাস্ট লাইফ তুমি লিড করছ, ইটস নট অফ ইয়োর কালচার। টেক ইয়োর লাইফ সিরিয়াসলি, সব সময় সাবধানে থাকবে। একজন প্রাপ্তবয়স্কা মেয়েকে বাবা হিসাবে এর বেশি আর কী বলা যায়?

বছর খানেক হল ঊর্মি কেন সাইলেন্ট হয়ে গেছিল। প্রশ্ন করলে কোনও উত্তর দিত না। বকাবকি করলেও কোনও প্রতিক্রিয়া ছিল না। কেবলই হাত খরচের টাকা বাড়াতে বলত। একুশ বছরের একটি মেয়ের পাঁচ হাজার টাকা হাত খরচে পোষায় না? কী করে ও অত টাকা নিয়ে একটা কল সেন্টারে কাজ করে, শুনেছি। ওখানে মাইনেপত্তর ভালো। এত টাকা উড়িয়ে কী সুখের সন্ধানে তুই মেতে ছিলি মা? একটিবার আমার কথা ভাবলি না?

কিন্তু সেদিন ডিসকো ঠেক-এ ঊর্মিকে কারা নিয়ে গিয়েছিল? কে ওর ড্রিংকসে ক্লাব ড্রাগস মিশিয়েছিল? এভাবে কারা রেপ করল ওকে? পুলিশ কি পারবে কালপ্রিটগুলোকে ফিক্স আপ করতে? হাজার প্রশ্নেরা আমাকে তাড়া করে। পাগলা কুকুরের মতো আমার ভিতর ছুটতে থাকি আমি। উত্তেজনায় মদের মাত্রা বাড়ে। এক সময় সব কেমন জেবড়ে যায়।

শ্রদ্ধেয় বাবা ও মা,

এ চিঠি যখন তোমরা পাবে আমি তখন অনেক অনেক দূরে। এখন রাত্রি তিনটে। একটু আগে ঘুম ভেঙেছে। বোধ হয় ঘুমের ওষুধের ক্রিয়া শেষ। আজ ষষ্ঠ দিন। শরীরের ব্যথা অনেকটা কমেছে, বেশ সুস্থ বোধ করছি। কয়েকটি ক্ষত থেকে যাবে মনে হচ্ছে।

এ কয়দিনে আমাকে নিয়ে পেপারে যা লেখালেখি হয়েছে তাতে পাড়ায় মুখ দেখাতে পারব না। তাই এ-পাড়া ছেড়ে চলে যাব মনস্থ করেছি। যাবার আগে তোমাদের সব জানানো উচিত বলে লিখে যাচ্ছি এ চিঠি।

কীভাবে যে এত সব ঘটে গেল বুঝতে পারলাম না। রাত দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে কোনও না কোনও পরিচিত মুখ পেয়ে যাব এই আশায় ডিসকো ঠেক-এ আমি গেছিলাম। এক পেগ হুইস্কি নেবার পর ইচ্ছা করল একটু নাচতে। ডান্স ফ্লোরে একটা ছেলে হেসে নাচতে ডাকে। ছেলেটা স্মার্ট। নাচতে নাচতেই পরিচয় দেয়, ওর নাম জাভেদ। নিউ মার্কেটে ওর নাকি লেদার গুডসের দোকান আছে।

নাচ শেষ করে একটু দম নেবার জন্য বসি। আর একটা পেগের অর্ডার দিই। আমার সামনে এক জোড়া ছেলে মেয়ে দারুণ নাচছিল। সম্ভবত সেই সময়ে পাশে থাকা চাপ দাড়িওলা লোকটা আমার ড্রিংকসে কিছু মিশিয়ে দিয়েছিল। আশ্চর্য, তাতে ড্রিংকসের স্বাদ, গন্ধ, বর্ণের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি।

পরের গান শুরুর মুহূর্তে আমার মনে হয়, মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। ক্রমশ বনবন করে ঘুরতে থাকে মাথাটা। দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। চোখের সামনে চারপাশ দ্রুত ঝাপসা হয়ে আসে। খেয়াল হয়, জাভেদ, পাশের চাপদাড়ি, আরও দু-তিনজন ছুটে এসেছে আমাকে সাহয্যের জন্য। ধরাধরি করে আমাকে কোথাও নিয়ে যেতে চায়। বিপদ বুঝতে পেরে আমি প্রাণপণে বাধা দিতে থাকি, চেঁচাতে থাকি, হেল্প, হেল্প। অনেক কিছু বলতে চেষ্টা করি। কিন্তু গলা দিয়ে কোনও শব্দ বের হয় না। টের পাই প্রতিরোধের সমস্ত শক্তি দ্রুত হারিয়ে ফেলছি। ছেলেগুলোর কথা কানে আসে ভাসা ভাসা, হঠ যাইয়ে হঠ যাইয়ে সামনে সে। মাই সিস্টার ইজ ফিলিং সিক।

আশ্চর্য! কেউ ওদের কোনও বাধা দিল না। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। যতদূর মনে পড়ে ওরা পাঁচজন আমাকে লিফটে করে নামিয়ে ধরাধরি করে একটা বড়ো গাড়িতে তোলে। বোলেরো কিংবা টাটা সুমো হতে পারে। একজন বলল, জলদি ভাগ হিয়াসে।

গাড়ি প্রচণ্ড গতিতে ছুটছিল। গাড়ির মধ্যেই ওরা আমার শরীর থেকে জামাকাপড় টেনেহিঁচড়ে খুলছিল হিংস্র ভাবে। জানোয়ারগুলো ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো কাড়াকাড়ি করে ছিড়েখুঁড়ে খেতে চাইছিল আমার দেহ। একজন জিন্সটা খোলার চেষ্টা করছিল। আমার বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ ক্ষমতা তখন নেই। ক্রমশ জ্ঞান হারালাম। যখন জ্ঞান হল, দেখি আমি নার্সিংহোমে। পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছি।

বাবা, তোমার যন্ত্রণা আমি বুঝি। এও বুঝি তুমি নিজেকে কতটা অসহায় বোধ করো। তোমার প্রতি আমার কোনও অভিযোগ নেই। তোমার আর মায়ের মধ্যে যে বিরাট এক শূন্যতা তা আমাকে বারবার কষ্ট দিয়ে এসেছে। জানি এতে তোমার কোনও দোষ নেই। কেন যে এত মদ খাও তাও বুঝেছি। তবে এত মদ খেও না বাবা। অন্তত আমার কথা ভেবে মদ খাওয়াটা কমাও।

আমার দুঃখ কেবল একটাই তোমরা আমার যন্ত্রণার খোঁজ কখনও নাওনি। আমার মনে পড়ে না, তোমরা দুজন একসঙ্গে স্কুলে আমাকে দেখতে এসেছ কখনও। জীবনে কোনওদিন একসঙ্গে আমাকে বেড়াতে নিয়ে গেছ। যে কটা জন্মদিন পালন করেছ, সেগুলিও কেমন যেন মেকি, ফাঁকা ফাকা, এলোমেলো।

মা, তোমাকে বলি, আমাকে তুমি কোনওদিন ভালোবাসোনি। চিরকাল নিজেকেই ভালোবেসেছ। নিজের সুখ, নিজের ভোগ নিয়ে মত্ত থেকেছ। তোমার বহু ঘটনার সাক্ষী আমি নিজে। সেসব কথা এখানে লিখতে চাই না। তবে বলতে লজ্জা নেই, পুরুষের প্রতি আসক্তি তোমার আজও কমেনি।

মা, তুমি আমার জন্য যতটুকু করেছ তা কেবল মিনিমাম কর্তব্যবোধ। আমার এই ছোট্ট জীবনে যতটুকু উপলব্ধি করেছি তাতে মনে হয়, দাম্পত্যে যদি ভালোবাসা না থাকে সেক্ষেত্রে তাদের সন্তান নেওয়া কোনওদিনই উচিত নয়। তুমি এ ঘটনার পর যে কবার দেখা করতে এসেছ, কেবল একটা কথাই জিজ্ঞাসা করেছ, আমার মেয়ে হয়ে তুই এত বড়ো ভুল করলি কী করে? মা, কীভাবে তোমাকে বোঝাই যে, ইট ওয়াজ অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট।

বাবা, তুমি চিরকালই আমাকে বড়ো ভালোবাসো। তবু চিরকালই কেন যেন আমি নিজেকে খুব একা বলে বোধ করেছি। আজ তোমার মধ্যে আমি নিজের অসহায়তা, একাকিত্ব, যন্ত্রণা সব উপলব্ধি করতে পারছি বাবা।

বাবা, কাল তুমি এসেছিলে। বারবার আমার হাতখানা ধরে বলেছ, তোকে বাঁচতে হবে মা, বাঁচতে হবে নতুন করে। এসব দুর্ঘটনা ভুলে, এ থেকে শিক্ষা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে হবে তোকে। জীবনে তুই যত বড়ো পথ দেখেছিস, জীবন তার থেকে অনেক অনেক বড়ো।

নিজের ভুল আমি বুঝতে পেরেছি বাবা। বুঝেছি, মুহূর্তের অসাবধানতা আগুনের ফুলকির মতো জ্বালিয়েপুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে জীবন। তবে আমি বাঁচব বাবা। অন্তত একটি বার প্রাণপণে বাঁচার চেষ্টা করব আমি।

এ মুহূর্তে আমার মুখময় অন্ধকার। এখানে থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব। তাই এখান থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছি আমি। কোনও নতুন শহরে নতুন করে জীবন গড়ে তুলতে চাই। যেখানে আমার চারপাশে থাকবে না কোনও পরিচিত লোকজন, থাকবে না এই কালিমাখা অতীত।

তোমরা আমার খোঁজ কোরো না। প্রয়োজনে আমিই তোমাদের খোঁজ নেব। বিদায়, ভালো থেকো তোমরা। বাবা, আমার জন্য চোখের জল ফেলো না। তোমার কথাকে সম্মান দিয়ে যদি নতুন করে নিজেকে গড়ে তুলতে পারি তবেই ফিরব, নতুবা নয়।

প্রণাম

ইতি,

তোমাদের ঊর্মি।

চিঠি শেষ। ভোরের আলো উঠি উঠি। ব্যাগ গোছানোই আছে। বাবা-মা নিশ্চয়ই এখন গভীর ঘুমে। বাড়ির পিছনের গেট খুলে নিঃশব্দে পথে নামে ঊর্মি।

ক্রমশ ভোর হচ্ছে। ভোর এত সুন্দর! এত স্নিগ্ধ! পাখিরা ডাকছে। সকালের প্রশান্তি তার হৃদয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে এক আশ্চর্য অনুভব। সামনে দূরের আকাশ, ক্রমশ লাল হয়ে উঠেছে ওটা।

সই চম্পাবতী

এক

গুপ্তিপাড়ার এক কবিরাজের কাছে গোপনে গোপনে ওষুধ খাচ্ছিল চম্পা মণ্ডল। যৌনতা-বর্ধক ওষুধ। না, কবিরাজকে সে চেনে না। জানেও না এর জন্য কত দাম নেয় সে। ওষুধের গুণ টের পাওয়া যাবে তিনমাস পর থেকেই। পুরো ফল পেতে হলে আরও তিনমাস মোট ছমাস খেতে হবে।

তাকে নিয়মিত এই ওষুধ এনে দেয় তার স্বামীর বন্ধু সুনীল। এমন উপকারী লোক, অথচ দ্যাখো পয়সা দিতে গেলে নেবে না। জোর করলে বলবে, এই কোবরেজের খুব নাম। অনেকেই তার ওষুধ খায়, শুনি কাজও হয়। যদি কাজ হয়, তখন তুমি আমাকে পয়সা দেবে, কেমন?

বিয়ের পর প্রথম প্রথম কিছু বলেনি হারান। দিন কয়েক যাবার পর সে মুখ খুলতে থাকে। মিলন শেষে নিরুত্তাপ গলায় বলত, তুমি বড়ো ঠান্ডা! কিছুতেই গা-গরম হয় না তোমার! অথচ তুমি যা গায়েগতরে। দেখলেই মনে হয় ঝাঁপ দিই ওই উত্তুঙ্গ যৌবনের ভিতর। প্রাণের জ্বালা জুড়াই। কিন্তু আসলে তুমি একটি ঠান্ডা সাপ ছাড়া আর কিছু নও। ঝাঁপ দিয়ে আগুন মেলে না, বরফের জলে গা ভিজে ওঠে।

কথাটা গায়ে মাখেনি চম্পা। যৌনতা তার ভালো লাগে না। ওই সময় সে কেন যে আড়ষ্ট হয়ে থাকত, তা সে নিজেই জানে না। পরের দিকে হারান নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। সে চম্পাকে মারধর করত। রাগে গরগর করতে করতে মাঝরাতেই ঘরের বাইরে চলে যেত।

একাকী বিছানায় উপুড় হয়ে কাঁদত চম্পা। তার গায়ের রং কালো। কিন্তু সুডৌল স্তন, ভরাট কোমর, চওড়া কাঁধ ও তার কালোর উপর সুন্দর মুখশ্রীতে এমন কিছু ছিল যে, একবার দেখতে গিয়ে হারানের তাকে ভালো লেগে যায়।

হারানের এক প্রাণের বন্ধু হল সুনীল রাজবংশী। সুনীল নৌকো বানায়। ঘর ছেড়ে নৌকো বানানোর জন্য কোথায় না কোথায় পাড়ি দেয় সে। এক মাস দিঘা তো কোনও মাস মেদিনীপুরের অচেনা কোনও এক নদীর ধারে, আবার কখনও তার ডাক আসত শিলিগুড়ি, রায়গঞ্জ থেকে। কখনও বা ঘরের পাশে কুন্তীঘাটে যেত নৌকো বানাতে।

নৌকোর কারিগর হিসেবে তার সুনাম আছে। কিন্তু তার নিজের কোনও নৌকো নাই। সে যখন হারানের সন্ধানে আসত, তাকে ঠেস মেরে চম্পা বলত, এবার এট্টা নৌকো বানাও মাঝি, গাঙ্গ-এ ভেসে পড়ি।

সুনীল তখন রসিক নাগরের মতো হাসত। বলত, তোমায় নিয়ে কোথা যাব, বউ? সুনীল তাকে গোপনে বউ বলে ডাকত। মুখে মুখে ছড়া কাটতে পারত সুনীল। চম্পার মাঝে মাঝে মনে হতো, তার যদি সুনীলের সঙ্গে বিয়ে হতো, তবে সে সুখী হতে পারত।

হারান ছিল রাজমিস্ত্রি। বড়ো রাজমিস্ত্রি নয়, সে ছিল সহকারী। কাজের টানে তাকেও বাইরে থাকতে হয়েছে। তখন সে সুনীলকে বলে যেত, বউটা রইল, দেখিস। সুনীল সেইসব দিনে আসত কিন্তু ঘরে ঢুকত না।

চম্পা ডাকত ঘরে বসার জন্য কিন্তু সে বলত, দিনকাল তো ভালো নয় বউ, কে কখন কী বদনাম দেয় তার ঠিক কী! তার চেয়ে এই ভালো। তোমার খবর করা হল, দেখা হল, কথা হল, সবদিক বজায় থাকল, আর কী চাই? এমনটাই থাক না।

চম্পা রেগে বলত, বদনাম আবার কী মাঝি? কে করবে বদনাম? তুমি কি আমার পর? তুমি আসবে, রোজ আসবে এই আমি কয়েক দি। শুনে মিটিমিটি হাসে সুনীল।

—আর বদনাম হলে? মুখটি ফিরিয়ে নেয় চম্পা।

—সে তো আমার ভাগ্য গো! এমন বদনামে যে মরেও সুখ!

বুক ভরে ওঠে সুনীলের। মুখে হাসি ধরে রেখে বলে, বলো কী, বউ! তারপর?

—তারপর আর কী, একখান নাও নিয়ে ভেসে পড়ব দুজনাতে।

সুনীল তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, তা ভেসে ভেসে যাবে কদ্দূর?

—যাব না। নাও-তেই থেকে যাব। সারারাত, সারাজীবন।

—সংসার তোমার ভালো লাগে না, না বউ?

নীচু মুখে, বাঁ হাতের আঙুলে আঁচল জড়াতে জড়াতে চম্পা বলে, পালাইনি তো তোমার সঙ্গে। পালালে, একটা সংসার পেতুম।

—তবে ভেসে পড়বার কথা বারবার কও কেন, বল দিকি?

—সে আমার ইচ্ছে!

—কেবলি ইচ্ছে? আর কিছু নয়?

উদাস গলায় চম্পা বলে, আমি কোনওদিন নদী দেখি নাই! অনেক অনেক জল দেখি নাই! পাড় থেকে দেখা কি আর দেখা হল মাঝি? নদীকে দেখতে হলে নদীর বুকে থাকতে হবে। কেন, তোমার কি আমাকে নিয়ে ভেসে পড়তে আপত্তি আছে?

সুনীল বলে, তা নয় বউ। তুমিই আমার সব। আমার জীবনমরণ। আমার নাও, আমার নদী, আমার নৌকো। পর তো নও তুমি আমার। কিন্তু জানো কী, যেখন তুমি নাও ভাসাবার কথা কও, তোমাকে কেমন যেন উদাস লাগে।

—আর কেমন লাগে?

—বেউলা লাগে তোমায়। বেউলা- সুন্দরী। এক কলার মান্দাসে চলেছ তুমি।

—সেই মান্দাস তুমি, মাঝি বোঝ না?

—বুঝি বউ, বুঝি।

—তবে আমাকে নিয়ে ভেসে পড়ো না, কেন?

—পারি না যে!

—কেন পারো না মাঝি? আমার এ জীবন কি জীবন? পারো না আমায় একটা নতুন জীবন দিতে?

—ও এমনি করে তোমার গায়ে হাত তুলবে আমি কল্পনাও করতে পারি নাই।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চম্পা বলে, দেহ ছাড়া সুখ হয় না মাঝি। দেহ ছাড়া দেহসুখ যে সোনার পাথরবাটি, মাঝি! দেহ ছাড়া স্বামী-স্ত্রী হয় না, সংসার হয় না, প্রেম-পিরিতি হয় না। দেহ ছাড়া এই পৃথিবী শূন্য মাঝি! এ-পৃথিবী দেহের বশ। আর সেই দেহ আমার নেই!

তার দীর্ঘশ্বাস নিজ গায়ে মেখে নিতে নিতে সুনীল বলে, এ-যে তোমার মনের কথা নয়, সখি চম্পাবতী। তুমি যেমনি করে আমাকে বোঝো, তেমনি আর কে বোঝে বলো দিকি। হারানের কথা বলছ? ও কিন্তু সহজ সরল ছেলে। ছোটো থেকেই তো দেখছি তাকে।

—সেটাই তো বিপদ মাঝি। সহজ-সরলেরা যে মনের গভীর কথা পড়তে পারে না! ওদেরকে সব যে বলে বলে দিতে হয়, বুঝিয়ে দিতে হয়!

মাথা নেড়ে সুনীল বলে, কেন যে হারান এমনি করে! ওকে এখন আমি বুঝতে পারি না। মাথা নীচু করে চম্পা।

—ওর শরীর যে আমি সুখে সুখে ভরাতে পারি না, মাঝি। ওকে খুশি করতে পারি না! এবার আমাকে নিয়ে একখানা নাও বানাও মাঝি। সে নাওয়ের নাম দিয়ো সই চম্পাবতী। আমি মরে যাই যদি, তোমার সেই নাও-এর মাঝেই আমি বেঁচে থাকব। আমার এই দুই চোখ এঁকে দিও নাও-এর গায়।

—তুমি নাও হবে, বউ? সুনীল চোখ বড়ো বড়ো করে। বলে, তুমি যে গহিন গাং বউ, নাও হতে যাবে কেন? কোন দুঃখে? গহিন গাং, তার এপার, ওপার দেখা যায় না। মনের গভীর-গোপনে কোন ধন খেলা করে, তাকে কে বোঝে, কে ছোঁবে বউ? গহিন গাং তাই চিরকাল মানুষের কাছে অধরাই থেকে যায়।

—আমি যদি গহিন গাং হই, তুমি তার বুকে এক নাও।

—না বউ। আমি তা নয়।

—তবে? গহিন গাং যদি তোমার কোনও কাজেই না-লাগে, তবে লাভ কী আমার গাং হয়ে

—তোমায় ডুবে মরে যে সুখ, সখি!

এর পর আর নিজেকে সামলাতে পারেনি চম্পা। দুবাহু এগিয়ে দিয়ে সে জাপটে ধরে সুনীলকে।

সুনীল থরথর করে কেঁপে ওঠে। চম্পার উষ্ণ নিঃশ্বাসের কাছে সে পুড়ে যেতে থাকে। নতজানু হয় তার শরীরী-সুবাসে। ক্রমে সব প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে তার। আর চম্পা তাকে দিয়ে নিজেকে চেনে। সে বোঝে, গহিন গাং-এ জোয়ার এসেছে। সেটা কবিরাজি ওষুধের কাজ নাকি সুনীলের সোহাগভরা ব্যবহার— তা সে নিজেই জানে না। মোটেই একটি ঠান্ডা সাপ নয়। সেও পারে। সেও জানে, কীভাবে প্রবল জোয়ারের ধাক্কায় ডুবাতে হয়, কীভাবে ভাসাতে হয়, একটি নাও-কে। কীভাবে সেই নাও-কে নিজের গোপন খাঁড়ির দিকে গভীরে নিতে হয়।

দুই

এক পথ-দুর্ঘটনায় হারান মণ্ডল মারা গেল। লরি-বাস নয়, তাকে ধাক্কা মেরেছিল একটা বাইক। সকালে যেমন কাজে বের হয়, সেদিনও তেমনি বেরিয়েছিল। সমুদ্রগড় স্টেশনে নেমে সে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। রাস্তা পেরোনোর সময় একটি দ্রুতগতির বাইক তাকে সজোরে ধাক্কা মারে, হারান রাস্তার ধরে অচেতন হয়ে পড়ে যায়। লোকজন জমা হয়। একটা ভুটভুটি ভ্যানে করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। সেখানে বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়েছিল তিনদিন।

লোকমুখে খবর পেয়ে সুনীলকে নিয়ে সেখানে যায় চম্পা। মৃত হারানকে দেখে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। অজ্ঞান হয়ে যায়। অবস্থা এমন দাঁড়ায়, তাকে একদিনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। তখনই জানা যায়, সে তিনমাসের পোয়াতি!

হারানের মৃত্যুর পর বাপের ভিটেতে ফিরে গেল না চম্পা। সে রয়ে গেল শ্বশুরের ভিটেতেই। কিন্তু সে এখন পড়েছে অথৈ জলে। তাকে দেখার কেউ নেই, শোনার কেউ নেই। তার সংসার চলে না। হারান বেঁচে থাকাকালীন সে বিড়ি বাঁধার কাজ করত। হাজারটা বিড়ি বাঁধলে আশি টাকা মিলত। কিন্তু এখন তাকে আর কেউ কাজ দেয় না।

সকলে বলে, হারানকে সে-ই চক্রান্ত করে মেরেছে। নইলে বাইকের ধাক্কায় কেউ মরে? আর এর সঙ্গে জড়িয়ে গেল সুনীলের নাম। ফলে সুনীল আর আসে না তার বাড়িতে। নিজের বাড়িতেও থাকতে পারে না সুনীল। কাজের অছিলায় সে নানাস্থানে চলে যায়, ফেরে না। আগে যেমন সে ফিরলেই চলে আসত চম্পাকে দেখতে, তার নাভি-পদ্মের দর্শনে, তার শরীরী সৌরভে মাতোয়ারা হতে— এখন এসবের ধারেকাছে নেই সুনীল।

সে শুনেছে, এই অবসরে সুনীলের দাদারা তাকে বাড়ি থেকে তাড়াতে উঠে পড়ে লেগেছে। ওদের কিছু জমিজমা আছে। তা থেকেও বেদখল করা হতে পারে সুনীলকে। এই নিয়ে বাড়ি থেকে সুনীলের বুড়ি মাকে নানারকম চাপ দেওয়া হচ্ছে। মাঠের ধারে, জলাজঙ্গলের মধ্যে, একটেরে এই মাটির বাড়িতে একাকী এক বিপন্ন যুবতি বিধবা কীভাবে বাস করে, এই নিয়ে সমাজের কিন্তু কোনও মাথাব্যথা নেই!

হারান মারা যাবার পর যে-মানুষটি সর্বদা তার পাশে ছিল, সে সুনীল। সেইসময় একদম ভেঙে পড়েছে চম্পা, ঘরে দুদিনের মতো খাবারও মজুত নেই, তখন সেই সুনীলই তাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে। কিন্তু সেই বা কতদিন দেবে। বিয়ের সময় একজোড়া দুল দিয়েছিল তাকে, বাপেরবাড়ি থেকে। সেটা বেচে দিল সে সুনীলেরই হাত দিয়ে কারণ, সে বুঝতে পারছিল, এইভাবে সুনীল আর বেশিদিন সাহায্য করতে পারবে না। তাকে কাজে বেরোতে হবে। আর সে কাজে গেলে মহাসমুদ্রের মাঝে হাবুডুবু খাবে চম্পা। তাই হাতে বেশ কিছু অর্থ থাকা দরকার। কারণ সে আর একা নয়। তার পেটের মধ্যে একটা প্রাণ বাড়ছে, তার কথা চম্পাকে আগে ভাবতে হবে।

দুলজোড়া হাতে নিয়ে সুনীল বলেছিল, সোনা বেচে দিচ্ছ বউ? একবার ঘর থেকে গেলে আর গড়াতে পারবে?

ম্লান গলায় চম্পা বলে, ও-জিনিস কী হবে আমার? ঘরে রেখে কী করব, বল দিকি! বিপদের দিনে সোনা যদি কাজে না-আসে মানুষের, তবে ঘরে সোনাদানা রাখা কেন?

—তা বটে!

—তিন-চার হাজার টাকা মিলবে না এ-থেকে?

—তা হয়তো মিলবে। কিন্তু এই দুলজোড়ায় যে-তোমাকে স্বপ্নের মতো লাগে, বউ!

—এ দুটি বেচে ঝুটো একজোড়া দুল এনো না হয়!

মুষড়ে পড়ে সুনীল বলে, আমার টাকা নিতে মানে লাগছে বুঝি?

—আমার মান বলো, মন বলো— সবই তুমি। তোমার এই ঋণ ফিরত দিব কী প্রকারে?

—না-হয় নাই দিলে, কে চাইছে তোমার থেকে?

—তুমি চাইবে না জানি, মাঝি। তুমি নাও বানাও, দূরে দূরে যাও টাকার দরকার কত লাগে তোমার। তাছাড়া তুমি দাদাদের সংসারে থাকো। সেখানেও টাকা দিতে হয়।

—আমার সংসার তো তুমি।

চম্পা কেঁপে ওঠে। মুখ ফিরিয়ে নেয়। তার কালো গায়ে সেই রোশনাই আর নেই। মুখ মলিন। সেই এক ঢাল কালো চুল রুক্ষ হয়ে উঠেছে। সব সময় সে কী যেন ভেবে যাচ্ছে। সব সময় চিন্তিত। সে যে পোয়াতি! একজন সহায় সম্বলহীন বিধবা কী করে একাকী একটি বাচ্চার জন্ম দেয়? তার প্রতিবেশী বা গ্রামের লোকদের আপত্তি এখানেই।

ওদের সকলেরই বক্তব্য, এই বাচ্চা আদৌ হারানের নয়। হারান জানতই না তার বউ পোয়াতি। তাদের ধারণা, এই বাচ্চা আসলে সুনীলের। এই নিয়ে নাকি তার আর হারানের মধ্যে রোজকার অশান্তি হতো। তাই তাকে ষড় করে সরিয়ে ফেলেছে সুনীল। আর এই কাজে তাকে সাহায্য করেছে চম্পা।

তিন

একদিন রাতেরবেলা, ঘুম আসছিল না চম্পার। বিছানায় শুয়ে খালি এ-পাশ ও পাশ করছে। রাত গড়াচ্ছে কিন্তু সে ঘুমুতে পারছে না। নিজের কী যে হচ্ছে, কিছু বুঝছে না সে। এইসময় তার দরজায় তিনটি টোকা পড়ল পরপর। নিঃশব্দে বিছানায় উঠে বসল সে। সাড়া দিল না। কোনও শব্দ করল না। কে হতে পারে দরজার ওপারে? সুনীল? কিন্তু সুনীল এইরকম করে না। রাতে কোনওদিন তার ঘরে আসে না সে। যতবার সে মিলিত হয়েছে সুনীলের সঙ্গে, সেটা দুপুর। উদ্দাম দুপুর, মিলনও তেমনি দুরন্ত। আর সেটা এতটাই চুপিসাড়ে যে, কারও টের পাবার উপায় নেই।

এই যে, লোকজন তার নামে এত অকথা-কুকথা বলে, সেটা হারান মারা গেছে বলেই। সুনীলের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিল চম্পা। আর বুঝেছিল, সব নারীর মধ্যেই যৌনতা থাকে। সেটাকে বের করে আনা, উপলব্ধি করার দাযিত্ব হল পুরুষের। পুরুষ যদি না পারে, সেখানে নারীর কিছুই করার থাকে না। সুনীল তাকে আবিষ্কার করেছিল। তারও কামনা আছে। তার স্পর্শেই একজন সত্যিকারের নারী হয়ে ফুটে উঠেছিল সে।

কিন্তু দরজার ওপারে কে? যে আছে, সে কোনও সাড়া করছে না। আর এমনি করে টোকা মারছে, নিশাচরের মতো, যেন কাক-পক্ষীতেও টের না পায়। মনের শঙ্কা এবার ভয়ে পরিণত হল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, কে…?

ওপাশ থেকে আওয়াজ এল— আমি, দরজা খোলো!

মেয়েমানুষের গলা! এবার নামল সে বিছানা থেকে। আলো জ্বালল। আস্তে আস্তে দরজার খিল সরাল। তবে পাল্লা দুটি হাট করে খুলে দিল না। একটা বন্ধ রেখে অপরটি একটু ফাঁক করল। ওপারের মানুষটির ছোটোখাটো চেহারার অল্প একটু দেখা গেল।

—খোলো হারানের বউ, ভয় পেয়ো না। আমি সুনীলের মা।

সুনীলের মা! সে তড়িঘড়ি দরজা খুলে দিল। এত রাতে সুনীলের মা তার কাছে কেন! সুনীলের কোনও বিপদ হল?

ঘরে ঢুকে বুড়ি বলল, নাও, এবার দরজা আটকে দাও। খিল তুলে দিল চম্পা।

—কিছু হয়েছে মাসিমা? আপনি এমন হাঁপাচ্ছেন কেন? কী হল?

—আমার বড়ো বিপদ!

—বিপদ! আপনি বসুন। জল খান। বলে বুড়িকে সে বসাল। এক গেলাস জল দিল।

বুড়ি ধাতস্থ হয়ে বলল, আমি তোমার কাছে থাকতে এলাম। আমাকে থাকতে দেবে আজকের রাতটা? আমি বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি।

—সেকি! কেন?

—ওই যে, আমি বলেছি, সুনীলকে জায়গা-জমির ভাগ দেব, তাই।

—সুনীল কোথায়?

—সে আছে নদীয়ায়।

—কবে ফিরবে?

—ফিরবে না। যদি মেরে দেয়, ওই ভয়ে ওখানে গেছে একমাস হতে চলল। যাবার আগে বলে গেছে, এবার ওখানেই থেকে যাব মা। আমি ঘর দেখছি। তার মধ্যেই এইসব ব্যাপার।

শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল চম্পার। বহুদিন হয়ে গেল, সুনীল তার কাছে আসে না। তাকে ভালোবাসে না। কতদিন সে দেখে না সুনীলকে। তার জন্য মন কেমন করে চম্পার। কিন্তু বাইরের কাউকে কিছুই বলার উপায় নেই। এমনিতেই ঢিঢি পড়ে আছে চারিদিকে। এবার তার মনকেমনের কথা একবার চাউর হলে, সে এখানে আর বাস করতে পারবে না।

সুনীলের মা গর্জে ওঠে, আমিও ছাড়ব বলে ভেবেছ? রাজবংশী পরিবারের বউ আমি। আমার এক ছেলেকে বঞ্চিত করে বাকিরা সুখ ভোগ করবে, এ আমি হতে দেব না। আমি উইল বদলাব। সমান ভাগ আর থাকবে না। তুমি একবার সুনীলকে ফোন করো।

—এত রাতে?

—হ্যাঁ, এখুনি করবে। আমি কথা বলব। তিনবার রিং হবার পর সুনীল ফোন ধরে হ্যালো বলল।

আহা! কতদিন পর সে সুনীলের কণ্ঠস্বর শুনছে। সে ফোনটা সুনীলের মায়ের হাতে ধরিয়ে দিল।

সুনীলের মা বললে, শোন সুনীল, আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। কাল ভোরের ট্রেনেই আমি আর চম্পা তোর ওখানে চলে যাচ্ছি। ঘর ঠিক করেছিস তো… আচ্ছা আচ্ছা ও… রাখ।

ফোনটা ফিরিয়ে দিয়ে সুনীলের মা বললে, আমাদের কাল ভোরের ট্রেনটা ধরতে হবে, ওদের কোনও বিশ্বাস নেই। আর ওখানে গিয়ে তোমার এই চম্পা নামটি থাকবে না। তুমি হবে চম্পাবতী রাজবংশী। নাও বউমা, কাপড়-জামা গুছিয়ে নাও। তুমি পোয়াতি, খুব সাবধানে যেতে হবে আমাদের। ভোরের ট্রেনে ভিড় কম হয়। দিনের আলো ভালো করে ফোটার আগেই আমরা ওখানে পৌঁছে যাব।

কিছু বুঝতে পারছিল না চম্পা। কেবল আমতা আমতা করে বলল, আমি, মানে…!

—বুঝতে পারছ না? ওখানে গিয়ে তোমার সঙ্গে আমি সুনীলের বিয়ে দেব। তোমাদের সব অপবাদ ঘুচিয়ে দেব। ওখানে তোমরা নিজের মতো করে সংসার পাতবে।

ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল চম্পা। মনে পড়ল, সুনীলকে একদিন বলেছিল সে, কদ্দিন আর পরের পোয়াতি বিধবার পিছনে ঘুরঘুর করবে। তোমায় এবার নিজের সংসার পাততে হবে, নিজেরটা দেখতে হবে। তোমার এখানে আর না-আসাই ভালো।

সুনীল বলেছিল, তুমি আবার পরের কোনখানটায়? পুরোটাই তো আপন।

চম্পাবতী হু-হু করে কাঁদছিল। চোখের জল বুক ভাসিয়ে দিচ্ছিল তার। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সুনীলের মা। তবু এক কষ্ট জাগে বুকের ভেতর। এত আনন্দের মাঝেও বুকের ভেতর এই এক দমচাপা কষ্ট চম্পার, কে জানে কার জন্যে!

 

 

যে যেখানে দাঁড়িয়ে

ইশ্ এই শীতকালে মেঘলা আকাশ দেখলেই ভীষণ মন খারাপ লাগে বলো। রঞ্জনা বারান্দার দরজাটা দিতে দিতে বলে।

প্রদীপ্ত লেপের মধ্যে নিজেকে সঁপে দেয়– ঠিক বলেছ। এরকম দিনে কেমন যেন পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে।

– তোমার পুরোনোদিনের কথা মানেই তো রেখা আসবে। ঠোঁট টিপে হাসে রঞ্জনা।

– বেশ রেখার কথা আর বলব না। তুমিই তো খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করো, অভিমানী স্বরে বলে প্রদীপ্ত।

– খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আবার কী! রেখার কথা যা বলো তাই শুনি। মনে কোনও প্রশ্ন জাগলে জিজ্ঞাসা করি। ব্যস। মনে হয় বঙ্কিমচন্দ্র কী আর সাধে বলেছিলেন, বাল্যপ্রেমে অভিশাপ আছে, মুখে ক্রিম ঘষতে ঘষতে চপলসুরে বলে রঞ্জনা।

প্রদীপ্ত লাজুক হাসে– যাঃ ওই বয়সে প্রেম কী তাই জানতাম না। আলগাটানে রঞ্জনাকে বিছানার মধ্যে নিয়ে এসে দু’হাতের তালুতে রঞ্জনার মুখটা ধরে বলল–প্রেম তো খুঁজে পেলাম অনেক পরে। রঞ্জনার দু’চোখে চুমু খেয়ে বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলল– এখানেই আমার প্রেমের আশ্রয় বুঝেছ।

রঞ্জনা প্রদীপ্তর চুলগুলো মুঠোর মধ্যে নিয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘাড় নাড়ল। তারপর আদুরে গলায় বলে– অনেকদিন রেখার কথা শুনিনি।

প্রদীপ্ত শুয়ে রঞ্জনার আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করতে থাকে। রেখা এক অদ্ভুত ধরনের মেয়ে ছিল, জানো তো। ক্লাসে সবসময় আমার পাশে বসত। ওকে কেউ যদি মারত আমাকে নালিশ করত। কারও কাছে বকুনি খেলেও আমাকেই বলত। একটু নাকি সুরে কথা বলত। বলার সময় ঠোঁট দুটো ফুলে যেত। চোখ ছলছল করত। অথচ আমরা তো একই বয়সি ছিলাম। কিন্তু সেই নার্সারি ক্লাস থেকেই আমি কী করে যেন রেখাকে আগলে রাখতাম। এমনকী মাঝেমধ্যে ধমক-ধামকও দিতাম। কিন্তু কক্ষনো মারতাম না। ওকে দেখলেই কেমন যেন মায়া লাগত।

– তোমার বন্ধুরা কিছু বলত না?

– অত ছোটো বয়স। এখনকার বাচ্চাদের মতো তো ম্যাচিওরড ছিলাম না। তবে মনে আছে স্কুলে কোনও অন্যায় যদি করতাম তাহলে পানিশমেন্ট হিসেবে টিচাররা আমাদের দুজনকে আলাদা বসিয়ে দিতেন। একটা মজার ঘটনা শোনো। উৎসাহে প্রদীপ্ত বালিশটা কোলে নিয়ে উঠে বসল– ক্লাস থ্রিতে পড়ি তখন। হাফ ইয়ারলি পরীক্ষায় রেখা অঙ্কে ফেল করল। কিন্তু আমি একশোতে একশো। রেখা তো হাপুসনয়নে কাঁদতে কাঁদতে বলছে– এই খাতা দেখালেই বাবা আমাকে প্রচণ্ড বকবে। আর মা তো খুন্তিপেটা করে সারা গায়ে দাগ করে দেবে। তুই আমাকে বাঁচা, তা রেখার কান্না দেখে আমারও চোখে জল চলে এল।

রঞ্জনা হেসে ফেলে– শেষমেশ রেখাকে মারের হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছিলে কি?

– সে আর এক কাণ্ড। পরে বলব। আসলে রেখাকে নিয়ে যে কত ঘটনা আছে ভাবতে পারবে না।

– সত্যি, তোমাদের মধ্যে কেমিস্ট্রিটা বেশ ছিল। আচ্ছা তোমার কী মনে হয়, রেখারও তোমার মতো করে এত ডিটেলে সব কথা মনে আছে?

প্রদীপ্তর ঘাড় নাড়া রঞ্জনা আবছা আলোতেও বুঝতে পারল।

প্রত্যয়ী স্বরে প্রদীপ্ত বলে– পৃথিবীর যে-প্রান্তেই থাকুক, রেখা কখনওই আমায় ভুলতে পারবে না।

চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে প্রদীপ্তর বুকের ভেতর থেকে– ক্লাস ফোরের অ্যানুয়াল পরীক্ষার পরপরই রেখার বাবার ট্রান্সফার অর্ডার এল। ওরা আগরপাড়া ছেড়ে গৌহাটিতে চলে যাবে। খবরটা শোনামাত্র আমি আর রেখা চিলেকুঠুরির ঘরে বসে কী কান্নাই না কেঁদেছিলাম। চলে যাবার দিনও আমরা একে অপরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে, কেউ কাউকে ভুলব না।

ছোট্ট হাই তোলে রঞ্জনা – তারপর?

– তারপর আবার কি? তখন তো আর ঘরে ঘরে টেলিফোন ছিল না। তাই আমরা একে অপরকে চিঠি লিখতাম। তুমি আগরপাড়ার বাড়িতে গেলে দেখো। চিলেকোঠার ঘরে একটা ট্রাংকে রেখার চিঠিগুলো এখনও রাখা আছে। গোটা গোটা অক্ষরে রেখা খুব সুন্দর চিঠি লিখত। রেখা শেষ যে-চিঠিটা দিয়েছিল, তাতে লিখেছিল, ওরা গৌহাটি থেকে ট্রান্সফার হয়ে মিরাট চলে যাচ্ছে। ওখানে গিয়ে নতুন ঠিকানা জানিয়ে চিঠি দেবে। কিন্তু তারপর আর কোনও চিঠি পাইনি। হয়তো ডাক গোলযোগে পাইনি।

রঞ্জনা প্রদীপ্তর কপালে নেমে আসা অবাধ্য চুলগুলো পিছনের দিকে ঠেলে দেয়–ফেসবুকে পাত্তা লাগাতে পারো তো। না হলে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দাও, ‘রেখা তোমাকে আমি খুঁজছি’। বলে খিলখিল করে হেসে উঠে রঞ্জনা আবদারের গলায় বলল– এই সত্যি বলছি। বিজ্ঞাপনের খসড়াটা করে দিও। আমি পাঠিয়ে দেব। দারুণ মজা হবে। হারিয়ে যাওয়া কাউকে খুঁজে পেলে কত ভালো লাগে জানো?

প্রদীপ্ত রঞ্জনার গালে আলতো টোকা মেরে বলে– রেখাকে তো হারাইনি।

রঞ্জনা বুঝতে পারে না প্রদীপ্তর কথায় ওর বুকে সূক্ষ্ম ঈর্ষার কাঁটা খোঁচা দিল কিনা।

– কত বছর আগের কথা ভাবো। মনে মনে সামান্য হিসেব করে নিয়ে প্রদীপ্ত বলে– তা প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল। কিন্তু এখনও রেখার সেই রোগাপাতলা চেহারা, মাঝেমধ্যে কাঁধ থেকে টেপফ্রক পরে যাওয়া, দুপাশে দুটো বেনুণি, নাকি সুরে কথা, সবকিছু আমার স্পষ্ট মনে আছে। এখনও কারও নাম রেখা শুনলেই আমি চমকে তাকাই। মেলাবার চেষ্টা করি।

রঞ্জনা বুকে বুঝি আর একবার পিঁপড়ের কামড় টের পেল।

কিন্তু রঞ্জনা জানে, প্রদীপ্ত ভীষণ সহজ সাদা-সিধে মানুষ। এজন্যই রঞ্জনার প্রদীপ্তকে ভালো লেগেছিল। কাজের সূত্রেই প্রদীপ্ত রঞ্জনাদের অফিসে আসত। আলাপ-পরিচয়পর্ব মিটিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ওরা একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। প্রদীপ্ত ওর জীবনে আসা মেয়েদের কথা পরিহাসচ্ছলে প্রায়ই বলে। বিশেষ করে রেখার কথা তো কত সহজেই বলে।

অথচ ওদের বিবাহিত জীবনের এক বছরের মধ্যেও রঞ্জনা সিদ্ধার্থর কথা প্রদীপ্তকে বলে উঠতে পারেনি। প্রদীপ্তর সঙ্গে ওর পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিতটা যাতে নড়ে না যায় সে বিষয়ে রঞ্জনা ভীষণ সতর্ক থাকে।

তবে এটাও ঠিক, রঞ্জনা মনে করে প্রতিটি মানুষেরই একটা নিজস্ব জগৎ থাকে, থাকে কিছু স্পর্শকাতর বিষয়। যা-সবসময় মনের মধ্যে সযত্নে রেখে দিতে হয়।

প্রদীপ্ত রঞ্জনার হাতে আলতো চাপ দিয়ে বলল–  আচ্ছা তোমার কথা কিছু বলো না কেন রঞ্জনা?

রঞ্জনা হেসে ফেলে– তোমার রেখার মতো আমার জীবনে দাগ কাটার মতো কেউ এলে তো বলতাম। এখন ঘুমোও তো। অনেক রাত হল।

– আরে কাল সানডে। এই শীতের দিনে ন’টার আগে বিছানা থেকে নড়ব না। সপ্তাহের ছ’টা দিনই তো শুধু চরকিপাকের মতো সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুরি। শনিবার রাতটা অন্তত বেহিসেবি হয়ে খরচ করতে দাও।

– তাহলে রেখার কথা বলো, শুনি।

– উহুঁ… আবার অন্যদিন বলব। তোমার কথা কিছু বলো না রঞ্জনা? প্রেম না থাক, ভালোলাগা বা দুর্বলতা ছিল এমন কারও কথা তো বলো।

কথাটায় রঞ্জনা প্রদীপ্তর মুখটা দেখার চেষ্টা করল। প্রদীপ্ত নিছকই কৌতূহলবশে জিজ্ঞাসা করছে কিনা তাও বোঝার চেষ্টা করল।

আসলে রাত্রির নির্জনতাকে রঞ্জনা ভয় পায়। মানুষের যে একটা সত্তা আছে, রাতের কাছে সে অসহায়। এক এক সময় অত্যন্ত দুর্বল মুহূর্তে তা আত্মসমর্পণ করতে চায়। সেজন্য রঞ্জনা সন্তর্পণে নিজেকে গুটিয়ে রাখে।

মাঝে মাঝেই রঞ্জনা একান্ত অবসরে ভাবে, কে জানে সিদ্ধার্থদা ওর কথা মনে রেখেছে কিনা।

কলেজে সিদ্ধার্থদার সঙ্গে যখন আলাপ হয় তখন রঞ্জনার সেকেন্ড ইয়ার। সিদ্ধার্থদা ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। শান্ত, স্থিতধী চেহারা। অসাধারণ বক্তৃতা দেবার ক্ষমতা। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয়। বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে সিদ্ধার্থদাকে নিয়ে মুগ্ধতাবোধ রঞ্জনার নজরে পড়ত। আর এই মুগ্ধতা থেকেই সিদ্ধার্থদার প্রতি একটা চোরা টান রঞ্জনা অনুভব করত।

তাই যেখানেই সিদ্ধার্থদা ইউনিয়নের কাজে রঞ্জনাকে যেতে বলত, রঞ্জনা খুশি মনে যেত। অথচ রাজনীতির কূটকাচালি কোনওদিনই রঞ্জনার ভালো লাগত না। তখনই রঞ্জনা বুঝেছিল যে, কাউকে ভালোবাসলে তার সবকিছুই কেমন যেন ভালো লেগে যায়। তাই পড়াশোনায় সিরিয়াস হয়েও সিদ্ধার্থদার কথায় ক্লাস বাংক করতেও রঞ্জনা আপত্তি করত না।

কিছুদিনের মধ্যেই রঞ্জনা বুঝতে পেরেছিল যে, সিদ্ধার্থদা ওকে একটু অন্য নজরে দেখে। সেজন্য স্বপ্না, সুশ্রীমা, মৌসুমী, কবিতা ওকে ঈর্ষার নজরে দেখত, সেটাও রঞ্জনা টের পেয়ে বেশ গর্বিত হতো।

একবার জুলাই মাসে ওরা কলেজ থেকে বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে পার্টিসম্মেলনে ডায়মন্ডহারবার গিয়েছিল। সিদ্ধার্থদা ছাড়া বিধানদা, মৃণালদা, শিলাদিত্যদারাও ছিল। তবে প্রধান উদ্যোক্তা ছিল সিদ্ধার্থদা। সারাদিন পার্টির নেতাদের বক্তৃতা শোনার থেকে নিজেদের মধ্যেই আড্ডা দিয়েছিল বেশি। ফেরার সময় যে-যার সুবিধেমতো দল করে বাড়ি ফিরেছিল।

রঞ্জনাকে শুধু একফাঁকে এসে সিদ্ধার্থদা বলে গিয়েছিল –তুমি আমার সঙ্গেই ফিরবে।

রঞ্জনাও মনে মনে এটাই চাইছিল। কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হওয়ার মুখে রঞ্জনা অস্থির হয়ে ওঠে। আসলে অনেক রাতে ফিরলে হোস্টেল সুপার ঝামেলা করেন। যদিও ওর রুমমেট কপোতাক্ষীকে বলা আছে, কোনওভাবে ম্যানেজ করে নেবে। তবুও অস্বস্তির চোরাস্রোত রঞ্জনাকে স্থির থাকতে দিচ্ছিল না।

তাড়া দিয়ে দিয়ে অবশেষে সাড়ে সাতটা নাগাদ সিদ্ধার্থদাকে মিটিং থেকে বার করতে পারল। কিন্তু স্টেশনে আসার পথে রিকশাওয়ালাই জানাল, ওভারহেডের তার ছিঁড়ে বিকেল থেকেই সব ট্রেন বন্ধ।

সিদ্ধার্থদা উদ্বিগ্নস্বরে জিজ্ঞাসা করল– কলকাতা যাবার বাস কোথা থেকে ছাড়ে?

সিদ্ধার্থদার অজ্ঞতায় তাচ্ছিল্যের সুরে রিকশাওয়ালা বলে –শেষ বাস সাড়ে ছ’টায় বেরিয়ে গেছে।

–তাহলে উপায়? রঞ্জনার ছিটকে আসা উৎকন্ঠিত স্বরের জবাবে রিকশাওয়ালা বলে –চলুন আমার সন্ধানে ভালো থাকার জায়গা আছে। বাসস্ট্যান্ডের কাছেই। ট্রেন কাল কখন চালু হবে ঠিক নেই। বরং কাল সকাল ছ’টা পনেরোর বাস ধরে ধর্মতলা পৌঁছে যেতে পারবেন।

রঞ্জনা সে সময় কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না। চিন্তাশক্তি লোপ পেয়ে গিয়ে মাথাটা কেমন যেন অসাড় লাগছিল। তাই সিদ্ধার্থদার সঙ্গে রিকশাওয়ালার আর কী কী কথা হয়েছিল তা রঞ্জনার কানে ঢোকেনি।

শুধু মনে হচ্ছিল, ওকে ফোন না করে মা যদি হোস্টেল সুপারকে ফোন করে, তাহলে? এরকম দু-একবার করেছে মা। পরিণতিটা ভেবেই রঞ্জনার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে গেল।

সিদ্ধার্থদা সেটা বুঝে রঞ্জনার পিঠে আলতো করে হাত রেখে বলেছিল –প্লিজ রঞ্জনা, বি স্টেডি।

রঞ্জনার মনে আছে, একটা সাধারণমানের দোতলা হোটেলের সামনে ওরা নেমেছিল। রিসেপশনের এক আধবুড়ো ভদ্রলোক ওদের আপাদমস্তক দেখলেন। কিন্তু কোনওরকম কৌতূহল প্রকাশ না করে সিদ্ধার্থদার সামনে রেজিস্টার খুলে দিয়ে বেয়ারাকে চাবিটা দিয়ে দিলেন।

ঘরটা ছিল সাগরফেসিং। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রঞ্জনা মেঘে ঢাকা আকাশের মধ্যে তারাদের খুঁজছিল। অন্ধকারে জলের মধ্যে টিমটিম করে জ্বলা মাছধরার নৌকাগুলোকে দেখে রহস্যময় লাগছিল।

রঞ্জনা ঘরের মধ্যে না তাকিয়েও সিদ্ধার্থদার উপস্থিতি টের পাচ্ছিল। একটা সিগারেট ধরিয়ে ওর পাশে দাঁড়িয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল –যাও মুখে চোখে জল দিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নাও।

রঞ্জনার মনের মধ্যে একটা অচেনা ভয় সর্পিল গতিতে জড়িয়ে ধরে ক্রমশ অসাড় করে দিচ্ছিল। তবুও বাথরুম যাওয়াটা জরুরি বলেই বাধ্য মেয়ের মতো ঘাড় নাড়ল।

বেশ কিছুক্ষণ সময় নিল বাথরুমে। তারপর নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করে বেরোল। দেখল সিদ্ধার্থদা জিন্সের প্যান্টটা হ্যাঙারে টাঙিয়ে রেখেছে। আর একটা তোয়ালে জড়িয়ে বসে আছে। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি।

একনজরে দেখেই রঞ্জনা অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নিল। ব্যাগ থেকে চিরুনি বার করে চুলটা আঁচড়াতে থাকল। দেয়াল আয়নার মধ্যে দিয়েই সিদ্ধার্থদার মুগ্ধ দৃষ্টি ও টের পেল। কেমন যেন শীত শীত করছে। সেটা কি ভয়ে, না সাগরের উত্তাল হাওয়ায় তা ঠিক বুঝতে পারছে না।

এর আগে সিদ্ধার্থদার সঙ্গে রেস্টুরেন্টে বসেছে। এমনকী পর্দাঢাকা কেবিনেও দু-তিনবার বসেছে। ইউনিয়ন রুমের মধ্যে একান্তে নানা সময় কাটিয়েছে। নানা সুযোগ পেয়েও সিদ্ধার্থদা কোনওদিন রঞ্জনার হাত ধরা তো দূরের কথা, কোনওরকম ইঙ্গিতপূর্ণ কথাও বলেনি। তাই রঞ্জনা ঠিক বুঝতে পারছে না, একঘরে রাত কাটানোর পরিণতিটা কী হবে।

ইতিমধ্যে কপোতাক্ষী ফোন করলে রঞ্জনা গলাটা যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলে দিল –ট্রেন বন্ধ। তাই এক দূর সম্পর্কের মাসির বাড়িতে থেকে যাচ্ছি রে। সুপারকে একটু ম্যানেজ করিস প্লিজ। ভাগ্য ভালো, আজ বাড়িতে মামা-মাইমা এসেছেন বলে মা খুব ব্যস্ত। তাই প্রথাগত দু-একটা কথা বলেই ফোনটা রেখে দিয়েছে।

রঞ্জনা স্মৃতির মাউস ক্লিক করে মনের মনিটারে ভেসে আসা সেদিনের ছবিগুলো দেখছিল।

রঞ্জনার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, সিদ্ধার্থদা এর পরের পার্টি সম্মেলন কোথায় হবে এই নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিল। তারপরই অত্যন্ত অনায়াস ভঙ্গীতে রঞ্জনার ডানহাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে আলতো চাপ দিয়ে বলল –রঞ্জনা এবারের কলেজ ইলেকশনে আমি জিএস হয়ে দাঁড়াচ্ছি। তুমি নিশ্চয়ই আমার পাশে থাকবে।

আকস্মিক হাত ধরার ভালোলাগায় অথবা সিদ্ধার্থদার কন্ঠস্বরের আকুলতায় রঞ্জনা তখন রীতিমতো সম্মোহিত। তাই মুখে কোনও কথা না বলে শুধু ঘাড়টা হেলিয়ে সম্মতি দিয়েছিল।

তারপর সিদ্ধার্থদা ওর খুব কাছে এসে দু’হাতের তালুর মধ্যে রঞ্জনার মুখটা ধরেছিল। সিদ্ধার্থদার দু’চোখের দৃষ্টিতে কি মায়া ছিল কে জানে, তবে রঞ্জনা সিদ্ধার্থর ইচ্ছায় নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করতে দ্বিধাবোধ করেনি।

সাগরের হু-হু বাতাস খোলা জানালার পর্দা উড়িয়ে ঘরের মধ্যে পাক খাচ্ছিল।

সারারাত জেগে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কখন যে ওরা সুখের আবেশ জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল কেউই খেয়াল করেনি। দরজা ধাক্বার আওয়াজে ঘুম ভেঙে দেখে সকাল সাড়ে আটটা। ব্যস তারপরই হুড়মুড় করে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়েছিল দুজনে।

প্রায় ন’বছর হতে চলল, তবুও রঞ্জনা সেই রাতের প্রতিটা মুহূর্তের কথা একটুও মুছতে পারেনি স্মৃতি থেকে।

আশ্চর্যজনক ভাবে ডায়মন্ডহারবার থেকে ফিরে আসার পর থেকেই সিদ্ধার্থদা ওকে দেখলেই এড়িয়ে যেত।

প্রথম প্রথম রঞ্জনা ব্যাপারটা বুঝতে পারত না। ভাবত ফাইনাল ইয়ার, পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত আছে। তাছাড়া সামনেঞ্জইউনিয়নের ইলেকশন, সেজন্যই সারাদিন মিটিং মিছিলে ব্যস্ত। তাই হয়তো আগের মতো রঞ্জনাকে সময় দিতে পারছে না। পরে সত্যিটা বুঝতে পেরে রঞ্জনাও দুরন্ত অভিমানে সরে গিয়েছিল।

পরে ওর সামনে দিয়েই সিদ্ধার্থদা মিমিকে নিয়ে ঘুরত। মিমি সরে যাবার পর শ্রাবণী।

রঞ্জনা তখন বুঝতে পেরেছিল ওর ভালোবাসার মূল্য দেয়নি সিদ্ধার্থদা। ওর বিশ্বাসকে চরম অমর্যাদা করেছে। নিছক শরীরী চাহিদা মেটাতে ওকে ব্যবহার করেছে।

ওর মুখ আর মুখোশের স্বরূপ জানার পর রঞ্জনা দীর্ঘদিন অবসাদগ্রস্ত ছিল। মাঝে মাঝে বঞ্চনার শিকার হয়েছে বলে রাগে ফুঁসত। কখনওবা সিদ্ধার্থদাকে দায়ী করে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথাও ভাবত।

এত বছর পরেও অপমানের সেই জ্বালা রঞ্জনার মধ্যে চোরাস্রোতের মতো বয়ে চলেছে। প্রদীপ্তর মতো যদি মন খুলে বলতে পারত, তাহলে হয়তো কিছুটা হলেও স্বস্তি পেত।

প্রাণপণে রঞ্জনা সেই অভিশপ্ত রাতটার কথা ভুলে যেতে চায়। পারে না। মাঝে মধ্যেই শুশুকের মতো ওর মনের গভীরে ঘটনাটা ভেসে ওঠে।

এখন তো সিদ্ধার্থদা পার্টির বড়ো নেতা হয়ে গেছে। খবরের কাগজ বা টিভিতে প্রায়ই দেখা যায়। দেখলেই যেন রঞ্জনা ফ্ল্যাশব্যাকে সিনেমার কাটা রিলের মতো ছোটো ছোটো দৃশ্যগুলো দেখতে পায়।

– এই কী হল তোমার? একেবারে চুপ মেরে গেলে যে! এত কথা বলে যাচ্ছি অথচ কোনও সাড়াশব্দ করছ না যে? ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?

প্রদীপ্তর ঝাঁকুনিতে রঞ্জনার ভাবনার জাল ছিঁড়ে গেল। সত্যি তো এতক্ষণ ধরে প্রদীপ্ত কত কথা বলে যাচ্ছিল, অথচ ওর কানে কিছুই ঢোকেনি। সামাল দিতে বলে –যাঃ, ঘুমাব কেন? তোমার রেখার কথাই তো মন দিয়ে শুনছি। রেখা সম্বন্ধে এত কথা তো আগে কখনও শুনিনি।

–থাক, খুব হয়েছে, এখন এসো তো কাছে।

রঞ্জনার শরীরের উত্তাপ নিতে নিতে প্রদীপ্ত ভাবে, জীবনের যাবতীয় রহস্য যদি প্রকাশ হয়ে পড়ে তাহলে জীবনটা একঘেয়ে ক্লান্তিকর হয়ে যায়। চাকরির শুরু থেকেই অফিসটুরে প্রদীপ্ত বেশিরভাগ ব্যাঙ্গালুরুতেই যায়। ফ্লাইট লেট বা ক্যানসেল হবার ঘটনা যে ঘটেনি তা নয়।

গত মাসে সকালবেলায় ব্যাঙ্গালুরুতেই এয়ারপোর্টে এসে শুনল ঘন কুয়াশার জন্য ফ্লাইট লেটে ছাড়বে। লাউঞ্জের কোণায় বসে এক কাপ কফি নিয়ে প্রদীপ্ত সেদিনের খবরের কাগজটায় চোখ বোলাচ্ছিল।

কিছুক্ষণ পর এক সুবেশা ভদ্রমহিলা এসে ওর পাশে বসল। ঈষৎ উত্তেজিত হয়ে চোস্ত হিন্দিতে কাউকে ফ্লাইট লেট হবার কথা বলছিলেন। কথাবার্তা শুনে মনে হল ভদ্রমহিলা দিল্লিতে কোনও ভাইটাল মিটিং অ্যাটেন্ড করতে যাচ্ছেন।

ফোনটা রেখে প্রদীপ্তর দিকে তাকিয়ে মুখে আলগা হাসি টেনে বলল –এক্সকিউজ মি, ক্যান আই হ্যাভ ওনলি দ্য ফ্রন্ট পেজ অফ ইয়োর নিউজপেপার প্লিজ।

প্রদীপ্ত মৃদু হাসি হেসে ঘাড় নেড়ে বলল –ইয়েস ইয়েস। হোয়াই নট! পুরো পেপারটা ধরে ভদ্রমহিলার দিকে এগিয়ে দিয়েছিল।

তারপর অলস দৃৃষ্টি ফেলে প্রদীপ্ত টুকরো টুকরো নানা ঘটনা দেখছিল।

হঠাৎ ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ রিংটোনটা কানে ভেসে এল। তারপরই ‘ইয়েস রেখা স্পিকিং’ কথাটা শোনামাত্র প্রদীপ্ত সচকিত হয়ে গেল।

ভদ্রমহিলার হাতের ছোটো ব্যাগটায় লাগানো ট্যাগটা সন্তর্পণে দেখার চেষ্টা করল। দেখল লেখা আছে রেখা রায়।

প্রদীপ্ত দেখল ভদ্রমহিলা ফোনে বাংলাতেই কথা বলছেন, তবে কথার মধ্যে ব্যস্ততার সুর। ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে প্রদীপ্ত প্রায় কুড়ি বছর আগের দেখা রেখার সঙ্গে মেলাবার চেষ্টা করছিল।

নিজের অগোচরেই প্রদীপ্ত কতক্ষণ যে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে ছিল, জানে না। চমক ভাঙল ভদ্রমহিলার কথায় –ডু য়ু ওয়ান্ট টু সে সামথিং?

প্রদীপ্ত অস্বস্তির হাসি হেসে বলল –আপনি বাঙালি?

– হ্যাঁ। কেন বলুন তো?

কে জানে কেন ভদ্রমহিলার ভ্রূ কুঁচকে চোখ সরু করে কথা বলার ভঙ্গিটা প্রদীপ্তর খুব পরিচিত লাগল।

তাই সামান্য ইতস্তত করে বলল –আপনি কি কখনও আগরপাড়ায় থাকতেন? কুসুমপুর বিদ্যামন্দিরে পড়াশোনা করতেন? আপনার নাম রেখা দে?

প্রদীপ্তর কথায় ভদ্রমহিলার চোখে-মুখে একরাশ বিস্ময়। আলতো করে ঘাড় নেড়ে বললেন –হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে তো আমি ঠিক…।

প্রদীপ্ত একগাল হেসে বলল –আমাকে চিনতে পারলে না রেখা? আমি প্রদীপ্ত। প্রদীপ্ত সিন্হা। দ্যাখো একেই বলে পৃথিবী গোল। আমি জানতাম। ঈষৎ প্রত্যয়ীস্বরে বলল –শুধু জানতাম না বিশ্বাস করতাম, একদিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবেই। আর দেখা হলে চিনতে আমি পারবই।

ভদ্রমহিলা অস্বস্তির হাসি টেনে বললেন –প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড। আর একটু যদি ডিটেলে বলেন তো হয়তো সব মনে পড়ে যাবে।

ভদ্রমহিলার কথায় প্রদীপ্তর যেন সব উৎসাহে জল পড়ে গেল। অবিশ্বাসীর দৃষ্টিতে ভদ্রমহিলার দিকে তাকায় প্রদীপ্ত –সত্যি আমায় চিনতে পারছ না? নাকি ঠাট্টা করছ? আরে ক্লাসে সবসময় তুমি আমার পাশে বসতে। আমরা একসঙ্গে স্কুলে আসতাম, ফিরতামও একসঙ্গে। তুমি কাঠচাঁপা ফুল খুব ভালোবাসতে। স্কুলের পিছনের গাছটা থেকে আমি ফুলের ডাল ভেঙে আনতাম। মনে পড়ছে?

ভদ্রমহিলা ঘাড় নেড়ে বললেন –হ্যাঁ, হ্যাঁ একটু একটু মনে পড়ছে।

প্রদীপ্ত মরিয়া হয়ে মনে করানোর চেষ্টায় বলল –আচার খেতে খুব ভালোবাসতে। ঠাকুমার ঘর থেকে আচার চুরি করতে গিয়ে কাঁচের বয়াম ভেঙে ফেলেছিলাম। হাত-পা কেটে রক্তারক্তি কান্ড। তা দেখে তুমি চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলে, আর আমি ধরা পড়ে গেলাম।

সরস্বতী পুজোর দিনে সকালে উঠে ফুল চুরি করতাম। মনে পড়ছে সে সব দিনের কথা?

কথার মাঝেই দিল্লি ফ্লাইটের প্যাসেঞ্জারদের চেক্ ইন করার জন্য অ্যানাউন্সমেন্ট শোনা গেল।

ভদ্রমহিলা হাতের ব্যাগটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর প্রদীপ্তর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি হেসে বললেন – বাব্বা কতদিন আগেকার ঘটনা। এত ডিটেলে সব কিছু মনে আছে দেখে সত্যিই ভীষণ আশ্চর্য লাগছে। ওকে চলি। সো নাইস টু মিট ইউ। বলে প্রদীপ্তর দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন।

প্রদীপ্ত যন্ত্রবৎ হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। দুটো হাতের ছোঁয়াতে কোনও উষ্ণতা ছিল না।

রেখার চলে যাওয়াটা প্রদীপ্ত দেখতে দেখতে ভাবল, এতদিনে রেখা সত্যি সত্যিই ওর জীবন থেকে হারিয়ে গেল। তারপরই হঠাৎ মনে হল, নাঃ এভাবে রেখাকে ও হারিয়ে যেতে দেবে না। রেখার সঙ্গে দেখা হওয়ার ঘটনাটা প্রদীপ্ত রঞ্জনাকে কখনও বলবে না। রেখা ওর জীবনে যে-জায়গায় ছিল, রঞ্জনার কাছে গল্প করার মধ্য দিয়ে প্রদীপ্ত ওর রেখাকে ঠিক সেই জায়গাতেই নিজের করে রাখবে।

আমেরিকান ডায়মন্ড

সরলা মাসি একেবারে খাঁটি বাঙাল। খাসা হাতের রান্না। ‘বাঙালরা আনাজপাতির খোসাও ছাড়ে না’ কথাটা ব্যাঙ্গাত্মক শোনালেও, কোনও ঘটি মাইয়ার পক্ষে ওই খোসাকেই অতুলনীয় সুস্বাদু করে তোলা প্রায় অসম্ভব। আমার রান্নার লোক। বহুদিন হয়ে গেল রয়েছে এবাড়িতে। তার টানটান বাঙাল ভাষার সঙ্গে রসিকতা তো তুলনাহীন। বেশ মজায় কাটে সকালটা। সেদিন সকালে রান্নাবান্না নিয়ে মাসির সঙ্গেই কথা বলছি, সেই সময় পাশের বাড়ি থেকে সোমার চিৎকার, ‘কেয়া আছিস? আয় শিগগির একটা জিনিস দেখে যা।’

ক্ষণিক বিলম্ব না করেই জবাব দিলাম, ‘আসছি আসছি।’ কারণ, খুব ভালো করেই জানি সাড়া না দিলে এক্ষুনি বাড়িতে চড়াও হবে। কালই মুম্বই থেকে ওর বর ফিরেছে। নিশ্চয়ই ওর জন্য অনেক কিছু এনেছে। সেটা দেখানোর জন্যই এত তৎপর। যাবার জন্য উঠে দাঁড়াতেই মাসি বেশ মজা করেই বলল, ‘যাও তোমারে হোয়াগ কইরা ডাকতাসে, কত কী দ্যাহাইব।’

‘ওঃ মাসি তুমিও না। ও যদি একটু দেখিয়ে শান্তি পায়।’

‘যাও যাও। তোমারে কেডা আটকাইতাসে।’

খানিক হেসে বললাম, ‘ঠিক আছে তুমি রান্না করো। আমি আসছি।’

সোমার বাড়িতে ঢোকা মাত্রই একপ্রকার পাকড়াও করে সোফায় নিয়ে গিয়ে বসিয়েই হাতে একটা সালোয়ার কামিজ ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘দ্যাখ কী সুন্দর, না?’

‘দারুণ রে, কাপড়টাও খুব ভালো। কৌশিক এনেছে না?’

‘আর কে আনবে বল? ওই একজনই তো আছে আমার ডার্লিং। দ্যাখ না এইবার তো তিনটে নাইটিও নিয়ে এসেছে। এটা তো আমি কাল রাতেই পরেছিলাম। কী সেক্সি না।’ সোমার চোখেমুখে খুশি ফুটে উঠল। ‘মাসে একবারই তো বাড়িতে আসে। যা যা নিয়ে আসে সব ওকে পরে পরে দেখাতে হয়, না হলেই তেনার মুখভার।’

‘তবে একটা কথা মানতেই হবে কৌশিকের আনা নাইটিগুলো সত্যিই অন্যরকম। এগুলো পরলে অটোমেটিক একটা রিচ লুক চলে আসবে।’ হাসতে হাসতে বললাম বটে, কিন্তু কেন জানি না খটকা একটা ছিলই। আমরা যে-স্ট্যান্ডার্ডে বিলং করি সেখানে এইধরনের ড্রেস একেবারেই খাপ খায় না। যে-কোনও কিছুর জন্যই যথাযথ পরিবেশ থাকাটা জরুরি। সেই পরিবেশ আমাদের মতো মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিতে কোথায়? ছোট্ট পরিসরে ফ্যামিলির সঙ্গে থাকতে গেলে এমন ভাবনাই ভুল। সেখানে কৌশিকের এমন পছন্দ…! ওর ব্যাকগ্রাউন্ডও তো তেমন সাউন্ড বলে মনে হয় না যে বলব,

বংশপরম্পরায় পাওয়া। তারপরেই মনে হল দূর এসব কী নিয়ে পড়লাম আমি, নিজেকে সংযত করলাম।

সোমা তখনও স্বামীর নাম জপে চলেছে। সেই সময় আমার বাড়ির টেলিফোনটা বেজে উঠল। বাড়ি যাওয়ার একটা ছুতো পেয়ে গেলাম। ‘আমি আসি রে। কে ফোন করছে কে জানে। মাসিও তো রান্না সেরে বাড়ি ফিরবে। সব দেখে-টেখে নিই। যাই।’ বলেই বেরিয়ে এলাম। বাড়ি ঢুকতে ঢুকতেই ফোনটা কেটে গিয়েছিল।

ফিরে আসার পরেও মনটা ওই নাইটির মধ্যেই আটকে রইল। শুধু কেন কেন কেন – মনের মধ্যে হাজারো প্রশ্ন। স্বামীর এত প্রশংসা – কেন কী দেখাতে চায় ও? ওর স্বামী ওকে কত ভালোবাসে, নাকি কৌশিক এখন অনেক টাকা রোজগার করছে, সেটা জানানোটাই প্রধান উদ্দেশ্য।

কদিন আগেও তো কৌশিক স্টেজ-শো করে বেড়াত। সুদর্শন হওয়ার সুবাদে দু-একজন পরিচালকের দয়ায় সিরিয়ালে ছোটোখাটো রোলে অভিনয় করত। হঠাৎ বউয়ের কথা শুনে নতুন ব্যাবসা শুরু করে এত টাকা উপায় করে ফেলল যে, ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাব থেকে শুরু করে গাড়ি পর্যন্ত কিনে ফেলল।

ভাবনায় এতটাই মশগুল হয়ে গিয়েছিলাম যে, বুঝতেই পারিনি, মাসি এর আগেও আমাকে ডেকেছে। এবার বেশ জোরেই বলে উঠল, ‘কী ভাবতাস কও তো। তহন থেইকা ডাকতাসি।’

‘ও! হ্যাঁ হ্যাঁ। বলো কী বলছ?’

‘কইতাসি, রান্না হইয়া গেসে। আমি আইতাসি।’

দুপুরে খাবার পর শুয়ে শুয়ে টিভিতে খবর দেখছি, ফোনটা আবার বেজে উঠল। রিসিভার তুলে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপার থেকে ভেসে এল খুনশুটি মেশানো স্বর, ‘হাই জানু, কী করছ?’

‘আরে টিভি দেখছিলাম…’ কথা শেষ হওয়ার আগেই ওপার থেকে বলতে শুরু করল, ‘টিভির দোহাই কেন দিচ্ছ ডিয়ার, বলোই না অজিত ছাড়ছিল না, তাই ফোন ধরতে এত দেরি করলে।’ স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই বলে যাচ্ছিল রাইমা।

‘রাইমা, সত্যি তুই আর শোধরালি না।’

‘শোধরাতে চাইলে তবে না শোধরাব। মুম্বইতে এসে তো আরও বিগড়ে গেছি। তুইও আয় তোকেও বিগড়োনোর সব পথ বাতলে দেব। অ্যায়েশ কাকে বলে দেখবি তখন।’

‘কী করে যাব বল। জানিসই তো অজিতের ব্যাবসার চক্বরে এখন আর কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠে না। এখন তো বিজনেসের খানিকটা দায়িত্ব আমার কাঁধেও চাপিয়ে দিয়েছে। সময়ের অভাবে এখন আর স্ক্রিপ্টও লিখতে পারি না।’ মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমার।

‘ডোন্ট ওরি কেয়া, ম্যায় হু না। সামনের মাসেই কলকাতায় আসছি। তোকে দিয়েই পুরো স্ক্রিপ্ট লেখাব ভেবেছি। কলকাতায় তো সময় দিতে পারবি নাকি?’

‘আরে হ্যাঁ হ্যাঁ এখানে হলে আমি ঠিক সময় বার করে নেব। তুই শুধু জানাস কবে আসবি, সেইমতো তোর থাকার ব্যবস্থা করব আমি।’ এক ঝটকায় মনটা ভালো হয়ে গেল।

‘না না, আমি হোটেলেই থাকব। কেন আমার আনন্দটা মাটি করতে চাইছিস বলতো।’ বেশ অবাক হয়েই বললাম, ‘মানে। ঠিক বুঝলাম না।’

‘জীবনকে কীভাবে উপভোগ করতে হয়, সেটা এখনও শিখিসনি তুই।’

‘তুই কী বলছিস কিছুই বুঝতে পারছি না।’ বোকার মতো বলে বসলাম।

‘স্টুপিড কোথাকার। তোকে বুঝতেও হবে না। যখন কলকাতায় আসব সময় নিয়ে তোকে সব বোঝাব। চল ফোন রাখছি। আমার স্পেশাল খাবার এসে গেছে।’

‘স্পেশাল খাবার! হ্যাঁ তো ঠিক আছে না খেতে খেতেও তো…’ ততক্ষণে ফোনটা কেটে গেছে। রাইমাটা কী যে করে! যাকগে আমার জন্য এটাই ভীষণ খুশির খবর যে, ও কলকাতায় আসছে। হিন্দির পাশাপাশি বাংলাতে অনেক সিরিয়াল, টেলিফিল্ম বানিয়েছে ও।

সাত বছর আগে সেই যে সিরিয়ালের শ্যুটে মুম্বই গেল, ওখানকার হয়েই থেকে গেল। মাঝে ওর বাংলা সিরিয়ালের জন্য বার চার-পাঁচেক স্ক্রিপ্টও লিখেছি। তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব। অনেকে তো ভাবত, আমরা দুই বোন। আজ ও উচ্চতার শিখরে পৌঁছে গেছে। একডাকে সবাই চেনে। বলা যেতে পারে সেলিব্রিটি। এত কিছুর পরেও কিন্তু আমাকে ভোলেনি। ওখানে গিয়ে বহুবার আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে, কিন্তু সংসারের জন্য সম্ভব হয়নি। এখন যখন রাইমা এখানে আসছেই, কাজের জন্য বেশ কিছুদিন থাকার প্ল্যানও আছে, তখন আমারও কাজ করতে অসুবিধা নেই।

সেইদিন রাতেই অজিতকে, রাইমার শহরে আসা থেকে আমার স্ক্রিপ্ট লেখা সব কিছুই জানালাম। আনন্দে উচ্ছ্বসিত অজিত, আমার হাতদুটো ধরে বলেছিল, ‘বিশ্বাস করো কেয়া, আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার ব্যাবসার চক্বরে তোমার ট্যালেন্ট চাপা পড়তে বসেছে। হয়তো তোমাকে বলতে পারিনি, মনে মনে ভীষণ অনুশোচনা হতো। যাক, আজ আমি খুব খুশি।’

এখন শুধু রাইমা আসার অপেক্ষা।

দিনকতক পরে শহরে পৌঁছে একটি পাঁচতারা হোটেলে উঠল সে। হোটেলে চেক-ইন করার পরেই ফোন করে ডেকে নিল আমাকে। তৈরি হয়ে বেরোতে যাব, সেই সময় সোমা এসে হাজির। ঘরে ঢুকে কোনও দিকে না দেখেই হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘দ্যাখ, আংটিটা। কাল শপিং করতে গিয়েছিলাম। সামনে জুয়েলারি শপ দেখে লোভে পড়ে ঢুকে গেলাম। কিনে ফেললাম আর কী। কেমন হয়েছে রে?’

কোনওরকমে দেখে বললাম, ‘ভালো হয়েছে।’

আমার দেখার ধরনটা ঠিক ওর পছন্দ হল না। মুখটা কেমন একটু বাঁকিয়েই বলল, ‘কোথায় এমন যাচ্ছিস যে একটু ভালো করে দেখবি সেই সময়ও নেই তোর।’

‘হ্যাঁ সত্যিই সময় নেই রে। সিরিয়ালে স্ক্রিপ্ট লেখার একটা কাজ পেয়েছি। প্রোডিউসারের সঙ্গেই দেখা করতে যাচ্ছি। সরি রে আমি ফিরে তোর সঙ্গে কথা বলব।’

জানি এসব টিভি সিরিয়াল, অ্যাক্টিং ওর একেবারেই পছন্দের নয়। সেই কারণেই কৌশিকের পিছনে সর্বক্ষণ পড়ে থাকত। এসব ছোটোখাটো কাজ ছেড়ে যাতে মোটা টাকা উপার্জন করতে পারে, সেরকম কাজ করার কথাই বলত। আজ অবশ্য প্রপার্টি ডিলিং-এ ভালোই ইনকাম করছে সে। সোমার খুশি থাকার কারণই হল তাই। কৌশিক সোমাকে এত টাকা দেয়, যখন যা খুশি কিনে ফেলে।

‘অজিতদা জানে যে তুই…’

দরজায় তালা দিতে দিতেই বললাম, ‘আরে হ্যাঁ হ্যাঁ।’ সোমা মুখ ব্যাজার করে চলে গেল। আমিও তর্কে না জড়িয়ে হোটেলের দিকে রওনা দিলাম।

হোটেলে পৌঁছেই দেখলাম রাইমাকে ঘিরে সাত-আটজন বসে রয়েছে। আমাকে দেখেই উঠে এসে জড়িয়ে ধরে স্বাগত জানাল সে।

‘হাই, মাই সুইটহার্ট… অনেকদিন পর দেখা হল আমাদের।’

‘সত্যিই অনেকদিন হয়ে গেল। তোকে ভীষণ মিস করতাম।’

‘ওহ্ রিয়েলি, সো সুইট। আয় বস।’ ওর পাশেই বসাল আমাকে।

‘আলাপ করিয়ে দিই, এ হল আমার সুইটহার্ট, কেয়া। আমার অনেক দিনের পুরোনো বন্ধু আর খুব ভালো রাইটারও… দশ বছর তো হয়েই গেছে না আমাদের বন্ধুত্বের… কী রে কেয়া তাই তো?’

হেসে উত্তর দিলাম, ‘বেশি হবে।’ সবার চোখেই তার প্রতি বেশ একটা সমীহ নজরে পড়ল।

‘কেয়া, ইনি হলেন ডাইরেক্টর বিনয়, ইনি মিউজিক ডিরেক্টর শতদ্রু। আর এরা রাহুল, সুমিত, প্রিয়ংকা আর শামসের। এরা সবাই শিল্পী তো বটেই, সঙ্গে আমার সমস্ত কাজ এরাই দেখাশোনা করে। আমাকে কিছু করতেই দেয় না।’

বুঝতেই পারলাম এরা সবাই রাইমার সহকারী। ‘রাহুল খাবারদাবারের ব্যবস্থা করো। অর্ডার দেওয়া হয়েছে তো?’ প্রশ্ন করল রাইমা।

‘হ্যাঁ, ম্যাডাম এক্ষুনি চলে আসবে।’

মিনিট চল্লিশ পর খাওয়াদাওয়ার শেষে রাইমা সবাইকে সবার কাজ বুঝিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিল। ঘরে এখন ও আর আমি। ‘দ্যাখ পরের সিরিয়ালে আমি বাছা বাছা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে কাজ করার কথা ভাবছি। সেইমতো কথাও হয়েছে কয়েকজনের সঙ্গে। সুতরাং স্ক্রিপ্ট-টা কিন্তু ফাটাফাটি হওয়া চাই।’ ওর কথা বলার স্টাইল দেখেই মনে হল ও ওর কাজের প্রতি কতটা যত্নশীল।

ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম। তারপর কিছু রিসার্চ পেপার দিল আমাকে, যেগুলোকে বেস করেই স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে হবে আমাকে।

ওর কথা শেষ হয়ে যাওয়ার পর বলেই ফেললাম, ‘এই কয়েক বছরেই ইন্ড্রাস্ট্রির খুঁটিনাটি সব কিছু বিষয়ে দারুণ অভিজ্ঞ হয়ে গেছিস।’

‘ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করব আর সেই জায়গা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা থাকবে না তা কখনও হয় বল? তুইও আমার সঙ্গে থাক, তোকেও সব শিখিয়ে-পড়িয়ে নেব।’ বলেই আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

‘মনেই হচ্ছে না যে, তুই আমার সেই পুরোনো বন্ধু রাইমা।’

‘মনে হবে কী করে। আমি তো সত্যিই আর আগের মতো নেই।’ কথাটা শেষ করে আবার হেসে ফেলল সে।

‘আচ্ছা ঠিক আছে, এসব প্রসঙ্গ ছাড়। বলতো, অজিত তোর ঠিকঠাক দেখাশোনা করে তো?’

ওর চোখের দুষ্টু চাহনি দেখেই বুঝেছিলাম, এবার আমাকে রাগাবার ধান্ধায় আছে।

বললাম, ‘খুব ভালো করেই দেখাশোনা করে, খেয়াল রাখে…, আমাকে দেখে কী মনে হচ্ছে না?’

‘আচ্ছা আর একটা কথা বল?’ ঠোঁটের কোণায় সেই শয়তানি হাসি।

‘আবার কী?’ বেশ বিরক্ত হয়েই বললাম।

‘না, বলছি রোজরোজ একই মাছের ঝোল-ভাত খেয়ে তুই বোর হয়ে যাস না। না মানে, নতুন কিছু খেতে ইচ্ছে করে না তোর?’

‘এই, তোর এই কথাগুলোই আমার ভালো লাগে না। ভালো কিছু বলতে পারিস না?’

‘দ্যাখ সেটাই তো বলছি, আমার একই কথা যেমন তোর ভালো লাগে না, সেইরকমই রোজরোজ একই জিনিস… মনে হয় না, নতুন কিছু করে দেখাই? বিলিভ মি, এই বিন্দাস লাইফ উপভোগ করতে শিখেছি মুম্বই গিয়ে। এখানে তো বেশিরভাগই মুখোশধারী।’ কথার মাঝেই ফোনের কি-বোর্ডে তার ফাইলকরা নেলপেইন্ট লাগানো আঙুলগুলো খেলা করে বেড়াচ্ছিল। আধুনিক জীবনের জনসংযোগ ব্যাবস্থা।

‘দ্যাখ সেই সকালে এসেছি, এখন সন্ধে হয়ে গেছে। কত কাজ, ক্লান্তি আসাটাই তো স্বাভাবিক বল। এখন মাইন্ড রিফ্রেশ করার জন্য তো আর জয়পুর থেকে বরকে আসতে বলতে পারি না। যখন খিদে পায়, তখনই খাওয়া উচিত, বাড়ি ফিরে ঘরের খাবারই খাব এটা তো অযৌক্তিক ভাবনা, তাই না। বল এব্যাপারে তোর কী অভিমত।’

‘রাইমা, ক্ষ্যামা দে বাবা। ওহ্ তুই আর তোর চিন্তাভাবনা।’ আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই দরজায় নক করে রাহুল ভিতরে এল।

‘বলুন ম্যাডাম।’

‘জয় কোথায়?’ বলেই আগ্রহী ভাবে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

‘জয় পরশুদিনের শুটিং-এর প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস আনতে গেছে। মিনিট পাঁচেক আগেই ফোন করেছিল। আসার সময় হয়ে এসেছে।’

‘ঠিক আছে। এলেই আমার কাছে পাঠিয়ে দিও। তুমি একটু ড্রিংকস বানাও।’

‘ঠিক আছে ম্যাডাম।’ বলেই সে তার কাজে লেগে গেল।

রাহুলকে ড্রিকংস বানাতে বলার পর মুচকি হেসে হঠাৎই আমাকে প্রশ্ন করে বসল, ‘এনজয় করেছিস কখনও? জীবন কাকে বলে জানিস?’

‘এ আবার কেমন কথা হল! গতবারই তো গৌহাটিতে গিয়ে দারুণ মজা হল। অজিত, আমি, মা, বাবা, অজিতের বন্ধুর ফ্যামিলি।’

রাইমা মাথা চাপড়ে বলল, ‘ধ্যাত তেরি কা। তোর দ্বারা কিস্সু হবে না।’ রাহুল ততক্ষণে ড্রিংক তৈরি করে দিয়ে চলে গেছে।

‘চল আজ আমরা দুজনে একসাথে জীবনটা উপভোগ করব।’ বলেই রাইমা আমার হাতে একটা আলতো চাপ দিল।

‘মানে!’ বিস্ময় ভরা নজরে তাকিয়ে থাকলাম ওর দিকে।

‘জয় বলে যে-ছেলেটাকে ডেকে পাঠালাম, দেখবি দারুণ হ্যান্ডসাম আর খুব চার্মিং। রাজস্থানের ছেলে… টুকটাক অভিনয় করত। অ্যাক্টিং-টা একেবারেই পারত না। আমি ওকে প্রোডাকশন কন্ট্রোলার-এর কাজটা দিলাম। ওকে দেখে যে কত অ্যাক্টর ফিদা হয়ে আমার কাছে কাজের জন্য আসে জানিস না। তাছাড়া আমার স্পেশাল কাজে তো লাগেই।’ রাইমার উপর কেমন যেন নেশা চড়ে বসল।

মনে মনে কুঁকড়ে গেলাম। কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করলাম না। কিছু বলতে গেলে যদি ও রেগে যায়। খানিক চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করল রাইমা, ‘জানিস কেয়া, আমার সিরিয়ালে প্রথম যে-ভদ্রলোক টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন, তিনি তো আমাকে দেখে একেবারে পাগল। ওই ভদ্রলোকের স্ত্রী রঞ্জনা আবার জয়কে দেখে নাছোড়। ওকে ওর চাই-ই। কতবার তো রঞ্জনা আর আমি জয়কে একসাথে শেয়ার করেছি।’

হাঁ হয়ে গেলাম আমি। আমাকে দেখে বলল, ‘অবাক হওয়ার কিছু নেই। ভালোভাবে বাঁচতে গেলে, নিজেকে ভালো রাখতে গেলে এগুলো দরকার। জাস্ট ফর রিল্যাক্সেশন। অবশ্য আমিও ওর জন্য কম করি না। কাজের দরুন প্রতি মাসে চল্লিশ হাজার আর আমার মাইন্ড ফ্রেশ রাখার জন্য প্রতিবার দশ-কুড়ি হাজার দিই। সঙ্গে ওর বউয়ের জন্য কাপড়চোপড়। এছাড়া যখন যা সঙ্গে থাকে।’ এসব শুনে সামনের মানুষটা যে ওর সম্পর্কে ঠিক কেমন ধারণা করতে পারে, সেদিকে বিন্দুমাত্রও ভ্রূক্ষেপ নেই রাইমার।

ওর সত্যিটা মানতে কষ্ট হলেও, নিজেকে সংযত করে বললাম, ‘দ্যাখ, প্রত্যেকটা মানুষই নিজের মতো করে বাঁচতে চায়। তুই তোর পৃথিবীতে খুশি, আমি আমার ফ্যামিলি নিয়ে। যাক এসব কথা এখন থাক। তুই এনজয় কর, আমি চললাম।’ বলে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

আমাকে উঠতে দেখেই বলল, ‘হ্যাভ এ চেঞ্জ ডিয়ার। একবার ওকে দেখলে তোর আর ছেড়ে যেতেই ইচ্ছে করবে না। আমি তো তোকে অজিতকে ছাড়তে বলছি না। তোদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও থাকল আর এক্সট্রা… মাঝে মাঝে তো এটা হতেই পারে নাকি।’ এক পেগ শেষ হওয়ার পর আর এক পেগ তুলে নিল রাইমা। ঠিক তখনই দরজায় নক করে ভিতরে ঢুকে এল জয়। দরজার দিকে পিছন করে বসেছিলাম বলে মুখটা ঠিক দেখতে পেলাম না।

‘কাম ডার্লিং, কাম।’ রাইমা ওর হাত ধরে নিয়ে একেবারে বিছানায় গিয়ে গা-ঘেঁষে বসল। অবশ্য গা-ঘেঁষে বললে বোধহয় ভুল হয়, কারণ রাইমার অর্ধেক শরীরটাই তখন জয়ের কোলে।

‘আমার বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই… কেয়া।’ মুখ তুলে আগন্তুককে দেখেই আমার চোখ কপালে উঠে গেল। ভুল দেখছি না তো। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। জয়েরও একই অবস্থা। কোনও কিছু বোঝার আগেই রাইমা জয়কে জড়িয়ে ধরে জয়ের শার্টের বাটন খুলতে শুরু করল। আর নিজেও প্রায় অর্ধনগ্ন হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর উপর।

‘উঃ ডিয়ার জয়… জয়… জয়…’

বুঝতে আর কিছু বাকি রইল না আমার। কৌশিক-ই তাহলে জয়। নাম ভাঁড়িয়ে কাজ করছে এখানে। তা হলে এটাই ওর প্রপার্টি ডিলিং-এর বিজনেস! মাথা ঘুরছিল। কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। বারবার সোমার সেই হাসি মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। কৌশিক খুব ভালোবাসে। নতুন নতুন নাইটি, শাড়ি, দামি গিফট এনে দেয়। এই তার ভালোবাসার নমুনা! ওদের দিকে আর তাকাতে ইচ্ছে করছে না। কোনওরকমে আসছি বলে হোটেল রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। মনে হল জয় নিজেকে ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ ছটফট করছে।

‘উঃ ছটফট করছ কেন। মুড খারাপ কোরো না আমার।’ রাইমার এই অস্ফুট স্বর সারা রাস্তা কানে বাজতে থাকল আমার। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। চেনামুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই রক্তমাংসের কদর্যতা সহ্য করতে পারছিলাম না আমি। ভাবলাম বাড়ি ফিরে স্নান করব। মাথাটা ঠান্ডা হবে।

বাড়ি ফেরার পথেই মোড়ের দোকানে রমলার সঙ্গে দেখা। রমলা ও-বাড়ির কাজের লোক। থাকা-খাওয়া সবই ওখানে। ও-ই বোধহয় আমার ফেরার খবরটা দিয়েছে। জিরোব বলে সবে ফ্যানটা চালিয়েছি, অমনি দরজায় ধাক্বা। খুলে দেখি ‘সোমা’। ওকে দেখেই হঠাৎ করে কেমন যেন শিউরে উঠলাম।

‘কীরে ভূত দেখলি নাকি। এমন চমকে উঠলি কেন?’

‘না না এমনি। বস। আমি হাতমুখ ধুয়ে আসি।’

ফিরে এসে দেখলাম হাতের আংটিটা নিয়েই নাড়াচাড়া করছে। দেখেও না দেখার ভান করলাম। ঘরে ঢোকামাত্রই জিজ্ঞাসা করল, ‘যে-কাজে গিয়েছিলি সব ঠিক হয়ে গেছে?’ উত্তরের আশা না করে হাতটা বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। ‘তখন তো ঠিক করে দেখলিই না। এই দ্যাখ ডায়মন্ড রিং এটা।’

প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েই প্রশ্ন করলাম, ‘কৌশিক কোথায় রে? ফেরেনি এখনও?’

‘না সকালে বলেই বেরিয়েছে কী যেন বড়ো একটা ডিল আছে, দুদিন ফিরতে পারবে না। কেন রে কিছু হয়েছে নাকি?’

‘নাঃ। এমনিই, কী আর হবে?’

একবার মনে হল ওকে সবকিছু জানিয়ে দিই, ওরও জানাটা প্রয়োজন। আবার পরক্ষণেই ওর মুখের হাসিটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। চুপ হয়ে গেলাম।

ওকে দেখে ভীষণ মায়া হল। বেচারি। একজন মধ্যবিত্ত মহিলার পক্ষে পাঁচতারা হোটেলের অন্দরমহলে কী হচ্ছে, সেটাও তো জানা সম্ভব নয়। আর বড়ো বড়ো লোকেদের মাইন্ড রিল্যাক্সেশন – এসব তো ওর ভাবনাচিন্তার উর্দ্ধে।

টুকটাক শপিং ছাড়া মেয়েটা আর যায়ই বা কোথায়, যে স্বামীর স্বেচ্ছাচারিতার কথা জানতে পারবে। স্বামীর প্রতি অন্ধ বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের উপরই দাঁড়িয়ে আজ ও কত সুখী। সেই খুশিতে বাধ সাধতে ইচ্ছে হল না। কাজেই আমিও ওকে খুশি করতে আংটিটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখতে লাগলাম। কখন যে হিরের দ্যুতি ঠিকরে এসে চোখের কোণায় জল জমিয়ে দিয়েছে বুঝিনি।

 

কলকাতার জিগোলো

।।১।।

গাড়িটা এটিএম-এর সামনে এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নেমে এল এক স্মার্ট সুদর্শনা যুবতি। সে নিজেই ড্রাইভ করছিল।

এটিএম-এর সামনে দাঁড়িয়েছিল সিকিউরিটি গার্ড যুবকটি। সে যেন তার জন্যই অপেক্ষায়। ভদ্রমহিলাকে স্যালুট করে সে বলল– গুড ইভিনিং ম্যাডাম।

যুবতিটি মৃদু হেসে প্রত্যুত্তর দিল– গুড ইভিনিং। কেমন আছো ঋষভ?

– ভালো। ক’দিন এটিএম-এ আসেননি ম্যাডাম?

– হ্যাঁ, ক’দিন আসা হয়নি। অফিস অফিস করে কেটে গেছে। তবে টাকার-ও বোধহয় অতটা প্রয়োজন হয়নি। নইলে এটিএম-এ না এসে পারা যায়? তুমি আমার আসা যাওয়ার হিসাব রাখো নাকি?

– না না, ঠিক হিসাব রাখা নয়। আমাদের তো এটিএম-কেন্দ্রিকই চাকরি। কিছু কাস্টমার মাঝেমাঝেই আসেন। তাদের আসারও নির্দিষ্ট সময় আছে। আপনি তাদেরই একজন।

যুবতিটি ঋষভের পাশে দাঁড়াল। পারফিউমের মিষ্টি গন্ধে তার সারাদিনের একাকিত্বের ক্লান্তি এক নিমেষে ভেসে গেল। যুবতিটি এলে এমনই হয় বারবার। ঋষভ কি করে তাকে বলবে–সে দীর্ঘদিন এটিএম-এ না এলে মনের মধ্যে এক ধরনের আকুলতা তৈরি হয়। অথচ সে যুবতিটির প্রায় কিছুই জানে না। এমনকী নামও নয়। জানতে ইচ্ছা হলেও উপায় নেই। কোনও কাস্টমারের ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করার হক তার নেই। কাস্টমারদের় এটিএম থেকে টাকা তোলার তারা শুধু নীরব দর্শক। কাস্টমারের টাকা তোলার সময় পারতপক্ষে স্ক্রিনে চোখ রাখে না তারা।

আট বাই দশ-বারো সাইজের ঘরে এটিএম বক্স-এর পিছনে এক টুকরো ড্রেসিংরুম আর একটি মাত্র বসার টুল নিয়ে অফিস পরিধিতে সে একমাত্র কর্মী। কথা বলার সঙ্গী বলতে কেউ নেই। এখানে উপরওয়ালার রক্তচক্ষু নেই। তারা নিধিরাম সর্দারের মতো ঢালতরোয়ালহীন। শুধু অর্থদাতা যন্ত্র আগলে পড়ে থাকা। নিজেই নিজের বস আর আর্দালি। এই বসকে কেউ পাত্তা দেয় না। তাকে গুরুত্ব দিয়ে কী-ই বা লাভ? এটিএম-এর ছোট্ট রুমটায় ঢুকে বড়োজোর কাস্টমাররা আড়চোখে তার দিকে তাকায়। তবে হ্যাঁ, অর্থদাতা যন্ত্রের যান্ত্রিক গোলোযোগ দেখা দিলে দু’-চার জন কথা বলে। ব্যাংকের অপদার্থতার অভিযোগ তার মুখের উপর ছুড়ে দিয়ে চলে যায়। হয়তো বা কেউ বলে– ফালতু সব লোকজন। সত্যিই তো, কে দেবে তার মতো একজন তুচ্ছ ব্যক্তিকে পাত্তা। অথচ যুবতি যেন একটু আলাদা–ঋষভের সাথে এক আধটা কথা বলে।

এটিএম-এ সাধারণত রাত সাড়ে ন’টা থেকে দশটার মধ্যে আসে। তখন প্রায় দিনই অন্য কাস্টমার থাকে না। প্রথম প্রথম একটু আধটু হাসত। নিউ টাউনের এমন জনমানবশূন্য জায়গায় অন্তত একটি লোকের দেখা মিলছে ভেবে হয়তো হাসত। এখন কখনও দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে কথা বলে আর নরম চোখে মৃদু হাসে। সেই হাসি ঋষভের শরীর মন জুড়ে ছড়িয়ে দেয় ভালোলাগা অনুভূতি। যুবতি চলে যাওয়ার পরও এটিএম ঘর মেখে থাকে পারফিউম আর মেয়েলি গন্ধে। ঋষভ কাস্টমার না থাকলে ঘরটার মধ্যে ঘুরে ঘুরে যুবতির রেখে যাওয়া গন্ধ শোঁকে। কখনও এটিএম-এর কি-বোর্ডে নাক ঘষে। তারপর আস্তে আস্তে ঢুকে যায় নির্জনতার গহ্বরে। ফিরে পায় নিজেকে। রাত বাড়ার সাথে আরও গুটিয়ে যায় নিজের গণ্ডির খোলসে।

– ঋষভ।

– অ অ, টাকা তোলা হয়ে গেছে ম্যাডাম?

– তুমি কোন ভাবের ঘোরে ঘুরে এলে? টাকা তুলেছি কিনা দেখতে পাওনি?

ঋষভের সম্বিত ফিরল। সে মাথা নীচু করে থাকল। বুঝতে পারল যুবতি তার সামনেই আসা অবধি দাঁড়িয়ে আছে। সে ভাবনার ঘোরে ডুবেছিল এতক্ষণ। মাথা চুলকাতে চুলকাতে লাজুক হাসি হেসে বলল,

– টাকা তুলবেন না ম্যাডাম?

– না। তুমি আমাকে সারাক্ষণ ম্যাডাম, ম্যাডাম করো কেন? আমি তোমার বসও নই দণ্ডমুণ্ডের কর্তাও নই।

– তা নন কিন্তু আমরা সব কাস্টমারকে স্যার বা ম্যাডাম বলে সম্বোধন করি। আজকাল তো অনেক সবজিওয়ালাও খরিদ্দারকে স্যার বলে। সুবিধাও কম নয়, সব ভাষাভাষি লোকেদের একটি শব্দ দিয়েই জুড়ে দেওয়া যায়। খরিদ্দাররাও খুশি হয়।

– ঋষভ, তুমি বেশ গুছিয়ে কথা বলো তো। একটা কথা বলবে?

– বলুন ম্যাডাম।

– আমি এই এটিএমটায় প্রায় দু’আড়াই বছর ধরে নিয়মিত আসি। তোমার সাথে আমার সম্পর্কও বেশ ভালো অথচ তুমি আমার নাম পর্যন্ত জানতে চাওনি কখনও। কেন?

– পেশাগত কারণে আমরা কোনও খরিদ্দারের প্রতি অহেতুক উৎসাহ দেখাই না। যদি না সন্দেহজনক কিছু থাকে।

– আমার নাম জানতে তোমার ইচ্ছা হয় না ঋষভ?

সে মাথা নীচু করে। কী বলবে? শুধু নামই বা কেন আরও অনেক কিছু জানতে ইচ্ছা হয়। অথচ সে তো জানে বাতুলতার পরিণতি কী ভয়ংকর হতে পারে। অভাবী সংসারে ঠেকা দেওয়া সামান্য চাকরিটার ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে পারে। তার দিকে তাকিয়ে থাকা মুখগুলোর কথা ভেবে সে কখনও অতটা মরিয়া হতে পারবে না। ঋষভ তার সীমার গণ্ডি ভালো করে জানে।

মৃদুস্বরে যুবতি বলল– আমি মেয়েমানুষ। আমরা পুরুষদের না বলা কথা বুঝতে পারি। চোখের ভাষা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ঋষভ, আমাকে তোমার ভালোলাগে?

অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের অভিঘাতে ঋষভ চমকে উঠল। অন্ধ আবেগে অনেক কথা বলতে চেয়েছে সে কিন্তু বলা হয়নি কখনও। নিয়ন জ্যোৎস্না মাখা যুবতির মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলল– আপনি এলে দু’টো কথা বলে প্রাণ বাঁচে। মনে হয় কেউ অন্তত আমাদের মানুষ ভাবে।

যুবতি মেয়েটি ঠোঁটে কমনীয় হাসি ঝুলিয়ে বলল আজ আমি টাকা তুলতে আসিনি। তোমাকে নিতে এসেছি। চলো আমার সঙ্গে।

– আমি! ডিউটি ছেড়ে কোথায় যাব? কেন যাব? আপনি কি জানেন আমাদের চাকরি কত ঠুনকো?

– হ্যাঁ, তুমি আমার সঙ্গে যাবে। কলকাতার কত এটিএম-ই তো নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া অরক্ষিত থাকে। তুমি এক রাতের জন্য শুধু আমার সঙ্গে হারিয়ে যাবে। তোমার ক্লান্তি থেকে মুক্তি।

– কিন্তু কেন যাব?

– সব কথা এখানে বলা হয়ে গেলে রাতভর কী বলব তোমার সাথে। তোমার চাকরির কোনও সমস্যা হলে আমি দেখব। আর কথা নয়। ঋষভ, গাড়িতে ওঠো।

ঋষভের মনে হল সামনে দাঁড়িয়ে নারী মরীচিকা। তবু নারীর ডাকে তার জাটিঙ্গা পাখি হতে ইচ্ছা হচ্ছে। হয়তো পুড়ে, পালক নিকষ কালো হয়ে যাবে। কিন্তু সে মনের থেকে কিছুতেই মায়াটান কাটাতে পারছে না। ঐন্দ্রজালিক জাদুকাঠিতে সম্মোহিত মানুষের মতো অচেনা যুবতির পিছু পিছু ঋষভ গাড়িতে উঠল।

জ্যোতি বসু নগরী দিয়ে গাড়ি ছুটছে এয়ারপোর্টের দিকে। তীব্রবেগে পিছনে ছুটে যাচ্ছে এক একটি বাতিস্তম্ভ। যুবতির হাতে স্টিয়ারিং, গাড়িটি যেন পক্ষীরাজ ঘোড়া। তার মুখে ঝুলে মৃদু হাসি। চোখেমুখে উচ্ছ্বাস। সত্যিই আজ একই দিনে অনেকগুলো পালক জুটেছে তার ঝুঁটিতে। গাড়ি এসে দাঁড়াল নীল আলো মাখা অনিমিখ-এর এইচআইজি কমপ্লেক্স-এ।

ড্রয়িংরুমে একা বসে আছে ঋষভ। খানিকটা জড়োসড়ো হয়ে একটি সোফার মধ্যে প্রায় ডুবে আছে সে। এমন আধুনিক সাজানো-গোছানো ফ্ল্যাটে আগে কখনও আসেনি। দামি আসবাবপত্রে পরিকল্পিত সাজানো ঘরদোর, ফ্ল্যাটের এমন রুম ঋষভ দেখেছে টিভি-তে, সিনেমায়। গোটা ঘরটায় ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের পেশাদারিত্বের ছোঁয়া। কিন্তু ঘরটা প্রাণহীন অচঞ্চল। বাড়িতে বোধহয় মালকিন বাদে আর কেউ থাকে না। তালা খুলে তারা দু’জনে রুমে ঢুকেছে। ঋষভকে ড্রয়িং রুমে বসতে বলে মেয়েটি চলে গেল অন্দরমহলে। অন্দরমহল মনে আসতেই ঋষভের মনে হল তার ভাবনার মধ্যে একটা প্রাচীন বনেদি বাড়ির ছায়া আছে। ফ্ল্যাট তেমনটি কেমন করে হবে? ফ্ল্যাট মানেই তো কয়েকটি ঘরের সমষ্টি। বেশি হলে ডাইনিং, ড্রয়িংরুম। অবশ্য ছোটো বড়ো সব ফ্ল্যাটেই ডাইনিং, কিচেন, বাথরুম থাকে। এ বাড়ির ভিতর সে আন্দাজ করতে পারছে না। যুবতি হয়তো সারাদিনের ক্লান্তির আভরণ ছেড়ে বেরিয়ে আসবে। তার পোশাকটা কী হবে? ভাবতেই ঋষভের গা ঘিনঘিন করে উঠল। নিজের শরীরে এখনও সারাদিনের ডিউটি করা ইউনিফর্ম। ইউনিফর্মে সিকিউরিটি এজেন্সির ব্যাচ। মানুষটার পরিচয় আটকে আছে শুধুমাত্র এজেন্সির লোগোতে। ঘরের ম-ম করা সুবাসকে ছাপিয়ে যাচ্ছে নিজের জামা প্যান্টের বাসি দুর্গন্ধ। তার অস্তিত্ব কী? তার অস্বস্তি ক্রমিক হারে বেড়ে যাচ্ছিল ঘরময় আভিজাত্যের নিস্তব্ধতায়। তার অস্তিত্বহীন অস্তিত্বের সংকটে।

ডোরবেল বেজে উঠল। ঋষভ ভাবছিল খুলবে কি খুলবে না। তখনই ড্রয়িংরুমে বেরিয়ে এল যুবতি। সাদা রঙের হাফ প্যান্ট আর উপরে টপ্ পরেছে। আধুনিকা মেয়েটির আয়নায় নিজেকে দেখে ঋষভ আরো গুটিয়ে গেল। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল,

– কে?

বাইরের থেকে উত্তর এল – হোম ডেলিভারি ম্যাডাম।

দরজা খুলে সে বলল, – ডাইনিং টেবিলে রেখে যাও।

সাদা রঙের হোটেল ইউনিফর্ম পরা একটি লোক পলি-প্যাকেটে খাবার হাতে ঋষভের সামনে দিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে চলে গেল। লোকটা তার দিকে কোনও আগ্রহ দেখাল না। তার দিকে একবার তাকিয়ে ডাইনিং রুমে ঢুকে গেল। মনে হল অভ্যস্ত চোখ। ডাইনিং রুমের দিকে যেতে যেতে মালকিন লোকটিকে জিজ্ঞেস করল,

– ক্যাসা লাপোসতোলে পেয়েছ?

– হ্যাঁ, ম্যাডাম। ম্যানেজার অনেক ফোনাফোনি করে জোগাড় করেছে। ওয়াইনটা জোগাড় করা খুব কঠিন। খাবার সার্ভ করে দেব ম্যাডাম?

– না, থাক। তুমি এখন এসো।

– গুড নাইট ম্যাডাম। পেমেন্ট নিয়ে ডেলিভারি বয় চলে গেল। সে চলে যাওয়ার পর গৃহকর্ত্রী একটা বারমুডা আর টি-শার্ট এনে বলল– ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো।

পুরুষহীন বাড়িতে পুরুষদের পোশাক দেখে ঋষভ একটু অবাকই হল।

– কিন্তু আমাকে কেন ডেকে এনেছেন? সে আবার জানতে চাইল।

– ঋষভ, সব কথা হবে। আগে তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো। দেরি হলে খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে। মাইক্রোওভেন অন করো, খাবার গরম করো, ওসব পারব না। এই উঠে পড়ো তো শিগ্গির।

ডাইনিং টেবিলে তারা দু’জন মুখোমুখি বসেছে। যুবতিটি কাচের গ্লাসে ওয়াইন ঢালতে ঢালতে ঋষভকে বলল – গোমড়া মুখে থেকো না। তুমি এখনও আমার নাম জানতে চাইলে না।

– হ্যাঁ ম্যাডাম, আপনার নাম জানা হয়নি।

– আমি হিমিকা। হিমি বলে ডাকতে পারো। আমি খুশিই হব। আজ রাতে তুমি আমার অতিথি।

– কিন্তু আমাকে ডিউটি থেকে তুলে আনার উদ্দেশ্যটা কী?

হিমিকা ঋষভের নীল চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। ঋষভের নীল চোখের মায়াজাল তাকে পাগল করে দেয়। অথচ কোনও দিন সামাজিক অবস্থানের খাতিরেই প্রকাশ করতে পারেনি। ঋষভকে দেখলে তার মনে হয় ইউরোপীয় রক্ত বইছে তার ধমনিতে। টিকোলো নাক আর রেশমি চুলে ঋষভ গড়পড়তা ভারতীয়দের থেকে কোথায় যেন আলাদা। চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঋষভের বুঝতে অসুবিধা হল না রাত কুহেলিকা হিমিকা কি ভাবছে। তাকে ঘিরে এমন ভাবনা অনেকেরই হয়। তারা ঋষভের মধ্যে আভিজাত্যের যোগসূত্র খুঁজতে চায়। এখানেই সবাই ভুল করে বসে। সেই অর্থে শিক্ষাদীক্ষা বা ধনসম্পত্তির উত্তরাধিকার তার নেই বা বিখ্যাত পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া কোনও সংরক্ষিত উত্তরণপথ। হিমিকা তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কৌতূহল আর চাপতে পারল না – ঋষভ, তুমি কোথায় পেলে এমন ব্লু আই?

– জানি না ম্যাডাম।

– আবার ম্যাডাম বললে! আমি বলছিলাম, তোমার বাবা-মা কার চোখ এমন নীল?

– আমার বাবা-মা’র চোখ আপনার মতো গভীর কালো। তবে লোকে মশকরা করে বলে আমার শরীরে নাকি ইউরোপীয় রক্ত বইছে।

– তাই নাকি? হিমিকা নিজের কল্পনার সমর্থন পায়।

– আমি একটি মফসসল শহরের ছেলে। কোনও কোনও শিশু এখনও চোখ কটা-নীল, ফর্সা চামড়া নিয়ে জন্মায় ওখানে। কোনও এক সময়ে ফরাসি বেনিয়া রক্ত মিশে গিয়েছিল কয়েক পুরুষ আগের মহিলাদের জঠরে। এখনও তলে তলে ধারা বইছে। সুযোগ পেলেই জিন থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে বেনিয়াদের লালসার ফল। রং যাই হোক না কেন এ তো একধরনের উপজাতপ্রাপ্তি।

– নিজেকে ওভাবে ভাবছ কেন? চেহারা তো মানুষের সম্পদই। শুধু জানতে হয় সম্পদের সদ্ব্যবহার। নারীমন বোঝ ঋষভ? বলতে বলতে বাঁহাতে ঋষভের হাত চেপে ধরল হিমিকা। অন্য হাতে গ্লাস ভরিয়ে দিল নীল মদিরায় – কাছে এসো ঋষভ। আজ রাতে তোমার আগুনে আমাকে গলিয়ে দাও লাভার মতো। স্রেফ্ তোমাতে ভাসার জন্য তোমাকে এমনভাবে নিয়ে এসেছি। আমি আর পারছি না ঋষভ। হিমিকা উঠে গিয়ে ঋষভকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো ঠোঁটে চুমু খেতে লাগল। মদিরার নীল নেশায় ঋষভ ক্রমশ ডুবে গেল তার নারীক্ষুধার কাছে। যাবতীয় পৌরুষত্বের সংযম ভেসে গেল বাঁধভাঙা জলোচ্ছ্বাসে।

গড়ে ওঠা জ্যোতি বসু নগরে অর্ধেক আকাশ জুড়ে অর্ধেক চাঁদ। পড়ে থাকা ফাঁকা জমি রাতের আঁধারে বিষন্নতায় ঢাকা। দাঁত মুখ খিঁচোনো নির্মীয়মান বাড়িঘর রাতের কোটরে কেমন নির্জীব। রাত দ্বিপ্রহরে বিমানবন্দরগামী বাবুদের গাড়ি উল্কাপাতের মতো ছুটে যাচ্ছে। ঋষভের অনুরোধে জানালা খুলেছে হিমিকা। হিমিকার ঘর রৌদ্র ছোঁয় না বা বলা যেতে পারে এসি ঘরে সে জানালা খোলার তাগিদ অনুভব করে না। খোলা জানালা দিয়ে রাতের নরম হাওয়া তেরো তলার ঘরে ঢুকছে। জানালার পাশে বসে আছে দুই আদিম নরনারী। দিদির বয়সি হিমিকাকে আরও বুকের কাছে টেনে এনে ঋষভ বলল – শুধু এ জন্যই আমাকে ডেকে এনেছ?

– আজ আমার প্রাপ্তির দিন, ভোগের দিন।

– ভোগের দিন না হয় বুঝলাম কিন্তু ভোগেই কি প্রাপ্তি ঘটে?

– না, আনন্দ উপভোগের এটা একটা দিক। প্রাপ্তি অন্য জায়গায়। আমি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর পদে প্রোমোশনের চিঠি আজই হাতে পেয়েছি।

– সত্যিই আনন্দের দিন তোমার হিমি।

হিমিকা বাইরের দিকে তাকিয়ে কেমন উদাসীন হয়ে গেল। নিশ্চুপে কেটে গেল অনন্ত প্রহর। তাকে ভাবনায় ডুবে থাকতে দেখে ঋষভ ডাকল, – হিমি।

– ও হ্যাঁ, বিনিময়ে আমাকে দিতে হয়েছে কত জানো?

– না, আমি কী করে জানব? আমার জানার পরিধি শুধু আট ফুট বাই বারো ফুট ঘর।

– আমি কাজ করি একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। চাকরিতে ঢোকার দিন থেকেই কোম্পানি টার্গেট বেঁধে দেয়। টার্গেটে পৌঁছোও তো টিকে থাকো। না পৌঁছোও তো পিছনে ঘন্টাধবনি– কেটে পড়ো। কেটে পড়ো। লক্ষ্যে পৌঁছোলেও নিস্তার নেই। টার্গেটের পরিধি আরও বেড়ে যাবে। সামনে খুঁড়োর কলের মতো অনেক রঙিন স্বপ্ন। গাড়ি, বাড়ি, পয়সা ওড়ানো ক্লাবের মেম্বারশিপ, বিদেশ ভ্রমণ এমন অনেক রঙিন ফানুস। সামনে ঝোলানো একটি মাত্র টোপ প্রোমোশন। আখের ছিবড়ার মতো রক্তশূন্য অবস্থায় জিভ বের করে কেউ সত্যি সত্যিই হয়তো পৌঁছাবে চূড়ায়। আবার এমনও হতে পারে যার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে সে হয়তো ঘোড়সওয়ারদের মধ্যেই নেই। সেখানে অন্য সমীকরণ, অন্য কেউ। বুঝলে ঋষভ, এই ডার্ক হর্সকে কেউ চেনে না। কিন্তু সে-ই জয়ী হবে। আমি জোকা থেকে ম্যানেজমেন্টে পিজি করে এখানে ঢুকেছি। তখন আমার কত আর বয়স হবে? পঁচিশের নীচে। এখন? না থাক, মেয়েদের বয়স গুপ্ত থাকাই ভালো। আমাকে দেখে তোমার যত বয়স মনে হয় ধরে নাও সেটাই আমার বয়স। চূড়ায় পৌঁছানোর জন্য বিয়ে করার সময় বের করতে পারিনি। এ তো এক ধরনের নেশা। প্রথম প্রথম সম্পদের মোহ টানে। তারপর বলতে পারো ক্ষমতা, পজিশনের মোহে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। তখন সমাজ টমাজ কাউকে চিনতে চায় না। ছোটে, দমবন্ধ করে নিজেকে বাজি রেখে ছোটে। আমিও ছুটেছিলাম। বেশ কয়েক বছর ধরেই আড়াই হাতের মধ্যে ফসকেই যাচ্ছিলাম। অথচ আমার পারফর্মেন্স, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বা নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার মধ্যে কোনও ঘাটতি ছিল না। বেশ কয়েক জন অযোগ্য লোকও আমাকে সুপারসিড করে গেল। আমার দুর্বলতা নিয়ে অনেক ভেবেছি আর হতাশায় ডুবে যাচ্ছিলাম। মানসিক অবসাদে রাত আমাকে সর্ব অর্থে গ্রাস করে নিত। একাকিত্ব, অবসাদ সব কিছু থেকে মুক্তি পেতে প্রতি রাতে আমি তুলে আনতাম পেশাদার জিগোলোদের।

ঋষভ আবছা আলোয় হিমিকার মুখের দিকে তাকাল। অনেক ইংরাজি শব্দই তার বোধগম্য নয়। জিগোলো শব্দটা তার কানে ঠকাস করে লাগল। মুখে কিছু বলল না।

হিমিকা আবার বলতে শুরু করল – পরে আমি বুঝেছি রোগটা মনের, শরীরের নয়। রাতের অতিথিরা কী করবে? একদিন মরিয়া হয়ে দেখা করলাম ম্যানেজিং ডিরেক্টর-এর সাথে। তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম,

– স্যার, হোয়াট ইজ মাই ডেফিসিয়েন্সি টু গেট প্রমোশন?

সে রিভলবিং চেয়ারে মৃদু দুলে দুলে বলল– ইউ আর দ্য মোস্ট এফিশিয়েন্ট অফিসার। কিন্তু মিস্ ব্যানার্জী যোগ্যতাই কি সব উন্নতির মাপকাঠি? পৌরাণিক যুগ থেকেই চলে আসছে বিনিময় প্রথা। কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হয়।

– আমাকে কী দিতে হবে?

– ইউ আর অ্যান ইনটেলিজেন্ট বিউটিফুল গার্ল। ইউ ক্যান হ্যাভ আ সলিটরি মিটিং টু ডিসাইড ইয়োর ফিউচার। মিস্ ব্যানার্জী, একটা সিদ্ধান্তে জীবনের মোড় ঘুরে যেতে পারে।

এমডি একটা বুড়ো ভাম। ওর লালসার চোখ দেখে আমার গা ঘিনঘিন করে উঠেছিল। কিন্তু পরক্ষণে মনে হল শরীরের সতীত্ব কি আমার আছে? আমি তো পয়সার বিনিময়েই কামনা হতাশা ঝলসাই প্রতি রাতে। আর একদিন বুড়োর সাথে নির্জন অবসর কাটালেই যদি খুলে যায় উন্নতির সিঁড়ি, দোষের কি? ঋষভ, সাফল্য অবশেষে এসেছে। আজ রাতে তুমি আনকোরা আলট্রা ফ্রেশ উত্তাপে আমাকে পাগল করে দিয়েছ। ইউ আর ট্রুলি…।

ঋষভ হাঁ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হিমিকাকে তার অত্যাশ্চর্য মনে হয়।

সকাল সাড়ে আটটা। ঋষভ চালক আসনের পাশে বসতে গেল। হিমিকা তাকে বলল

– পিছনের সিটে বসো। হিমিকা গাড়ি চালাচ্ছে। আর একটাও কথা বলল না ঋষভের সাথে। ঋষভ সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্মের মধ্যে আরও গুটিয়ে যেতে লাগল। হু হু করে ছুটছে গাড়ি। গাড়িটা এসে থামল এটিএম-এর সামনে। ঋষভ নেমে চালক আসনের কাছে এসে বলল – আর কি দেখা হবে?

হিমিকা তার সামনে এগিয়ে দিল একটা প্যাকেট

– এটা ধরো।

– কী আছে এতে?

– তোমার রাতের চার্জ।

– সে কি হিমি, তুমি আমাকে টাকা দিচ্ছ!

– আমি বিনা পয়সায় কাজ করাই না। খুশি হয়ে অন্যদের থেকে একটু বেশিই দিয়েছি।

– ম্যাডাম, আমি…।

ঋষভ কথা শেষ করতে পারল না। গাড়ির চাকা গড়াল। তার চোখের সামনে গাড়িটা দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল। হাতের মুঠোয় টাকার প্যাকেট নিয়ে কাঁদবে না ছুড়ে ফেলবে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না ঋষভ। তার হাত-পা কেমন অসাড় মনে হল।

এটিএম-এ ঢুকতে বাধা পেল সে – সারা রাত কোথায় ছিলে? যমদূতের মতো সামনে দাঁড়িয়ে সিকিউরিটি সুপারভাইজার। জাঁদরেল গোঁফের নীচে কঠিন কঠোর চেহারা। সে প্রাক্তন সেনাকর্মী। চাকরি থাকার সময় যা না গোঁফের বহর ছিল এখন বুড়ো বয়সে আরো পোক্ত হয়েছে। বুড়োকে আড়াল আবডালে সিকিউরিটি গার্ডরা বলে ঢ্যাঁড়স। সেই সিকিউরিটি সুপারভাইজার যে কত ভয়ংকর হতে পারে তা হাতেনাতে টের পাচ্ছে ঋষভ।

সুপারভাইজার গোঁফে পাক দিতে দিতে বলল,

– রাত বারোটায় আমি রাউন্ড আপে এসেছিলাম কিন্তু এটিএম খোলা হাট। তোমার দেখা নেই। বুঝেশুনে বড়ো নৌকায় পাল তুলেছ ভাই। তবে উড়ে উড়ে মধু খাবে আর সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করবে, দু’টো একসাথে তো হবে না। এই ধরো তোমার টার্মিনেশন লেটার। আর ডুবে ডুবে জল খেতে হবে না।

ঋষভের চাকরিটা ঠুনকো চুড়ির মতো চলে গেল।

।।২।।

– ঋষভ, কেমন আছ?

সে প্রথমে হতচকিত হয়ে গেল। ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে চিনতে পারল – ম্যাডাম, আপনি এখানে? টাকা তুলতে এসেছেন?

– না, টাকাপয়সা নয়। তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে দু’বছর কেটে গেছে। কাল হঠাৎ আবিষ্কার করলাম তুমি এটিএম-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছো। তখনই আসতাম কিন্তু কোন মু্খে তোমার সামনে দাঁড়াই? কালকে সাহস পাইনি। রাতভোর নিজের সীমাহীন অপরাধের কৈফিয়ত দিতে হয়েছে মনের কাছে। হতাশা বা উন্নতির সর্পিলরেখার দোহাই দিয়েও আমার কর্মের কোনও সদুত্তর দিতে পারিনি। তবু মরিয়া হয়েই তোমার কাছে এসেছি। তোমার গভীর নীল চোখের সরলতার কাছে আমি আগেই হেরেছি ঋষভ।

– ম্যাডাম, এখন আমি ডিউটিতে আছি। কাল ডে-শিফটে ডিউটি। চাইলে সন্ধ্যায় আমি আপনার ফ্ল্যাটেও যেতে পারি। দেয়ার উই ক্যান নেগোশিয়েট দ্য ডিল।

বিস্মিত চোখে ঋষভের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল হিমিকা খানিকক্ষণ। তারপর বলল– আমার ফ্ল্যাটটা একটা শয়তানের গুহা। আমি চাই না ওখানে আর আমাদের এভাবে দেখা হোক। ফোন নম্বর বলো, কথা বলে মিটিং প্লেস ঠিক করব।

প্রিন্সেপঘাটে আগেই এসে বসে আছে হিমিকা। বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের আলো খানিকটা কেটে কেটে পড়ছে জেমস প্রিন্সেপ-এর স্মৃতিসৌধের উপর। খোদ কলকাতায় বিজ্ঞানপ্রযুক্তির বিদ্যাসাগর সেতু আর ঐতিহাসিক স্থাপত্যে সূর্যের আলোর আচ্ছন্নতা ভেঙে দিল ঋষভ – হাই ম্যাডাম, হাউ লং? ঋষভ এসেছে। কালো গেঞ্জি-জিন্স আর পায়ে নর্থস্টার শু-তে তাকে শার্প-স্মার্ট লাগছে।

হিমিকা বলল – অনেকক্ষণ। নির্ধারিত সময়ের বেশ খানিকটা আগেই।

– তা বলুন ম্যাডাম, কেন আমাকে খুঁজছেন।

– আমি জানি ঋষভ, তোমার প্রতি আমি অন্যায় করেছি। পেশাগত জীবনে যেখানেই পৌঁছাই না কেন, আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই– আমি ক্লেদাক্ত। তবু ভিতরে ভিতরে তোমার জন্য আমি দুর্বলতা অনুভব করি। আমার মনে হয়েছে তুমিই পারো আমাকে ফিরিয়ে আনতে। আমাকে একটু আশ্রয় দেবে ঋষভ?

– ম্যাডাম, টু ইয়ার্স ব্যাক আই হ্যাভ বিন অ্যান ইনোসেন্ট ইয়ুথ। কিন্তু আপনি আমার সামনে অনেকগুলো রাস্তা খুলে দিয়েছিলেন। আয়ের রাস্তা আর নরকের রাস্তা। বাস্তবে আপনি ছিলেন আমার প্রথম খরিদ্দার। কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে বিনা পয়সায় আজ বিকালে আপনার সাথে সঙ্গ দিতে এলাম। যদিও আমার সঙ্গদান থেকে বেডরুম শেয়ারের আলাদা আলাদা রেট আছে। তা বলতে পারেন দু’বছর আগের থেকে রেটটা একটু হাই। আর প্রোফাইল বুঝে রেট হেরফের হয় বটে। হাজার থেকে দশ হাজার। এখন অন-লাইনে শরীর বিকিকিনি হয়। রাস্তায় না দাঁড়িয়েও ঘরে বসে ডিল হয়। হাতে একটা সেলফোন – ব্যস যৌনতার জগৎ হাতের মুঠোয়। একান্ত প্রয়োজন হলে স্টাইলিশ কালো ব্যান্ড হাতে চিরাচরিত পদ্ধতিতে পথের পাশে রেলিং-এ এসে ইশারাময় শরীর খোঁজা। কেউ কেউ বোল্ড পত্রমিতালির বিজ্ঞাপন দেয়। আপনার মতো মেয়েদের কাছে বিজ্ঞাপনের বক্তব্য মানে অন্য কিছু। তাই না?

– ঋষভ! একি কথা বলছ?

– ওকে। আই নো ইউ ক্যান্ট অ্যাকসেপ্ট মি লাইক দিস। আপনি সেই সরল নীল চোখের ঋষভকে খুঁজছেন। সে তো আর নেই। আপনি কি কখনও জানতে চেয়েছেন আমি কেমন আছি?

হিমিকা মাথা নীচু করে রইল। এমন প্রশ্নের সামনে তাকে পড়তে হবে তার কল্পনায় ছিল না। সে বলল – আমার নেশা কাটতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল। তারপর যখন ফিরে এলাম তখন তোমার বদলি হয়ে গেছে। পাগলের মতো রাস্তার অলিগলিতে কোথায় খুঁজিনি তোমায়?

– আপনি ভুল শুনেছেন। আমার বদলি হয়নি। কর্তব্যে অবহেলার জন্য সিকিউরিটি গার্ডের সামান্য চাকরিটা চলে যায়। মাস গেলে ন্যূনতম মজুরি আর ওভারটাইম মিলিয়ে চার-পাঁচ হাজার টাকা আসত। এক রাতের ফুর্তির ধাক্বায় তা বন্ধ হয়ে গেল। একটা অভাবের সংসারে হঠাৎ চার-পাঁচ হাজার টাকার রোজগার বন্ধ হয়ে গেলে তার অভিঘাত কত ভয়ংকর হতে পারে ভাবতে পারেন ম্যাডাম?

হিমিকা কোনও উত্তর খুঁজে পেল না।

– আমি জানি আপনি কোনও দিন এতটা মাপা জীবন দেখেননি। আমার সেই অর্থে কোনও যোগ্যতা বা বিদ্যা নেই যা দিয়ে তৎক্ষণাৎ কিছু একটা জুটিয়ে নিতে পারতাম। ভালো থাকার ইচ্ছা আছে সব মানুষের কিন্তু ভালো থাকার রসদ উপার্জনের মুরোদ নেই অধিকাংশ মানুষের। অনেকে তাই চাহিদাপূরণের সহজ পথ বেছে নেয়। অপরাধের উৎসভূমি বিস্তৃত হয়। আমারও হয়েছিল। তখন আপানার কথা মনে পড়ে গেল। আমার নীল চোখে নাকি নারীহূদয় বশ করার জাদু আছে। চেহারার সদ্ব্যবহার জানলে নাকি আয়ের রাস্তা খুলে যায়। আপনার কাছেই প্রথম শুনেছিলাম জিগোলো শব্দটা। তখন মানে জানতাম না। কিন্তু রাতের শয্যাসঙ্গী হওয়ার বিনিময়ে আপনি আমাকে টাকা দিয়েছিলেন। তাই একটা ভাবার্থ মনে হয়েছিল। অভিধানে জিগোলোর মানে প্রৌঢ়া বা বৃদ্ধা স্ত্রীলোকের অর্থপুষ্ট তরুণ প্রণয়ী। আমার শরীর আছে – যৌবন আছে, তা হলে ক্ষুধার কাছে মার

খাওয়া কেন?

– ঋষভ!

– জানেন, প্রথমে জানতাম না কারা জিগোলো। কোথায় থাকে তারা। কোন মেয়ে পয়সার বিনিময়ে যৌন সঙ্গী খুঁজছে। শুধু একটা সিনেমা থেকে জেনেছি পার্ক স্ট্রিট জিগোলোদের স্বর্গরাজ্য। তারা হাতে কালো রুমাল বাঁধে। একদিন সত্যি সত্যিই কালো রুমাল বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়লাম পার্ক স্ট্রিটে। কিছু সময় যেতে না যেতে কয়েকটা ছেলে আমাকে ঘিরে ধরল – এখানে কী চাই?

আমি ঘাবড়ে গেলাম– না মানে…

হো হো করে হেসে উঠল তারা – মুরগি, …কক্-কক্। ব্লাডি হোর, উড বি মেল এসকর্ট। পার্ক স্ট্রিট শুধুমাত্র ক্যালকাটা জিগোলো ক্লাব সদস্যদের জন্য। হেই রাসটিক গাই, এখানে ফের এলে বটল শুদ্ধু নিপল ধরিয়ে দেব। তারা আমাকে প্রায় ঘাড় ধাক্বা দিয়ে পার্ক স্ট্রিট থেকে তাড়িয়ে দিল। চকচকে লালটুস চেহারার যুবকের দল। বেশভূষায় হিপি হিপি ভাব। অনর্গল ইংরাজিতে কথা বলে। ফিরে এলাম সেদিন। কিন্তু পেটে খিদে থাকলে পশুরা বিপদ অগ্রাহ্য করেও ফিরে আসে, আমাকেও ফিরতে হয়েছিল। পরদিন থেকে দাঁড়াতে শুরু করলাম পার্ক স্ট্রিটের আশেপাশে। কখনও ফ্রি-স্কুল স্ট্রিটে, কখনও লিনডসে স্ট্রিটে। ক’দিন যেতে না যেতে আমার মতো ছুটকো পাবলিকদের চিনতে শুরু করলাম। শহরের রাস্তা সবার অথচ ভিতরে ভিতরে করে খাওয়ার এলাকা ভাগ থাকে। প্রথম প্রথম এরাও আমাকে এক চুল জায়গা ছাড়তে চায়নি। কিন্তু সমস্যাটা কি জানেন ম্যাডাম?

– কী? হিমিকা শুকনো গলায় জানতে চাইল।

– কে বা কারা খরিদ্দার তাই চিনি না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আঠারো থেকে পঞ্চান্ন বছরের মহিলাদের মনে হতো প্লেবয় খুঁজছে। আবার তাদের বেশভূষা চাল-চলনে ভড়কে যেতাম। আমার মফসসল শহরের গাঁইয়া চেহারা প্রকট হয়ে উঠত। একজন বয়স্ক জিগোলোর সাথে পরিচয় হল। সে বলল – তুমি ভাই সারা জীবন বঁড়শিতে একটাও গাঁথতে পারবে না। এ তো মাছ নয় যে ফাতনা ডুবিয়ে তোমায় টেনে নেবে। এদের পেটে খিদে নেই। চোখে খিদে। শরীর অভুক্ত। তোমাকে চোখের অভুক্ত  চাহনি পড়তে হবে। চালচলনে চেকনাই চাই। অর্ধেক কথা হবে চোখে চোখে।

– তুমি দুষ্টু লোকটার কথা শুনে পালটে গেলে ঋষভ?

হায় ভগবান!

– আমার তো কোনও ভার্জিনিটির অহংকার ছিল না। তা আপনার কাছে আগেই খুইয়েছি। আমার দরকার ছিল একজন অভিজ্ঞ লোকের টিপস। লোকটার পরামর্শে ইংরেজি শিখতে লাগলাম। আর সামর্থ্যের মধ্যে সাজগোজ পালটে ফেললাম। মানুষের পোশাক এক ধাক্বায় বদলে দেয় অনেকটা। একটু ব্যক্তিত্ব যোগ করতে পারলেই কেল্লাফতে। ওর পেশাগত নাম পিটার। পিটার আমাকে ইন্দ্র, ইন্দ্রজিৎ বলে ডাকত। বলত – পুরুষরা সব সময় ইন্দ্রর মতো। যা পেতে ইচ্ছা হয় তা যেনতেনপ্রকারেণ আদায় করে নেবে। নারীকে জয় করায় কোনও পাপ নেই। পুরুষ বহুগামী। যথা সময়ে ঋষি হয়ে গেলেই হল। পৌরাণিক যুগ থেকে পুরুষরা এরকমই স্বার্থপর আত্মকেন্দ্রিক সাধু। প্রথম প্রথম পিটার আমাকে দু’চারটে খরিদ্দার ধরে দিত। তবে কমিশনের ব্যাপারে পিটারের কোনও আপস নেই। অন্যের গতর খাটানো পয়সা কে না খায়। হোটেল ম্যানেজারগুলো এক একটা তিলে খচ্চর। ফরেনারদের সাথে মোটা টাকার ডিল হয়। আমরা পাই সামান্যই। ম্যানেজার হারামিগুলো মেরে দেয় সিংহভাগ।

– ঋষভ, আমার আর শুনতে ভালো লাগছে না।

– ফিরে যখন এসেছেন তখন কষ্ট করে না হয় একটু শুনলেন ম্যাডাম। এখন আমি সমাজের উচ্চবিত্ত মহিলাদের সাথে কাজ চলার মতো কমিউনিকেটিভ ইংলিশ শিখেছি। আঠারো থেকে পঞ্চান্ন বছরের স্টুডেন্ট, ওয়ার্কিং লেডি, হাউস ওয়াইফ, উইডো, ডিসস্যাটিসফায়েড লেডি– সবাই আমাদের খরিদ্দার। আইটি সেক্টরের অনেক ওয়ার্কিং লেডি আজকাল আর লিভ টুগেদারের ঝামেলাও চায় না। তারা সব ফ্যান্টাস গাইদের হায়ার অ্যান্ড ফায়ার করতে অভ্যস্ত। টাকায় রেডিমেড আনন্দ পেলে কে পোহায় হ্যাপা-বিয়ে-শাদি-লিভ টুগেদার-এর? সবাই মেতে থাকতে চায় সেল্ফ-অ্যাপোতে। নিজেকে নিয়ে মেতে থাকা। সংসার নামক সনাতনী জোয়ালটি কে বইতে চায়? পিটার আমাকে পিএসএল পদ্ধতি-র মতো আধুনিক এবং পৌরাণিক কামসূত্র শিখিয়েছে। নাও আই নো দ্যা আর্ট অফ স্যাটিসফায়িং ওমেন।

– চুপ করো, চুপ করো। আমি আর শুনতে চাই না।

– আমি আবার একটা সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নিয়েছি। এজেন্সি আমার অনুরোধে পার্ক স্ট্রিটের এটিএম-এ পোস্টিং দিয়েছে। বলতে পারেন এই পোস্টিংটা আমার সোনায় সোহাগা হয়েছে। প্রতিদিন ইভিনিং ডিউটি করি আর এটিএমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি উপোসি চোখের খোঁজে। চাকরিটা এখন আমার গৌণ আয়ের জায়গা, তবু ইউনিফর্মে ঢেকে রাখি নষ্ট আমিটাকে। আর কিছু খরিদ্দার ছাড়া ইন্দ্রজিৎকে কে চেনে বলুন? ম্যাডাম, আমি এখন শুধু মেয়েদের কামনাময় চোখ খুঁজি। আপনার চোখ এখন স্বাভাবিক। অসুস্থ অস্থিরতা নেই। চোখের অস্থিরতার কাছে আমরা জিগোলোরা বিকিয়ে যাই। কেউ আনন্দ করতে গিয়ে বিকিয়ে যায় – কেউ বা পেটের টানে। আমি জানি না পুরুষ যৌনকর্মী বলে অভিধানে কোনও শব্দ আছে কিনা, বা বেশ্যার পুংলিঙ্গ কী হবে? কিন্তু আমার বলতে দ্বিধা নেই আমি বাস্তবে একজন জিগোলো। প্রয়োজন হলে ডাকবেন, আপনার ক্ষেত্রে অল্প টাকায় কাজ করে আসব। আপনি ফিরে যান ম্যাডাম।

হিমিকা হাঁটুতে চিবুক ঠেকিয়ে চুপচাপ বসে আছে। তার নিজেকে মনে হচ্ছে সাপ-লুডোর নিরানব্বই-এ সাপে খাওয়া ঘুঁটি। যাবতীয় বিষন্নতা শরীরে ভর করেছে। তবু মরিয়া হয়ে সে ঋষভের হাত জড়িয়ে বলল – বুকের পাথরটা একটু নেমেছে ঋষভ?

– বিষের ব্যথা কখনও নামে?

– তোমার সব দুঃখ যন্ত্রণার ভার আমাকে বইতে দেবে…

– তা হয় না ম্যাডাম। আপনি ফিরে যান। আমাদের আর কোনওদিন না দেখা হওয়াই মঙ্গল। জিগোলোদের কখনও প্রেমে পড়তে নেই। জিগোলো একট ব্যাধি।

হিমিকা ফোঁপাতে ফোঁপাতে দ্রুত পায়ে হাঁটা লাগাল। তার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে ঋষভের বুকের মধ্যে হঠাৎ কান্না দলা পাকিয়ে উঠল। মনে হল একটা আলোর বিন্দু এসেছিল। এখন ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তার তীব্র ইচ্ছে হল হিমিকার হাত ধরে নতুন করে বাঁচতে। দৌড়ে গিয়ে পিছন থেকে ডাকতে – হিমি, যেও না। চলো আমরা গঙ্গার পাড় দিয়ে হাঁটি। শুনেছি গঙ্গা সব গ্লানি ধুয়ে দেয়।

 

অটোর সেই লোকটা

বিডন স্ট্রিট পার হয়নি তখনও। ব্যাকসিটে হেলান দিয়ে সবে চোখ দু’টো একটু বুজেছে নীলোৎপল। শেষ কবে অটোয় উঠে এত আরামে বসেছিল মনে পড়ে না। বাঙালি গতরে বাড়ছে নাকি কলকাতার অটোগুলো বহরে ছোটো হচ্ছে ইদানীং কে জানে। দু’টোর পর তিনটে লোক যেই উঠল অমনি শুরু হল চাপাচাপি। অগত্যা সেই আগুপিছু করে বসা।

আজ প্রথমটায় একটু অবাকই লেগেছিল তাই। এই অটোটার পিছনের সিটে বসতে গিয়ে। আগে থাকতেই বসেছিল দু’টো লোক। তাকে উঠতে দেখে খুব একটা যে নড়েচড়ে বসল মনে হল না। কিন্তু সিটে পিঠ রেখেই টের পেল নীলোৎপল– বেঁকেচুরে বসার দরকার নেই কোনও। দিব্যি আরামে কাঁধ ছড়িয়ে বসা যাবে।

লোকগুলোর দিকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছিল সে। সিড়িঙ্গে টাইপের চেহারা। গায়ে বেরঙা টি-শার্ট। একেবারে কর্নারের লোকটা কপালে হাত দিয়ে মাথা নামিয়ে বসেছিল। মুখখানা ভালো করে দেখতে পায়নি সে। যাকগে। কপাল করে অটোটা পেয়েছে। শোভাবাজার থেকে উলটোডাঙা কম রাস্তা নয়। আয়েশ করে যাওয়া যাবে। একসঙ্গে দু’ দু’টো এমনি রোগা রোগা লোক চট করে পাওয়া যায় না আজকাল। আর একজন এসে পড়লেই হয় এবারে। মোবাইল বের করে ফোন করে দিল সায়ন্তনকে, ‘শোভাবাজারে। এই অটোয় উঠলাম। আর-একজন হলেই ছাড়বে…’

‘শালা এতক্ষণে মোটে শোভাবাজার! সোনাগাছিতে ঢুকেছিলি নাকি?’

‘ক্যালানে। টাইম লাগে না নাকি বাসে আসতে। গ্লোবারের সামনেটায় দাঁড়া। সবাই এসে গেছিস?’

‘জয়ন্ত আর নির্মাল্যটা কোথায় কে জানে। বাকিরা এসে গেছি। তুই কুইক আয়…’

এরমধ্যেই গগলস্ চোখে সাতাশ আঠাশের একটা ছেলে ব্যাগ হাতে এসে বসে পড়ল ড্রাইভারের পাশের সিটে।

‘গৌরীবাড়ি…’

‘বসুন।’

অটো ছেড়ে দিল।

ফেব্রুয়ারির ফুরফুরে হাওয়ায় চোখ যেন লেগে আসছিল নীলোৎপলের। একেবারে ভর দুপুরে বেরিয়েছে। বাড়িতে থাকলে এতক্ষণে একঘুম হয়ে যেত। বিডন স্ট্রিট আসতে আসতে আপনা থেকেই বুজে এসেছিল চোখ দু’টো। আর ঠিক তখনই জিন্সের বাঁ পকেটে বেজে উঠল মোবাইলখানা। বিরক্তিতে এবার মুখচোখ রীতিমতো কুঁচকে উঠল তার। হারামজাদাগুলোর কি তর সইছে না একটুও! সেই গ্রে স্ট্রিট থেকে সমানে জ্বালিয়ে যাচ্ছে পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর। বিডন স্ট্রিট থেকে উলটোডাঙা অবধি কি সে উড়ে যাবে এখন। একবার ভাবল দরকার নেই ধরার। বেজে যায় যাক। কিন্তু ফোন আসতেই থাকবে সমানে। যতক্ষণ না ধরছে জ্বালিয়ে মারবে। বাধ্য হয়েই কলটা রিসিভ করতে হল। জয়ন্ত ফোন করছে। তারমানে সেও বোধহয় পৌঁছে গেছে এতক্ষণে।

ওপাশ থেকে সম্মিলিত গলায় ভেসে আসছে চার-পাঁচটা করে অক্ষর। আর কোনও কথা নেই। মনের সুখে গালি দিচ্ছে শালারা। নেহাত কাকার বয়সি লোকজন রয়েছে অটোয়। নইলে বাছা বাছা কয়েকখানা এখনই শুনিয়ে দেওয়া যেত বাছাধনদেরও। বিরক্ত গলায় শুধু বলে নীলোৎপল, ‘এই তো খান্নায় এখন। উড়ে যাব নাকি? অত তাড়া থাকলে চলে যা। বাপের বিয়ে লাগেনি আমার…’

কথা শেষ করে সুইচড অফ করে দিল নীলোৎপল। নে শালারা, এবারে যত পারিস ট্রাই করে যা। পৌঁছোনোর পর অবশ্য খিস্তি খেতে হবে কনফার্ম। তবে সেও ছেড়ে কথা বলবে না। অনেক তো দেখা আছে। এমন নয় যে পুরোনো বন্ধুদের মধ্যে সেই প্রথম জব নামাল ক্যাম্পাসিংয়ে। জয়ন্ত, দেবরূপ, সায়ন্তন– সক্বলে আরও আগেই সব মোটা মোটা প্যাকেজের জব নামিয়ে বসে আছে। ট্রিট তো কে কেমন দিয়েছে দেখাই গেছে। সে তো তাও রাজি হয়েছে হাসিমুখে। নাকি তার চাকরিটা পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা ভাবছে সবাই! অন্যরা ক্যালকাটা বেল্টের এক একখানা নামি কলেজ থেকে বি টেক করছে। ভাল চাকরি তো পাবেই। আর সে যেহেতু জেলার একটা এলেবেলে কলেজ থেকে পড়ছে, কোনও গতি হতো না হয়তো। নেহাত ফাইনাল ইয়ারে অনেক হাঙ্গাম হুজ্জোত করে কলেজকে ক্যাম্পাসিং করাতে বাধ্য করে চাকরি জুটিয়েছে, তাই ট্রিট দেওয়াটা তার নৈতিক দায়!

কথাবার্তায় তো বোঝা যায়। স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে সবার আগে চাকরি পেয়েছিল অনুরাগ। ক্যাম্পাসিংয়ের আগের রাতে তাই তাকেই ফোন করেছিল নীলোৎপল, ‘কী টাইপের কোশ্চেন আসতে পারে বল তো। আমার তো কোনও এক্সপিরিয়েন্স নেই এসবের…’

‘তোদের টিচাররা কিছু বলছে না?’

‘ফার্স্ট টাইম ক্যাম্পাসিং হচ্ছে ভাই কলেজ হিস্ট্রিতে…’

‘আই সি। তা নামটা কি বললি যেন কোম্পানির?’

‘জিটিবি সল্যুশনস।’

‘কীসের কোম্পানি এটা? কথার সুরেই মনে হচ্ছিল নীলোৎপলের ফোনের ওপারে ভুরু কুঁচকোচ্ছে অনুরাগ।’

‘সফ্টওয়্যার।’

দায়টা তার নিজের। তাছাড়া সেই প্রথম ক্যাম্পাসিংয়ের পরীক্ষায় বসতে যাচ্ছে সে। অত গায়ে মাখাতে গেলে চলবে না তখন।

‘জন্মে নাম শুনিনি’, ফোনের ওপাশে বোধহয় ঠোঁট উলটাল অনুরাগ, মনে হল নীলোৎপলের। একটা গুঞ্জন ভেসে আসছিল অনেকক্ষণ থেকেই। দোকান বাজারে কোথাও রয়েছে নিশ্চয় অনুরাগ। তখনই নির্মাল্যর গলাও শুনতে পেল সে, ‘আর-একটা সোডা হবে দাদা এই টেবিলে..’

আরও কে কে আছে ওখানে সে কথা ভাবার সময় তখন নয়। তবুও মনে হয়েছিল এমন অসময়ে ক্যাম্পাসিংয়ের কোশ্চেন টাইপ নিয়ে ফোন এলে হয়তো বিরক্ত হতো সেও।

কিন্তু আশ্চর্য। বিরক্ত হয়েছে বলে মনেই হচ্ছিল না অনুরাগের গলা শুনে। অল্প কথায় কাজ মিটিয়ে ফেলার মতো কথাও বলছিল না সে। বরং নীলোৎপলের সঙ্গে যেন অনেক কথাই বলতে চাইছিল সে। হস্টেলের রুমের ভেতর থেকে টাওয়ার পাওয়া যায় না সবসময়। কথা বলতে বলতে আচমকা কেটে যায় ফোন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা লাগছিল নীলোৎপলের। শার্টের ওপরে স্রেফ একখানা চাদর জড়িয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল। কতক্ষণই বা কথা হবে– মনে হয়েছিল তখন, আবার উইন্ডচিটার পরবে! ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোপালপুরে কলেজ। সামনে দিয়ে স্টেট হাইওয়ে গেলেও সন্ধের পর মাইলের পর মাইল স্রেফ শুনশান। টাউন থেকে দূরত্ব প্রায় মাইল ছয়েক। বয়েজ হস্টেল ততোধিক নিশুতির রাজ্যে। কলেজ ক্যাম্পাস থেকে আরও এক কিলোমিটার উত্তরে। চায়ের দোকানটা বন্ধ হয়ে যায় সন্ধে নামার আগেই। জানুয়ারির মাঝামাঝি কেমন ঠান্ডা পড়তে পারে এমন তেপান্তরের দেশে, কলকাতায় বসে কল্পনাও করতে পারবে না কেউ। ক্যাম্পাসিংয়ের আগের সন্ধেটায় হুইস্কি নিয়ে বসারও প্রশ্ন নেই অনুরাগদের মতো। চাদরটা গায়ে বেশ করে জড়িয়ে নিচ্ছিল নীলোৎপল।

তখনই শুনতে পেল কলকাতার দিক থেকে অণুতরঙ্গে ভেসে আসা অনুরাগের কথাগুলো, ‘পুনে সাইডের কোম্পানি বললি না? রেপুটেড কিছু নয়। আসলে কি জানিস, তেমন অ্যাক্লেমড কোনও কোম্পানি হলে টাইপটা বলা যেত। কে কেমন টাইপ ফলো করে না করে। আসলে তোরা ঝামেলা করেছিস। ইমিডিয়েটলি কাউকে নিয়ে আসতে হবে। যা হয় আর কি। হুট করে তো রেপুটেড কারুর সঙ্গে কিছু ফিক্স করে ফেলা যায় না। তখন এই টাইপের ছোটোখাটো কাউকে ধরে আনে। যাদের কেমন কোশ্চেন প্যাটার্ন হবে কেউ বলতে পারে না।’

রাগারাগির কিছু নেই। একেবারে সত্যি কথাই বলছিল অনুরাগ। বরং এই অবস্থায় এতটা সময় হয়তো নীলোৎপল নিজেও দিত না কাউকে। গুঞ্জনের মাত্রা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে কলকাতায়। আর সেই তেপান্তরের অন্ধকার রাজ্যে একটুখানি আলেয়ার মতো জ্বলে থাকা বয়েজ হস্টেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ততক্ষণে বেশ ভালোই শিরশিরানি টের পাচ্ছে সে।

অনুরাগ বলে যাচ্ছিল, ‘একটা কাজ করতে পারিস। ওদের সাইটে ঢুকে দেখ তেমন কিছু পাস কিনা। সাইটে ঢুকলে ভুলভাল কিনা বুঝতেও পারবি। এরকম ধরে আনে তো অনেক এই টাইপের কলেজগুলো। এইরকম ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে। তোর কথা শুনে মনেও হচ্ছে তেমন যুতের কেউ নয় যারা আসছে। নইলে ভেবে দেখ না ক্যালকাটা থেকেই কেউ যেতে চায় না বীরভূমে ক্যাম্পাসিং করতে, আর পুনে থেকে এককথায় চলে আসছে…’

‘বীরভূম নয় এটা বর্ধমান ডিস্ট্রিক্ট,’ অনেকক্ষণ পরে একটা কথা বলেছিল নীলোৎপল।

তোরা শহিদ ধরে ফিরিস বলেছিলি না। শহিদ তো বীরভূম সাইডেই যায়…

বর্ধমান পেরিয়ে তবে তো বীরভূমে ঢোকে। অজয়ের ওপারে বীরভূম। তবে আমাদের কলেজ বীরভূম লাগোয়াই একরকম। গুসকরাতে নেমে…

‘আচ্ছা। আর সাইটে ঢুকে প্যাকেজটাও দেখে নিবি। আর-একটা কথা, বন্ডের ব্যাপারে কনশাস থাকবি। এসব আননোন কোম্পানির বন্ড তো! অরিজিনাল টেস্টিমোনিয়ালস জমা নিয়ে নেয় জয়েনিংয়ের সময় অনেকে। তারপর বন্ড পিরিয়ড যতদিন না শেষ হচ্ছে ওদের তাঁবে থাকে। আর পুনেতে মাসে কুড়ি হাজারে স্রেফ জলমুড়ি খেয়ে থাকতে হবে…’

‘ঠিক আছে। থ্যাংক্স ফর অ্যাডভাইস।’

আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে হয়নি। ঠান্ডা তো লাগছিলই বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে একটা গরমও টের পেতে শুরু করেছিল। সেই হপ্তাখানেক আগে যেদিন বিকেলে কলেজের গেটে তালা মেরে ডিরেক্টর, রেজিস্ট্রার, ডিনদের মতো হোমরাচোমরাদের আটকেছিল গোটা ফোর্থ ইয়ার মিলে, সেদিনের মতো গরম।

হস্টেলের রুমে ঢুকে বেশ কয়েক মিনিট বসে খালি ভেবেছিল মদ খেয়ে একটুও কিন্তু নেশাড়ুর মতো কথা বলেনি অনুরাগ। কত সহজ স্বাভাবিক গলায় উপদেশ দিয়ে যাচ্ছিল।

জিটিবির সাইটে অবশ্য ঢোকেনি আর সেই রাতে। চার বছরের সিলেবাসে তো কম সাবজেক্ট নেই। সাইট ঘেঁটে স্যালারি প্যাকেজের হিসেবনিকেশ করে ক্যাম্পাসিংয়ের আগের সন্ধেটা নষ্ট করার কোনও যুক্তি ছিল না। যা থাকে কপালে ভেবে যা যা দরকারি মনে হয়েছিল সবেতেই চোখ বোলাতে বোলাতেই বেজে গিয়েছিল রাত সাড়ে তিনটে।

ঠিক দু’ দিন বাদে সেই অনুরাগই যখন শুনল স্টার্টিংয়ে অ্যারাউন্ড ফর্টি প্লাস ও অ্যাকোমোডেশনের কথা, বলেছিল, ‘একদিন ট্রিট দিতে হবে কিন্তু বস। ম্যূলা রুঁজ। আর স্কচ। কোনও কথা শুনছি না। একেবারে ছক্বা মেরে দিয়েছিস। আমাদেরই শালা এই ছাতাপড়া ক্যালকাটায় ঘষতে হবে বসে বসে…’

এক বছরের পারফরম্যান্স দেখবে জিটিবি। ভালো করতে পারলে নেদারল্যান্ডস, ইটালি বা ব্রিটেনে পাঠিয়ে দিতেও পারে তারপর।

নীলোৎপল ভাবছিল দু’দিনের ভেতরেই দর কোথা থেকে কোথায় চলে যায় একলাফে। সত্যি সেই রাতে যা খেটেছিল সেমিস্টারের আগের রাতেও অত খাটেনি চার বছরে কোনও দিন। অবশ্য খাটতে হয়ও না সেমিস্টারে। ওই তো কলেজ। আর তার ওই তো সব ফ্যাকাল্টি। সিলেবাস শেষ করাতে কালঘাম বেরিয়ে যায় তেনাদের। চোতা সঙ্গে না থাকলে বোর্ডে একটা সার্কিট ঠিক করে অাঁকতে পারে না এমন লোকও আছে। তা স্যার ম্যাডামরা ক্লাসে চোতা নিয়ে আসবে আর তারা মাইক্রো জেরক্স নিয়ে হলে ঢুকলেই যত দোষ! অবশ্য ওইটুকু চক্ষুলজ্জা ফ্যাকাল্টিদেরও আছে। দু’একজন ঝামেলা করে না এমন নয়। প্রথম দেড়ঘন্টায় নিজে লিখতে হবে। পিছন ঘোরা যাবে না। তবে মোটের উপর নির্বিঘ্নেই কেটে যায় সেমের দিনগুলো।

একটু হেসে বলেছিল নীলোৎপল, ‘ঠিক আছে। আগে ফিরি। কলেজের এদেরও খাওয়াতে হবে। ফেব্রুয়ারি আঠের’র আগে নো চান্স।’

‘আচ্ছা’, অনুযোগের গলায় বলেছিল অনুরাগ, ‘এখন আমরা স্কুলের বন্ধুরা সব পুরোনো হয়ে গেলাম।’

‘তোরা তো পুরোনো বন্ধুই।’

ঠান্ডাটা অনেকটাই কমে এসেছিল মাঝের দু’দিনে। আর সেদিন ঘন্টার পর ঘন্টাও যদি কথা বলতে চাইত অনুরাগ, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে কোনওই আপত্তি ছিল না নীলোৎপলের।

সেই পুরোনো বন্ধুদের জন্যই ছুটির দিনের ভাতঘুমটা মাথায় তুলে আজ বেরোতে হয়েছে। আবার দশ মিনিট দেরি হচ্ছে বলে খিস্তিও খেতে হবে! কোথাকার লাটের বাঁট রে তোরা। পড়তিস তো কবে একসাথে মিত্র ইন্সটিটিউশনে। সেই খাতিরে গলাখানা ভালো করেই কাটার প্ল্যান করেছিলি সবকটায় মিলে। পার্ক স্ট্রিটের বাইরে তো বেরোতেই চাইছিলি না। অনেক দরাদরি করে উলটোডাঙার গ্লোবার অবধি নামা গেছে। শিয়ালদার টাওয়ারে নিয়ে গিয়ে শালা ট্রিট দেওয়া উচিত ছিল তোদের।

মনে আছে চার বছর আগে যখন ভর্তি হয়েছিল বিআইইএমে, কলেজের নামটা নিয়েও কি হাসাহাসি সক্বলের।

‘আর কলেজ পেলি না? বোর্দুরিয়া ইন্সটিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট! তার চাইতে প্রেসিডেন্সি বা জেভিয়ার্সে অনার্স করতে পারতিস ইংলিশেও…’

‘যাক, পরের উইকে ফিরবি যখন টিনটিনের অটোগ্রাফ নিয়ে আসতে ভুলিস না কিন্তু।’

‘দেখিস আবার কলেজটার অ্যাফিলিয়েশন আছে তো রিয়েলি? চার বছর বাদে যেন কলেজটাই না ইমাজিনারি হয়ে যায়।’

‘হ্যাঁ রে, এত কিছু থাকতে হঠাৎ বোর্দুরিয়া কেন নামের ডগায়?’

দেবরূপ, সায়ন্তন, জয়ন্তদের চাট খেতে খেতে বলতে হয়েছিল, ‘যতদূর শুনেছি ম্যানেজিং ট্রাস্টির মেয়ে টিনটিনের কমিক্স খুব ভালোবাসে। আর মেয়ে নাকি খুব লাকি লোকটার। মেয়ের জন্মের পরেই বিজনেস ফুুলে-ফেঁপে উঠেছিল ম্যানেজিং ট্রাস্টির। তাই যখন লোকটা এডুকেশন সেক্টরে এল…’

‘বোর্দুরিয়া নাম দিয়ে দিল! রগড় কিন্তু হেভি…’

সেই বোর্দুরিয়া ইন্সটিটিউট চাকরি দিয়েছে বলেই শালারা আজ ফোকটে গলা অবধি মদ খাবি। ভাবতে ভাবতে নীলোৎপলের মনে হয়, ট্রিট যদি অনেস্টলি দিতেই হয় বরং দেওয়া উচিত ছিল বিআইইএমের মেকানিক্সের টিচার তমাল রায়চৌধুরিকে। শুধু তার একার নয় সব স্ট্রিম মিলিয়ে গোটা ফোর্থ ইয়ারের যে-আটান্ন জন চাকরি পেয়েছে তাদের সক্বলের চাঁদা তুলে ট্রিট দেওয়া উচিত ছিল টিআরসি স্যারকে।

নইলে প্লেসমেন্ট সেল তো ওই ঠুঁটো জগন্নাথ। ষোলো তারিখ বিকেলে যখন তালা পড়ল কলেজের গেটে, কোন ফাঁকে যে প্লেসমেন্ট অফিসার পাঁচিল টপকে ভেগেছিল সবার আগে কেউ জানতেও পারেনি ঘুণাক্ষরে। কেমন করে যে সময় থাকতেই খবর পেয়ে গিয়েছিল লোকটা– সেও এক রহস্য। যাহোক, তারপর আর এক সপ্তাহ টিকিটাও দেখা যায়নি প্লেসমেন্ট অফিসারের। এক হপ্তা ধরে নিয়ম করে গোটা ফোর্থ ইযার সকালে এসে তালা মেরে দিয়েছে কলেজের গেটে গেটে। ফ্যাকাল্টিরা সেই তেপান্তরের মাঠে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়িয়েছে। সিগারেটের পর সিগারেট ফুঁকেছে। হস্টেল থেকে ব্যানার বানিয়ে এনে ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্টরা মাঝেমধ্যে হল্লা তুলেছে। অন্যান্য ইয়ারের ক্লাসও শিকেয় উঠেছে। কিন্তু ম্যানেজমেন্টের হেলদোল নেই। ডিরেক্টর স্যার অবশ্য ফোন করে চলেছেন কলকাতার হেড অফিসে। কিন্তু কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি উঁচুতলা থেকে। একটা সপ্তাহ কাটার পর স্টুডেন্টদের নিজেদের মধ্যেই জল্পনা– এভাবে আর কতদিন? শেষ অবধি ভবিষ্যৎ কী?

এই সময় আচমকা একদিন খবর পাওয়া গেল প্লেসমেন্ট অফিসারের অবর্তমানে কোম্পানির সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল টিআরসি স্যারকে। তা নিজের ব্যক্তিগত চেনা পরিচিতির লিংক থেকে টিআরসি নাকি যোগাযোগ করেছেন পুনের জিটিবি সল্যুশনসের সঙ্গে। ঊনত্রিশ তারিখ নাকি কলেজে আসছে জিটিবি। বিশ্বাস অবিশ্বাসের একটা মিশ্র বাতাবরণ তৈরি হল স্টুডেন্টদের ভেতর।

ভর্তির সময় ব্রোশিওরেও লেখা ছিল না সেভেন্টি পারসেন্ট ক্যাম্পাসিং ফেসিলিটি, এসি ক্লাসরুমের গল্প…

হস্টেল মে সেপারেট রুম ভি লিখা হুয়া থা। কাঁহা গয়া ভাই উয়ো সব? এক রুম কে অন্দর ইধার তো চার চার লোগোকো শেয়ার করনা পড়তা হ্যায়।

ইতনা ঘাটিয়া খানা ভি জিন্দেগি মে নেহি মিলি

লেকিন আভি ইসি ওয়াক্ত অ্যায়সা ঝুট ক্যাহেগা ইয়ে লোগ?

সেটাই। এই কন্ডিশনে পাগল না হলে কেউ এরকম গুজব রটাবে না…

পরের দিনই নোটিস পড়ে গেল মেন গেটের সামনে। ঊনত্রিশ তারিখ জিটিবির ক্যাম্পাসিংয়ের খবর দিয়ে। হইহই করে তালা খুলে দিল ফোর্থ ইয়ার। কলেজের নোটিস বোর্ডে এতদিন খালি সেমিস্টারের আগে অ্যাটেডেন্স কমের অজুহাতে ফাইনের নোটিসই বেরিয়েছে। চার বছরে এই প্রথম

ক্যাম্পাসিংয়ের নোটিস ঝুলল সেখানে। স্ট্রাইক তুলে সবাই ছুটল হস্টেলে। ধুলো ঝাড়তে হবে বইপত্রের।

দু’একজন বলাবলি করে সন্ধের পরে, ‘বেশ ছিল কিন্তু ভাই। দিনে স্ট্রাইক আর রাতে মাল। পড়তে পড়তে এখন কেলিয়ে যাচ্ছি।’

আঠাশ তারিখ সকাল থেকে ঝাঁট পড়তে লাগল গোটা কলেজ বিল্ডিংয়ে। লনের ঘাস ছাঁটা হল। গাছের পাতা সরিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে ফেলা হল ক্যাম্পাস। চার বছরে কেউ কখনও যা দেখেনি সেটাই ঘটল ঊনত্রিশ তারিখ সকালে। আটটার মধ্যে ডিরেক্টর, রেজিস্ট্রার, ডিনের মতো হোমরাচোমরারা সক্বলে স্যুট, টাই পরে হাজির। কলকাতা থেকে হেড অফিসের লোক চলে এসেছিল আঠাশ তারিখ রাতেই। মেন টাউনে লজ ভাড়া করে ছিল রাতে। তারাও গাড়ি নিয়ে হাজির সাড়ে ন’টার ভেতর। বিল্ডিংয়ের প্রত্যেক ফ্লোরে বারান্দায় বারান্দায় টবে করে ফুলগাছ এনে বসানো হয়েছে। সুগন্ধে ম ম করছে সব ক’টা ফ্লোর়, মায় টয়লেট অবধি। সাড়ে দশটার পর স্যুট বুট পরে হাজির জিটিবির এইচআর পার্সোনেলদের টিম। কলেজের মাথাদের সঙ্গে সঙ্গে টিআরসি স্যারও এগিয়ে গিয়ে হ্যান্ডশেক করল জিটিবির লোকজনের সঙ্গে।

‘খুচরো দেবেন দাদা,’ অটোওলার কণ্ঠস্বরে সম্বিত ফেরে নীলোৎপলের। গৌরীবাড়ি এসে গেছে। সামনের সিটের সেই গগল্স পরা ছেলেটা পার্স থেকে একটা কুড়ি টাকার নোট বের করেছিল। অটোওলার কথায় নোটটা আবার পার্সে ঢুকিয়ে কয়েন বের করতে থাকে।

তার কাছে আছে তো খুচরো পয়সা? এই এক হয়েছে ঝামেলা। বাসে ট্রামে দোকানে বাজারে যেখানেই যাও, আজকাল খুচরো নিয়ে ঝঞ্ঝাট। তিরিশ টাকার মিষ্টি কিনে একশো টাকার নোট ধরালেও বিনা বাক্যব্যয়ে সত্তর টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছে ময়রা। কিন্তু তিন চার টাকার খুচরো নিয়ে কথা কাটাকাটি বেধে যাচ্ছে। সব খুচরো কয়েন শালা নাকি ব্লেড বানাতে চলে যাচ্ছে। তার কাছে আছে তো খুচরো কিছু? বাসভাড়া দেওয়ার সময় বেরিয়েছে একবার। দেখে নেওয়া ভালো এখনই। বাঁদিকে একটু আড় হয়ে নীলোৎপল ডান পকেট থেকে পার্সটা বের করতে যায়। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অটোর ব্যাকসিটের আরোহী একেবারে ডান কর্নারের লোকটার মুখের উপর নজর পড়ে যায় তার। কপাল থেকে হাত সরিয়ে সিড়িঙ্গে লোকটা গৌরীবাড়ির গলির দিকে তাকিয়েছিল একদৃষ্টে।

আরে, এই লোকটাই তো জিটিবির এইচআর টিমের হয়ে বিআইইএমে গিয়েছিল। নীলোৎপলের ফাইনাল রাউন্ড ইন্টারভিউ এই লোকই নিয়েছিল। বেশ মনে আছে। দু’একটা কথা ইংলিশে হওয়ার পর লোকটা সটান জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আর ইউ কমফর্টেবল ইন হিন্দি? আই থিঙ্ক সাচ। সো মাচ নন বেঙ্গলিজ ইন ইওর ক্যাম্পাস। মাস্ট ইউ নো হিন্দি।’

একটু অবাক হলেও তখন মনে হয়েছিল ভালোই হল। শালা মনে মনে ট্রান্সলেট করে করে ইংলিশ বলার থেকে তো হিন্দিটা বলতে পারবে তুরন্ত। জন আব্রাহামের এত সিনেমা নইলে কেন বেকার বেকার দেখল এতদিন! তাছাড়া কলেজেও বেশির ভাগ স্টুডেন্ট হয় বিহারি নয়তো ইউপির বলে স্যার ম্যাডামদের দু’একজন বাদে বাকিরা হিন্দিতেই পড়ান। ইংলিশে পড়ান দু’একজন টেঁটিয়া টাইপের স্যার। শালা অত দেমাক যখন বিআইইএমে পড়ে আছিস কেন? সেখানে পুনের কোম্পানির এইচআর ম্যানেজার কেমন সুন্দর সেধে হিন্দি বলতে চাইছে।

সেই লোকটির সঙ্গে এক অটোতে যাচ্ছে নীলোৎপল! স্বপ্নের মতো মনে হয় তার। বাবা মার কাছে শুনেছে, যে-লোক সত্যিকারের গুণী বাইরে সে অতি সাধারণ হয়। সেদিন ভদ্রলোকের পরনে ছিল ঝকঝকে স্যুট টাই। অফিসিয়াল কাজে ভিজিট। দামি পোশাক তো থাকবেই। অথচ আজ কেমন সাধারণ টি-শার্ট আর একটা স্যান্ডেল পায়ে অটোতে উঠে পড়েছেন। একটা রিস্ট ওয়াচ অবধি নেই কবজিতে। অটো তখন সবে স্টার্ট দিয়েছে আবার গৌরীবাড়ি থেকে। ভদ্রলোককে দেখে নীলোৎপলের মনে হল কোনও মেকি গাম্ভীর্য থাকা সম্ভবই নয় এই লোকের। নইলে সেদিন তাকে ভেবে ভেবে ইংরেজি বলতে দেখে ওইভাবে সরাসরি হিন্দি বলতে সাহস জোগাতেন না। আচ্ছা, আলাপ করলে হয় না ভদ্রলোকের সঙ্গে! নাকি ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু হবে! না, তা কেন। একটা কথা জিজ্ঞেস করে তো কথা পাড়াই যায়।

ভদ্রলোক রাস্তার বাঁদিকেই তাকিয়েছিলেন তখনও। একবার গলা খাঁকারি দিয়ে নীলোৎপল বলে ওঠে, ‘এক্সিউজ মি স্যার, আপলোগ ভিজিট কিয়ে থে না হামারে বিআইইএম কলেজ মে। পিছলে মাহিনে…’

ভদ্রলোক বোধহয় অন্যমনস্ক ছিলেন। হঠাৎ করে খেয়াল করতে পারেন না নীলোৎপলের কথা। একটা জিজ্ঞাসু চাহনিতে তাকালেন তার মুখের দিকে।

নীলোৎপল আবার বলে, ‘স্যার মুঝে পহেচানা? বিআইইএম কলেজ মে পড়তে হ্যায়। মুঝকো সিলেক্ট কিয়া স্যার আপনে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার কব ভেজেঙ্গে স্যার? জুলাই মে হি?’

ভদ্রলোক হঠাৎ এমন চমকে উঠলেন জীবনে কাউকে এতখানি চমকাতে দেখেনি নীলোৎপল। সে আশ্চর্য হয়ে যায়। ভদ্রলোকের মুখ একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে আচমকাই।

‘অ্যাই, রোকিয়ে। অটো ইধার হি রোকিয়ে। তুরন্ত রোকিয়ে ভাই…’

ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষার আওয়াজ। অটোওলা বিরক্ত হয়েছে স্বভাবতই। বলতে থাকে, ‘আরে ঠিকঠাক বাতাইয়ে কাঁহা ইতরেগা। উধার বোলা উলটোডাঙা…’

নীলোৎপলকে প্রায় টপকে নেমে যান জিটিবির এইচআর ম্যানেজার ভদ্রলোক। পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে দিয়েই আর তিলমাত্র অপেক্ষা করেন না ফিরতির। অটোওলাও অবাক হয়ে গেছে। মুখে বলে, ‘পাগলা নাকি রে ভাই। ফেরত পয়সাটা নিয়ে যাবি তো নাকি। এরকম লোক রোজ যেন ওঠে কয়েকটা করে…’

কী হয়ে গেল আচমকা বুঝতে পারে না নীলোৎপল। ভদ্রলোক এমন চমকে উঠলেন কেন তাকে দেখে? তবে এরই মধ্যে খেয়াল করেছে সে কোনও পার্স ছিল না ভদ্রলোকের সস্তার ট্রাউজার্সের পকেটে। পকেট থেকেই নোটটা বের করে দিয়েই প্রায় দৌড়ে উলটোমুখে যেন পালিয়ে গেলেন ভদ্রলোক।

অটো আবার চলতে শুরু করে। বোকা বনে যাওয়ার মতো মুখ করে বসে থাকে সে। এই মুহুর্তে অটোয় আরোহী মাত্র দু’জন। রোগাভোগা চেহারার অন্য লোকটা একবার তাকায় তার মুখের দিকে। তার চোখেও জিজ্ঞাসু চাহনি।

অরবিন্দ সরণির মাথায় উঠে যানজটশূন্য পথ। তিরের গতিতে ছুটতে থাকে অটো। সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্রমশ বোকা বোকা ভাবটা কেটে যায় নীলোৎপলের। বিচারবুদ্ধি কাজ করতে থাকে আবার। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক কথাই পরিষ্কার হতে থাকে ক্রমশ। পুনের কোম্পানির এইচআর ম্যানেজার ক্যাম্পাসিং শেষ হয়ে যাওয়ার হপ্তাখানেক পরেও কেন কলকাতায় বসে আছে। যদি ছুটিতেও লোকটা থেকে যায় বাড়িতে তবে কেন প্রাইভেট গাড়ি নিদেনপক্ষে ট্যাক্সিতেও চাপেনি এই দরের একজন মানুষ। আর যদি স্রেফ তর্কের খাতিরেই অটোতেও চাপল তবে কেন গৌরীবাড়িতেই নেমে গেল সে। উলটোডাঙায় যাবে বলে উঠেছিল যেখানে অটোয়। তাকে দেখে ভূত দেখার মতো লোকটার চমকে ওঠার কারণটুকুও বুঝতে আর বাকি থাকে না।

উলটোডাঙার স্ট্যান্ডে পৌঁছে গেছে অটো। ধীরে ধীরে রাস্তায় নেমে আসে নীলোৎপল।

সেই মুহূর্তে মনে পড়ে যায় অনুরাগের কথাগুলো– ‘হুট করে তো রেপুটেড কারুর সঙ্গে কিছু ফিক্স করে ফেলা যায় না।’

অনুরাগরা নিশ্চয় এতক্ষণে অনেকবার ফোনে ট্রাই করে ফেলেছে তাকে। দঙ্গল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে গ্লোবারের সামনেটায়। দেখতে পেলেই চরম খিস্তিতে ভূত করে দেবে বলে।

কিন্তু অনুরাগদের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মতো মুখ আর নেই তার। যদি অটোর সেই লোকটা ঊনত্রিশে জানুয়ারি না যেত তাদের কলেজে, তাহলেও বরং আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারত ওদের সামনে।

অটোর ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে রাস্তার মাঝখানটায় এসে দাঁড়ায় নীলোৎপল। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে শোভাবাজারের দিক থেকে দৈত্যের গতিতে তার শরীরের দিকে এগিয়ে আসা একটা বাসের দিকে।

টাইম মেশিন

সম্প্রতি আমাদের দেশের বিজ্ঞানী ড. পলাশ সেনের নাম প্রতিদিনই খবরের কাগজে বেরোচ্ছে। জানা গেছে তাঁর একটি আবিষ্কার, যেটি এখনও গোপন আছে, সেটির ঘোষণা তিনি করতে চলেছেন খুব শীঘ্রই। তবে সেটি সারা বিশ্বের কাছে এক অভতপূর্ব আবিষ্কার হবে বলে সকলের ধারণা।

তাজা খবর কাগজের সম্পাদক, সৌমিত্রবাবু এ সুযোগ আর ছাড়তে চাইলেন না। তিনি ফোন করলেন বিজ্ঞানী ড. পলাশ সেন-কে এবং অনেক অনুরোধ করে বললেন, দেখুন আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই। মাত্র আধঘণ্টা সময় আপনার থেকে চাই।

অনেক ভেবে-চিন্তে সেনবাবু বললেন, ঠিক আছে আজ সন্ধে সাতটায় আসুন। তবে ব্যাপারটা যেন খুব গোপন থাকে। না হলে মিডিয়ার লোকেরাও আমাকে ছেঁকে ধরবে।

কথামতো সৌমিত্র ভট্টাচার্য অফিসের সব কাজ সহ-সম্পাদক-কে বুঝিয়ে দিয়ে অফিস ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। বেশ উত্তেজিত বোধ করছিলেন। এরকম একজন বিজ্ঞানীর সাথে দেখা হবে ভেবেই খুব খুশি হচ্ছিলেন। যথা সময়ে গিয়ে হাজির হলেন বিজ্ঞানী ড. সেনের গবেষণাগারে। ড. সেনের সঙ্গে দেখা হতেই তিনি সৌমিত্রবাবুকে আপ্যায়ন করে ভেতরে নিয়ে গেলেন। প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা এবার বলুন আপনি আমার থেকে কী জানতে চান?

—আচ্ছা, একটা উড়ো খবর শুনছি, আপনি নাকি টাইম মেশিন আবিষ্কার করেছেন এবং সেটির ঘোষণা আগামীকাল সাংবাদিক সম্মেলনে করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেবেন! কথাটা কি ঠিক?

—ঠিকই শুনেছেন। আচ্ছা, আপনি কি টাইম মেশিনের কথায় বিশ্বাস করেন?

—স্যার, আজকাল অনেক শুনছি, তবে ব্যাপারটা যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। কীভাবে এটা সম্ভব! এ নিয়ে নানা দ্বন্দ্ব রয়েছে মনের মধ্যে।

—চলুন পাশের ঘরটায় যাওয়া যাক। ওটাই আমার স্পেস শিপ।

একথা বলেই দুজনে গিয়ে পাশের ঘরটায় বসলেন। দেখলেন নানা রকমের লাল, নীল আলো জ্বলছে। কোনওটা থেকে বিপ বিপ আওয়াজ আসছে। বিজ্ঞানী বললেন, ভয় পাবেন না। ভয়ের কিছু নেই। আপনি হলেন ভারতবর্ষের প্রথম ব্যক্তি যাকে আমি এটা দেখাতে চলেছি। আগামীকাল সারা বিশ্ব এটা জানবে। কথা বলতে বলতে আনমনা হয়ে গেলেন বিজ্ঞানী। তাঁর চোখ মাথার ওপর সিলিংয়ে দিকে। গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন তিনি।

সৌমিত্রবাবু ভাবছেন, অফিসে অনেক কাজ জমে আছে। এখানে বেশি দেরি হয়ে গেলে খুব মুশকিল হতে পারে অফিস পৌঁছোতে। এসব ভাবতে ভাবতে নিজের বুদ্ধিকে একটু কাজে লাগালেন। হঠাৎ হাত থেকে পেনটা মেঝেতে ফেলে দিলেন। পেনটা মেঝেতে পড়ে যেতেই তত্ক্ষণাৎ একটা জোরে বিপ সাউন্ড হল। আর ড. সেন  সংবিৎ ফিরে পেলেন।

ড. সেন বললেন, আচ্ছা, আপনার সাথে এমন কখনও হয়েছে যে, আপনি অফিসের জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন আর নিমেষেই অফিসে পৌঁছে গেলেন, অর্থাৎ গন্তব্যস্থানে! কীভাবে পৌঁছোলেন, কোন রাস্তা ধরে গেলেন তার কোনও কিছুই আর হাজার চেষ্টা করেও মনে করতে পারলেন না।

আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে সৌমিত্রবাবু বললেন, না, স্যার আমার তেমন কখনও হয়নি। এরকমও কি হয়! আপনি তাহলে বলুন, আমি শুনছি।

আবার গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলেন বিজ্ঞানী। অনেকক্ষণ পর মুখ খুললেন, বললেন, গত সপ্তাহের সকালে অর্থাৎ ১ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে আমি আমার ড্রইং রুম-এ সকাল ৮টায় টিভি খুলে একটা ভালো সাক্ষাত্কার দেখছিলাম। দেখতে দেখতে একটা কাজে এই ঘরটাতে এসে কাজটা শেষ করতে থাকি এবং এই ঘরের টিভিটা চালাই। হঠাৎ দেখি টিভিতে ওই চ্যানেলে তখন খবর পড়া চলছে। ভালো করে দেখে বুঝলাম তারিখটা ৩ জানুয়ারি সকাল ৮টা দেখাচ্ছে। ভাবলাম নিজের মাথাটা হয়তো ঠিক কাজ করছে না। কিন্তু বাইরে গিয়ে ওই টিভি-তে দেখলাম আগের সাক্ষাত্কারটাই চলছে। তখন একটু নড়েচড়ে বসলাম। বুঝলাম আমার গবেষণা সার্থক রূপ নিতে চলেছে। ৩ জানুয়ারি বাইরের ঘর থেকে ওই সময়ে ওই চ্যানেল খুলে দেখলাম আমার এই ঘর থেকে দেখা খবর পড়া অনুষ্ঠানটাই দেখানো হচ্ছে। সাধারণত এমন হওয়ার কথা নয়। তখন বুঝলাম আমার স্পেস শিপ-টা কাজ করছে।

এসব শুনতে শুনতে সৌমিত্রবাবু প্রায় চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, তা কী করে সম্ভব, যদি না…

ড. সেন বললেন, ঠিক ধরেছেন। যদি না আমি কোনও স্পেস শিপে গতিশীল থাকি। তাই না? আমার এই ঘরটা কোনও স্পেস শিপ নয়। তবে স্পেস শিপের মতোই। আমাদের ভারতবর্ষের বিজ্ঞানীরা পারে না কি বলতে পারেন? আমরা যে-সব রকেট পাঠাচ্ছি তা অনেক কম খরচে। চাঁদে যে-রকেট পাঠানো হয়েছিল তার জন্য যে অনেক কম খরচ হয়েছিল, তা তো আপনারা সবাই এখন জেনে গেছেন।

শুধু তাই নয়, ২৭ মে বাইরের ঘরে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে পেনটা নিতে এই ঘরে ঢুকেছিলাম। পেনটা নিয়ে যখন বাইরের ঘরে ফিরে গেলাম, দেখলাম রামু আমার টেবিলে ২৮ ও ২৯ মে-র খবরের কাগজটা রেখে গেছে। এই ২৮ তারিখটা আমার জীবন থেকে কোথায় হারিয়ে গেল বুঝলাম না। আমার ড্রাইভার, চাকরবাকর, বন্ধুবান্ধব থেকে শুরু করে আমার সহকর্মীদের কেউই ২৮ মে আমাকে দেখতে পায়নি।

সৌমিত্রবাবুর গলাটা তখন যেন কেমন শুকিয়ে কাঠ হওয়ার জোগাড়। ভাবতে লাগলেন, এ তো দেখা যাচ্ছে মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের থিযোরি অফ রিলেটিভিটিকেও ডাইভার্ট করছে এই ঘটনা। এমন ঘটনা, যার কোনও ব্যাখ্যা নেই!

—আপনার তো ভুল হতে পারে। আপনি হয়তো আসলে ২৯ মে-তেই এ ঘরে এসেছিলেন। বেশ শুকনো গলায় সৌমিত্রবাবু কথাগুলো বললেন।

আবার উদাস হয়ে গেলেন ড. পলাশ সেন। তারপর হঠাৎ বললেন, আপনি কটায় আমার বাড়িতে এসেছিলেন সৌমিত্রবাবু?

—ঠিক সাতটায়। সৌমিত্রবাবুর ঠিক মনে আছে কারণ কলিংবেলটা টেপার সময় মোবাইল-এ সময়টা দেখেছিলেন। হ্যাঁ, সাতটাই বেজেছিল তখন।

—এর মধ্যে কতক্ষণ হল আপনার সাথে আমি কথা বলছি? প্রায় আধঘণ্টা তাই না?

—আজ্ঞে হ্যাঁ।

—তাহলে তো এখন সাড়ে সাতটা বাজার কথা?

—আজ্ঞে হ্যাঁ।

—কিন্তু ঘড়িটা দেখুন তো।

দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন সৌমিত্রবাবু। কিন্তু এ কি করে সম্ভব! ঘড়িতে সাড়ে দশটা দেখাচ্ছে। সৌমিত্রবাবু ভাবলেন, নিশ্চয়ই কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। এ ঘড়িটা হয় খারাপ, নয়তো ইলিউশন। তিনি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখলেন, তাতেও সাড়ে দশটা দেখাচ্ছে। এটা কী করে সম্ভব! ভাবতে থাকেন অবাক হয়ে।

—ভাবছেন আমি বিজ্ঞানের কোনও এক্সপেরিমেন্ট করছি? হেসে জিজ্ঞেস করলেন বিজ্ঞানী সেন। বলতে বলতে নিজের ভাবনায় ডুবে গেলেন বিজ্ঞানী।

—আমি তাহলে এবার চলি। অনেক রাত হল, বলেই সৌমিত্রবাবু বেরিয়ে গেলেন। ফেরার জন্য গাড়িতে চড়ে আবার মোবাইলটা দেখলেন। তখনও দেখাচ্ছে রাত ১০টা ৪০ মিনিট। ভাবলেন কিছু একটা গণ্ডগোল হচ্ছে। আজ আর অফিসে ফিরবেন না, সোজা বাড়ি ফিরে যাবেন। অফিসে ফোন করে বলে দিলেন খবরটা সহ-সম্পাদককে দিয়ে দিতে।

সৌমিত্রবাবু গাড়ি চালাতে চালাতে ভাবতে লাগলেন, একটু আগে ঘড়িতে এবং মোবাইল-এ যখন সাড়ে দশটা দেখলেন সেটা কোনও ভ্রম বা ম্যাজিক নয়তো? ড. সেনের ঘরটা কোনও ম্যাজিক ঘর নয়তো? বিজ্ঞানীর সমস্যার সমাধান হয়তো করা যাবে, একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে। এরকম নানা উদ্ভট কল্পনা করতে করতে বাড়ি এসে পৌঁছোলেন। বাড়িতে ফোন করবেন ভাবলেন কিন্তু ফোনে চার্জ শেষ হয়ে গেছে। এরকম তো হয় না সাধারণত। আজ সকালেই পুরো চার্জ দেওয়া হয়েছিল। নতুন মোবাইল, তাই প্রায় দুদিন অনায়াসেই চলে যায়। কিন্তু এরকম হল কেন! আজ সবই যেন কেমন ওলটপালট লাগছে। এসব আবোলতাবোল ভাবতে ভাবতে বাড়িতে এসে পৌঁছোলেন সৌমিত্রবাবু।

বাড়িতে ঢুকতেই তাঁর ছোটো মেয়ে রিঙ্কি ছুটে এলো। চেঁচিয়ে বলতে লাগল মা, দাদা, দেখে যাও বাবা এসেছে!

অমনি সবাই হুড়মুড় করে ড্রইংরুমে এসে ঢুকল।

—কী হয়েছে? তোমরা এত হইচই করছ কেন? বিরক্তির সুরে জানতে চাইলেন তিনি।

স্ত্রী সুমনাদেবী বলে উঠলেন, হইচই মানে!  শুনলাম কাল বিকেলে অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলে। তারপর থেকে তোমার আর কোনও খোঁজ নেই। আর তুমি বলছ আমরা হইচই করছি। কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন সুমনা। আমাদেরকে মানুষ বলেই মনে হয় না তোমার না!

তার কান্না সৌমিত্রকে আচ্ছন্ন করল বটে কিন্তু তাঁর জীবন থেকে যে একটা দিন হারিয়ে গেল সেই অঙ্কটা কিছুতেই মেলাতে পারলেন না!

মৌন-মুখর

দিল্লি এয়ারপোর্ট-এর অ্যারাইভাল টার্মিনাল দিয়ে বেরোতেই, সদ্য বিবাহিত বর-কনেকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এল শ্বশুরবাড়ির সকলে। ফুল দিয়ে সাজানো একটা ইনোভা অপেক্ষা করছিল ওদেরই জন্য। আর বরণের জিনিসপত্র নিয়ে গাড়ির সামনেই হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুজাতা।

তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হল। একমাত্র ছেলে অভিরূপের বিয়ে হবে, এই স্বপ্ন সেই কতবছর ধরে দেখে আসছিলেন সুজাতা। স্বামী বীরেন্দ্র দেখতে পেলেন না এটাই যা আক্ষেপের। অভি অবশ্য তার পছন্দের পাত্রীকেই বিয়ে করেছে। কর্মসূত্রে কলকাতায় কিছুদিন ছিল অভি। সেই কোম্পানিতেই কর্মরতা বৃষ্টির সঙ্গে প্রেম হয়ে যায় অভির। বছর দুয়েক আগে দিল্লিতে নিজের শহরে ফিরে এলেও, বৃষ্টি আর অভি, লং ডিস্ট্যান্স সম্পর্কটা সফল ভাবে রাখতে পেরেছিল।

কিন্তু শেষ অবধি সুজাতা একদিন ছেলেকে, ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বলেন কী বাপু তোদের এযুগের প্রেম বুঝি না। বিয়ে করে বৃষ্টিকে এ বাড়িতে নিয়ে চলে আসবি তা নয়, ফোনে আর ই-মেলে চলছে তোদের সম্পর্ক! মায়ের কাছে খোঁচা খেয়ে হয়তো শেষ অবধি একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় দুজনে।

বৃষ্টিকে আপাত ভাবে দেখলে একটু কেরিয়ারিস্ট-ই মনে হতে পারে। হবেই বা না কেন। তার মা মানসী রায় ভৌত বিজ্ঞানের শিক্ষিকা, বাবা প্রতুল রায় একজন অধ্যাপক। বাড়িতে বরাবরই পড়াশোনার আবহাওয়া। সফটওয্যার কোম্পনিতে বৃষ্টি জয়ে করার পর, তার দ্রুত উন্নতিই হয়েছে। অভির সঙ্গে প্রেমটা তার কাছে সত্যিই কেরিয়ারের মতো প্রায়োরিটি ছিল না।

বৃষ্টি একটু রিজার্ভ। আসলে বাড়িতে মা তাঁর কাজ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। বাবাও অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রটাতে নানা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। নানা বড়ো পদে তাঁর অধিষ্ঠান। ফলে সংসারে তেমন সময় দিতে পারেননি। বৃষ্টির সে অর্থে বন্ধুবান্ধবও নেই। যেটুকু যা আছে ওই সোশ্যাল সাইট-এ আর কর্মক্ষেত্রে।

অভি তুলনায় খুব প্রাণখোলা। হইচই করতে ভালোবাসে। আপাত গুরুগম্ভীর চেহারার হবু শ্বশুর-শাশুড়িকে কোন মন্ত্রবলে এমন পকেটস্থ করেছিল অভি, বৃষ্টি আজও তা জানে না। তবে এর সুফল মিলেছে দ্রুত। বৃষ্টির সঙ্গে অভির বিয়ে প্রস্তাবে আপত্তি করেননি মানসী ও প্রতুল। শুধু একটিবার মেয়েে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, কলকাতার কালচার ছেড়ে দিল্লিওয়ালাদের সঙ্গে অ্যাডজার্স্ট করতে পারবি তো মা? তোর শাশুড়ি কিন্তু একটু সেকেলে। বাড়ির বাইরে পা রাখেন না। পুজোপাট, ব্রত উপবাস নিয়ে কেটে যায়। পারবি তো মানাতে?

মায়ের এই সাবধান বাণী নিয়ে একেবারেই যে ভাবেনি বৃষ্টি, তা নয়। কিন্তু অভির সঙ্গে সম্পর্কটা অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। অভিকে স্বামী হিসাবে বরণ করলে, তার পরিবারকেও মেনে নিতে হবে। সুতরাং বৃষ্টি মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল। এই মুহূর্তে যে-মহিলা বধূবরণ করে তাকে ঘরে তুলছেন, এক নজরে তাঁকে খারাপ লাগেনি বৃষ্টির। সামান্য ভারিক্কি চেহারা, ফর্সা সুন্দর মুখশ্রী, দেখে বোঝা যায় কমবয়সে বেশ সুন্দরী ছিলেন। নিজের প্রতি তেমন মনযোগ দেননি বলে বয়সের চাইতে বেশি বয়স্ক দেখায়, কিংবা অকাল বৈধব্য তাঁকে বুড়িয়ে দিয়েছে।

চিত্তরঞ্জন পার্কের বাড়িতে পেঁছে আত্মীয়স্বজনরা নানা রকম আচার অনুষ্ঠান শুরু করল। খুব ক্লান্ত লাগছিল বৃষ্টির। একে বিয়ে ধকল, তারপর ভোরের ফ্লাইট, চোখ টেনে আসছিল। অভি ব্যাপারটা বুঝে আচার অনুষ্ঠান থামাতে বলার আগেই, সুজাতাদেবীই হই হই করে উঠলেন আত্মীয়দের উদ্দেশ্যে। আরে থামো তোমরা এবার। মেযোকে একটু বিশ্রাম দেবে না, নাকি? জার্নি করে এসেছে অত দূর থেকে।

বৃষ্টি রীতিমতো অবাক হল। সুজাতাদেবী সম্পর্কে তার ধারণা ছিল মহিলা একদম ওল্ড ফ্যাশনড। কিন্তু তিনিই যে ওর ত্রাণে এভাবে এগিয়ে আসবেন, এটা তার কাছে বেশ চমকপ্রদ।

দিন যায়, বৃষ্টি আর সুজাতা আজ গল্প করতে বসেছে। আত্মীয়স্বজনরা এক এক করে বিদায় নিয়েছে, এক সপ্তাহ ধরে বিয়ে হই হুল্লোড় সেরে। তাই আজ ফুরসত মিলেছে দুজনে মুখোমুখি বসার। অফিস থেকে কটা দিন ছুটি নিয়েছে বৃষ্টি আর অভি। তাদের প্ল্যান আছে হনিমুন সেরে আবার কাজে যোগ দেবে। বৃষ্টি কলকাতার অফিস থেকে ট্রান্সফার নিয়েছে গুরগাঁওতে। ফলে অভি আর বৃষ্টি এখন সহকর্মী।

কাজে যোগ দেওয়ার আগে হনিমুন করে মনটা ফ্রেশ করে নিতে হবে। অভি বলেছিল। সেইমতো তারা পরদিনই চলে যাচ্ছে মানালি। আজ ডাইনিং টেবল-এ টুকিটাকি সবজি কাটায় সাহায্য করছিল বৃষ্টি, তার শাশুড়িকে। খুবই চুপচাপ মানুষ। কথায় কথায় বৃষ্টি বোঝে, মানুষটা একটু নিঃসঙ্গও। সুজাতা বলেন, অভি সারাদিনের জন্য বেরিয়ে যায়। ফেরে সেই রাতে। সারাদিন আমি একাই থাকি। যাক, এখন তুই এসে গেছিস, মনের কথা বলার একটা লোক পেলাম। তুই কড়াইশুঁটিগুলো ছাড়া, আমি পুজোটা সেরে নিই। সকাল থেকে উপোস করে আছি।

বৃষ্টি আন্তরিকতার সঙ্গে বলে, কেন মা, উপোস করে পুজো করলে কি ঠাকুর বেশি খুশি হবেন? এবার থেকে এত উপোস কোরো না। অসুস্থ হয়ে পড়লে তো পুজোটাই করতে পারবে না। তাতে তো ঠাকুর আরও অসন্তুষ্ট হবেন, তাই না? সুজাতা হাসেন বৃষ্টির কথায়। বলেন, ওরে মেয়ে তুই ভালো যুক্তি দিয়েছিস তো! বেশ শুনব পরের বার থেকে তোর কথা। বৃষ্টির মাথায় আঙুল দিয়ে চুলে বিলি কেটে দেন সুজাতা। খুব অদ্ভুত একটা অনুভতি হয় বৃষ্টির। সত্যিই মা   দিন এ ভাবে তাকে আদর করেনি। সময়ই পেত না মা। আজ বৃষ্টির ভেতর থেকে যেন একটা স্নেহ-কাঙাল সত্তা বেরিয়ে আসতে চাইছে। কেন যেন খুব ভালোবেসে ফেলল সে সুজাতাদেবীকে।

মাসদুয়েক কেটে গেছে। বৃষ্টি আর অভি এখন একসঙ্গেই অফিস বেরোয়। সকালের দিকটায় তাই দম ফেলার ফুরসত পান না সুজাতা। ওদের ব্রেকফাস্ট বানিয়ে টিফিন প্যাক করে দেন। বৃষ্টি বার দুয়েক প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে বলেছিল, মা লাঞ্চটা বাইরেই করে নেব, তোমায় কষ্ট করতে হবে না। তা সে কথা কানেই নেন না সুজাতা। নিজে হাতে রান্না করে খাওয়ানোর মধ্যেই তাঁর তপ্তি।

আজ সান ডে। বৃষ্টি সবাইকে সারপ্রাইজ দেবে বলে আজ সুজাতাদেবীরও আগে ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে ঢুকেছে। আলুর পরোটা বানাবে বলে। সুজাতাদেবী আলুথালু শাড়ি সামলে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে অবাক। আরে তুই কেন এলি, একটা দিন ছুটি পাস। আমি করে দিচ্ছি। তুই যা বিশ্রাম নে। বৃষ্টি দুহাতে সুজাতাকে হাতে ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে বলে, চুপচাপ এখানে বসে থাকবে। আজ তোমার সান ডে। তুমি রেস্ট নেবে। এবেলার পুরো দাযিত্ব আমার। রাতে ডিনার বাইরে। সুজাতার কোনও ওজর আপত্তি শুনল না বৃষ্টি।

অভি শাশুড়ি-বউয়ে এই রাগ-অনুরাগের খেলা দেখে বেশ মজা পায়। সে বোঝে বৃষ্টির সঙ্গে সুজাতার একটা আলাদা ইকোয়েন কাজ করে। তাই মিটিমিটি হাসে, কিছু বলে না। ব্রেকফাস্টের পর বৃষ্টি চুপি চুপি সুজাতার কানের কাছে মুখ এনে বলে, আজ বিকেলে একটা জায়গায় তোমায় নিয়ে যাব। কাউকে কিছু বলবে না আগে থেকে। এমনকী তোমার ছেলেকেও নয়। সুজাতা বেশ অবাক। উত্তেজিত হয়ে বলতে যান, কোথায় নিয়ে যাবি রে বৃষ্টি! বৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে, চুপ জানতে পারবে সময় মতো।

একটা উবর বুক করতে করতে বৃষ্টি অভিকে বলে, আমি মা-কে নিয়ে একটু বেরোচ্ছি। তুমি রাত নটা নাগাদ চাইনিজ টেম্পল রেস্টুরেন্ট-এ একটা টেবিল বুক করে রাখো। ওখানেই তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে অভি কী, কেন এসব !9  করে না। সে বৃষ্টিকে ভালো মতোই চেনে। জানে  করেও লাভ হবে না। বৃষ্টির প্ল্যান আগে থেকে সে কিছুতেই বলে না। তাই সে সংক্ষেপে, যথা আজ্ঞা ম্যাডাম বলে নেটফ্লিক্স-এর নতুন সিরিজ-এ মনোনিবেশ করে।

উবরটা এসে একটা বিউটি পার্লারের সামনে দাঁড়ায়। সুজাতাকে সঙ্গে নিয়ে বৃষ্টি দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে পার্লারে। তারপর একজন বিউটিশিয়ানকে ইশারায় ডেকে, তাকে কী যেন বুঝিয়ে দেয়। সুজাতার অবাক হওয়ার আরও কিছুটা বাকি ছিল। বিউটিশিয়ান মেয়েটি সুজাতাকে বসিয়ে দেয় একটা ঘোরানো চেয়ারে। সুজাতা বৃষ্টিকে বলার চেষ্টা করেন, আরে কী হচ্ছে এসব! বৃষ্টি ঠোঁটে আঙুল রেখে কপট রাগের ভঙ্গি করে। তারপর হাসি মুখে বলে, এত সুন্দরী একজন মহিলা, এভাবে এলোঝেলো কেন থাকবে। চুপটি করে বসো। ওরা যা যা করছে করতে দাও।

সুজাতা আড়ষ্ট হয়ে বসলেও, আস্তে আস্তে শরীরে আরাম নেমে আসে। দুটি মেয়ে তাঁর মাথা হেলিয়ে বেসিনে শ্যাম্পু করে দিচ্ছে চুল। চোখ বুজে আসে সুজাতার। মেয়ে দুটি বলে, আন্টি আপকে বাল কিতনে সুন্দর হ্যায়, আপ স্পা করেঙ্গে তো অউর ভি সুন্দর হো জাযো। সুজাতা একটু হেসে ওদের হাতে নিজেকে সমর্পণ করেন।

চোখ বুজে চেয়ারে গা এলিয়ে কত কথা মনে পড়ে সুজাতার। তাঁর সেই বিয়ে দিনটা, কনের সাজে সাজা। তারপর বর্ধমানের মেয়ে দিল্লির প্রবাসী বাঙালি পরিবারে বউ হয়ে আসার কথা। তখন শরিকি বাড়িতে যৌথ পরিবারে থাকতেন সুজাতা। ভাসুর, দেওর, নিয়ে বিরাট পরিবার। সময়ই পেতেন না নিজের যত্ন নেওয়ার। স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেকে বড়ো করতে করতে আর সুযোগই পাননি নিজেকে সাজানোর। আজ ছেলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সিআর পার্কের এই ছিমছাম ফ্ল্যাটে অঢেল সময় সুজাতার হাতে কিন্তু কী আশ্চর‌্য সাজার ইচ্ছেটাই যেন মরে গেছে।

চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল বৃষ্টির ডাকে। দ্যাখো তো মা, তোমায় কত সুন্দর দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যেই শ্যাম্পু করা চুলে সুন্দর করে ইউ কেটে দিয়েছে পার্লার প্রসাধিকারা। ফেসিয়ালের প্রলেপ, আইব্রো, ওয়াক্সিং, সব নিখুঁত। সুজাতা নিজেকে পার্লারের আয়নায় দেখে হতবাক। এই ঘরের ছটা আয়নায় যার মুখ প্রতিবিম্বিত হচ্ছে, সত্যিই তিনি! বয়সটা যেন হঠাৎই কমে গেছে সুজাতার। কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। কথা হাতড়াচ্ছেন।

বৃষ্টি কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়েছে, মুগ্ধতা তার চোখে স্পষ্ট। বলে, এত সুন্দর তুমি, কেউ ভাবতে পারত। কী চেহারা করে রেখেছিলে নিজের! আমি কিন্তু ওজর শুনব না। প্রতি মাসে একবার করে এখানে আসবে তুমি। আমি কথা বলে রাখব। বৃষ্টির জোরের কাছে হার মেনেছেন সুজাতা। এই পাগলি মেয়ের যে কী করবে, আগে থেকে কিছু বোঝা যায় না।

পার্লার থেকে সুজাতা যখন বেরোলেন, অনেকেই যে তাঁকে দেখছে, তা টের পেতে তাঁর অসুবিধে হল না। একটা হালকা নীল শাড়ি পরে বেরিয়েছিলেন বাড়ি থেকে। বিধবা হওয়ার পর শুধু সাদাই পরতেন। কিন্তু অভি ওই বেশে মাকে দেখলেই কান্না জুড়ে দিত। তাই মনের সংস্কার কাটিয়ে খুব হালকা রঙের শাড়ি পরা শুরু করেছিলেন সুজাতা। আপাত ভাবে দেখলে তাঁকে সেকেলে ভাবতে পারে অন্যরা। কিন্তু সুজাতা নিজে জানেন, ভেতর থেকে তিনি অনেকের থেকে বেশি সংস্কারমুক্ত। সমাজের চাপে পড়ে কিছু নিয়ম তাঁকে মানতে হয়েছে ঠিকই কিন্তু সবেতে যে তাঁর সায় ছিল, তেমন নয়।

পার্লারে যে প্রায় তিন ঘন্টা অতিক্রান্ত হয়েছে তা এতক্ষণে খেয়াল হল সুজাতার। মণিবন্ধে বাঁধা ঘড়িটা দেখে তিনি বৃষ্টিকে তাড়া দিলেন, ওরে ভয়ংকর দেরি হয়ে গেল যে!

উফ্ কীসের দেরি মা। রাতে তো আর তোমায় রান্না করতে হচ্ছে না। আমরা বাইরে ডিনার করব বললাম না?

বৃষ্টি সুজাতাকে নিয়ে চাইনিজ টেম্পল রেস্তোরাঁয় ঢুকল। অভি ইতমধ্যেই পেঁছে অপেক্ষা করছে নির্দিষ্ট টেবিলে। এবার আরও একবার অবাক হওয়ার পালা সুজাতার, অভি ওদের দেখেই উঠে দাঁড়াল। এসো মা, এসব বৃষ্টির প্ল্যান, আমি করলে হইচই বাধাতে, বকতে। নাও এবার সামলাও তোমার বউমা-কে, বলে হাসতে থাকে অভি।

সুজাতা টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখেন একটা ঢাউস কেক-এ লেখা হ্যাপি বার্থডে মা। মোমবাতি আর বেলুন দিয়ে পার্সোনালাইজ করে এই টেবিলটা সাজানো। সুজাতা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দেখেন সে মিটিমিটি হাসছে। সুজাতার নিজের জন্মদিন মনেই থাকে না। এভাবে পালন করার তো প্রশ্নই নেই। অভি নির্ঘাৎ তারিখটা বলেছে বৃষ্টিকে। পরম মমতায় বৃষ্টিকে কাছে টেনে নেন সুজাতা। দ্যাখো তো পাগলির কাণ্ড! ইশ এই বয়েছে আমার জন্মদিন! লজ্জায় লাল হয়ে যান সুজাতা।

অভি এবার ভালো করে লক্ষ্য করে মা-কে, মা তুমি কী করেছ বলো তো। দারুণ গ্ল্যামারাস দেখাচ্ছে তোমাকে!

সারপ্রাইজ। বুঝলে অভিবাবু। মা-কে পার্লারে নিয়ে গেছিলাম আজ, হাসতে হাসতে বলে বৃষ্টি। গল্পে, আড্ডায় জমিয়ে খাওয়াদাওয়া করে তিনজনে। বৃষ্টি আসার পর যেন জীবনটাই বদলে গেছে সুজাতার। আর পাঁচ জায়গায় তিনি শোনেন শাশুড়ি-বউয়ে নাকি বনিবনা হয় না। বাড়িতে ঝগড়া, অশান্তিতে কাক চিল বসতে পারে না। কিন্তু তাঁর বেলায় ঘটেছে এর ঠিক উলটো। এই মেয়ে এতই আপন করে নিয়েছে তাঁকে, যেন নিজের মা।

সেদিন গা ধুয়ে টিভি-টা চালিয়েছেন। ছেলে-বউ এখনও অফিস থেকে ফেরেনি। ফোনটা বেজে উঠল সুজাতার। তাঁর ওই হাত দিয়ে সুইচ টেপা আদ্যিকালের ফোনটা ধরতে ধরতেই কেটে গেল। আবার নম্বর খুঁজে কল ব্যাক করা এক হয়রানি। ছেলে অনেকবার বলা সত্ত্বেও ফোন বদলাননি সুজাতা। তাঁর বাড়িতে এখনও একটা ল্যান্ড লাইন আছে। আত্মীয়স্বজনরা তাতেই ফোন করে। কিন্তু এই নম্বরটা কার? ফোনের কী টিপে হাতড়াতে গিয়ে আবার ফোন এল একই নম্বর থেকে। এবার আর দেরি হল না ধরতে। সুজাতা হ্যালো বলতেই ওপার থেকে ভেসে এল মানসীদেবীর গলা। খোঁজখবর নেওয়ার জন্য ফোন করেছেন। কুশল বিনিময় হল দুই বেয়ানে। তারপর মানসী একটু অভিমানের সুরেই যেন বললেন, কী জাদু করেছেন দিদি। মেযো তো বাপের বাড়ি আসার নামই করছে না, বলে হাসতে থাকলেন মানসী। হাসির আড়ালে অনুযোগটা কিন্তু চিনতে ভুল হল না সুজাতার। খুবই বিনীত ভাবে বললেন, খুব ভালো মেয়েটি আপনার দিদি। কী যে আপন করে নিয়েছে আমায়। তবে ওরা দুটিতে বড্ড ব্যস্ত। একটু সময় পেলে নিশ্চয়ই যাবে আপনার কাছে। আজ এলেই বলছি।

এরপর আরও কিছুক্ষণ চলল গল্পগাছা। তারপর আবার টিভি দেখায় মন দিলেন সুজাতা। কলিংবেল বাজল। ঝড়ের বেগে ঢুকল বৃষ্টি। মা চটপট তৈরি হও। বেরোব। শপিংয়ে যাব। এরকম প্রায়ই করে বৃষ্টি। কখনও তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে বাড়ি এসে শপিংয়ে নিয়ে যায় সুজাতাকে। কখনও আবার ফিল্ম দেখতে যায় দুজনে। এখানে বাংলা ছবি এলেই মাল্টিপ্লেক্স-এ টিকিট কাটে বৃষ্টি। অনলাইন-এ ওরা খুব চটপটে। ব্যাংক থেকে সিনেমার টিকিট সবই ফোন-এ করে। সুজাতা এসব ব্যাপারে ভীষণ আনাড়ি। তাই সভয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন ছেলে-বউয়ে কাণ্ড। ছেলে যতবারই বলেছে নতুন ফোন কিনে দিই, হাঁ হাঁ করে ওঠেন সুজাতা। বলেন, খেপেছিস। এই বয়সে কী করতে কী করে ফেলব। অত দামি ফোন। পাগল! আমার ওই সুইচ টেপা ফোনই ভালো।

কিন্তু এই আপত্তিও ধোপে টিকল না। আজ শপিংয়ের প্ল্যানটা বৃষ্টি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে করেছে। মল-এর একটা মোবাইল স্টোর-এ জোর করে ঢোকাল সুজাতাকে। তারপর বেশ দামি একটা অ্যান্ড্রয়ে ফোন একরকম জোর জবরদস্তি করে কিনে দিল বৃষ্টি। এটা তোমায় নিতেই হবে। কোনও কথা শুনব না, জোর করে বৃষ্টি। সুজাতা কী যে করবেন এই মেয়েকে নিয়ে ভেবেই পান না।

ফোন বাড়িতে আসার পরও সুজাতা যত্ন করে সেটাকে তুলে রেখে  দেন, কাজ চালান সেই পুরোনো ফোনটাতেই। বৃষ্টি ব্যাপারটা খেয়াল করে মৃদু ধমক লাগায় শাশুড়িকে, ব্যাপারটা কী! ফোন-টা তোমায় ব্যবহার করার জন্যই তো কিনে দিলাম নাকি?

ও আমার দ্বারায় হবে না। বলার চেষ্টা করেন সুজাতা।

আলবাত হবে। নিয়ে এসো ফোন। বৃষ্টি নাছোড়। এরপর সারা দুপুর ধরে চলল ফোন ব্যবহার করার টুকিটাকি শেখানো। সুজাতা ভুল করেন, হাসেন, বকুনি খান কিন্তু মনের ভেতর একটা ভারি ভালো লাগা কাজ করে। এই বয়সে পেঁছেও তিনি এদের বোঝা নন। ওনার প্রতি এদের অকৃত্তিম ভালোবাসা ভরিয়ে রাখে সুজাতাকে। বিয়ের পর ছেলে পর হয়ে যাবে, এরকম অমূলক ভয় তাঁর জীবনে কাজ করেনি। স্বামী হারিয়েছেন অল্প বয়সে ঠিকই, অনেক দুঃখ যন্ত্রণা পেরিয়েছেন এটাও ঠিক কিন্তু এখন তাঁর আর কোনও দুঃখ নেই, নিঃসঙ্গতা নেই। বৃষ্টি তাঁর জীবনের সব একাকীত্ব দূর করে দিয়েছে।

কিন্তু নিরবিচ্ছিন্ন দুঃখ যেমন মানুষের জীবনে থাকে না, সুখেরও সেটাই ধর্ম। একদিন বিকেলে সুজাতা ব্যস্ত স্যান্ডউইচ বানাতে, ছেলে-বউমা অফিস থেকে এসে যাবে। কলিংবেল বাজল। বৃষ্টি একাই ফিরেছে। সুজাতা বললেন, কইরে সে কোথায়?

বৃষ্টি ব্যাগটা সোফার উপর ছুড়ে দিয়ে গা এলিয়ে বসল। আসবে আসবে। আমি আগে বেরিয়েছি। আচ্ছা মা, তোমাকে একটা সিরিয়াস কথা বলার আছে, বলে বৃষ্টি।

কী কথা? বল শুনি। পাশে এসে বসেন সুজাতা।

আমায় ছমাসের জন্য চেন্নাই ব্রাঞ্চে পাঠানো হচ্ছে একটা বিশেষ কাজের দাযিত্ব দিয়ে পরশু সকালেই ফ্লাইট।

কথাটা শুনে সুজাতার মুখটা ম্লান হয়ে গেল। বৃষ্টিকে ছাড়া বাড়িটাই যেন আর বাড়ি মনে হবে না। মন খারাপ করা গলায় সুজাতা বললেন, তোকে ছাড়া আর কাউকে পেল না ওরা? অভিটাই বা কী! সে কী করে অফিসে? বলতে পারল না, আমি সদ্য বিয়ে করেছি, আমার বউ যাবে না?

বৃষ্টি হেসে ফেলে শাশুড়ির কথায়। মা এটা খুব প্রেস্টিজিয়াস ব্যাপার। আমার প্রমোশন হয়েছে। সেই জন্যই কোম্পানি আমায় দাযিত্ব দিয়ে পাঠাচ্ছে। এবার সুজাতা একটু ধাতস্থ হন। বলেন, কিন্তু তুই ছাড়া আমি তো খুব একলা হয়ে যাব রে।

কে বলল একলা হয়ে যাবে। তোমার ফোন আছে না!

সুজাতার বৃষ্টির কথাটা মোটেই গ্রহণযোগ্য মনে হল না। একজন মানুষের পরিপূরক কি কখনও একটা মোবাইল ফোন হতে পারে?

বৃষ্টি উৎসাহ নিয়ে বলে, মা এখন সোশ্যাল সাইট-এ। আজই তোমায় একটা অ্যাপ নামিয়ে দেব ফোন-এ। এর নাম ফেসবুক। দেখবে তোমার হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদেরও খুঁজে পাবে সেখানে। আরে সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পারের লোকেদেরও ওখানে চাক্ষুস দেখতে পাবে। তারপর করো না ভিডিযো চ্যাট, গল্প, আড্ডা। একটুও একা লাগবে না আর তোমার!

সুজাতা চুপ করে রইলেন। সত্যি বলতে কী, তাঁর মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেছে বৃষ্টির চেন্নাই যাওয়ার খবরে।

মা-কে রাজি করাতে বৃষ্টিরও খুব খারাপ লেগেছিল। চেন্নাইয়ে অ্যাপার্টমেন্ট-এ সে এখন একা। ভীষণ মিস করছে সুজাতাকে। হ্যাঁ অভিকে মিস করাটা আছে, কিন্তু সুজাতা তার মনে একটা অন্য জায়গা জুড়ে আছেন। এমন স্নেহ সে ছোটো থেকে পায়নি। এক সপ্তাহ হল এসেছে। কাজে যোগ দিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সারা সপ্তাহ ব্যস্ততায় এই একলা লাগাটা ফিল করেনি বৃষ্টি। কিন্তু আজ প্রথম উইক এন্ড-এ বেশ ফাঁকা ফাঁক লাগছে। অভির সঙ্গে কথা হয়েছে একটু আগে। মায়ের সঙ্গেও কিন্তু তাতে মনখারাপটা আরও বেড়ে গেছে।

মোবইলটা একাকিত্বের শেষ ভরসা। সেটা নিয়ে বিছানায় গা এলাল বৃষ্টি। খানিক ইনস্টাগ্রাম ঘাঁটাখাঁটি করল। তারপর পাশে রেখে দিল ফোনটা। একটু চোখ বুজে শুয়ে থাকবে ঠিক করল। হঠাৎই একটা নোটিফিকেশন আসার শব্দ হল। আলস্যে ভর করে ফোনটা আবারও হাতে তুলে নিল বৃষ্টি। ফেসবুক-এর নোটিফিকেশন। একটা ফ্রেন্ড রিকোযে্ট এসেছে। অবহেলায় ক্লিক করে বৃষ্টি। সুজাতা সেন সেন্ড ইউ আ ফ্রেন্ড রিকোযে্ট।

বৃষ্টি উঠে বসে বিছানায়। মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে বৃষ্টির। অ্যাকসেপ্ট বাটনটা প্রেস করে। সুজাতার একটা খুব সুন্দর ছবি রয়েছে প্রোফাইলে। একটা ছোট্ট সাফল্যের আনন্দে মনটা ভরে ওঠে বৃষ্টির। এই প্রথম যেন একটা অন্য জগতের সঙ্গে যোগাযোগ হতে যাচ্ছে সুজাতার। আর তার সেতুটা তৈরি করেছে সে, অর্থাৎ বৃষ্টি। ভিডিযো কল বাটনটা টিপে দেয় বৃষ্টি। স্ক্রিনের ওপর ভেসে ওঠে সুজাতার হাস্যময় মুখ।

কেমন আছিস সোনা, বাড়িটা কী যে ফাঁকা লাগছে…। বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন সুজাতা। বৃষ্টিরও ভারি কান্না পাচ্ছিল, সে যথা সম্ভব সেটা চেপে নিয়ে বলে, কোথায় বাড়ি ছেড়ে গেছি আমি মা? এই আছি তোমার স্ক্রিনে।

বিষবৃক্ষ

ঘটনাটা ১৯৮১ সালের। সুজয় তখন ব্যাচেলার। চাকরি পেয়ে কলকাতা থেকে দিল্লি এসেছে বেশ কিছুদিন হল। অ্যান্ড্রুজগঞ্জে অমিতের সাথে মেসে থাকে। বাড়ি থেকে এসে মনটাও বেশ খারাপ লাগছিল। দিল্লিতে অমিতের বেশ কয়েক বছর হয়ে গেছে। একদিন সুজয় অমিতকে বলল দ্যাখ, একটু আশেপাশে বেড়াতে গেলে হয়। অমিতও রাজি হয়ে গেল। পরেরদিনই বেরিয়ে গেল হরিদ্বার ও ঋষিকেশের উদ্দেশে।

হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যখন যাচ্ছিল তখন বেশ ভালোই লাগছিল। সে সময় হরিদ্বারের চণ্ডী পাহাড়ে বা মনসাদেবী পাহাড়ে রোপওয়ে হয়নি। পায়ে হেঁটেই উঠতে হতো। প্রথম দিন মনসাদেবী পাহাড়ে চড়ে সুজয় বেশ আপ্লুত হল। একটা বেশ নতুন অনুভূতি। তাই অমিতকে বলল চল কাল খুব সকাল সকাল আমরা চণ্ডী পাহাড়ে চড়তে যাব।

দ্যাখ, অত সকালে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?

কিছু হবে না। চল তো।

পরের দিন সকালে চণ্ডী পাহাড়ে উঠতে গিয়ে একটা জিনিস লক্ষ্য করল। আর অন্য কোনও লোকজনই ওদের আশেপাশে নেই। তাই একটু অবাক হল। চণ্ডী পাহাড়ে উঠতে উঠতে হঠাৎ দেখতে পেল, কে যেন চিত্কার করে হিন্দিতে তাদের ডাকছে। ওপরে তাকিয়ে দেখল একজন সাধু কমণ্ডলু হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের উঁচু একটা জায়গায় আর তাদের নিষেধ করছে ওপরে যেতে। সেই সাধুটি চণ্ডী পাহাড় থেকে নামার সিঁড়ির ওপরের দিকে একজায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল।

তার হিন্দি থেকে যা বোঝা গেল, তা হল সাধুবাবা তাদের ওপরে উঠতে এখন নিষেধ করছে। ওরা দুজনেই কিছু বুঝতে না পেরে সেখানেই দাঁড়িয়ে গেল। এর মিনিট পাঁচেক পর আবার সেই সাধু চিত্কার করে তাদের জানাল যে, তারা এখন ওপরে উঠতে পারে। এসবের কিছু মাথামুণ্ডু বুঝতে না পেরে দুই বন্ধু আবার যাত্রা শুরু করল। হঠাৎ নজরে পড়ল, সিঁড়ির দুপাশের গাছপালা কেউ যেন দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে চলে গেছে। কিছু গাছপালা সিঁড়ির মাঝখানেও পড়ে আছে। দেখে মনে হবে কিছুক্ষণ আগে এখানে কেউ তোলপাড় করে গেছে। ওপরে উঠতে উঠতে সিঁড়ির মাঝপথেই দেখা হয়ে গেল সেই সাধুর সঙ্গে।

সাধু হিন্দিতে যা বললেন তা তরজমা করলে এরকম দাঁড়ায় দেখে তো তোমাদের লেখাপড়া জানা শিক্ষিত লোক বলে মনে হয়। এই পাহাড়ে অনেক জন্তু, জানোয়ার আছে। কাকভোরে এই পাহাড়ে আসা ঠিক নয়, এটাও কি তোমরা জানো না? দেখছ না আর অন্য কোনও লোক এই ত্রিসীমানায় নেই। তোমরা আজ বেঁচে গেলে। একটু আগে বুনো হাতির দল এখান দিয়ে যাওয়ার সময় সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেছে। আমি তোমাদের সতর্ক না করলে তোমরা ওই হাতিদের আক্রমণের শিকার হতে। এর পর থেকে আর এরকম ভুল কোরো না। সন্ধের পরেও এদিকে আসবে না। আর হ্যাঁ, তোমরা নতুন মনে হচ্ছে এখানে। ঋষিকেশ যাওয়ার পথে যে-জঙ্গলটা অতিক্রম করে যেতে হয়, তার ভেতরে ঢুকতে যেও না। যদিও পাশেই একটা ছোটো গ্রামে কিছু লোক বসবাস করে, তবে সেখানে না যাওয়াই ভালো। একথা বলেই সাধু সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল।

চণ্ডী পাহাড় থেকে ফিরে হর-কি-পৌরিতে স্নান সেরে দাদা বউদির হোটেলে সুস্বাদু খাবার খেয়ে দুজনেই হোটেলে ফিরে একটা ঘুম দিল। ঘুম থেকে উঠে দুজনে মিলে ঠিক করল আগামীকাল তারা গাড়ি নিয়ে ঋষিকেশ রওনা হবে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। পরের দিন গাড়িতে রওনা হল ঋষিকেশের উদ্দেশে।

অমিত পাকা ড্রাইভার, খালি রাস্তা পেয়ে গাড়ির গতিবেগ বাড়িয়ে দিল। সুজয় বলল অমিত অত জোরে চালাস না। তার ওপর গতকাল রাতে বৃষ্টি হয়ে রাস্তাও পেছল হয়ে আছে।

তুই ভাবিস না, আমি দিল্লির রাস্তায় চালিয়ে অভ্যস্ত। তুই একদম ভাবিস না।

কিছুদূর যাবার পর একটা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল। দুপাশে কয়েকটা হরিণও চোখে পড়ল। বাঁদরের পাল খাবারের উদ্দেশে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুজনেই এই প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে মোহিত হয়ে পড়েছিল। যখন দুজনেই গল্পে মশগুল, হঠাৎ অমিত ব্রেক কষল। হঠাৎ করে এমন ব্রেক মারাতে দুজনেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল।

গাড়ির সামনে হঠাৎ একজন বৃদ্ধ এসে গেছে। তাকেই বাঁচাতে এই ব্রেক মারতে হল। মনে হল বাঁচাতে পেরেছি। চল নীচে নেমে দেখি। দুজনেই তাড়াতাড়ি দরজা খুলে গাড়ির সামনে গিয়ে দেখল এক বৃদ্ধ পড়ে আছে গাড়ির সামনে।

চামড়া ঝুলে কুঁচকে গেছে। চোখের দৃষ্টি ঘষা কাচের মতো। মাথার চুলগুলো বেশিরভাগই পেকে সাদা। খুব বাঁচা বেঁচে গেছে। না, কোনও ক্ষতি হয়নি। উঠে বসার চেষ্টা করছে বৃদ্ধ লোকটি। গায়ে ছেলে ছোকরাদের হাফ শার্ট ও পরনে একটা

থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। এসব বেশি বয়সের জন্য বেমানান। কাঁপছে তার শরীর। সুজয় ও অমিত দুজনে তাকে তুলে বসাল। গাড়ি থেকে জলের বোতল বের করে খেতে দিল। মুখে, চোখে একটু জল ছিটিয়ে দিল। লক্ষ্য করল, লোকটা ঢকঢক করে বোতলের অর্ধেকের বেশি জল শেষ করে দিল। টেনে টেনে আস্তে আস্তে করে বলল ভুখ লাগা হ্যায়।

লোকটিকে দুজনে ধরাধরি করে নিয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে একটি গাছের নীচে হেলান দিয়ে বসাল। জায়গাটা বেশ ছায়াময়। বাতাসও বইছে। সুজয় গাড়ি থেকে কেক, বিস্কুট, জুস এনে খেতে দিল। গোগ্রাসে খেতে লাগল লোকটা। মুহূর্তের মধ্যে সব খাবার শেষ করে দিল। একটু সুস্থ হতেই বলল ম্যায় নেহি বাঁচ পঊঙ্গা (আমি বাঁচব না)। এরপর লোকটি হিন্দিতে যা যা বলল তার তরজমা করলে এরূপ দাঁড়ায়

কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে হয় মরে যাব।

কেন? তোমার তো চোট লাগেনি, অমিত প্রশ্ন করল।

যা দেখেছি, আমার চোখের সামনে যে আশ্চর্য রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে, তার ব্যাখ্যা আমার জানা নেই।

সুজয় জিজ্ঞাসা করল, কী ঘটনা? তুমি সুস্থ না হলে আমরাও যেতে পারছি না। আমরা জানতে চাই, কী সে রোমহর্ষক ঘটনা! আমাদের দুজনেরই শুনতে খুব ইচ্ছে করছে।

লোকটি কিছুক্ষণ গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে রইল, তারপর সহসাই চোখ মেলে তাকাল। বড়ো বড়ো দুটো চোখে আতঙ্কের ছায়া স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বলতে শুরু করল…

কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে হয় আমি মারা যাব। আমি যা দেখেছি, যা আমার চোখের সামনে ঘটেছে। এর কোনও ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই।

অমিত জিজ্ঞাসা করল কি ঘটনা? আমাদের বলুন।

সুজয় বলল, বুঝতে পারছি আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ঘটনাটা না শুনে যাওয়াটা ঠিক হবে না। লোকটা যেমন হিন্দি বলছেন তাতে একদম অশিক্ষিত বলে মনে হচ্ছে না তাঁকে। আপনি বলুন। আমরা শুনতে চাই।

আমার নাম রতন সিং। এখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে আমার খামারবাড়ি ছিল। পাহাড়ে আমার কিছু নিজের জমি আছে এবং কিছুটা লিজে নিয়েছি। সেখানে এই ঠান্ডায় বাঁধাকপি, ফুলকপি আর টম্যাটো লাগিয়েছিলাম। প্রতিবছর বেশ ভালো ফলন হয়। সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিল। একা সব সামলাতে পারি না বলে চাষবাসে সাহায্য করার জন্য কয়েকজন লোকও রেখেছিলাম। আমার ছোট্ট পরিবার, স্ত্রী আর একটি ছেলে। আমার বাড়িটা পাহাড়ের ঢালেই ছিল। ওপরে টালির ছাদ দেওয়া। সামনে সুন্দর ফুলের বাগান।

একদিন সন্ধেবেলা সব কাজকর্ম সেরে ফিরছি, হঠাৎ নজরে পড়ল আকাশ থেকে কী যেন একটা নীচের দিকে ধেয়ে আসছে। লাল রঙের আগুনের গোলক ছিল সেটা। আমার বাড়ির থেকে প্রায় দুশো গজ দূরে একটা ঝোপের মধ্যে এসে পড়ল সেটা। ঝপাৎ করে বেশ জোরে একটা শব্দ হল। ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবলাম আগুন না লেগে যায় চারিদিকে। কিন্তু না, তা হল না। মনে হল আগুনের পিণ্ডটা যেন নিভে গেছে। জায়গাটা দেখে রাখলাম। ঠিক করলাম, পরের দিন সকালে গিয়ে দেখতে হবে ওটা কী ছিল! শব্দটা শুনে মনে হল না যে ওটা ভেঙে গেছে। এমনকী আশেপাশে আগুনও ধরে যায়নি। এত রাতে জীবজন্তুর ভয়ে ওই ঝোপের দিকে যেতে সাহস হল না।

রাতটা বেশ দুঃশ্চিন্তা ও আতঙ্কে কাটালাম। স্ত্রী ও ছেলেকে রাতে ওই ঘটনার কথা জানাইনি। ভোর হতেই সূর্য ওঠার আগে পৌঁছে গেলাম ওই ঝোপের কাছে। চারিদিকে ফুলের বাহার দেখে মনটাও আনন্দে ভরে গিয়েছিল। খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। ওখানে একটা বেশ বড়ো স্বচ্ছ পাথরখণ্ড দেখতে পেয়ে অবাক হলাম। স্বচ্ছ পাথর খণ্ডের মধ্যে কালচে রঙের কী যেন দেখা যাচ্ছিল।

পাথরটা যেন কেমন আমায় টানছিল। একটা অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করলাম। দৌড়ে গিয়ে ওটা হাতে তুলে নিলাম। দেখে মনে হল মহাজাগতিক কোনও বস্তু এই প্রথম হাতে নিয়েছি। অনন্ত কোটি গ্রহাণুর কোনও একটির থেকে হয়তো খসে পড়েছে বলে নানারকম উদ্ভট কল্পনা মাথায় আসছিল। শরীরটা কেমন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। ইতিমধ্যেই সূর্য‌্য উদয় হয়েছে।

পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে আলো এসে আমার হাতের স্ফটিক খণ্ডটার ওপর পড়াতে ওটা যেন আরও ঝলমলে হয়ে উঠল। ভেতরের কালো জিনিসগুলো স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আগে যেগুলোকে কালো মনে হচ্ছিল সেগুলো সূর্য‌্যের আলোয় মনে হল বেদানার বীজের মতো লালচে রঙের। মনে মনে ভাবলাম, এগুলো অন্য কোনও গ্রহের গাছের বীজ নয়তো! আজকাল তো পৃথিবীর মতো দেখতে আরও অন্য গ্রহেও জীবন আছে বলে নানা পরীক্ষা চলছে। ভাবলাম তেমনও হতে পারে।

এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে স্ফটিকটা ভেঙে ফেললাম। ঘাসের ওপর ওটার টুকরোগুলো ছড়িয়ে পড়ল। বীজগুলোও চারিদিকে ছড়িয়ে গেল। ওগুলো দেখতে এতই অদ্ভুত ছিল যে, সেগুলো থেকে কেউ চোখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না। আমিও ওখান থেকে চারটে বীজ তুলে নিয়ে আমার ফতুয়ার পকেটে ঢুকিয়ে ফেললাম। পাথরগুলো এতই অসাধারণ ছিল যে সূর্য‌্যের আলোতে ওগুলো থেকে যেন দু্যতি ছড়িয়ে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল ওগুলো চুনি, পান্নার মতো দামি পাথর। ঠিক তখনই মাথার মধ্যে একটা ইচ্ছে জাগল। এগুলো যদি কোনও গাছের বীজ হয় তবে বীজগুলো রোপণ করেই দেখা যাক না। রোজ জল দিয়ে দেখব গাছ জন্মায় কিনা।

তখনও বুঝতে পারিনি যে, ওই বীজ রোপণ করাটাই আমার কাল হবে। চলে গেলাম আমার অন্য একটা জমিতে যেখানে অন্যান্য ফসল ফলাতাম। পাহাড়ের একটা ঢাল দেখে সেখানে গিয়ে খুরপি দিয়ে মাটি খুঁড়ে একটা বীজ পুঁতে দিলাম। জায়গাটা জল দিয়ে ভিজিয়ে ফিরে গেলাম নিজের আস্তানায়। ভাবলাম পরের দিন এসে আবার জল ঢেলে দেব।

পরের দিন সকালে উঠেই জল দিতে চলে গেলাম সেই জায়গায়। ওপর থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। পাহাড়ের নীচে আমার জমিটাতে আমার স্ত্রী, ছেলে ও কাজের লোকেরা জমি ও গাছের পরিচর‌্যা করে চলেছে। গতকালের বীজের জায়গাটায় পৌঁছে অবাক হয়ে গেলাম। গতকাল যে-বীজটা লাগিয়ে গিয়েছিলাম, সেটা থেকে একটা চারাগাছ হয়েছে। গাছের পাতাগুলো ভেলভেটের মতো। মনমাতানো তার অদ্ভুত রং। আমি এর আগে এমন গাছ কখনও দেখিনি। অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম গাছটার দিকে। তারপর জল ঢেলে ফিরে গেলাম অন্যান্য মজুরদের কাজকর্ম দেখতে।

পরের দিন আবার যখন সেখানে গাছটাতে জল দিতে গেলাম, অবাক করা কাণ্ড দেখতে পেলাম। দেখলাম গাছটা এই একদিনে আরও প্রায় তিন-চার হাত লম্বা হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকল গাছটার প্রতিদিন বেড়ে ওঠা। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে গাছটা বিশাল রূপ নিল। সূর্য‌্যের আলোয় দেখতে পেলাম গাছের পাতাগুলো অদ্ভুতরকম দ্যুতি ছড়াচ্ছে। সূর্য‌্যের রক্তিম ছটায় পাতাগুলো লাল হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন আগুন ছড়াচ্ছে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। গাছটা যেন আমাকে কেমন সম্মোহিত করে ফেলেছে। লাল রঙের ফুলও ফুটেছে।

গাছটাকে উঁচু পাহাড় থেকে কেমন লাগছে দেখতে দেখার জন্য একটু উঁচু জায়গায় উঠে গেলাম। গাছটাকে দেখতে দেখতে চোখ চলে গেল আমার খেতের দিকে। সেখানে আমার বউ, বাচ্চাকে দেখলাম ফসলের পরিচর‌্যা করে চলেছে। একবার ভেবেছিলাম, বাড়ির লোকেদের এই গাছটার কথা বলে দেব। আবার পরক্ষণেই ভাবলাম কয়েকদিন বাদেই সব জানিয়ে একটু অবাক করে দেব ওদের। পাহাড়ের চড়ায় উঠে গাছটাকে দেখলে দেখতে পেতাম এক অদ্ভুত দৃশ্য। মনে হতো গাছটা থেকে যেন সূর্য‌্যের সাত রং ছিটকে পড়ছে। দেখে মনে হতো, গাছটা রং বদলাচ্ছে। সকালে এক রং, দুপুরে অন্য রং আর বিকেলে আর এক অন্য রং। এমনকী সূর্য‌্যাস্তের পরও গাছের আশপাশটায় তীব্র আলো ছড়িয়ে থাকত। এরপর হঠাৎই ঘটল এক অঘটন।

সেদিনও আমি পাহাড়ের অন্য একটা চড়া থেকে গাছটাকে দেখছিলাম। কিছু বোঝার আগেই বিনা শব্দে বিস্ফোরিত হল গাছটা। গাছের ডালপালা, পাতা সবকিছু চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র কাণ্ডটা দাঁড়িয়ে আছে সোজা হয়ে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম গাছের কাণ্ডটার ভেতরের গর্ত থেকে গুবরে পোকার চেয়ে বড়ো বড়ো কিন্তু লাল রঙের পোকা বেরিয়ে আসছে লক্ষ লক্ষ নয়, কোটি কোটি। এ যেন আগ্নেয়গিরির লাভা। শেষ-ই হচ্ছে না। পোকাগুলো পিল পিল করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। পোকাগুলো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচের দিকে নেমে চলেছে। যেখান দিয়ে যাচ্ছে সেখানকার সব গাছপালা, ঝোপঝাড়, সবকিছুকে এমনকী ছোটো প্রাণীগুলোকেও নিমেষে ধ্বংস করে এগিয়ে চলেছে।

এই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে গেলাম, যখন দেখলাম ওই পোকাগুলো ঢালটা পেরিয়ে আমার খেতের দিকে, আমার বউ-বাচ্চার দিকে এগিয়ে চলেছে। চিত্কার করে

বউ-বাচ্চাকে সাবধান করার জন্য ডাকতে লাগলাম। কিন্তু আমার ডাক ওদের কানে পৌঁছোনোর আগেই আমার বউ, বাচ্চা, খেত সব কিছুকেই বন্যার জলের মতো ধ্বংস করে এগিয়ে যেতে লাগল প্রাণীগুলো। এ ধ্বংসলীলা সহ্য করার মতো শক্তি আমার ছিল না। ওগুলো যখন আমার জমি পেরিয়ে গেল, তখন দেখলাম কয়েকটা কঙ্কাল পড়ে আছে আর কিছু নেই। আমার ফসল, স্ত্রী, বাচ্চা কেউ আর বেঁচে নেই।

তবুও সাহস করে দৌড়ে নামতে গেলাম, আর তখনই দেখতে পেলাম পোকাগুলো শব্দ করে ফাটছে আর একরকম লালাজাতীয় রস বের করে মরে যাচ্ছে। এই বিভীষিকা মনের মধ্যে আর সহ্য করতে পারছিলাম না। পোকাগুলোই বা কেন মরল, বুঝতে পারলাম না। ভাবছিলাম ওগুলো তো মরল। একটু আগে মরলে আমার পরিবার ও ফসলগুলো বেঁচে যেত। কিন্তু আমাকে শেষ করে দিয়ে গেল।

অনুশোচনায় ভুগতে লাগলাম, আমি নিজেই এই বীজ বপন করেছি এই কথা ভেবে। আর এই বীজই আমার সব কিছু কেড়ে নিল। হাতের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেলাম। দেখলাম আমার হাতের চামড়া কুঁচকে গেছে নব্বই বছরের বৃদ্ধের মতো। দৌড়ে বাড়ি গেলাম। আয়নার সামনে নিজেকে দেখে চমকে উঠলাম। দেখে মনে হল আমি আর টগবগে ৩৫ বছরের যুবক নেই। আমার বয়স বেড়ে নব্বই হয়ে গেছে। এমনকী আমার কালো চুলগুলোও সাদা হয়ে গেছে। আমি নিজের এই দশা দেখে অসহায় বাচ্চার মতো কাঁদতে লাগলাম।

তখন মনে পড়ল, গাছটায় যখন বিস্ফোরণ হয় তখন ওখান থেকে নীলাভ আলো এসে আমার গায়ে লেগেছিল। নিজের এই অবস্থা দেখে নিজেকেই দোষী মনে হচ্ছিল। একবার ভাবলাম আত্মহত্যা করি কিন্তু শেষ অবধি করতে পারলাম না…। এই কথাগুলো বলার পর লোকটি হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।

গাছে হেলান দেওয়া অবস্থাতেই মারা গেল। হাতের মুঠোটা আপনা থেকেই খুলে গিয়ে কয়েকটা লাল স্ফটিকের মতো পাথর গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। দেখে মনে হচ্ছিল বেদানা ফলের বীজের মতো। ওগুলো বেশ চিকমিক করছিল।

সুজয় আর অমিত একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল সেদিকে। এটা কি গল্প ছিল, না সত্যি ঘটনা? নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না! সুজয় ওই বীজগুলোর দিকে হাত বাড়াতে যেতেই অমিত হাতটা চেপে ধরল সুজয়ের। চিত্কার করে উঠল, ওগুলো ছুঁতে যাস না। বিষবৃক্ষের ফল হতে পারে!

মাছি

ট্রেনটা আচমকাই ঘ্যাঁচ করে থেমে গেল। হুড়োহুড়ি পড়ে গেল যাত্রীদের মধ্যে। স্টেশন তো এখনও আসেনি। তাহলে? কী হল? নিশ্চয়ই কিছু একটা অঘটন ঘটেছে। কৌতুহলী কিছু যাত্রী দরজা থেকে উঁকি মারতে থাকল। কেটে গেল বেশ কিছুক্ষণ সময়। অধৈর্য হয়ে উঠল নীহার। এ শালা আচ্ছা জ্বালা হল তো। কী হবে এবার? এখান থেকে লিলুয়া স্টেশন খুব বেশি দূরে নয়, এখানটাই ফাঁসল! এদিকে মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপে ক্রমাগত মেসেজ এসে যাচ্ছে সুমনার। কী হল এখন কোথায়? প্লিজ তাড়াতাড়ি আসো। এতক্ষণ প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল নীহার। এই মেয়েটা বড্ড ক্রেজি। ভীষণ অধৈর্য। আজ সুমনার ফ্ল্যাটে যাচ্ছে নীহার। কারণ…। কারণ একটাই। সুমনা জানিয়েছে দুপুরে নীহারের নেমন্তন্ন।

প্রায় মিনিট পনেরো অপেক্ষা করার পর অনেকের মতোই ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে নামল নীহার। আর অপেক্ষা করা যাচ্ছে না। এবার বাকি রাস্তাটুকু হেঁটেই মারতে হবে। তারপর অন্য ট্রেন ধরে হাওড়া পৌঁছোতে হবে। লাইন বরাবর হাঁটতে হাঁটতেই সহযাত্রীদের মুখে শুনতে পেল ট্রেন থামার কারণটা। একজন ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়েছে। শোনামাত্র গা ঝিনঝিন করে উঠল। তারপরেই বিরক্তি। শালা ঝাঁপ দেওয়ার আর টাইম পেল না। ওদিকে সুমনা বসে রয়েছে। ভাবামাত্র ফেসবুক প্রোফাইলে সুমনার মুখ আর বুকের ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠল একঝলক। সবুজ চোখের মণি। ঘন চকোলেট কালারের লিপস্টিক। চওড়া কপাল। টাইট টি শার্টের আড়ালে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাওয়া একজোড়া বুক। সুমনার প্রোফাইলে অন্তত দুটো ফটো আছে বিভিন্ন পোজে। তার মধ্যে ক্লিভেজওলা ছবিও রয়েছে বেশ কিছু। এবং প্রতিটি ছবিতে দুশো-র ওপর লাইক। তার মধ্যে ‘সো হট’। ‘ইউ আর মোস্ট বিউটিফুল’, ‘তুমি কবিতার মতো সুন্দর’-এর পাশাপাশি ‘গ্ল্যামার কুইন’, ‘ক্রেজি’, ‘সুপার সেক্সি’ থেকে বিশুদ্ধ বাঙালে একটি আদিরসাত্মক কমেন্ট-ও আছে। এবং মজার কথা কোনও কমন্টে-ই ডিলিট করেনি সুমনা। বরং একাধিকবার রিপ্লাইতে প্রশংসাকারীদের নাম ট্যাগ করে ‘থ্যাংক ইউ’ লিখেছে সে। সুমনার ফটো অ্যালবামে তার ফ্যামিলির কোনও ছবি নেই। পুরোটাই তার নিজের রাজত্ব। পরিবারের প্রবেশ নিষেধ। এবং ইনফোতে ম্যারিটাল স্টেটাসে কিছুই নেই। তবে ওয়ার্কস অ্যাট অ্যাক্ট্রেস, মডেলিং। মডেলিং-এর ছবি প্রায় নেই বললেই চলে। যে দুটো রয়েছে তা দেখলে উত্তেজনা তো দূরের কথা হাসি চেপে রাখা দায় এমনই ভঙ্গি।

যাই হোক এই সুমনার সঙ্গেই একদিন বন্ধুত্ব হয়ে গেল ওয়ার্কস অ্যাট সি্্ক্রপ্ট রাইটার নীহারেন্দু সেনগুপ্তর। আজকাল মানুষের বন্ধুত্ব খুব দ্রুত হয়। প্রযুক্তি এসে সম্পর্ক তৈরি অনেক সোজা করে দিয়েছে। চোখের পলক পড়ার আগেই ঝ্যাট করে আজকাল ‘রিলেশন’ তৈরি হয়ে যায়। অ্যাড ফ্রেন্ড আর আনফ্রেন্ড দুটোই যেহেতু খুব পাশাপাশি এবং মাত্র একটা ক্লিকে সিদ্ধান্ত হয়ে যায় তাই রিলেশনের চাপ অনেকটা কমে গেছে। দায়ও।

নীহার বাঙালি হিসেবে বেশ সুপুরুষ। হাইট, চেস্ট, ওয়েস্ট থেকে একজন পুরুষের শরীরে আর যা যা শক্তসমর্থ হলে সে মেয়েদের কাছে সর্বান্তে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে তা সবই নীহারের রয়েছে। সুতরাং সেই সহজে বন্ধুত্ব করুন এর পৃথিবীতে নীহারের অনেক ফ্রেন্ড। বাংলা সিরিয়ালের নিরলস অন্তহীন চিত্রনাট্যের কলমকারি নীহারেন্দু বেশ কয়েকবছর ধরে টালিগঞ্জ পাড়ায় দুটো একটা রোলের জন্য বহু শ্রম পণ্ড করার পর হতাশায় যখন প্রায় ভেঙে পড়ছে, তখন তাকে এক শুভানুধ্যায়ী অলি পাব-এর এক সন্ধেয় বুঝিয়েছিল, দেখ সবাই জানে তুই দেখতে সুন্দর, ভয়েস ভালো। হয়তো সুযোগ পেলে অভিনয়টাও উতরে দিবি, কিন্তু কি জানিস এই লাইনে কোয়ালিটি কথা বলে না, কপাল কথা বলে। সুতরাং অন্যকিছু ভাব।

টালিগঞ্জ ছেড়ে দিতে বলছ?

না একেবারে ছাড়তে বলছি না, বলে একটু ভেবে নিয়ে সেই বন্ধু বলেছিল, তুই তো শখের কবি তাই না?

আজ্ঞে আমি নিজে বলতে চাই না। হেসে উত্তর দিয়েছিল নীহার।

শোন লিখতে যখন একটু আধটু পারিস তাহলে বিদ্যেটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা কর। বাংলা সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট লিখবি? কামাই মন্দ না।

কথাগুলো বছর দেড়েক আগের। তারপর একটা সময়ের পর টুকটাক কাজ পেতে শুরু করল। প্রচুর কিছু নয় তবে মোটামুটি নিজের খরচ চালিয়ে একটা বিয়ে করার স্বপ্ন দেখাই যেতে পারে এমন রোজগার মাস গেলে পকেটে ঢোকে।

ট্রেনের একেবারে সামনে আসতেই গা শিউরে উঠল নীহারের। রেলের লোক বডিটাকে লাইনের ভেতর থেকে টেনে বার করছে। তাকাব না ভেবেও স্বাভাবিক কৌতূহলে একবার চোখ পড়েই গেল শরীরটার দিকে। লাল রঙের শাড়ি আর ব্লাউজ পরা। বডিটাকে বার করে এনে কালো প্লাস্টিকে মুড়তে শুরু করল লোকগুলো। নীহার প্রাণপণে চাইছিল ওর নিজের পা দুটো সামনে এগোতে থাকুক আর চোখদুটো অন্যদিকে তাকাক। কিন্তু কিছুতেই পারছিল না। পাদুটো থেমে গিয়ে চোখদুটো সেই মেয়েটার শরীরে পড়ল। একঝলক দেখে মনে হল কোনও অঙ্গহানি হয়নি। মুখটাও অক্ষত। হয়তো মাথার পিছনে থেঁতলে গেছে। একগোছা চুল। মেয়েটার চোখদুটো খোলা, চওড়া কপালে খানিকটা লাল, রক্ত না সিঁদুর বোঝার উপায় নেই। আর তার চিবুকের সামনে একটা বড়ো আঁচিল। ওই অাঁচিলটাই মেয়েটার মুখের দিকে তাকালে সবার আগে চোখে পড়ে। অাঁচিলটা একবার উড়ে প্রমাণ করল, সে অাঁচিল নয় মাছি। বেশ বড়ো সাইজের মাছি। মহিলার সামনে একটা পাঁচ-ছয় বছরের বাচ্চা ছেলে প্রাণপণে চিৎকার করে কাঁদছে, ওকে জড়িয়ে ধরে রয়েছে আরপিএফ-এর একজন কর্মী। হয়তো ওই মহিলা ওই ছেলেটির মা ছিল। ছেলেকেও নিয়ে এসেছিল একসঙ্গে মরবে বলে। শেষ মুহূর্তে পারেনি। ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিজে লাইনে ঝাঁপ দিয়েছে। কান্নার মধ্যেও জ্বলছে ছেলেটার চোখদুটো। ওদের দুজনের পোশাক দেখে আন্দাজ করা যায় ভদ্র শিক্ষিত পরিবারের।

গা বমি বমি করতে থাকল নীহারেন্দুর। কেন্তু পেট তেমন ভর্তি নয় বলে শুধু ভেতর থেকে ঠেলা দিল, কিছু বেরোল না। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটা জ্যান্ত মেয়ে কালো প্লাস্টিকে চালান হয়ে গেল মর্গে। ওরও কি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ছিল? এক সঙ্গে সক্বলকে আনফ্রেন্ড করে চলে গেল কোন অভিমানে?

লিলুয়া স্টেশন পর্যন্ত হেঁটে এসে কর্ড লাইনের ট্রেনে উঠে বসল নীহার। ভেতরটা খুব অস্থির করছে। ঘাম হচ্ছে খুব।

হাওড়া স্টেশন পেৌঁছে মনে হল বাড়ি ফিরে যাই। কিন্তু ফেরার উপায় নেই। ফিরলে লস। সাবওয়ে পেরিয়ে একটা এয়ারকন্ডিশন বাসে চেপে বসল। প্রায় ঘণ্টা খানেকের রাস্তা এবার। গন্তব্য রুবি হসপিটালের কাছে অভিষিক্তা অ্যাপার্টমেন্ট।

নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের সামনে এসে কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলতে সামনে সুমনার মুখ। ওহ মাই গড তুমি এসে গেছ! বলে নিজের দুগালে দুই হাত রাখল সুমনা। এসো এসো ভেতরে এসো। নীহার হাসি মুখে ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকতেই গা গুলিয়ে উঠল নীহারের। ভেতরটায় মাছের আঁশটে গন্ধে ভর্তি।

আমি ভাবতেই পারছি না তুমি সত্যি সত্যি আসবে। বলে সুমনা বলল বসো বসো। আর ঠিক নীহার খেয়াল করল সুমনার চিবুকের ঠিক নীচে একটা আঁচিল। এটা তো আগে ছিল না…! নাকি ছিল ঠিক মনে পড়ছে না। সাধারণত মানুষের মুখের কোনও বৈশিষ্ট মনে থাকে সব থেকে বেশি। ফটোয় সুমনার মুখে কি এমন অাঁচিল ছিল আদৌ? মনে পড়ছে না।

সোফায় বসার পর সুমনা বলল আমার হেব্বি আনন্দ হচ্ছে। ইস্স তুমি খুব ঘেমে গেছ। শার্টটা ছেড়ে রাখতে পারো।

না না ঠিক আছে।

এসি চালিয়ে দেব?

না থাক।

এমনি জল খাবে নাকি কোল্ড ড্রিংক্স দেব?

এমনি জলই দাও।

এই তুমি কিন্তু খুব আনইজি ফিল করছ। বুঝতে পারছি। রিল্যাক্স করো।

উত্তরে সামান্য হাসল নীহার। তারপর বলল আমাকে টয়লেটটা কোনদিকে বলো। সুমনার মুখের দিকে তাকাতেই আবার চমকাল নীহার। এ কি! আঁচিলটা কই গেল? এসব কী হচ্ছে? ভালো করে সুমনার মুখের দিকে তাকাল নীহার, না সত্যিই নেই অাঁচিলটা। আশ্চর্য! এতক্ষণ ভুল দেখল!

সুমনার দেখিয়ে দেওয়া টয়লেটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বেসিনের কল খুলে বেশ ভালো করে মুখে ঘাড়ে জল দিল। আয়নার দিকে তাকাল। মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। পকেটের রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে যেতেই আবার সেই রেললাইনের নীচ থেকে বার করা মেয়েটাকে মনে পড়ল। অসহ্য! কেন যে মনে আসছে বারবার! অস্বস্তি লাগছে খুব। এমনিতে কোনও মহিলার ফ্ল্যাটে আসা নীহারের কাছে প্রথম নয়। এমনটা ও আগেও বেশ কয়েকজনের কাছে গেছে। এবং কোনওবারই খালি হাতে ফেরেনি। আজও ফিরবে না। এখানে দুপুরে সুমনার বানানো চর্ব্যচূষ্য খেয়ে তারপর কিছুক্ষণ বিশেষ কাজকর্ম সেরে দুজনে সুমনার গাড়িতে ঘুরতে বেরোবে। মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখে দামি কোনও রেস্তোরাঁতে বসে দুপেগ স্কচ-সহ দামি ডিনার সেরে বাড়ি ফেরা। পুরো খরচ সুমনার। এমনকী বাড়ি ফেরার সময়ে ওকে হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত লিফট দিয়ে দেবে এমনও বলে রেখেছে সুমনা।

কিন্তু তাও আজ মনে হচ্ছে পালাই পালাই। মুখ মুছতে মুছতে আবার নিজের দিকে তাকাল নীহার। না নিজের পৌরুষে এতটুকু ঘাটতি নেই। সারাদিনে ও কতবার যে নিজেকে দেখে এবং মুগ্ধ হয়। আর কখনও মনে পড়ে, আর কতদিন? নীহার একেক সময় নিজেও ভাবে নিজেকে নিয়ে একটু বেশিই মুগ্ধ ও। যে কারণে স্বাতী একদিন ওকে ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে বলে গেছিল, তুই নিজেকে এতটাই ভালোবাসিস, এতটাই ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে যে অন্যের ভালোবাসা বোঝার ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছিস।

তা শুনে হেসেছিল নীহার।

টয়লেট থেকে বেরিয়ে নীহার দেখল সুমনা সোফাতে পা গুটিয়ে বসে রয়েছে। সামনে টি টেবিলে রাখা দুটো কাচের গ্লাসে কোল্ড

ড্রিংক্স।

ওর পাশ দিয়ে উলটোদিকের সোফাতে বসার আগে নীহার আড় চোখে দেখতে পেল সুমনার ডিপ নেক টপের ফাঁক দিয়ে ফরসা ধবধবে বুকের খাঁজ দেখা যাচ্ছে।

এই নাও বলে সামনে ঝুঁকে নীহারকে গ্লাস দিল সুমনা। বুকের আরও কিছুটা স্পষ্ট হল এবং নীহারের যে সেদিকে চোখ পড়ল সেটার নজর এড়াল না ওর।

গ্লাসে চুমুক দিয়ে সুমনা বলল কী দেখছ?

তোমাদের ঘরটা। সুন্দর সাজানো।

আরে এটায় আমরা সবসময় থাকি না। আমাদের মেন ফ্ল্যাটটা এ ব্লকে। সেটা অনেক বড়ো আর টপফ্লোরে। এটা আমরা মাঝে মাঝে ব্যবহার করি, তেমন ফারনিশড নয়।

ও আচ্ছা বলে ড্রয়িংরুমটায় চোখ বোলাল নীহার। পেল্লায় ডবলডোর ফ্রিজ, ঢাউস এলইডি টিভি, এয়ার কন্ডিশন, তুলতুলে নরম সোফাসেট, আরও যা যা সব থাকলে একটা ড্রয়িং রুম থেকে বড়োলোক বড়োলোক গন্ধ বেরোয় তার সবই মজুত এখানে, এটাই যদি ট্রেলর হয় তাহলে আসলি সিনেমায় কত কী আছে!

তুমি কি আগে রেস্ট করে তারপর লাঞ্চ করবে?

না না ঠিক আছে তুমি ব্যস্ত হয়ো না।

পাশেই বেডরুম রয়েছে, চাইলে একটু শুয়ে নিতে পারো, বলে হাসল সুমনা।

আমি… কথাটা কমপ্লিট করতে পারল না নীহার। সুমনার চিবুকের নীচে আবার সেই আঁচিলটা ফিরে এসেছে। শুধু তাই নয় অল্প অল্প নড়াচড়া করছে। নীহার কথা থামিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল সেদিকে। আর তখনই সুমনা থুতনির সেই অাঁচিলে হাত রাখতেই অাঁচিলটা পালাল।

ধুউউসসস শালা মাছি! আশ্বস্ত হল নীহার। কী না কী ভাবতে শুরু করেছিল ও।

কিছু ভাবছ তুমি?

নাহ না তো।

আরে রিল্যাক্স করো বাবা। এই প্রথম তুমি এলে সহজে কিন্তু ছাড়ছি না।

থেকে যাব আজ?

থাকতেই পারো। নো প্রবলেম। আমার হাবি আসবে সেই পরশুদিন। বলে খিক খিক করে হাসল সুমনা।

সুমনার হাসিটা খেয়াল করল। একেবারে আকর্ণ হাসি যাকে বলে। দাঁতগুলো পরিপাটি কিন্তু আকারে বেশ বড়ো। নিয়মিত ফেসিয়াল করা চকচকে মুখ, তবু কপালে আড়াআড়ি শোওয়ানো তিনখানা ভাঁজ। আর স্লিভলেস টপের দুপাশ দিয়ে যে ফরসা হাতদুটো বেরিয়ে রয়েছে সেগুলো পেশল এবং শিরাওঠা, হাতের আঙুলগুলোও ছেলেদের মতো। এমন কেঠো হাত কোনও মেয়ের হয়? ভালো লাগায় হাতের মস্ত ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এই মেয়েটার হাতদুটো…। মনে মনে ঝিমোতে শুরু করে নীহার। সুমনার উপচে পড়া বুকও হাতের কাছে হার মানতে শুরু করে। কত বয়েস হতে পারে ওর? পঁয়তাল্লিশের কম তো নয়ই। নিয়মিত রূপচর্চা করে বোঝাই যায়, তবু বয়স এমনই, কীভাবে যেন নিজেকে নির্লজ্জের মতো জানিয়েই বসে।

নীহারের মন বসছে না। কিন্তু এমন হলে তো হবে না। শুধুমাত্র লাঞ্চের কারণে এই এতদূর উজিয়ে এখানে আসা নয়। পার্সের ভেতর দুখানা এক্সট্রাটাইম চকোলেট ফ্লেভারের প্যাকেট কচ কচ করছে, তারমধ্যে অ্যাটলিস্ট একখানা খরচ করতেই হবে।

এটা নীহারের নেশা। শুধু নতুন নতুন শরীর পাওয়া তা নয়, ও খুঁজে খুঁজে বার করে সেইসব মহিলাদের যারা নিঃসঙ্গ এবং ধনী। তারপর তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব জমিয়ে পাল্সটা বোঝার চেষ্টা করে। ফাতনা ফেলে ওয়েট করে। কখনও মাছ লাগে, তখন বিনামূল্যে শরীর পাওয়ার পাশাপাশি দামি গাড়িতে চেপে একটু আউটিং, দামি দোকানের নামি গিফ্ট, শার্ট কিংবা পারফিউম। দিব্যি লাগে। একটা খেলার মতো। লোকে যেমন অবসরে মোবাইলে ভিডিয়ো গেম খেলে ঠিক তেমনই। নিউ আলিপুরের এক বছর পঁয়তাল্লিশের মহিলা নাম ছিল আনন্দি চট্টরাজ, তার স্বামী কাজের সূত্রে দুবাইতে থাকেন। মহিলা নীহারকে নিয়ে শুধু শপিং করতে বেরোতেন। তাতেই তার আনন্দ। টাকার কুমির। দোকানে কিছু একটা পছন্দ হলে নীহারকে এমনভাবে জিজ্ঞাসা করত অ্যাই দ্যাখো এটা কিনব? যেন নীহারই ওর বিয়ে করা বর। নীহার না বললে যেন উনি কিনবেন না। মহিলা সেক্স-এ খুব একটা আগ্রহ দেখাতেন না। বলতেন ওসব ইচ্ছে ঘুচে গেছে। দু-একটা চুমুটুমু ব্যস। ওতেই খুশি। নীহার অনেককিছু পেয়েছিল সেই মহিলার কাছে। তারপর আর ভালো লাগছিল না। ততদিনে গড়িয়ার অর্পিতা বসুকে পেয়ে গেছিল।

নীহার কেন এমনটা করে? কী লাভ এই নিয়ে নিজের সঙ্গে অনেক কথা বলার পর ও মোটামুটি একটা যুক্তি খাড়া করেছে তা হল, বেশ করি, করি। শুধু ছেলেরাই কেন মেয়েদের জন্য পয়সা ওড়াবে? কেন তাদের একটু ছোঁয়া পাওয়ার জন্য কুকুরের মতো লেজ নেড়ে ল্যাও ল্যাও করবে? এটা আমার প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে প্রোটেস্ট। আমার অবসর বিনোদন। আমার পৌরুষ ফুরিয়ে যাওয়ার আগে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে এনজয় করা, ব্যস। নো আদার কোয়েশ্চেন প্লিজ।

বত্রিশ বছরের নীহার খুব চট করে বুঝে গেছে প্রেম, ভালোবাসা, বিবেক, নীতি এইসব শব্দগুলো আসলে এই যুগে কুসংস্কার।

তুমি কিন্তু হেবি হ্যান্ডসাম। কটা গার্লফ্রেন্ড আছে তোমার?

একটাও নেই?

বাজে কথা রাখো তো?

রিয়েলি নেই।

কেন?

কে অত হ্যাপা পোয়াবে?

তাও ঠিক। বলে হাসল সুমনা। তারপর বলল, তোমাকে ফেসবুকে যতটা সুন্দর দেখেছিলাম তার থেকেও বেশি সুন্দর তুমি।

থ্যাংক ইউ। অ্যান্ড সেম টু ইউ।

যাহ্ বাজে কথা! আমি মোটেও সুন্দরী নই।

কে বলে? তাকে একবার চিনিয়ে দেবে তো?

নীহারের কথায় হো হো করে হেসে উঠল সুমনা। গদগদ হয়ে বলল, আমার আগের ছবি দেখাব তোমাকে।

নীহার ড্রইং রুমে রাখা একটা কেয়ারি করা টেবিলের ওপর ফ্রেমে বাঁধানো ঘোড়ায় চাপা ছোটো ছেলের ফটোর দিকে আঙ্গুল তুলে জিজ্ঞাসা করল ওটা তোমার ছেলে?

হ্যাঁ ঠিক ধরেছ। তবে এখন আর অত ছোটো নেই। ক্লাস এইট হয়ে গেল। দার্জিলিঙে হোস্টেলে থাকে। আমার তো অনেক অল্পবয়সে বিয়ে হয়েছে। বলতে বলতে সুমনা উঠে এসে নীহারের পাশে এসে বসল। নীহার দেখল ফ্রেমের মধ্যে ঘোড়ায় চেপে বসা ছেলেটা ওর মায়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে। নীহার অন্যদিকে চোখ ফেরাল।

আমার না খুব ফ্যাট হয়ে যাচ্ছে জানো। তুমি কী সুন্দর ছিপছিপে আছ।

কোথায়? আমার কিন্তু ঠিকই লাগছে তোমাকে।

উহু বেলি ফ্যাট জমেছে অনেকটা।

বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু।

ভেতরে আছে বাবু, দেখতে পাবে, বলে ফিক করে হেসে সুমনা বলল আমি খাবার গরম করব তুমি চাইলে বেড রুমে একটু শুয়ে নিতে পারো ততক্ষণ।

ইঙ্গিত স্পষ্ট। কিন্তু কেন কে জানে আজ শালা সব ডাউন লাগছে।

তোমার হাতগুলো খুব সুন্দর। বলে সুমনা ওর নির্লোম পেশল হাত বাড়িয়ে নীহারের হাতের ওপর রেখে আলতো করে বোলাল। নীহার কিছুই ফিল করল না উপরন্তু আবার দেখতে পেল সেই মাছিটা কোথা থেকে ঘুরে ফিরে আবার সুমনার চিবুকে এসে বসেছে। নীহারকে দেখছে।

হাজব্যান্ডের দিন রাত কাজ, ছেলে হোস্টেলে থাকে। আমার এখন কাজ হয়েছে ফেসবুক ফ্রেন্ড বানানো আর তাদের সঙ্গে গল্প করা। চিবুক থেকে অবাধ্য মাছিটাকে তাড়ানোর চেষ্টা করল সুমনা। ভালোই লাগে। দিব্যি সময় কেটে যায়। মাছিটা চিবুক থেকে সরে কপালের ওপর বসল।

তুমি এত স্টিফ হয়ে আছ কেন? দাঁড়াও তোমাকে একটা জিনিস দেখাই। বলে উঠে পাশের ঘরে গেল সুমনা। নীহার আপ্রাণ নিজের মধ্যে যৌন উত্তেজনা আনার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। কিন্তু কিছুতেই সেই অনুভূতি আসছিল না। এমন নয় যে ওর প্রতিবারই অপ্সরা বিশেষ জোটে। অনেক সময়েই কিংবা বলতে গেলে…

ভাবতে ভাবতেই সুমনা ফিরে এল। হাতে মোটা একটা অ্যালবাম।

পাশে গা ঘেঁষে বসে বলল, আমার পোর্টফোলিও। দ্যাখো একবার।

দ্যাখাতে শুরু করল সুমনা। প্রতিটি ছবিই এত হাস্যকর এবং ভঙ্গিমায় এতটাই অশ্লীল যে সুমনার প্রতি করুণা লাগতে শুরু করল নীহারের। ফটো তো নয় যেন একেকটা কার্টুন। এত অখাদ্য কিন্তু সুমনা নিজের সেই ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে একের পর এক বলে চলেছিল… দ্যাখো দ্যাখো এই ছবিটা। কী ভালো লাগছে না… আমার তো দারুণ প্রিয় এটা। আর এটা দ্যাখো কত স্লিম ছিলাম আমি…। আর এইটায় হাসিটা…

নীহার আবার চোখ তুলল সুমনার দিকে। মাছিটা চিবুকের ওপর বসে নীহারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে একদৃষ্টে। ওটাকে এক থাপ্পড়ে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করল। সেটা করতে গিয়েও কোনওরকমে চেক করল নিজেকে। আবার চোখ গিয়ে পড়ল ফ্রেমে বসে থাকা সেই হাফপ্যান্ট পরা ছেলেটার দিকে। চোখদুটো কি একটু বেশি জ্বলজ্বল করছে!

উফ্ কী বারবার অন্যদিকে দেখছ? এদিকে দ্যাখো না, ভালো লাগছে না তোমার? জিজ্ঞসা করল সুমনা।

উঁ লাগছে তো। খুব সুন্দর। প্রাণপণ ভালো লাগার অভিনয় করে যেতে থাকল নীহার। বাহ্ খুব সুন্দর। …এটা আরও ভালো হয়েছে।

অ্যাই তোমার তো এই লাইনে অনেক যোগাযোগ রয়েছে। আমি অ্যাড ফিল্ম করতে চাই, আমাকে প্লিজ একটু যোগাযোগ করিয়ে দাও না।

যোগাযোগ? প্রশ্নটা সমেত সুমনার সবুজ কনট্যাক্ট লেন্স পরা মণিদুটোর দিকে তাকাল নীহার। চোখদুটোতে অস্থির অপেক্ষা উত্তর পাওয়ার।

আচ্ছা দেখছি। বলে আবার টেবিলে রাখা সেই ফটোর দিকে তাকাল। বাচ্চাটার চোখদুটো যেন ধক ধক করে জ্বলছে।

এই তুমি এবার ওই ঘরে চলো তো। বেডরুমে আয়েশ করে বসে বাকি কথা হবে এবার। খুব খুশি হয়ে নীহারের হাত টানল সুমনা। ঠিক তখনই সেই মাছিটা সুমনার গোটা মুখে চক্রাকারে ঘুরতে শুরু করল। আর আচমকাই নীহারের মনে হল এটা সেই মাছি নয় তো যেটা সেই ট্রেনের তলা থেকে বার করা লাশের মুখের ওপর বার বার উড়ে উড়ে বসছিল। সুমনা হাত নাড়িয়ে বিরক্তিকর মাছিটাকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করছিল ক্যাজুয়ালি। নীহার তখনই উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি চট করে একটু নীচ থেকে আসছি।

কেন কী হয়েছে?

আমার এক বন্ধু এখন নীচে দাঁড়িয়ে থাকার কথা, ও একটা স্ক্রিপ্ট দেবে আমাকে। ভুলেই গেছিলাম।

এখানে ডেকে নাও। এই গরমে আবার নীচে নামবে? বলে নীহারের হাত ধরল সুমনা। কনকনে ঠান্ডা হাত! শিউরে উঠে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল ও। না না এখনি আসছি বলে দরজা খুলে বেরোনোর আগে আবার সেই ফটোটার দিকে তাকাল একঝলক। শান্ত হয়ে এসেছে আবার চোখদুটো। হুড়মুড় করে নীচে নামতে থাকল নীহার। প্রায় ছুটে রাস্তায় নেমে পড়ে বার বার পিছনে তাকাচ্ছিল। মাছিটা ওকেও মৃত বলে ঘোষণা করার আগে এখান থেকে যেভাবে হোক পালাতেই হবে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব