দিল্লি এয়ারপোর্ট-এর অ্যারাইভাল টার্মিনাল দিয়ে বেরোতেই, সদ্য বিবাহিত বর-কনেকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এল শ্বশুরবাড়ির সকলে। ফুল দিয়ে সাজানো একটা ইনোভা অপেক্ষা করছিল ওদেরই জন্য। আর বরণের জিনিসপত্র নিয়ে গাড়ির সামনেই হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুজাতা।

তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হল। একমাত্র ছেলে অভিরূপের বিয়ে হবে, এই স্বপ্ন সেই কতবছর ধরে দেখে আসছিলেন সুজাতা। স্বামী বীরেন্দ্র দেখতে পেলেন না এটাই যা আক্ষেপের। অভি অবশ্য তার পছন্দের পাত্রীকেই বিয়ে করেছে। কর্মসূত্রে কলকাতায় কিছুদিন ছিল অভি। সেই কোম্পানিতেই কর্মরতা বৃষ্টির সঙ্গে প্রেম হয়ে যায় অভির। বছর দুয়েক আগে দিল্লিতে নিজের শহরে ফিরে এলেও, বৃষ্টি আর অভি, লং ডিস্ট্যান্স সম্পর্কটা সফল ভাবে রাখতে পেরেছিল।

কিন্তু শেষ অবধি সুজাতা একদিন ছেলেকে, ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বলেন কী বাপু তোদের এযুগের প্রেম বুঝি না। বিয়ে করে বৃষ্টিকে এ বাড়িতে নিয়ে চলে আসবি তা নয়, ফোনে আর ই-মেলে চলছে তোদের সম্পর্ক! মায়ের কাছে খোঁচা খেয়ে হয়তো শেষ অবধি একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় দুজনে।

বৃষ্টিকে আপাত ভাবে দেখলে একটু কেরিয়ারিস্ট-ই মনে হতে পারে। হবেই বা না কেন। তার মা মানসী রায় ভৌত বিজ্ঞানের শিক্ষিকা, বাবা প্রতুল রায় একজন অধ্যাপক। বাড়িতে বরাবরই পড়াশোনার আবহাওয়া। সফটওয্যার কোম্পনিতে বৃষ্টি জয়ে করার পর, তার দ্রুত উন্নতিই হয়েছে। অভির সঙ্গে প্রেমটা তার কাছে সত্যিই কেরিয়ারের মতো প্রায়োরিটি ছিল না।

বৃষ্টি একটু রিজার্ভ। আসলে বাড়িতে মা তাঁর কাজ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। বাবাও অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রটাতে নানা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। নানা বড়ো পদে তাঁর অধিষ্ঠান। ফলে সংসারে তেমন সময় দিতে পারেননি। বৃষ্টির সে অর্থে বন্ধুবান্ধবও নেই। যেটুকু যা আছে ওই সোশ্যাল সাইট-এ আর কর্মক্ষেত্রে।

অভি তুলনায় খুব প্রাণখোলা। হইচই করতে ভালোবাসে। আপাত গুরুগম্ভীর চেহারার হবু শ্বশুর-শাশুড়িকে কোন মন্ত্রবলে এমন পকেটস্থ করেছিল অভি, বৃষ্টি আজও তা জানে না। তবে এর সুফল মিলেছে দ্রুত। বৃষ্টির সঙ্গে অভির বিয়ে প্রস্তাবে আপত্তি করেননি মানসী ও প্রতুল। শুধু একটিবার মেয়েে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, কলকাতার কালচার ছেড়ে দিল্লিওয়ালাদের সঙ্গে অ্যাডজার্স্ট করতে পারবি তো মা? তোর শাশুড়ি কিন্তু একটু সেকেলে। বাড়ির বাইরে পা রাখেন না। পুজোপাট, ব্রত উপবাস নিয়ে কেটে যায়। পারবি তো মানাতে?

মায়ের এই সাবধান বাণী নিয়ে একেবারেই যে ভাবেনি বৃষ্টি, তা নয়। কিন্তু অভির সঙ্গে সম্পর্কটা অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। অভিকে স্বামী হিসাবে বরণ করলে, তার পরিবারকেও মেনে নিতে হবে। সুতরাং বৃষ্টি মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল। এই মুহূর্তে যে-মহিলা বধূবরণ করে তাকে ঘরে তুলছেন, এক নজরে তাঁকে খারাপ লাগেনি বৃষ্টির। সামান্য ভারিক্কি চেহারা, ফর্সা সুন্দর মুখশ্রী, দেখে বোঝা যায় কমবয়সে বেশ সুন্দরী ছিলেন। নিজের প্রতি তেমন মনযোগ দেননি বলে বয়সের চাইতে বেশি বয়স্ক দেখায়, কিংবা অকাল বৈধব্য তাঁকে বুড়িয়ে দিয়েছে।

চিত্তরঞ্জন পার্কের বাড়িতে পেঁছে আত্মীয়স্বজনরা নানা রকম আচার অনুষ্ঠান শুরু করল। খুব ক্লান্ত লাগছিল বৃষ্টির। একে বিয়ে ধকল, তারপর ভোরের ফ্লাইট, চোখ টেনে আসছিল। অভি ব্যাপারটা বুঝে আচার অনুষ্ঠান থামাতে বলার আগেই, সুজাতাদেবীই হই হই করে উঠলেন আত্মীয়দের উদ্দেশ্যে। আরে থামো তোমরা এবার। মেযোকে একটু বিশ্রাম দেবে না, নাকি? জার্নি করে এসেছে অত দূর থেকে।

বৃষ্টি রীতিমতো অবাক হল। সুজাতাদেবী সম্পর্কে তার ধারণা ছিল মহিলা একদম ওল্ড ফ্যাশনড। কিন্তু তিনিই যে ওর ত্রাণে এভাবে এগিয়ে আসবেন, এটা তার কাছে বেশ চমকপ্রদ।

দিন যায়, বৃষ্টি আর সুজাতা আজ গল্প করতে বসেছে। আত্মীয়স্বজনরা এক এক করে বিদায় নিয়েছে, এক সপ্তাহ ধরে বিয়ে হই হুল্লোড় সেরে। তাই আজ ফুরসত মিলেছে দুজনে মুখোমুখি বসার। অফিস থেকে কটা দিন ছুটি নিয়েছে বৃষ্টি আর অভি। তাদের প্ল্যান আছে হনিমুন সেরে আবার কাজে যোগ দেবে। বৃষ্টি কলকাতার অফিস থেকে ট্রান্সফার নিয়েছে গুরগাঁওতে। ফলে অভি আর বৃষ্টি এখন সহকর্মী।

কাজে যোগ দেওয়ার আগে হনিমুন করে মনটা ফ্রেশ করে নিতে হবে। অভি বলেছিল। সেইমতো তারা পরদিনই চলে যাচ্ছে মানালি। আজ ডাইনিং টেবল-এ টুকিটাকি সবজি কাটায় সাহায্য করছিল বৃষ্টি, তার শাশুড়িকে। খুবই চুপচাপ মানুষ। কথায় কথায় বৃষ্টি বোঝে, মানুষটা একটু নিঃসঙ্গও। সুজাতা বলেন, অভি সারাদিনের জন্য বেরিয়ে যায়। ফেরে সেই রাতে। সারাদিন আমি একাই থাকি। যাক, এখন তুই এসে গেছিস, মনের কথা বলার একটা লোক পেলাম। তুই কড়াইশুঁটিগুলো ছাড়া, আমি পুজোটা সেরে নিই। সকাল থেকে উপোস করে আছি।

বৃষ্টি আন্তরিকতার সঙ্গে বলে, কেন মা, উপোস করে পুজো করলে কি ঠাকুর বেশি খুশি হবেন? এবার থেকে এত উপোস কোরো না। অসুস্থ হয়ে পড়লে তো পুজোটাই করতে পারবে না। তাতে তো ঠাকুর আরও অসন্তুষ্ট হবেন, তাই না? সুজাতা হাসেন বৃষ্টির কথায়। বলেন, ওরে মেয়ে তুই ভালো যুক্তি দিয়েছিস তো! বেশ শুনব পরের বার থেকে তোর কথা। বৃষ্টির মাথায় আঙুল দিয়ে চুলে বিলি কেটে দেন সুজাতা। খুব অদ্ভুত একটা অনুভতি হয় বৃষ্টির। সত্যিই মা   দিন এ ভাবে তাকে আদর করেনি। সময়ই পেত না মা। আজ বৃষ্টির ভেতর থেকে যেন একটা স্নেহ-কাঙাল সত্তা বেরিয়ে আসতে চাইছে। কেন যেন খুব ভালোবেসে ফেলল সে সুজাতাদেবীকে।

মাসদুয়েক কেটে গেছে। বৃষ্টি আর অভি এখন একসঙ্গেই অফিস বেরোয়। সকালের দিকটায় তাই দম ফেলার ফুরসত পান না সুজাতা। ওদের ব্রেকফাস্ট বানিয়ে টিফিন প্যাক করে দেন। বৃষ্টি বার দুয়েক প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে বলেছিল, মা লাঞ্চটা বাইরেই করে নেব, তোমায় কষ্ট করতে হবে না। তা সে কথা কানেই নেন না সুজাতা। নিজে হাতে রান্না করে খাওয়ানোর মধ্যেই তাঁর তপ্তি।

আজ সান ডে। বৃষ্টি সবাইকে সারপ্রাইজ দেবে বলে আজ সুজাতাদেবীরও আগে ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে ঢুকেছে। আলুর পরোটা বানাবে বলে। সুজাতাদেবী আলুথালু শাড়ি সামলে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে অবাক। আরে তুই কেন এলি, একটা দিন ছুটি পাস। আমি করে দিচ্ছি। তুই যা বিশ্রাম নে। বৃষ্টি দুহাতে সুজাতাকে হাতে ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে বলে, চুপচাপ এখানে বসে থাকবে। আজ তোমার সান ডে। তুমি রেস্ট নেবে। এবেলার পুরো দাযিত্ব আমার। রাতে ডিনার বাইরে। সুজাতার কোনও ওজর আপত্তি শুনল না বৃষ্টি।

অভি শাশুড়ি-বউয়ে এই রাগ-অনুরাগের খেলা দেখে বেশ মজা পায়। সে বোঝে বৃষ্টির সঙ্গে সুজাতার একটা আলাদা ইকোয়েন কাজ করে। তাই মিটিমিটি হাসে, কিছু বলে না। ব্রেকফাস্টের পর বৃষ্টি চুপি চুপি সুজাতার কানের কাছে মুখ এনে বলে, আজ বিকেলে একটা জায়গায় তোমায় নিয়ে যাব। কাউকে কিছু বলবে না আগে থেকে। এমনকী তোমার ছেলেকেও নয়। সুজাতা বেশ অবাক। উত্তেজিত হয়ে বলতে যান, কোথায় নিয়ে যাবি রে বৃষ্টি! বৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে, চুপ জানতে পারবে সময় মতো।

একটা উবর বুক করতে করতে বৃষ্টি অভিকে বলে, আমি মা-কে নিয়ে একটু বেরোচ্ছি। তুমি রাত নটা নাগাদ চাইনিজ টেম্পল রেস্টুরেন্ট-এ একটা টেবিল বুক করে রাখো। ওখানেই তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে অভি কী, কেন এসব !9  করে না। সে বৃষ্টিকে ভালো মতোই চেনে। জানে  করেও লাভ হবে না। বৃষ্টির প্ল্যান আগে থেকে সে কিছুতেই বলে না। তাই সে সংক্ষেপে, যথা আজ্ঞা ম্যাডাম বলে নেটফ্লিক্স-এর নতুন সিরিজ-এ মনোনিবেশ করে।

উবরটা এসে একটা বিউটি পার্লারের সামনে দাঁড়ায়। সুজাতাকে সঙ্গে নিয়ে বৃষ্টি দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে পার্লারে। তারপর একজন বিউটিশিয়ানকে ইশারায় ডেকে, তাকে কী যেন বুঝিয়ে দেয়। সুজাতার অবাক হওয়ার আরও কিছুটা বাকি ছিল। বিউটিশিয়ান মেয়েটি সুজাতাকে বসিয়ে দেয় একটা ঘোরানো চেয়ারে। সুজাতা বৃষ্টিকে বলার চেষ্টা করেন, আরে কী হচ্ছে এসব! বৃষ্টি ঠোঁটে আঙুল রেখে কপট রাগের ভঙ্গি করে। তারপর হাসি মুখে বলে, এত সুন্দরী একজন মহিলা, এভাবে এলোঝেলো কেন থাকবে। চুপটি করে বসো। ওরা যা যা করছে করতে দাও।

সুজাতা আড়ষ্ট হয়ে বসলেও, আস্তে আস্তে শরীরে আরাম নেমে আসে। দুটি মেয়ে তাঁর মাথা হেলিয়ে বেসিনে শ্যাম্পু করে দিচ্ছে চুল। চোখ বুজে আসে সুজাতার। মেয়ে দুটি বলে, আন্টি আপকে বাল কিতনে সুন্দর হ্যায়, আপ স্পা করেঙ্গে তো অউর ভি সুন্দর হো জাযো। সুজাতা একটু হেসে ওদের হাতে নিজেকে সমর্পণ করেন।

চোখ বুজে চেয়ারে গা এলিয়ে কত কথা মনে পড়ে সুজাতার। তাঁর সেই বিয়ে দিনটা, কনের সাজে সাজা। তারপর বর্ধমানের মেয়ে দিল্লির প্রবাসী বাঙালি পরিবারে বউ হয়ে আসার কথা। তখন শরিকি বাড়িতে যৌথ পরিবারে থাকতেন সুজাতা। ভাসুর, দেওর, নিয়ে বিরাট পরিবার। সময়ই পেতেন না নিজের যত্ন নেওয়ার। স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেকে বড়ো করতে করতে আর সুযোগই পাননি নিজেকে সাজানোর। আজ ছেলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সিআর পার্কের এই ছিমছাম ফ্ল্যাটে অঢেল সময় সুজাতার হাতে কিন্তু কী আশ্চর‌্য সাজার ইচ্ছেটাই যেন মরে গেছে।

চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল বৃষ্টির ডাকে। দ্যাখো তো মা, তোমায় কত সুন্দর দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যেই শ্যাম্পু করা চুলে সুন্দর করে ইউ কেটে দিয়েছে পার্লার প্রসাধিকারা। ফেসিয়ালের প্রলেপ, আইব্রো, ওয়াক্সিং, সব নিখুঁত। সুজাতা নিজেকে পার্লারের আয়নায় দেখে হতবাক। এই ঘরের ছটা আয়নায় যার মুখ প্রতিবিম্বিত হচ্ছে, সত্যিই তিনি! বয়সটা যেন হঠাৎই কমে গেছে সুজাতার। কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। কথা হাতড়াচ্ছেন।

বৃষ্টি কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়েছে, মুগ্ধতা তার চোখে স্পষ্ট। বলে, এত সুন্দর তুমি, কেউ ভাবতে পারত। কী চেহারা করে রেখেছিলে নিজের! আমি কিন্তু ওজর শুনব না। প্রতি মাসে একবার করে এখানে আসবে তুমি। আমি কথা বলে রাখব। বৃষ্টির জোরের কাছে হার মেনেছেন সুজাতা। এই পাগলি মেয়ের যে কী করবে, আগে থেকে কিছু বোঝা যায় না।

পার্লার থেকে সুজাতা যখন বেরোলেন, অনেকেই যে তাঁকে দেখছে, তা টের পেতে তাঁর অসুবিধে হল না। একটা হালকা নীল শাড়ি পরে বেরিয়েছিলেন বাড়ি থেকে। বিধবা হওয়ার পর শুধু সাদাই পরতেন। কিন্তু অভি ওই বেশে মাকে দেখলেই কান্না জুড়ে দিত। তাই মনের সংস্কার কাটিয়ে খুব হালকা রঙের শাড়ি পরা শুরু করেছিলেন সুজাতা। আপাত ভাবে দেখলে তাঁকে সেকেলে ভাবতে পারে অন্যরা। কিন্তু সুজাতা নিজে জানেন, ভেতর থেকে তিনি অনেকের থেকে বেশি সংস্কারমুক্ত। সমাজের চাপে পড়ে কিছু নিয়ম তাঁকে মানতে হয়েছে ঠিকই কিন্তু সবেতে যে তাঁর সায় ছিল, তেমন নয়।

পার্লারে যে প্রায় তিন ঘন্টা অতিক্রান্ত হয়েছে তা এতক্ষণে খেয়াল হল সুজাতার। মণিবন্ধে বাঁধা ঘড়িটা দেখে তিনি বৃষ্টিকে তাড়া দিলেন, ওরে ভয়ংকর দেরি হয়ে গেল যে!

উফ্ কীসের দেরি মা। রাতে তো আর তোমায় রান্না করতে হচ্ছে না। আমরা বাইরে ডিনার করব বললাম না?

বৃষ্টি সুজাতাকে নিয়ে চাইনিজ টেম্পল রেস্তোরাঁয় ঢুকল। অভি ইতমধ্যেই পেঁছে অপেক্ষা করছে নির্দিষ্ট টেবিলে। এবার আরও একবার অবাক হওয়ার পালা সুজাতার, অভি ওদের দেখেই উঠে দাঁড়াল। এসো মা, এসব বৃষ্টির প্ল্যান, আমি করলে হইচই বাধাতে, বকতে। নাও এবার সামলাও তোমার বউমা-কে, বলে হাসতে থাকে অভি।

সুজাতা টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখেন একটা ঢাউস কেক-এ লেখা হ্যাপি বার্থডে মা। মোমবাতি আর বেলুন দিয়ে পার্সোনালাইজ করে এই টেবিলটা সাজানো। সুজাতা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দেখেন সে মিটিমিটি হাসছে। সুজাতার নিজের জন্মদিন মনেই থাকে না। এভাবে পালন করার তো প্রশ্নই নেই। অভি নির্ঘাৎ তারিখটা বলেছে বৃষ্টিকে। পরম মমতায় বৃষ্টিকে কাছে টেনে নেন সুজাতা। দ্যাখো তো পাগলির কাণ্ড! ইশ এই বয়েছে আমার জন্মদিন! লজ্জায় লাল হয়ে যান সুজাতা।

অভি এবার ভালো করে লক্ষ্য করে মা-কে, মা তুমি কী করেছ বলো তো। দারুণ গ্ল্যামারাস দেখাচ্ছে তোমাকে!

সারপ্রাইজ। বুঝলে অভিবাবু। মা-কে পার্লারে নিয়ে গেছিলাম আজ, হাসতে হাসতে বলে বৃষ্টি। গল্পে, আড্ডায় জমিয়ে খাওয়াদাওয়া করে তিনজনে। বৃষ্টি আসার পর যেন জীবনটাই বদলে গেছে সুজাতার। আর পাঁচ জায়গায় তিনি শোনেন শাশুড়ি-বউয়ে নাকি বনিবনা হয় না। বাড়িতে ঝগড়া, অশান্তিতে কাক চিল বসতে পারে না। কিন্তু তাঁর বেলায় ঘটেছে এর ঠিক উলটো। এই মেয়ে এতই আপন করে নিয়েছে তাঁকে, যেন নিজের মা।

সেদিন গা ধুয়ে টিভি-টা চালিয়েছেন। ছেলে-বউ এখনও অফিস থেকে ফেরেনি। ফোনটা বেজে উঠল সুজাতার। তাঁর ওই হাত দিয়ে সুইচ টেপা আদ্যিকালের ফোনটা ধরতে ধরতেই কেটে গেল। আবার নম্বর খুঁজে কল ব্যাক করা এক হয়রানি। ছেলে অনেকবার বলা সত্ত্বেও ফোন বদলাননি সুজাতা। তাঁর বাড়িতে এখনও একটা ল্যান্ড লাইন আছে। আত্মীয়স্বজনরা তাতেই ফোন করে। কিন্তু এই নম্বরটা কার? ফোনের কী টিপে হাতড়াতে গিয়ে আবার ফোন এল একই নম্বর থেকে। এবার আর দেরি হল না ধরতে। সুজাতা হ্যালো বলতেই ওপার থেকে ভেসে এল মানসীদেবীর গলা। খোঁজখবর নেওয়ার জন্য ফোন করেছেন। কুশল বিনিময় হল দুই বেয়ানে। তারপর মানসী একটু অভিমানের সুরেই যেন বললেন, কী জাদু করেছেন দিদি। মেযো তো বাপের বাড়ি আসার নামই করছে না, বলে হাসতে থাকলেন মানসী। হাসির আড়ালে অনুযোগটা কিন্তু চিনতে ভুল হল না সুজাতার। খুবই বিনীত ভাবে বললেন, খুব ভালো মেয়েটি আপনার দিদি। কী যে আপন করে নিয়েছে আমায়। তবে ওরা দুটিতে বড্ড ব্যস্ত। একটু সময় পেলে নিশ্চয়ই যাবে আপনার কাছে। আজ এলেই বলছি।

এরপর আরও কিছুক্ষণ চলল গল্পগাছা। তারপর আবার টিভি দেখায় মন দিলেন সুজাতা। কলিংবেল বাজল। ঝড়ের বেগে ঢুকল বৃষ্টি। মা চটপট তৈরি হও। বেরোব। শপিংয়ে যাব। এরকম প্রায়ই করে বৃষ্টি। কখনও তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে বাড়ি এসে শপিংয়ে নিয়ে যায় সুজাতাকে। কখনও আবার ফিল্ম দেখতে যায় দুজনে। এখানে বাংলা ছবি এলেই মাল্টিপ্লেক্স-এ টিকিট কাটে বৃষ্টি। অনলাইন-এ ওরা খুব চটপটে। ব্যাংক থেকে সিনেমার টিকিট সবই ফোন-এ করে। সুজাতা এসব ব্যাপারে ভীষণ আনাড়ি। তাই সভয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন ছেলে-বউয়ে কাণ্ড। ছেলে যতবারই বলেছে নতুন ফোন কিনে দিই, হাঁ হাঁ করে ওঠেন সুজাতা। বলেন, খেপেছিস। এই বয়সে কী করতে কী করে ফেলব। অত দামি ফোন। পাগল! আমার ওই সুইচ টেপা ফোনই ভালো।

কিন্তু এই আপত্তিও ধোপে টিকল না। আজ শপিংয়ের প্ল্যানটা বৃষ্টি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে করেছে। মল-এর একটা মোবাইল স্টোর-এ জোর করে ঢোকাল সুজাতাকে। তারপর বেশ দামি একটা অ্যান্ড্রয়ে ফোন একরকম জোর জবরদস্তি করে কিনে দিল বৃষ্টি। এটা তোমায় নিতেই হবে। কোনও কথা শুনব না, জোর করে বৃষ্টি। সুজাতা কী যে করবেন এই মেয়েকে নিয়ে ভেবেই পান না।

ফোন বাড়িতে আসার পরও সুজাতা যত্ন করে সেটাকে তুলে রেখে  দেন, কাজ চালান সেই পুরোনো ফোনটাতেই। বৃষ্টি ব্যাপারটা খেয়াল করে মৃদু ধমক লাগায় শাশুড়িকে, ব্যাপারটা কী! ফোন-টা তোমায় ব্যবহার করার জন্যই তো কিনে দিলাম নাকি?

ও আমার দ্বারায় হবে না। বলার চেষ্টা করেন সুজাতা।

আলবাত হবে। নিয়ে এসো ফোন। বৃষ্টি নাছোড়। এরপর সারা দুপুর ধরে চলল ফোন ব্যবহার করার টুকিটাকি শেখানো। সুজাতা ভুল করেন, হাসেন, বকুনি খান কিন্তু মনের ভেতর একটা ভারি ভালো লাগা কাজ করে। এই বয়সে পেঁছেও তিনি এদের বোঝা নন। ওনার প্রতি এদের অকৃত্তিম ভালোবাসা ভরিয়ে রাখে সুজাতাকে। বিয়ের পর ছেলে পর হয়ে যাবে, এরকম অমূলক ভয় তাঁর জীবনে কাজ করেনি। স্বামী হারিয়েছেন অল্প বয়সে ঠিকই, অনেক দুঃখ যন্ত্রণা পেরিয়েছেন এটাও ঠিক কিন্তু এখন তাঁর আর কোনও দুঃখ নেই, নিঃসঙ্গতা নেই। বৃষ্টি তাঁর জীবনের সব একাকীত্ব দূর করে দিয়েছে।

কিন্তু নিরবিচ্ছিন্ন দুঃখ যেমন মানুষের জীবনে থাকে না, সুখেরও সেটাই ধর্ম। একদিন বিকেলে সুজাতা ব্যস্ত স্যান্ডউইচ বানাতে, ছেলে-বউমা অফিস থেকে এসে যাবে। কলিংবেল বাজল। বৃষ্টি একাই ফিরেছে। সুজাতা বললেন, কইরে সে কোথায়?

বৃষ্টি ব্যাগটা সোফার উপর ছুড়ে দিয়ে গা এলিয়ে বসল। আসবে আসবে। আমি আগে বেরিয়েছি। আচ্ছা মা, তোমাকে একটা সিরিয়াস কথা বলার আছে, বলে বৃষ্টি।

কী কথা? বল শুনি। পাশে এসে বসেন সুজাতা।

আমায় ছমাসের জন্য চেন্নাই ব্রাঞ্চে পাঠানো হচ্ছে একটা বিশেষ কাজের দাযিত্ব দিয়ে পরশু সকালেই ফ্লাইট।

কথাটা শুনে সুজাতার মুখটা ম্লান হয়ে গেল। বৃষ্টিকে ছাড়া বাড়িটাই যেন আর বাড়ি মনে হবে না। মন খারাপ করা গলায় সুজাতা বললেন, তোকে ছাড়া আর কাউকে পেল না ওরা? অভিটাই বা কী! সে কী করে অফিসে? বলতে পারল না, আমি সদ্য বিয়ে করেছি, আমার বউ যাবে না?

বৃষ্টি হেসে ফেলে শাশুড়ির কথায়। মা এটা খুব প্রেস্টিজিয়াস ব্যাপার। আমার প্রমোশন হয়েছে। সেই জন্যই কোম্পানি আমায় দাযিত্ব দিয়ে পাঠাচ্ছে। এবার সুজাতা একটু ধাতস্থ হন। বলেন, কিন্তু তুই ছাড়া আমি তো খুব একলা হয়ে যাব রে।

কে বলল একলা হয়ে যাবে। তোমার ফোন আছে না!

সুজাতার বৃষ্টির কথাটা মোটেই গ্রহণযোগ্য মনে হল না। একজন মানুষের পরিপূরক কি কখনও একটা মোবাইল ফোন হতে পারে?

বৃষ্টি উৎসাহ নিয়ে বলে, মা এখন সোশ্যাল সাইট-এ। আজই তোমায় একটা অ্যাপ নামিয়ে দেব ফোন-এ। এর নাম ফেসবুক। দেখবে তোমার হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদেরও খুঁজে পাবে সেখানে। আরে সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পারের লোকেদেরও ওখানে চাক্ষুস দেখতে পাবে। তারপর করো না ভিডিযো চ্যাট, গল্প, আড্ডা। একটুও একা লাগবে না আর তোমার!

সুজাতা চুপ করে রইলেন। সত্যি বলতে কী, তাঁর মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেছে বৃষ্টির চেন্নাই যাওয়ার খবরে।

মা-কে রাজি করাতে বৃষ্টিরও খুব খারাপ লেগেছিল। চেন্নাইয়ে অ্যাপার্টমেন্ট-এ সে এখন একা। ভীষণ মিস করছে সুজাতাকে। হ্যাঁ অভিকে মিস করাটা আছে, কিন্তু সুজাতা তার মনে একটা অন্য জায়গা জুড়ে আছেন। এমন স্নেহ সে ছোটো থেকে পায়নি। এক সপ্তাহ হল এসেছে। কাজে যোগ দিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সারা সপ্তাহ ব্যস্ততায় এই একলা লাগাটা ফিল করেনি বৃষ্টি। কিন্তু আজ প্রথম উইক এন্ড-এ বেশ ফাঁকা ফাঁক লাগছে। অভির সঙ্গে কথা হয়েছে একটু আগে। মায়ের সঙ্গেও কিন্তু তাতে মনখারাপটা আরও বেড়ে গেছে।

মোবইলটা একাকিত্বের শেষ ভরসা। সেটা নিয়ে বিছানায় গা এলাল বৃষ্টি। খানিক ইনস্টাগ্রাম ঘাঁটাখাঁটি করল। তারপর পাশে রেখে দিল ফোনটা। একটু চোখ বুজে শুয়ে থাকবে ঠিক করল। হঠাৎই একটা নোটিফিকেশন আসার শব্দ হল। আলস্যে ভর করে ফোনটা আবারও হাতে তুলে নিল বৃষ্টি। ফেসবুক-এর নোটিফিকেশন। একটা ফ্রেন্ড রিকোযে্ট এসেছে। অবহেলায় ক্লিক করে বৃষ্টি। সুজাতা সেন সেন্ড ইউ আ ফ্রেন্ড রিকোযে্ট।

বৃষ্টি উঠে বসে বিছানায়। মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে বৃষ্টির। অ্যাকসেপ্ট বাটনটা প্রেস করে। সুজাতার একটা খুব সুন্দর ছবি রয়েছে প্রোফাইলে। একটা ছোট্ট সাফল্যের আনন্দে মনটা ভরে ওঠে বৃষ্টির। এই প্রথম যেন একটা অন্য জগতের সঙ্গে যোগাযোগ হতে যাচ্ছে সুজাতার। আর তার সেতুটা তৈরি করেছে সে, অর্থাৎ বৃষ্টি। ভিডিযো কল বাটনটা টিপে দেয় বৃষ্টি। স্ক্রিনের ওপর ভেসে ওঠে সুজাতার হাস্যময় মুখ।

কেমন আছিস সোনা, বাড়িটা কী যে ফাঁকা লাগছে…। বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন সুজাতা। বৃষ্টিরও ভারি কান্না পাচ্ছিল, সে যথা সম্ভব সেটা চেপে নিয়ে বলে, কোথায় বাড়ি ছেড়ে গেছি আমি মা? এই আছি তোমার স্ক্রিনে।

Tags:
COMMENT